কিম জং উনের সঙ্গে আবার বৈঠকে বসতে চান ট্রাম্প, জবাবে ১০ মিসাইল ছুড়ল উত্তর কোরিয়া
চলতি বছরের শেষ দিকে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে বৈঠক করতে চান বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে তার এই উদ্যোগে পিয়ংইয়ং শীতল প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। তাই দুই নেতার মধ্যে সম্পর্ক 'চমৎকার' হলেও এমন বৈঠক করতে হলে উত্তর কোরিয়া কঠিন কিছু শর্ত আরোপ করবে।
চলতি সপ্তাহের শুরুতে ট্রাম্প আকস্মিকভাবে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সামরিক মহড়ার পরিসর কমিয়ে দেন। তিনি বলেন, এসব মহড়া উত্তর কোরিয়ার জন্য 'শত্রুতামূলক'। বুধবার তিনি বলেন, চলতি বছরের শেষ দিকে কিমের সঙ্গে তার বৈঠক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার কর্মকর্তাদের মধ্যকার আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একজন জানান, ট্রাম্প উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে আলোচনা আবার শুরু করতে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি কূটনৈতিক সাফল্য অর্জন করতে আগ্রহী।
এসব বিষয়ে কিম জং উনের প্রভাবশালী বোন কিম ইয়ো জং উলচি ফ্রিডম শিল্ড সামরিক মহড়ার পরিসর কমানোর বিষয়টি খারিজ করে বলেছেন, মহড়াটি চালিয়ে যাওয়াও আগ্রাসী পদক্ষেপ। তিনি আরও বলেন, উত্তর কোরিয়ার প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নীতি এখনো শত্রুতামূলক।
ট্রাম্প ও কিমের মধ্যে কোনো যোগাযোগ হয়েছে এ কথাও অস্বীকার করেছেন তিনি। তবে তিনি দুই নেতার ব্যক্তিগত সম্পর্ককে 'চমৎকার' বলে উল্লেখ করেছেন।
বৃহস্পতিবার দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, উত্তর কোরিয়া তার পূর্ব উপকূল থেকে প্রায় ১০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, চলমান যুক্তরাষ্ট্র-দক্ষিণ কোরিয়া সামরিক মহড়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসেবেও এই ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করা হয়ে থাকতে পারে।
রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা কেসিএনএর বরাতে কিম ইয়ো জং তার বিবৃতিতে বলেন, 'যুক্তরাষ্ট্র যদি এবার নেওয়া পদক্ষেপগুলোকে কোনো ধরনের সদিচ্ছার ইঙ্গিত হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করে, তাহলে তারা যে উত্তর আশা করছে, তা পাবে না।'
ইরানের সঙ্গে প্রায় ছয় মাস ধরে চলা যুদ্ধের অবসানের তাৎক্ষণিক কোনো সম্ভাবনা নেই। এর মধ্যেই উত্তর কোরিয়ার দিকে হাত বাড়াচ্ছেন ট্রাম্প। অথচ ইউক্রেনে রাশিয়ার চলমান যুদ্ধে সহায়তার জন্য পিয়ংইয়ং রাশিয়াকে সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম পাঠিয়েছে, যার মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্রও রয়েছে।
ওই সূত্রের মতে, দক্ষিণ কোরিয়া ব্যক্তিগত পর্যায়ে ট্রাম্পের কৌশলের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়া কমানোর বিষয়ে সিউলের কর্মকর্তাদের এখনো সংশয় রয়েছে।
ওই সূত্র আরও বলেন, চলতি বছরের শেষ দিকে ট্রাম্প এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোটের সম্মেলনে যোগ দিতে শেনঝেনে যেতে পারেন। উত্তর কোরিয়া যদি আবার যোগাযোগে আগ্রহ দেখায়, তাহলে ওই অঞ্চলে দুই নেতার বৈঠকের একটি সুযোগ তৈরি হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের এক মুখপাত্র বলেন, 'পূর্বশর্ত ছাড়াই উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সংলাপে বসার জন্য যুক্তরাষ্ট্র এখনো উন্মুক্ত। উপযুক্ত সময়ে প্রেসিডেন্ট এবং কিম জং উন আবার বৈঠক করবেন।'
হোয়াইট হাউস এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ও মন্তব্যের অনুরোধের জবাব দেয়নি। তবে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আগে দেওয়া একটি বিবৃতির দিকে ইঙ্গিত করেছে, যেখানে বলা হয়েছিল, ট্রাম্পের মন্তব্য পিয়ংইয়ংয়ের সঙ্গে অর্থবহ সংলাপের পথ তৈরি করবে—এমন আশা করছে সিউল।
তবে এখন পর্যন্ত উত্তর কোরিয়ার প্রতিক্রিয়া ভিন্ন ধরনের বার্তা দিচ্ছে। পিয়ংইয়ং কিম ও ট্রাম্পের 'চমৎকার ব্যক্তিগত সম্পর্কের' প্রশংসা করলেও স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, দুই নেতার ব্যক্তিগত সম্পর্ককে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগের বিষয় থেকে আলাদা করে দেখছে তারা। কিউংনাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ফর ফার ইস্ট অ্যান্ড ইস্ট এশিয়ান স্টাডিজের অধ্যাপক লিম উল-চুল এ কথা বলেছেন।
লিম বলেন, 'ব্যক্তিগত সম্পর্ককে কখনোই জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থ কিংবা সামরিক সক্ষমতা জোরদারের প্রচেষ্টার সঙ্গে আপস করতে দেওয়া হবে না। এছাড়া অন্য কথায়, পিয়ংইয়ং ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ব্যক্তিগত কূটনীতির সীমা রয়েছে এবং এটি কৌশলগত অগ্রাধিকারকে অগ্রাহ্য করতে পারবে না।'
পিয়ংইয়ংয়ের শর্ত
ওয়াশিংটনভিত্তিক স্টিমসন সেন্টারের সিনিয়র গবেষক জেনি টাউনের মতে, কোন পরিস্থিতিতে বৈঠককে অর্থবহ মনে করবে—সে বিষয়ে উত্তর কোরিয়া স্পষ্ট করে দিয়েছে। আর এসব শর্ত পূরণ করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত কঠিন হবে।
তিনি বলেন, এই শর্তগুলোর মধ্যে থাকবে উত্তর কোরিয়ার প্রতি মার্কিন নীতির বড় ধরণের পরিবর্তন এনে পিয়ংইয়ং যেগুলো শত্রুতাপূর্ণ মনে করে সেসব উপাদান দূর করা, এর পারমাণবিক অবস্থান মেনে নেওয়া বা অন্ততপক্ষে একটি ঘোষণা দেওয়া যে নিরস্ত্রীকরণ আর ওয়াশিংটনের লক্ষ্য নয়।
তিনি বলেন, 'ট্রাম্প যে সময়সীমা এখন নির্ধারণ করেছেন, সেই সময়ের মধ্যে বৈঠক নিশ্চিত করতে তিনি এসব শর্ত মেনে নিতে কতটা প্রস্তুত—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।'
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র বলেন, যুক্তরাষ্ট্র 'উত্তর কোরিয়ার সম্পূর্ণ পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের প্রতি এখনো প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।'
ট্রাম্প ২০১৮ এবং ২০১৯ সালে কিমের সাথে অভূতপূর্ব এক ধারাবাহিক শীর্ষ সম্মেলন করেছিলেন। তবে উত্তর কোরিয়াকে তার পারমাণবিক অস্ত্র ত্যাগ করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের দাবির কারণে সেই কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ভেঙে পড়ে।
এরপর থেকে ট্রাম্প বারবার উত্তর কোরিয়াকে 'পারমাণবিক শক্তিধর দেশ' হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে তার প্রশাসন এখনো দেশটির পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের আহ্বান জানিয়ে আসছে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তর কোরিয়াকে পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি।
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের তুলনায় কিমের এখন বৈঠকে রাজি হওয়ার তাগিদও কম। সে সময় কিম নিষেধাজ্ঞা থেকে কিছুটা স্বস্তি পাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।
এরপর থেকে উত্তর কোরিয়া চীন ও রাশিয়ার আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। এই দুই দেশের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য দেশটির অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে সহায়তা করেছে।
টাউন বলেন, 'উত্তর কোরিয়ার সামনে এখন বিভিন্ন বিকল্প রয়েছে। তারা এমন সব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলছে, যাদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে কোনো ধরনের ছাড় দিতে হয় না; বরং উভয় পক্ষই লাভবান হয়।'
তিনি আরও বলেন, 'এমন আলোচনায় দ্রুত ফিরে যাওয়ার জন্য তার খুব কমই তাগিদ রয়েছে, যেখানে তার কাছ থেকে কোনো না কোনো বিষয়ে ছাড় দেওয়ার প্রত্যাশা থাকবে। বিশেষ করে এমন কোনো বিষয়, যেটিকে তিনি দেশের প্রতিরক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন।'
আলোচনার জন্য এখনো উন্মুক্ত
কোরিয়া ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল ইউনিফিকেশনের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো হং মিন বলেন, কিম ইয়ো জংয়ের বিবৃতি থেকে মনে হচ্ছে, উত্তর কোরিয়ার প্রতিক্রিয়া এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে কূটনীতির সম্ভাবনা পুরোপুরি খোলা থাকে।
হং বলেন, 'মূল লক্ষ্য মনে হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রকে আরও নমনীয় অবস্থান নিতে উৎসাহিত করা।'
তিনি আরও বলেন, পিয়ংইয়ং সম্ভবত ইরানের প্রসঙ্গ এড়িয়ে গেছে, যাতে ট্রাম্পকে বিরক্ত না করা হয়।
তিনি বলেন, 'কিম ইয়ো জংয়ের বিবৃতিটি সংলাপ প্রত্যাখ্যান করার চেয়ে ট্রাম্পের ধারণাকে নিয়ন্ত্রণ করা, উত্তর কোরিয়া সম্পর্কে তার বোঝাপড়াকে প্রভাবিত করা এবং ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র-উত্তর কোরিয়া আলোচনার সম্ভাব্য ভিত্তি তৈরি করার প্রচেষ্টা বলেই বেশি মনে হচ্ছে।'
বিবৃতিতে জাপানেরও বিশেষভাবে সমালোচনা করা হয়েছে। দেশটির সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে নিরাপত্তা সম্পর্ক জোরদার করার বিষয়টি পিয়ংইয়ংয়ের ক্ষোভের ক্রমবর্ধমান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
হং আরও বলেন, পিয়ংইয়ং এমন একটি যুক্তরাষ্ট্র-উত্তর কোরিয়া কাঠামোর ইঙ্গিত দিচ্ছে, যেখানে দক্ষিণ কোরিয়ার ভূমিকা প্রান্তিক থাকবে এবং জাপানকে মূলত একটি সামরিক প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
তিনি বলেন, 'যুক্তরাষ্ট্র-উত্তর কোরিয়া সম্পর্ক পারস্পরিকভাবে একে অপরের অবস্থান যাচাই এবং বিভিন্ন বার্তা দেওয়ার একটি পর্যায়ে প্রবেশ করতে পারে।'
