১ লাখ ৭৫ হাজার মার্কিন ভিসা বাতিল করেছে ট্রাম্প প্রশাসন, হতে পারে নতুন রেকর্ড
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মেয়াদে ভিসা বাতিলের সংখ্যা নতুন রেকর্ডের দিকে এগোচ্ছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর।
সোমবার পররাষ্ট্র দপ্তর জানায়, ডোনাল্ড ট্রাম্প পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর এখন পর্যন্ত ১ লাখ ৭৫ হাজারের বেশি বিদেশি নাগরিকের মার্কিন ভিসা বাতিল করা হয়েছে।
তারা আরও জানায়, যারা ভিসার শর্ত লঙ্ঘন করেছেন, অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়েছেন, মার্কিন নাগরিকদের বিরুদ্ধে সহিংসতার উস্কানি দিয়েছেন, প্রতারণা করেছেন, অভিবাসন ব্যবস্থার অপব্যবহার করেছেন কিংবা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছেন—মূলত তাদেরই ভিসা বাতিল করা হয়েছে।
হংকংভিত্তিক সংবাদমাধ্যম 'সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট'-কে পররাষ্ট্র দপ্তরের এক মুখপাত্র জানান, ২০২৫ সালে ১ লাখের বেশি ভিসা বাতিল করা হয়েছিল, যা ছিল বার্ষিক হিসেবে সর্বোচ্চ রেকর্ড। তবে বর্তমান গতি বজায় থাকলে ২০২৬ সালে ভিসা বাতিলের সংখ্যা আগের সেই রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা করছেন তিনি।
যদিও পররাষ্ট্র দপ্তর ২০২৬ সালের সুনির্দিষ্ট হিসাব অথবা ভিসার ধরন ও নাগরিকত্বভিত্তিক আলাদা তথ্য প্রকাশ করেনি। তবে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরেই অতিরিক্ত প্রায় ৭৫ হাজার ভিসা বাতিল হয়েছে।
পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র জানান, প্রতিটি ঘটনা আলাদাভাবে পর্যালোচনা করেই ভিসা বাতিলের এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ভিসা বাতিল হওয়া ব্যক্তিদের ধরন বা দেশের কোনো পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হয়নি। এতে কেবল তাদেরকে 'বিদেশি নাগরিক' হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে উত্তর আফ্রিকার দেশগুলোর নাগরিকসহ বেশ কিছু ঘটনার কথা বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়, যার মধ্যে ইরানি, কুয়েতি, কিউবান এবং লাওতিয়ান নাগরিকদের মতো যেসব অভিবাসীদের ফেরত পাঠানো সম্ভব—এমন মামলাগুলোর উপর জোর দেওয়া হয়েছে।
পররাষ্ট্র দপ্তরের তথ্যপত্রে জানানো হয়েছে, 'অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের জেরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মুখোমুখি হওয়ায় এসব ভিসার বেশিরভাগ বাতিল করা হয়েছে। এর মধ্যে হামলা, মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানো, চুরি ও মাদক সংক্রান্ত অপরাধই প্রধান কারণ।'
তথ্যপত্রে আরও বলা হয়, 'অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানো, যৌন নির্যাতন, শিশু নির্যাতন, জালিয়াতি, আত্মসাৎ ও অন্যান্য অপরাধের কারণেও অনেক ভিসা বাতিল হয়েছে।'
একটি আলোচিত ঘটনার কথা এতে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়। মিনেসোটার সেন্ট পলের বাসিন্দা ৪২ বছর বয়সী হমং সম্প্রদায়ের ব্যক্তি তু লু ওয়াংকে জুলাই মাসে তার জন্মভূমি লাওসে ফেরত পাঠায় ট্রাম্প প্রশাসন।
২০০৬ সালে ১০ বছরের এক শিশুকে যৌন নির্যাতনের অপরাধে অভিযুক্ত ওয়াংকে গত জুনে ক্ষমা মঞ্জুর করেছিল মিনেসোটার এ সংক্রান্ত বোর্ড।
চলতি বছর জানুয়ারিতে পররাষ্ট্র দপ্তর জানায়, তারা ২০২৫ সালে এক লাখের বেশি ভিসা বাতিল করেছে। যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মুখোমুখি হওয়া প্রায় ৮ হাজার শিক্ষার্থী এবং বিশেষায়িত পেশায় নিয়োজিত ২ হাজার ৫০০ জন কর্মীর ভিসা।
অ্যাডভান্সিং জাস্টিস/এএজেসি-র ইমিগ্রেশন অ্যাডভোকেসি বিভাগের পরিচালক মার্টিন কিম বলেন, 'ভিসা বাতিলের এসব সিদ্ধান্ত ট্রাম্প প্রশাসনের সুপরিকল্পিত প্রক্রিয়ার অংশ। অভিবাসী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে আসা এবং বসবাস করা পুরোপুরি অসম্ভব করে তুলতেই এটি তৈরি করা হয়েছে।'
তিনি আরও বলেন, অভিবাসী কিংবা যারা আমেরিকান নাগরিকত্ব পেয়েছেন সকলের জন্যই অত্যন্ত প্রতিকূল ও অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি করা এদের মূল লক্ষ্য।
কিম উল্লেখ করেন, অনেক অভিবাসী তরুণ বয়সে হয়তো আইনি জটিলতা বা অপরাধের মুখোমুখি হয়েছিলেন, কিন্তু পরবর্তীতে তারা নিজেদের শুধরে নিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছেন এবং সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন।
তার মতে, ট্রাম্প প্রশাসন জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নয়, বরং অতীতে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হওয়ার যেকোনো ঘটনাকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে অভিবাসন ব্যবস্থার ওপর এমন আক্রমণ চালাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, 'কারা আমেরিকান হতে পারবে আর কারা পারবে না—এমন সেকেলে ও বৈষম্যমূলক ধারণার ওপর ভিত্তি করেই বর্তমান প্রশাসন এসব সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।'
বার্থ ট্যুরিজমের বিরুদ্ধে কড়াকড়ি
যদিও মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর বাতিল হওয়া ভিসার সুনির্দিষ্ট কোনো শ্রেণির কথা প্রকাশ করেনি, তবে এর মধ্যে বেশ কিছু ট্যুরিস্ট ভিসা ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পররাষ্ট্র দপ্তর জানায়, উত্তর আফ্রিকা অঞ্চলের একটি মার্কিন দূতাবাস থেকে 'বার্থ ট্যুরিজম' বা জন্মভিত্তিক নাগরিকত্ব ভ্রমণের অভিযোগে শতাধিক ভিসা বাতিল করা হয়েছে। প্রধানত যুক্তরাষ্ট্রে সন্তান জন্ম দিয়ে মার্কিন নাগরিকত্ব পাওয়ার উদ্দেশ্যে সফর করা অভিভাবকদের ক্ষেত্রে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
সম্প্রতি জন্মভিত্তিক নাগরিকত্ব সুবিধা সীমিত করার জন্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দুটি নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষরের পরই এ সংক্রান্ত ভিসা বাতিলের তথ্য প্রকাশ পেল। জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব সংক্রান্ত সাংবিধানিক অধিকার বহাল রেখে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট যে রায় দিয়েছিল, এরপর ট্রাম্প প্রশাসন এই পদক্ষেপ নিল।
নতুন আদেশগুলোর একটির অধীনে কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন তারা ভিসা যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া আরও জোরদার করেন এবং বার্থ ট্যুরিজমের সঙ্গে জড়িত সন্দেহভাজন চক্রগুলোর বিরুদ্ধে যেন তদন্ত হয়। এছাড়া যেসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এসব সুবিধা দেয় তাদের বিরুদ্ধে দেওয়ানি বা ফৌজদারি ব্যবস্থা গ্রহণের কথাও বলা হয়।
অপর নির্বাহী আদেশে সুপ্রিম কোর্টের রায় মেনে নিয়ে আইনগতভাবে আর কী কী অতিরিক্ত বিধিনিষেধ আরোপ করা সম্ভব, তা খতিয়ে দেখতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পুনরায় হোয়াইট হাউসে দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিনেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট একটি নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেছিলেন। এতে যেসব মা-বাবা অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন কিংবা দক্ষ কর্মী ও শিক্ষার্থীসহ সাময়িক ভিসায় অবস্থান করছেন—তাদের সন্তানরা মার্কিন ভূখণ্ডে জন্ম নিলেও নাগরিকত্বের সনদ না দিতে কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
তবে গত ৩০ জুন সুপ্রিম কোর্ট ৬-৩ সংখ্যাগরিষ্ঠতার এক রায়ে ট্রাম্পের এই চেষ্টা খারিজ করে দেয়। আদালত জানায়, ১৪তম সংশোধনী অনুযায়ী অবৈধ বা সাময়িকভাবে অবস্থানরত অভিভাবকদের সন্তানরাও যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণ করলে জন্মসূত্রেই নাগরিক বলে গণ্য হবে।
প্রশাসন শুরুতে অবৈধ অভিবাসীদের সন্তানদের বিষয়ে নজর দিলেও, তারা ক্রমান্বয়ে বার্থ ট্যুরিজম-এর ওপর—বিশেষত চীনা নাগরিকদের বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগের ওপর জোর দিতে শুরু করে।
রায়ের পর ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, 'জন্মভিত্তিক নাগরিকত্ব সংক্রান্ত এ বিশাল বিজয়ের জন্য আমি প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং মহান দেশ চীনকে অভিনন্দন জানাতে চাই!'
তবে সোমবার মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের দেয়া তথ্যে বাতিল করা ভিসার মধ্যে কোনো চীনা নাগরিক অন্তর্ভুক্ত ছিলেন কি না তা নির্দিষ্ট করে উল্লেখ করা হয়নি।
বার্থ ট্যুরিজম-এর নির্ভুল পরিমাপের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে কোনো কেন্দ্রীয় সরকারি তথ্যভাণ্ডার নেই। তবে প্রাপ্ত তথ্য ইঙ্গিত দেয়, যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর জন্ম নেওয়া মোট শিশুর তুলনায় এই সংখ্যা অত্যন্ত সামান্য।
পেনসিলভানিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির এক গবেষণায় যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে স্থায়ী ঠিকানা থাকা বিদেশি মায়েদের সন্তান জন্মদানের হার পর্যালোচনা করা হয়। এতে দেখা যায়, ২০১৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত যেকোনো একক বছরে যুক্তরাষ্ট্রে মোট সন্তান জন্মের মাত্র ০.৩ শতাংশেরও কম ছিল বার্থ ট্যুরিজম-এর অন্তর্ভুক্ত।
গত বছর পুনরায় দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে বৈধ ও অবৈধ উভয় ধরনের অভিবাসনের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। প্রশাসনের এই কড়া পদক্ষেপ বর্তমান অভিবাসন ব্যবস্থার প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলছে।
বৈধ অভিবাসন সীমিত করার পদক্ষেপ হিসেবে নতুন 'এইচ-ওয়ান বি' ভিসার আবেদন ফি বাড়িয়ে ১ লাখ মার্কিন ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে। পেশাদারদের ন্যূনতম বেতন স্কেল বৃদ্ধির প্রস্তাব এবং বিদেশি শিক্ষার্থী, সাংবাদিক ও বিনিময় কর্মসূচিতে যুক্ত ব্যক্তিদের জন্য ভিসা নীতি কঠোর করা হয়েছে।
গত জুনে যুক্তরাষ্ট্রের একটি কেন্দ্রীয় আদালত এই ১ লাখ ডলারের ফি বাতিল করে দেন। পরবর্তীতে ট্রাম্প প্রশাসন আদালতের সেই স্থগিতাদেশের ওপর বিরতি বা নতুন স্থগিতাদেশ চেয়ে আবেদন জানালে আদালত তা খারিজ করে দেন।
