সংকট বাড়লেই বাড়ে ট্রাম্পের মিথ্যাচার: ১০ বছর ফ্যাক্টচেক করে মিথ্যার ১৫ ধরন পেলেন সিএনএনের সাংবাদিক
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্যের তথ্য যাচাই করতে গিয়ে গত এক দশকে তার মিথ্যাচারের ধরন, রাজনৈতিক প্রভাব এবং তা জনসাধারণ ও গণমাধ্যম কীভাবে গ্রহণ করে—এসব নিয়ে নানা অভিজ্ঞতা হয়েছে সিএনএনের তথ্য যাচাই বিষয়ক প্রতিবেদক ড্যানিয়েল ডেলের। ট্রাম্পের মিথ্যাচার নিয়ে দীর্ঘদিনের কাজের অভিজ্ঞতা থেকে সম্প্রতি তিনি ১৫টি পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন।
২৭ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে ডেল জানান, ১০ বছর আগে টরন্টো স্টারের ওয়াশিংটন সংবাদদাতা থাকার সময় তিনি ট্রাম্পের বক্তব্যের তথ্য যাচাইয়ের কাজ শুরু করেছিলেন। তখন তিনি মনে করেছিলেন, এটি সাময়িক একটি কাজ হবে এবং ২০১৬ সালের নির্বাচনে ট্রাম্প হেরে যাবেন। পরে অবশ্য তার সেই ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়।
ডেলের মতে, গত এক দশকে ট্রাম্প অসংখ্য বিষয়ে ভুল ও মিথ্যা দাবি করে গেছেন। তার নিরলস অসততা যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্ব রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে।
২০২০ সালের নির্বাচনের দুই মাস আগে ট্রাম্পের প্রতিটি বক্তব্য যাচাইয়ের কাজ বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন ডেল। তার ভাষ্য, ট্রাম্প এত বেশি নির্বাচনী মিথ্যা বলছিলেন যে, সব বক্তব্য যাচাই করা তার পক্ষে শারীরিকভাবেই অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। ততদিনে ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ট্রাম্পের আট হাজার ৫০০টিরও বেশি মিথ্যা দাবি নথিবদ্ধ করেছিলেন তিনি।
২০২১ সালে ট্রাম্প ক্ষমতা ছাড়ার পর কিছুদিন এই কাজ থেকে বিরতি নেন ডেল। তবে দুই বছরেরও কম সময়ের মধ্যে ট্রাম্প আবারও সংবাদ শিরোনামে ফিরে আসেন। ২০২২ সালে তৃতীয়বারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দেওয়ার ভাষণেই ডেল ২০টির বেশি মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর দাবি শনাক্ত করেন।
সিএনএনে ২০১৯ সালে তথ্য যাচাই প্রতিবেদক হিসেবে যোগ দেওয়ার পর থেকে ডেল মূলত তথ্য ও মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য তুলে ধরার কাজ করে আসছেন। ট্রাম্পের বক্তব্য নিয়ে শত শত ঘণ্টা কাজের অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি তার পর্যবেক্ষণগুলো তুলে ধরেছেন।
ওয়াশিংটনে ট্রাম্পের মতো মিথ্যাবাদী আর নেই
ডেলের মতে, ওয়াশিংটনের অন্য রাজনীতিকরাও কখনো কখনো মিথ্যা বলেন। জো বাইডেন, জে ডি ভ্যান্স, কংগ্রেসের রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট সদস্য এবং মন্ত্রিসভার সদস্যদের মধ্যেও এমন নজির রয়েছে।
তবে তার মতে, ট্রাম্পের মতো এত ঘন ঘন, এত প্রকাশ্যভাবে এবং এত বেশি বিষয়ে মিথ্যা বলেন—এমন কোনো সরকারি কর্মকর্তা ওয়াশিংটনে নেই।
'সবাই তো মিথ্যা বলে'—এমন মন্তব্য করে ট্রাম্পের মিথ্যাচারকে যারা এড়িয়ে যান, তাদের সঙ্গে একমত নন ডেল। তার মতে, ট্রাম্প একজন বিরল রাজনৈতিক মিথ্যাবাদী, এমনকি তার মতো কাউকে সম্ভবত জীবনে একবারই দেখা যায়।
সংকট যত বড় হয়, ট্রাম্পের মিথ্যাও তত বাড়ে
ডেলের পর্যবেক্ষণ, রাজনৈতিক সংকটের সময় ট্রাম্প সবচেয়ে বড় মিথ্যাচারের ধারায় যান।
২০১৮ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন, ২০১৯ সালের ইউক্রেন কেলেঙ্কারি, ২০২০ সালের কোভিড-১৯ মহামারি এবং একই বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন—এসব রাজনৈতিক সংকটের সময় ট্রাম্পের মিথ্যাচার বেড়ে গিয়েছিল বলে উল্লেখ করেন ডেল।
তার মতে, ট্রাম্প যখন সমস্যায় পড়েন, তখন তিনি আরও বেশি অসততার আশ্রয় নেন। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে সেই অসততাই যখন তার সমস্যার কারণ হয়, তখনও তিনি মিথ্যা বলা থেকে বিরত থাকেন না।
সবচেয়ে ছোট মিথ্যাগুলোই ট্রাম্পকে সবচেয়ে বেশি আলাদা করেছে
ডেলের মতে, ট্রাম্পের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো তিনি শুধু বড় রাজনৈতিক বিষয়েই মিথ্যা বলেন না; অত্যন্ত তুচ্ছ বিষয় নিয়েও মিথ্যা বলেন।
উদাহরণ হিসেবে তিনি ট্রাম্পের দাবি করা একটি ফোনকলের কথা উল্লেখ করেছেন, যা আসলে কখনো আসেনি। ট্রাম্প মিশিগানের 'ম্যান অব দ্য ইয়ার' পুরস্কার পাওয়ার দাবিও করেছিলেন, যদিও এমন কোনো পুরস্কার তিনি পাননি বলে ডেল উল্লেখ করেন।
এ ছাড়া কোনো অনুষ্ঠানের ভেন্যুতে আসন খালি থাকার বিষয়েও ট্রাম্প এমন দাবি করেছেন, যেখানে খালি আসনগুলো দৃশ্যমান ছিল।
ডেলের মতে, এসব বিষয় মোটেও গুরুত্বপূর্ণ নয়। কিন্তু ট্রাম্প সেগুলো নিয়েও গল্প বানিয়েছেন—এটাই তাকে অন্য রাজনীতিকদের থেকে আলাদা করে।
ট্রাম্প একই মিথ্যা বারবার বলেন
ডেলের মতে, ট্রাম্পের মিথ্যাগুলো খণ্ডন করার ক্ষেত্রে তার একটি 'সুবিধা' হলো—ট্রাম্প একই অসত্য কথা বারবার বলেন।
প্রথমবার কোনো মিথ্যা যাচাই করতে সময় লাগলেও দশম বা শততমবার সেটি বলা হলে তথ্য যাচাইকারীদের জন্য বিষয়টি সহজ হয়ে যায়। কারণ আগের যাচাইয়ের তথ্য তাদের কাছে থাকে।
ডেলের ভাষ্য, কিছু মিথ্যার ক্ষেত্রে সত্যিই এমন হয়েছে যে ট্রাম্প একই দাবি শততমবারও করেছেন।
ট্রাম্পের মিথ্যা বলার কিছু বিশেষ লক্ষণ আছে
ডেল মনে করেন, ট্রাম্পের কিছু গল্প শুনলেই বোঝা যায় যে তিনি সম্ভবত মিথ্যা বলছেন।
তার মতে, ট্রাম্প যদি এমন কোনো গল্প বলেন, যেখানে কোনো অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি তাকে 'স্যার' বলে সম্বোধন করেছেন, তাহলে সেই গল্পটি প্রায়ই কাল্পনিক হয়।
এ ছাড়া তার সামনে শক্তসমর্থ শ্রমজীবী পুরুষেরা কেঁদেছেন অথবা তার সমালোচকদের কেউ এসে তার কাছে অনুনয় করেছেন—এমন গল্পের বড় একটি অংশও সন্দেহজনক বলে মনে করেন ডেল।
তার মতে, এসব গল্পে ট্রাম্পকে এমন একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়, যার সামনে অন্যরা নতজানু হন।
ট্রাম্পের ব্যবহৃত জরিপের তথ্যগুলোও সন্দেহজনক
নির্বাচনী জরিপ, মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ, জ্বালানির দাম, পররাষ্ট্রনীতি কিংবা জনসমাগম—প্রায় সব ধরনের পরিসংখ্যান ব্যবহারের ক্ষেত্রেই ট্রাম্প ভুল করেন বলে মনে করেন ডেল।
তার মতে, এমনকি কোনো সঠিক পরিসংখ্যান ট্রাম্পকে ভালোভাবে উপস্থাপন করলেও তিনি প্রায়ই তার চেয়ে বেশি সুবিধাজনক একটি ভুল সংখ্যা বেছে নেন।
ডেল এ ক্ষেত্রে ট্রাম্পের ব্যবসায়ী জীবনের প্রসঙ্গও টেনেছেন। তার মতে, নিজের টেলিভিশন অনুষ্ঠানের দর্শকসংখ্যা কিংবা ভবনের আকার বাড়িয়ে বলার প্রবণতার মতোই রাজনৈতিক বক্তব্যেও ট্রাম্প প্রায়ই বাস্তবতার চেয়ে বড় সংখ্যা ব্যবহার করেন।
ট্রাম্প শুধু মিথ্যা ছড়ান না, অন্যের মিথ্যাও বিশ্বাস করেন
ডেলের মতে, ট্রাম্প নিজের রাজনৈতিক সুবিধার জন্য শত শত মিথ্যা তৈরি করেছেন। তবে অন্যদের ছড়ানো নানা হাস্যকর ষড়যন্ত্রতত্ত্বও তিনি প্রচার করেন এবং অনেক সময় সেগুলো সত্যিই বিশ্বাস করেন বলে মনে হয়।
ডেলের মতে, বিষয়টি আরও উদ্বেগের। কারণ বিশ্বের অন্যতম ক্ষমতাধর ব্যক্তি হওয়া সত্ত্বেও ট্রাম্পের প্রয়োজন হলে সীমাহীন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তারপরও তিনি শুধু মিথ্যা তথ্য তৈরি করেন না, অন্যদের ছড়ানো মিথ্যা তথ্যেরও শিকার হন।
তথ্য যাচাই সম্পর্কে ট্রাম্প জানেন, কিন্তু পাত্তা দেন না
ডেলের মতে, ট্রাম্প তথ্য যাচাই সম্পর্কে অবগত। কিন্তু তার বক্তব্য সংশোধন করা হলেও তিনি অনেক সময় সেই মিথ্যাই আবার বলেন।
উদাহরণ হিসেবে ডেল ট্রাম্পের সেই দাবি উল্লেখ করেন, যেখানে ট্রাম্প বলেছিলেন বাইডেন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতির সময় প্রেসিডেন্ট ছিলেন।
অনেকে এই দাবিকে ভুল বলে সংশোধন করার কথা ট্রাম্প নিজেই উল্লেখ করেছেন। কিন্তু এরপরও তিনি একই দাবি আবার করেছেন।
ডেলের উদ্ধৃতি অনুযায়ী, ট্রাম্প একবার বলেন, 'কিছু মানুষ আমাকে সংশোধন করবে, কারণ তারা সবসময় আমাকে সংশোধন করতে ভালোবাসে, যদিও সবকিছুতেই আমি ঠিক।'
ডেলের মতে, এভাবে ট্রাম্প একটি মিথ্যার ওপর আরেকটি মিথ্যা যোগ করেন।
ট্রাম্পের চারপাশে এখন তার মিথ্যাকে সমর্থনকারীরাও আছেন
ডেলের মতে, ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা তার মিথ্যা নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্ন এড়িয়ে যেতেন। কারণ যা রক্ষা করার উপায় নেই, তা রক্ষা করা কঠিন।
কিন্তু এখন ট্রাম্প এমন লোকজন দিয়ে নিজেকে ঘিরে রেখেছেন, যারা তার বক্তব্য সমর্থন করতে প্রস্তুত।
ডেল বলেন, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে সরকারি মুখপাত্ররা এমন বিষয়েও তাকে 'সঠিক' বলে ঘোষণা করছেন, যেসব বিষয়ে তিনি স্পষ্টতই ভুল।
তার মতে, বর্তমানে ট্রাম্পের অনুগতদের প্রভাবাধীন রিপাবলিকান রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে মূলধারার সংবাদমাধ্যমের সামনে নিজের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন করে ট্রাম্পের পক্ষে অবস্থান নেওয়া ক্যারিয়ার ধ্বংসের কারণ হচ্ছে না।
ট্রাম্পের মিথ্যাচার মোকাবিলায় গণমাধ্যমও যথেষ্ট সফল নয়
ডেলের মতে, ট্রাম্পপন্থী সংবাদমাধ্যমগুলো তার মিথ্যা নিয়ে আলোচনা করতে খুব একটা আগ্রহী নয়। তবে অপেক্ষাকৃত নিরপেক্ষ সংবাদমাধ্যমও এ ক্ষেত্রে নিয়মিত ব্যর্থ হয়েছে।
ডেল বলেন, ট্রাম্পের প্রকাশ্য মিথ্যা নিয়ে সংবাদ প্রকাশের সময় অনেক ক্ষেত্রে তার অসততার বিষয়টি শুধু দায়সারাভাবে উল্লেখ করা হয়, অথবা একেবারেই করা হয় না। অনেক সময় তার মিথ্যা বক্তব্যও সেগুলো যে ভুল, তা ব্যাখ্যা না করেই উদ্ধৃত করা হয়।
এর পেছনে পুরোনো অভ্যাস, ট্রাম্পের কারণে তৈরি হওয়া বিপুলসংখ্যক তাৎক্ষণিক সংবাদ এবং সাংবাদিকের সংখ্যা কমে যাওয়াসহ বিভিন্ন কারণ রয়েছে বলে মনে করেন ডেল।
তার মতে, ট্রাম্পের বিপুল পরিমাণ ভুল তথ্য ছড়ানোর প্রবণতা সংবাদমাধ্যমের জন্য এক ধরনের 'পরিষেবা অচল করে দেওয়ার আক্রমণের' মতো কাজ করে। একটি মিথ্যা ব্যাপক কাভারেজ পেলেও বছরের পর বছর প্রতি সপ্তাহে অসংখ্য মিথ্যা বলা হলে সেগুলো একপর্যায়ে সংবাদমাধ্যমের কাছে 'পেছনের শব্দের' মতো হয়ে যায়।
ডেলের মতে, ট্রাম্পের সাবেক হোয়াইট হাউস কর্মকর্তা স্টিভ ব্যানন ২০১৮ সালে যে কৌশলকে 'এলাকাজুড়ে বিষ্ঠা ছড়িয়ে দাও' হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন, তা কার্যকর হয়েছে। এর ফলে বিপুলসংখ্যক মিথ্যা প্রায় কোনো চ্যালেঞ্জ ছাড়াই জনপরিসরের আলোচনায় ঢুকে পড়েছে।
ট্রাম্পের মিথ্যাচার নিয়ে অনেক মানুষই উদ্বিগ্ন
ডেল বলেন, ট্রাম্পের মিথ্যাচার নিয়ে তার কাজের বিষয়ে বক্তৃতা দেওয়ার সময় শ্রোতাদের সবচেয়ে সাধারণ প্রশ্নগুলোর একটি হলো—'কেউ কি আসলেই এসব নিয়ে মাথা ঘামায়?'
ডেলের মতে, এই ধারণাও সঠিক নয়।
তিনি বলেন, লাখ লাখ আমেরিকান হয় মূলধারার সংবাদমাধ্যমের তথ্য খণ্ডন বিশ্বাস করেন না, অথবা সেগুলো নিয়ে আগ্রহী নন। তবে একই সঙ্গে লাখ লাখ আমেরিকান জানতে চান, প্রেসিডেন্ট কখন এবং কীভাবে তাদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছেন।
ডেলের মতে, ট্রাম্পের পুরো রাজনৈতিক ক্যারিয়ারজুড়ে পরিচালিত জনমত জরিপগুলোতে তাকে সৎ ও বিশ্বাসযোগ্য মনে করেন—এমন মানুষের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ মানুষ তাকে সৎ ও বিশ্বাসযোগ্য মনে করেন না।
তবে ট্রাম্প দুটি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন উল্লেখ করে ডেল বলেন, এর অর্থ এই নয় যে তিনি পুরো জনগোষ্ঠীকে তার সত্যবাদিতা নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়া থেকে বিরত রাখতে পেরেছেন।
অনেকেই ট্রাম্পের মিথ্যাচার পছন্দও করেন
ডেলের সাংবাদিকতা জীবনের উল্লেখযোগ্য অভিজ্ঞতাগুলোর একটি ছিল ২০১৭ সালে ওহাইওর দুটি ট্রাম্প-সমর্থক এলাকায় প্রতিবেদন করতে যাওয়া।
সেখানে ট্রাম্পের সমর্থকদের অনেকেই তাকে বলেছেন, তারা শুধু ট্রাম্পের মিথ্যা বলাকে মেনে নেন তা নয়, বরং তা পছন্দও করেন। কারণ তাদের কাছে এটি প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে উসকে দেওয়ার একটি উপায়।
ডেলের বর্ণনা অনুযায়ী, এক ব্যক্তি তাকে বলেছিলেন, 'বছরের পর বছর আমরা ওয়াশিংটনে এত বাজে জিনিস দেখেছি, আর এখন এমন একজনকে পেয়েছি, যে তাদের ভালোভাবেই নাড়িয়ে দিচ্ছে।'
ডেল বলেন, ট্রাম্পের অনেক সমর্থক হয়তো জানেন না যে তিনি মিথ্যা বলছেন। আবার কেউ কেউ মনে করেন, ট্রাম্পের নীতিগত অবস্থান তার অসততার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তবে ডেলের মতে, ট্রাম্পের সমর্থকদের মধ্যে এমন একটি অংশও রয়েছে, যারা অসততাকে পছন্দ করেন—অন্তত সেই অসততা যখন তাদের অপছন্দের মানুষদের লক্ষ্য করে করা হয়।
রাখঢাকহীন বক্তব্য মিথ্যাবাদী রাজনীতিককেও সৎ হিসেবে তুলে ধরতে পারে
ডেল বলেন, তিনি প্রথম ঘনঘন মিথ্যা বলা যে রাজনৈতিক নেতাকে নিয়ে কাজ করেছিলেন, তিনি ছিলেন টরন্টোর সাবেক মেয়র রব ফোর্ড।
তার অভিজ্ঞতায়, কোনো রাজনীতিক যদি এমন ধারণা তৈরি করতে পারেন যে তিনি নিজের মনের কথা অকপটে বলেন, তাহলে তার বক্তব্যের বড় একটি অংশ সত্য না হলেও অনেক মানুষ তাকে সৎ মনে করতে পারেন।
ডেলের মতে, ট্রাম্প সততার জনমত জরিপে বরাবরই খারাপ ফল করেছেন। তবে তার অপমাননির্ভর এবং প্রস্তুত করা বক্তব্য অনুসরণ না করে নিজের মতো করে কথা বলার ধরনও জনগোষ্ঠীর একটি অংশকে তাকে বিশেষভাবে সত্যবাদী মনে করতে সাহায্য করেছে।
ট্রাম্পের সবচেয়ে ক্ষতিকর মিথ্যাগুলো দ্রব্যমূল্য নিয়ে
ডেলের মতে, ট্রাম্প যখন দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে কোনো সামরিক চুক্তি, কানাডার কৃষিনীতি কিংবা কোনো ডেমোক্র্যাটের কর্মকাণ্ড নিয়ে মিথ্যা বলেন, তখন সাধারণ ভোটার হয়তো তা জানেন না বা বিষয়টি নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামান না।
কিন্তু তিনি যখন বলেন, ক্ষমতায় আসার সময়ের তুলনায় এখন প্রতিটি পণ্যের দাম কম, অথবা প্রায় সব পণ্যের দাম 'দ্রুত' কমছে, তখন তার সবচেয়ে কট্টর সমর্থকেরাও নিজের চোখে বাজারদর দেখতে পারেন।
ডেলের ধারণা, জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে ট্রাম্পের বর্তমান জনমত এবং সামগ্রিকভাবে তার কম জনপ্রিয়তার সঙ্গে শুধু মূল্যস্ফীতিই নয়, মূল্যস্ফীতি নেই—এমনটা আগ্রাসীভাবে অস্বীকার করার সিদ্ধান্তেরও সম্পর্ক রয়েছে।
ট্রাম্পের মিথ্যাচারে বাস্তব ক্ষতিও হয়েছে
ডেলের মতে, ট্রাম্পের কিছু মিথ্যা এতটাই অদ্ভুত বা তুচ্ছ যে সেগুলো হাস্যকর মনে হতে পারে। তবে সামগ্রিকভাবে তার মিথ্যাগুলো দেশের জন্য গভীর ক্ষতি করেছে।
২০২০ সালের নির্বাচন নিয়ে ট্রাম্পের মিথ্যার কারণে উসকে ওঠা ক্যাপিটল দাঙ্গায় মানুষ মারা গেছে বলে উল্লেখ করেন ডেল।
তার মতে, কোভিড-১৯-এর গুরুত্ব খাটো করে দেখানো ট্রাম্পের মিথ্যাগুলোও মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়েছে।
এ ছাড়া ট্রাম্পের মিথ্যার লক্ষ্যবস্তু হওয়া সাংবাদিক, বিচারক ও নির্বাচনকর্মীদের কেউ কেউ হুমকি ও হয়রানির মুখে পড়েছেন।
ডেলের মতে, গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত বিভিন্ন বিষয়ে জনসাধারণের বিতর্ককেও ট্রাম্পের মিথ্যাগুলো আরও জটিল করে তুলেছে। তার ভাষায়, এত মিথ্যা বলার কারণে আমেরিকার গণতন্ত্রও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
