ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে 'যুগান্তকারী' সাফল্য: ক্যান্সার ফিরে আসা রুখল নতুন ভ্যাকসিন
ত্বকের ক্যান্সার চিকিৎসায় এক যুগান্তকারী ও সম্ভাবনাময় মাইলফলক স্পর্শ করেছেন বিজ্ঞানীরা। একটি বিশেষ ওষুধের সঙ্গে যৌথভাবে প্রয়োগ করা নতুন এক 'ব্যক্তিগত ভ্যাকসিন' (পারসোনালাইজড ভ্যাকসিন) ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে রোগীদের শরীর থেকে পুনরায় ত্বকের ক্যান্সার ফিরে আসা ঠেকাতে সফল হয়েছে।
ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানি 'মার্ক' এবং 'মডার্না'-র যৌথ উদ্যোগে তৈরি এই ভ্যাকসিনটি অস্ত্রোপচারের পর মেলানোমা বা মারাত্মক ধরনের ত্বকের ক্যান্সারের উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা রোগীদের ওপর প্রয়োগ করা হয়েছিল। দুই কোম্পানির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রাথমিক ফলাফলে দেখা গেছে এই নতুন ভ্যাকসিনটি গ্রহণের পর রোগীরা তুলনামূলকভাবে দীর্ঘ সময় ক্যান্সারমুক্ত ছিলেন। তবে এই সুরক্ষাকাল ঠিক কতদিন স্থায়ী হবে, তা এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।
ক্যান্সার বিশেষজ্ঞরা এই আবিষ্কারকে একটি বড় ধরনের 'ব্রেকথ্রু' বা যুগান্তকারী সাফল্য হিসেবে দেখছেন। তবে ট্রায়ালের চূড়ান্ত ফলাফল এখনও প্রকাশ না হওয়া এবং স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের দ্বারা এটি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা (পিয়ার-রিভিউ) না হওয়ায় তাঁরা কিছুটা সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছেন। এই ট্রায়াল প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরও চিকিৎসা পদ্ধতিটি সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করার আগে ঔষধ নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর অনুমোদন পেতে হবে।
কীভাবে কাজ করে এই ভ্যাকসিন?
'ইন্টিসমেরান' নামের এই নতুন ভ্যাকসিনটি ক্যান্সার চিকিৎসায় ইতিমধ্যেই ব্যবহৃত ইমিউনোথেরাপি ওষুধ 'কিট্রুডা'-র সঙ্গে মিলিয়ে রোগীদের দেওয়া হয়েছিল। কোম্পানিগুলো জানিয়েছে, শুধু কিট্রুডা ওষুধ ব্যবহার করার চেয়ে এই ভ্যাকসিন ও ওষুধ একসঙ্গে ব্যবহার করলে রোগীরা অনেক বেশি সময় ক্যান্সারমুক্ত থাকেন এবং শরীরের অন্যান্য অঙ্গে ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের তৃতীয় ধাপে (ফেজ থ্রি) ১,০০০-এর বেশি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ মেলানোমা আক্রান্ত রোগী অংশ নেন। যাদের শরীরে বড় টিউমার থাকা থেকে শুরু করে অন্যান্য অঙ্গে ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়ার মতো গুরুতর অবস্থা ছিল।
বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, এটি একটি 'পারসোনালাইজড' বা ব্যক্তিগত ভ্যাকসিন। অর্থাৎ, প্রতিটি রোগীর নিজস্ব টিউমারের ধরন অনুযায়ী এটি আলাদাভাবে তৈরি করা হয়। এই ভ্যাকসিনটি তৈরিতে বিজ্ঞানীরা বিশ্বখ্যাত 'এমআরএনএ' প্রযুক্তি ব্যবহার করেছেন, যা করোনার কিছু ভ্যাকসিনেও ব্যবহার করা হয়েছিল।
প্রক্রিয়া অনুযায়ী, প্রথমে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে রোগীর টিউমারের একটি ছোট অংশ কেটে নেওয়া হয় এবং সেটির ডিএনএ সিকোয়েন্সিং বা নকশা বিশ্লেষণ করা হয়। এরপর সেই নির্দিষ্ট ক্যান্সার কোষের মিউটেশনকে লক্ষ্য করে তৈরি করা হয় এই ব্যক্তিগত ভ্যাকসিন। এটি রোগীর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউন সিস্টেমকে শরীরের ভেতরে থাকা যেকোনো অবশিষ্ট ক্যান্সার কোষ চিনে নিয়ে সেগুলোকে ধ্বংস করার নির্দেশ দেয়।
এই সফলতার পর কোম্পানি দুটি ফুসফুস, মূত্রথলি (ব্লাডার) এবং কিডনি ক্যান্সারের জন্যও একই ধরনের ব্যক্তিগত ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা পরীক্ষা করছে। মডার্নার প্রধান নির্বাহী স্টিফেন ব্যানসেল এই ফলাফলকে ক্যান্সার গবেষণার ক্ষেত্রে একটি 'যুগান্তকারী মুহূর্ত' বলে অভিহিত করেছেন। এই ঘোষণার পর শেয়ার বাজারে মডার্না ও মার্কের শেয়ারের দাম ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
যুক্তরাজ্যের ক্যান্সার রিসার্চ ইউকে-র কর্মকর্তা ড. তালিসিয়া কুয়ালো এই গবেষণাকে অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক বলে উল্লেখ করেছেন। তবে অন্তর্বর্তীকালীন তথ্যগুলো এখনও পুরোপুরি পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে বলে জানান তিনি।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক এবং অনকোলজিস্ট ড. লেনার্ড লি বলেন, 'এটি মেলানোমা রোগীদের জন্য অবশ্যই একটি সুসংবাদ, তবে এই গবেষণার গুরুত্ব আরও অনেক বেশি। এটি প্রমাণ করেছে যে ব্যক্তিগত ক্যান্সার ভ্যাকসিনগুলো আসলেই মানবশরীরে কার্যকর হতে পারে।'
