সৌদি আরবের পাঠ্যবই থেকে বাদ দেয়া হলো ‘মুসলিমরা কখনোই জেরুজালেম ছাড়বে না’ বাক্য
ইসলাম, ফিলিস্তিন ও ইসরায়েল বিষয়ে দেশটির পাঠ্যক্রমে পরিবর্তন আনার অংশ হিসেবে সৌদি আরবের স্কুলের পাঠ্যবই থেকে 'মুসলিমরা কখনোই জেরুজালেম ছাড়বে না' বাক্যটি বাদ দেওয়ায় সৌদি সরকারের প্রশংসা করেছে ইসরায়েলভিত্তিক একটি সংগঠন।
ইসরায়েলি গবেষণা সংস্থা ইমপ্যাক্ট-সির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি আরবের পাঠ্যক্রম পর্যালোচনা করে তারা জুলাইয়ের শেষ দিকে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই বক্তব্য থেকে মনে হতে পারে, জেরুজালেমে মুসলিমদের নিয়ন্ত্রণ বা উপস্থিতি হুমকির মুখে রয়েছে। এতে জেরুজালেমকে মুসলিম ও অন্য গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘাতের জায়গা হিসেবেও তুলে ধরা হতে পারে। বিশেষ করে, এখানে ইসরায়েলের সঙ্গে মুসলিমদের বিরোধের বিষয়টি সামনে আসতে পারে।
তবে সৌদি পাঠ্যবই থেকে ওই বাক্য বাদ দেওয়ার প্রশংসা করা হয়েছে এমন এক সময়ে, যখন ইসরায়েলি রাজনীতিবিদদের একটি অংশ নিয়মিত আল-আকসা মসজিদ ধ্বংস করে সেখানে 'ইহুদি মন্দির' নির্মাণের আহ্বান জানাচ্ছেন।
সোমবার ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ প্রথমবারের মতো দখল করা পূর্ব জেরুজালেমের আল-আকসা মসজিদের ভেতরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের ইহুদি প্রার্থনার অনুমতি দেয়।
এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে আল-আকসা মসজিদকে ঘিরে কয়েক দশক ধরে চলে আসা প্রচলিত স্থিতাবস্থা আরও লঙ্ঘন ও দুর্বল হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
সরকারি সমর্থনে ইসরায়েলিরা জেরুজালেমের জনসংখ্যার কাঠামো বদলাতে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে বসতি নির্মাণ চালিয়ে যাচ্ছে।
ইমপ্যাক্ট-এসইর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাদের সংজ্ঞা অনুযায়ী সৌদি আরবের পাঠ্যক্রম থেকে 'ইহুদি-বিদ্বেষের সব উপাদান' বাদ দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনে কোরআনের কিছু আয়াত এবং মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর বাণী ও শিক্ষা-সংবলিত কিছু হাদিস বাদ দেওয়াকেও 'ইতিবাচক অগ্রগতি' হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সৌদি পাঠ্যবই থেকে একটি পরিচিত হাদিসও বাদ দেওয়া হয়েছে। ওই হাদিসে বলা হয়েছে, মহানবী (সা.) এক অসুস্থ ইহুদি বালককে দেখতে গিয়েছিলেন। পরে ওই বালক ইসলাম গ্রহণ করে।
ইমপ্যাক্ট-এসই বলেছে, ২০২৫ সালের সংস্করণে এই উদাহরণটি বাদ দেওয়া ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের গ্রহণযোগ্যতার ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন। কারণ, এখন শিক্ষার্থীদের এমন শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে না যে ইসলামে অবিশ্বাসের পরিণতি নিশ্চিত ধ্বংস।
পাঠ্যবইয়ে কোরআনের আয়াত ও মানচিত্রে পরিবর্তন
কুফর ও পাপ নিয়ে কোরআনের বিভিন্ন আয়াত সংক্ষিপ্ত করার সৌদি সিদ্ধান্তকেও স্বাগত জানিয়েছে ইমপ্যাক্ট-এসই।
তবে অন্য ধর্মগুলোতেও একই ধরনের শিক্ষা রয়েছে উল্লেখ করে সংস্থাটি সৌদি পাঠ্যবইয়ের সমালোচনা করেছে। তাদের দাবি, সৌদি স্কুলগুলোতে এখনো ইসলামকে মানবজাতির 'স্বাভাবিক ধর্ম' হিসেবে শেখানো হয়।
প্রতিবেদনে পাঠ্যবইয়ের মানচিত্র ও শব্দচয়নও পর্যালোচনা করা হয়েছে।
ইমপ্যাক্ট-এসই জানিয়েছে, আগের কয়েকটি মানচিত্রে ইসরায়েলকে দেখানো হয়নি। পুরো ভূখণ্ডকে 'ফিলিস্তিন' হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।
তবে ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবইয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষ মানচিত্র থেকে 'ফিলিস্তিন' নামটিও সরিয়ে দিয়েছে।
যদিও মানচিত্রে এখনো ইসরায়েলের নাম দেখানো হয়নি, নতুন পরিবর্তনের ফলে পুরো ভূখণ্ডকে 'ফিলিস্তিন' হিসেবে চিহ্নিত করার বিষয়টি বাদ পড়েছে।
একাদশ শ্রেণির একটি ইতিহাস বইয়ে 'ইহুদি শত্রু' শব্দের পরিবর্তে 'ইসরায়েলি দখলদারত্ব' ব্যবহার করা হয়েছে।
তবে ইমপ্যাক্ট-এসই এই পরিবর্তনকেও যথেষ্ট মনে করছে না।
সংস্থাটি বলেছে, শব্দ পরিবর্তনের ফলে ইসরায়েলের প্রতি শত্রুভাব কিছুটা কমেছে। তবে 'ইসরায়েলি দখলদারিত্ব' শব্দটি ব্যবহার করে পুরো ইসরায়েলকে বোঝানো হচ্ছে বলে মনে হয়। ফলে এতে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি না দেওয়ার অবস্থানই প্রকাশ পায়।
ইসরায়েল সরকারও ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিষয়টি প্রকাশ্যে প্রত্যাখ্যান করে আসছে। গত নভেম্বরে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছিলেন, 'কোনো ফিলিস্তিন রাষ্ট্র হবে না। এটি খুবই সহজ বিষয়: এটি কখনোই গঠিত হবে না।'
ইহুদিদের নিয়ে পাঠ্যবইয়ের বর্ণনা
সৌদি পাঠ্যবইয়ে ইহুদিদের 'ধূর্ত ও চতুর' হিসেবে বর্ণনা করার বিষয়েও আপত্তি জানিয়েছে ইমপ্যাক্ট-এসই।
একটি বইয়ে বলা হয়েছে, ইহুদি নেতা চাইম ওয়াইজম্যান (যিনি পরে ইসরায়েলের প্রথম প্রেসিডেন্ট হন) সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠাতা বাদশাহ আবদুল আজিজকে 'ফিলিস্তিন ইস্যু পরিত্যাগ' করতে এবং 'ইহুদি আন্দোলনের আকাঙ্ক্ষার ক্ষেত্রে প্রধান বাধা না হতে' ঘুষ দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।
বইটিতে বলা হয়েছে, ইবনে সৌদ ওয়াইজম্যানের এই 'অপরাধমূলক দুঃসাহসকে' ঘৃণ্য বলে মনে করেছিলেন।
ইমপ্যাক্ট-এসইর দাবি, এই বর্ণনা ইহুদিদের ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে তুলে ধরে এবং তাদের সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করে।
তবে ঐতিহাসিক নথিতে এই ঘটনার মূল তথ্যগুলোর সমর্থন পাওয়া যায়।
১৯৪০ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের একটি স্মারকে ওয়াইজম্যানের বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, 'ইহুদিদের দেওয়ার মতো একমাত্র জিনিস ছিল অর্থ।'
ওয়াইজম্যান বলেছিলেন, ইবনে সৌদের সমর্থনের বিনিময়ে তিনি ৩০ থেকে ৪০ লাখ পাউন্ড সংগ্রহ করতে প্রস্তুত ছিলেন। ওই পরিকল্পনায় ফিলিস্তিনিদের ট্রান্সজর্ডান ও ইরাকে 'স্বেচ্ছায় স্থানান্তরিত' করার কথা ছিল।
এই বক্তব্য বর্তমানে গাজা ও অধিকৃত পশ্চিম তীর থেকে ফিলিস্তিনিদের 'স্বেচ্ছায়' সরিয়ে দেওয়ার যে প্রস্তাব ইসরায়েলি কয়েকজন মন্ত্রী দিচ্ছেন, তার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।
ইমপ্যাক্ট-এসইর ভূমিকা
ইমপ্যাক্ট-এসইর প্রতিষ্ঠাতাদের সঙ্গে ইসরায়েল রাষ্ট্র ও বিভিন্ন ইহুদি প্রতিষ্ঠানের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। সংস্থাটি মধ্যপ্রাচ্যের পাঠ্যবইয়ে পরিবর্তন আনার জন্য প্রচার চালিয়ে আসছে। একই সঙ্গে তারা আঞ্চলিক ইতিহাসের একটি ইসরায়েলি দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে।
সংস্থাটির দাবি, ফিলিস্তিনি ও আরব দেশগুলোর পাঠ্যবইয়ে ইসরায়েলকে স্পষ্টভাবে স্বীকৃতি দেওয়া উচিত।
তবে ইমপ্যাক্ট-এসই বা এর প্রতিষ্ঠাতারা নিজেরা ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে একইভাবে স্বীকৃতি দিয়েছেন কি না, তা স্পষ্ট নয়।
ইহুদি-বিদ্বেষ পর্যবেক্ষণ ও প্রতিরোধে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত ইসরায়েলি বংশোদ্ভূত রাষ্ট্রদূত র্যাবাই ইহুদা কাপলুনের নেতৃত্বে বিভিন্ন উদ্যোগ ও কূটনৈতিক চাপের মাধ্যমে ওয়াশিংটনও এই প্রচারণাকে জোরদার করেছে।
প্রতিবেদন প্রকাশের পর ইমপ্যাক্ট-এসই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছে, 'স্কুলের পাঠ্যক্রমের মানোন্নয়ন এবং পাঠ্যবইয়ের উদ্বেগজনক বিষয়গুলো সংশোধনে সৌদি আরবের ধারাবাহিক প্রচেষ্টাকে আমরা সাধুবাদ জানাই।'
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, 'ইসরায়েল ও ইহুদিবাদকে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে আগের ইমপ্যাক্ট-এসই প্রতিবেদনগুলোতে যে ধারাবাহিক ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেছে, তা এখনো অব্যাহত রয়েছে।'
