হাসপাতালে থেকে আবার কারাগারে ফিরিয়ে নেওয়া হলো পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে
পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও কারাবন্দি পিটিআই নেতা ইমরান খানকে হাসপাতালে নিয়ে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানোর পর শুক্রবার ভোরে পুনরায় কারাগারে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ইসলামাবাদ শাফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালের চিকিৎসকেরা তাঁকে 'শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ' বলে ঘোষণা করার পর এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার জানিয়েছেন, হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ, চক্ষু বিশেষজ্ঞ ও সাধারণ মেডিসিন বিশেষজ্ঞসহ 'যোগ্য চিকিৎসকদের একটি দল' ইমরান খানের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেছেন।
কারাগারে ইমরান খানের স্বাস্থ্যের অবনতি সংক্রান্ত অভিযোগের প্রেক্ষিতে গত মঙ্গলবার দেশটির সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে এই ক্রিকেটার-রাজনীতিবিদকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের দ্বারা স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে হবে। ২০২৩ সালে দুর্নীতির অভিযোগে কারাবন্দি হওয়ার পর থেকে এটিই ইমরান খানের জন্য সুপ্রিম কোর্ট থেকে পাওয়া সবচেয়ে বড় স্বস্তির খবর। এই অভিযোগগুলোকে তিনি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে আসছেন।
হাসপাতালে স্থানান্তরের পাশাপাশি সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, ইমরান খানকে তাঁর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করতে দিতে হবে, যা গত কয়েক মাস ধরে বন্ধ ছিল। আদালতের নির্দেশের পর মঙ্গলবার রাতে ইমরান খানের বোন আজমা খান কারাগারে তাঁর সঙ্গে দেখা করেন। তথ্যমন্ত্রী তারার জানান, বৃহস্পতিবার রাতে ইমরান খানের স্বাস্থ্য পরীক্ষার প্রতিটি ধাপে আজমা খান সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
ইমরান খানের রাজনৈতিক দল তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) সাধারণত তাঁর বিরুদ্ধে যাওয়া আদালতের যেকোনো সিদ্ধান্তকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে থাকে। তবে সুপ্রিম কোর্টের এই সিদ্ধান্তের পেছনে পর্দার অন্তরালে কোনো রাজনৈতিক সমঝোতা রয়েছে কি না—এমন গুঞ্জন নিয়ে দলটির পক্ষ থেকে প্রকাশ্য কোনো মন্তব্য করা হয়নি।
ইমরান খানের চিকিৎসাকালে শাফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালের আশপাশের এলাকা পুলিশ ব্যারিকেড ও ভ্যান দিয়ে সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছিল। বিবিসি জানিয়েছে, হাসপাতালের চারপাশের রাস্তা খালি করতে ক্রেন দিয়ে গাড়ি সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল এবং সেখানে পুলিশ ও সাঁজোয়া যান টহল দিচ্ছিল। সুপ্রিম কোর্ট ইমরান খানের দলকে হাসপাতালের বাইরে কোনো প্রেস কনফারেন্স না করার নির্দেশ দিয়েছিলেন, যাতে তাঁর চিকিৎসা নিয়ে কোনো রাজনীতি না হয়।
৭৩ বছর বয়সী ইমরান খানের আইনজীবীরা এর আগে জানিয়েছিলেন যে, তিনি চোখের দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়াসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন এবং কারাগারে তাঁকে কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। গত ফেব্রুয়ারিতে তাঁর আইনজীবী অভিযোগ করেছিলেন যে, কারা কর্তৃপক্ষের চরম অবহেলার কারণে ডান চোখে ইমরান খানের মাত্র ১৫ শতাংশ দৃষ্টিশক্তি অবশিষ্ট রয়েছে, তবে সরকার এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
গত মঙ্গলবারের রায়ে সুপ্রিম কোর্টের প্যানেল লিখেছিল: 'বন্দির জীবন, স্বাস্থ্য, মর্যাদা এবং নিরাপত্তা রক্ষা করা আমাদের সাংবিধানিক ও আইনি বাধ্যবাধকতার মধ্যে পড়ে।' বিচারপতিরা জানিয়েছিলেন, ইমরান খানের চোখের চিকিৎসার জন্য একজন চক্ষু বিশেষজ্ঞকে নিয়োজিত করা হবে। একই সঙ্গে বিচারপতি ও পিটিআই নেতারা সমর্থকদের নির্দেশ দিয়েছিলেন যাতে তাঁরা হাসপাতালের বাইরে জমায়েত না হন, কারণ এটি আদালতের রায়ের অবমাননা হবে।
পাকিস্তানের সাবেক ক্রিকেট অধিনায়ক ইমরান খান ২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত দেশটির প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৩ সালের আগস্টে বন্দি হওয়ার পর থেকে তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য ফাঁস এবং রাষ্ট্রীয় উপহার সামগ্রী বিক্রিসহ ১০০টিরও বেশি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
গত বছরের শেষভাগে ইমরান খান এবং তাঁর স্ত্রী বুশরা বিবিকে ১৭ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তাঁর কারাবাসের পর দেশজুড়ে পিটিআই সমর্থকদের বড় ধরনের বিক্ষোভের মুখে ক্র্যাকডাউন বা দমনপীড়ন চালায় পাকিস্তান প্রশাসন। তবে বন্দি থাকা সত্ত্বেও পাকিস্তানের রাজনীতিতে এখনও ইমরান খানের ব্যাপক প্রভাব ও জনপ্রিয়তা রয়েছে।
