মানুষের ক্যানসার আরও ভালোভাবে বুঝতে বিজ্ঞানীদের সাহায্য করতে পারে বিড়াল: গবেষণা
লুইস ভ্যান ডার ওয়েডেন কুকুরের চেয়ে বিড়াল বেশি পছন্দ করেন। তবে পশুর ক্যানসার নিয়ে গবেষণা করা এই বিজ্ঞানী সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিড়ালের ওপর তার বিশেষ মনোযোগ দিয়েছেন। তিনি জানান, বিড়ালের ক্যানসার সংক্রান্ত তথ্যগুলো এত দিন বিজ্ঞানীদের কাছে এক 'অন্ধকার বাক্সের' মতো ছিল, কারণ এ বিষয়ে বিস্তারিত কোনো তথ্যই তাদের জানা ছিল না।
তবে বছরের পর বছর গবেষণার পর তিনি যে তথ্যটি পেয়েছেন, তা তাকে অবাক করে দিয়েছে। বিড়ালের ক্যানসারের সাথে মানুষের ক্যানসারের অনেক মিল রয়েছে, যা ভবিষ্যতে ক্যানসারের চিকিৎসায় নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে। ভ্যান ডার ওয়েডেন বলেন, 'এটি একটি অনন্য সুযোগ, যা দিয়ে একই সঙ্গে দুটি ভিন্ন প্রজাতির ক্যানসার নিরাময়ে কাজ করা সম্ভব।'
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের বিজ্ঞানীদের নিয়ে গঠিত একটি দলের সঙ্গে ভ্যান ডার ওয়েডেন প্রায় ৫০০টি গৃহপালিত বিড়ালের টিউমারের নমুনা থেকে ক্যানসার সৃষ্টিকারী জিনের মিউটেশন খতিয়ে দেখেছেন। এই গবেষণার ফলাফল গত ফেব্রুয়ারি মাসে বিখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী 'সায়েন্স'-এ প্রকাশিত হয়েছে।
বিজ্ঞানীরা ক্যানসার আক্রান্ত বিড়ালের শরীরে 'এফবিএক্সডব্লিউ-৭' নামক একটি জিনের মধ্যে সবচেয়ে বড় মিল খুঁজে পেয়েছেন, যা মানুষ ও বিড়াল উভয়ের শরীরেই টিউমার দমন করতে কাজ করে। বিড়ালের স্তন ক্যানসারে এই জিনটির অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা যায়। মানুষের স্তন ক্যানসারের তীব্রতা বৃদ্ধির জন্যও এই জিনের অস্বাভাবিক পরিবর্তন দায়ী।
কানাডার ইউনিভার্সিটি অব গুয়েলফের ভেটেরিনারি প্যাথলজিস্ট এবং এই গবেষণার সহ-লেখক জেফরি উড বলেন, 'এখানে উভয়ের জন্যই প্রকৃত সুবিধা রয়েছে, যা বিড়াল এবং মানুষ—দুজনের জন্যই এক 'উইন-উইন' পরিস্থিতি।'
জিনগত দিক থেকে মানুষের ডিএনএ'র সাথে বিড়ালের ডিএনএ'র মিল কুকুর, গরু বা ইঁদুরের চেয়ে অনেক বেশি। সে কারণে বিড়ালের ক্যানসার নিয়ে গবেষণার মাধ্যমে মানুষের রোগ আরও ভালোভাবে বোঝা সম্ভব। তাছাড়া গৃহপালিত বিড়াল তার মালিকের সঙ্গে একই ঘরে থাকে বলে তারা পানি ও বাতাসের মাধ্যমে একই ধরণের কার্সিনোজেন বা ক্যানসার সৃষ্টিকারী উপাদানের সংস্পর্শে আসে।
কুকুরের ক্যানসার মানুষের চেয়ে দ্রুত বাড়ে বলে গবেষকেরা সাধারণত কুকুরের ওপর ওষুধ পরীক্ষা করে দ্রুত ফল পান। হাড়ের ক্যানসার 'অস্টিওসারকোমা' মানুষের চেয়ে কুকুরের বেশি হওয়ায় বিজ্ঞানীরা কুকুর থেকে এর চিকিৎসা শিখে মানুষের ওপর তা প্রয়োগ করেছেন। ১০ বছর আগে 'দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট'-কে গবেষকেরা জানিয়েছিলেন, বিড়ালের টিউমার নিয়ে তথ্য কম থাকা এবং মানুষের সঙ্গে মেশার সময় বিড়াল দ্রুত আতঙ্কিত হয়ে পড়ায় এতদিন ক্যানসার গবেষণায় বিড়ালের চেয়ে কুকুরকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হতো।
এই গবেষণার জন্য অস্ট্রিয়া, কানাডা, ইংল্যান্ড, জার্মানি, নিউজিল্যান্ড এবং স্কটল্যান্ডের গৃহপালিত বিড়ালের ক্যানসার টিস্যুর নমুনা সংগ্রহ করা হয়। বিজ্ঞানীদের দল বিড়ালের ১ হাজারটি জিন পরীক্ষা করেন, যা ক্যানসার সংশ্লিষ্ট মানুষের জিনের সমতুল্য।
গবেষকেরা কেবল স্তন ক্যানসারই নয়, বরং মানুষ ও বিড়ালের রক্ত, হাড়, ফুসফুস, ত্বক, পরিপাকতন্ত্র এবং কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের ক্যানসারের মধ্যেও মিল খুঁজে পেয়েছেন। ইংল্যান্ডের ক্যামব্রিজশায়ারের ওয়েলকাম স্যাঙ্গার ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী ভ্যান ডার ওয়েডেন বলেন, 'আমি মূলত এটি বিড়ালের জন্যই শুরু করেছিলাম। কিন্তু যখন দেখলাম এর সাথে মানুষের ক্যানসারের মিল আছে এবং আমরা মানুষের চিকিৎসাতেও এটি ব্যবহার করতে পারব, তখন সত্যিই খুব ভালো লেগেছে।'
গবেষণায় দেখা গেছে, বিড়ালের স্তন ক্যানসার নিরাময়ে কেমোথেরাপির ওষুধ 'ভিনক্রিস্টিন' বেশ কার্যকর। বিড়ালের ক্যানসারগুলোর মধ্যে স্তন ক্যানসার তৃতীয় সাধারণ ক্যানসার এবং এটি সাধারণত প্রাণঘাতী হয়ে থাকে।
জেফরি উড বলেন, 'আগে আমরা বিষয়টির কিছুই জানতাম না; কোন ওষুধটি নির্বাচন করা দরকার তাও আমাদের অজানা ছিল। এখন অন্তত আমাদের কাছে একটি তালিকা রয়েছে, যা নিয়ে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরু করা সম্ভব।'
ইউনিভার্সিটি অব মিনেসোটার স্কুল অব ভেটেরিনারি মেডিসিনের অধ্যাপক জেইমি মোদিয়ানো (যিনি এই গবেষণায় যুক্ত ছিলেন না) বলেন, এই গবেষণাটি মানুষ ও বিড়ালের ক্যানসার সম্পর্কে আরও জানার ক্ষেত্রে একটি মজবুত ভিত্তি তৈরি করল। তবে এই আবিষ্কার মানুষের ক্যানসার নিরাময়ে কতটা সাহায্য করবে তা জানতে আরও অনেক গবেষণার প্রয়োজন। তিনি মন্তব্য করেন, 'হাজার মাইলের যাত্রায় এটি কেবল প্রথম পদক্ষেপ মাত্র'।
