শতবর্ষ পর সৌদির মরুভূমিতে ফিরল বন্য গাধা ওনাগার, শাবকের জন্ম
সৌদি আরবে এক শতাব্দীরও বেশি সময় পর একটি ওনাগার (এশীয় বন্য গাধা) শাবকের জন্ম হয়েছে। দেশটির স্থানীয় প্রজাতি পুনরুদ্ধার এবং একসময় আরব উপদ্বীপের পরিবেশব্যবস্থাকে গড়ে তোলা জীববৈচিত্র্য ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টায় এটি একটি বড় মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান রয়্যাল রিজার্ভের প্রধান নির্বাহী অ্যান্ড্রু জালুমিস আরব নিউজকে বলেন, '১ হাজার বছরেরও বেশি আগের কবিদের কবিতায় যে প্রাণীর প্রশংসা করা হতো, প্রায় ১০০ বছর পর সেই প্রাণী আমাদের মরুভূমিতে ফিরে এসেছে—আর তার প্রত্যাবর্তনের সূচনা হয়েছে একটি শাবকের জন্মের মধ্য দিয়ে। বিষয়টির মধ্যে গভীর সৌন্দর্য রয়েছে। এটি স্বাধীনতা, প্রতিকূলতা মোকাবিলার সক্ষমতা এবং সেই বন্য চেতনার প্রতীক।'
তিনি বলেন, এক শতাব্দীরও বেশি সময় পর সৌদি ভূখণ্ডে জন্ম ও বেড়ে ওঠা প্রথম ওনাগারের জন্ম শুধু একটি প্রাণীর আগমন নয়, এর তাৎপর্য আরও অনেক বেশি।
রিজার্ভের 'রিওয়াইল্ড অ্যারাবিয়া' কর্মসূচির আওতায় এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। এ কর্মসূচির লক্ষ্য হলো ওই অঞ্চলের ঐতিহাসিক ২৩টি স্থানীয় প্রজাতিকে তাদের আগের আবাসস্থলে ফিরিয়ে আনা।
পুরুষ ওনাগার শাবকটির জন্ম ২০২৫ সালের জুনে। তবে এক বছর পূর্ণ হওয়ার আগ পর্যন্ত প্রাণীটির জন্মের খবর প্রকাশ করা হয়নি। কারণ জীবনের প্রথম বছর ওনাগার শাবকদের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সময়। এই সময়ের মধ্যে মাত্র প্রায় অর্ধেক শাবক মারা যায়।
রিজার্ভ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রাণীটি সফলভাবে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ প্রথম ১২ মাস পার করেছে। এ ছাড়া আরও দুটি স্ত্রী ওনাগার বর্তমানে গর্ভবতী এবং আগামী শীতে তাদের সন্তান প্রসব করার কথা।
পারস্য অনাগারের অস্তিত্ব হুমকির মুখে রয়েছে। বর্তমানে বন্য পরিবেশে ৬০০টিরও কম পারস্য ওনাগার টিকে আছে বলে ধারণা করা হয়। এ কারণে ২০২৫ সালে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার (আইইউসিএন) প্রাণীটির এই উপপ্রজাতিকে 'চরম বিপন্ন' হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে।
কার্যকর সংরক্ষণ ব্যবস্থা নেওয়া না হলে ২০৫০ সালের মধ্যে এর সংখ্যা ৯০ শতাংশ কমে যেতে পারে বলে আইইউসিএন পূর্বাভাস দিয়েছে।
আরবের প্রাকৃতিক ও সাহিত্যিক ঐতিহ্যে একসময় ওনাগারের গুরুত্বপূর্ণ স্থান ছিল। ইসলামপূর্ব ও ইসলামের শুরুর যুগের ৮০টিরও বেশি টিকে থাকা কবিতায় প্রাণীটির উল্লেখ রয়েছে। এর ক্ষিপ্রতা, সতর্কতা ও স্বাধীনচেতা প্রকৃতির জন্য প্রাণীটির প্রশংসা করা হয়েছে এসব কবিতায়।
গৃহপালিত ঘোড়া ও গাধার মতো ওনাগার মানুষের প্রভুত্ব মেনে নেয়নি। ফলে এটি স্বাধীনতা ও মরুভূমির বন্য, অদম্য চরিত্রের প্রতীকে পরিণত হয়েছিল।
প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান রয়্যাল রিজার্ভজুড়ে বন্যপ্রাণীর ছবি আঁকা প্রাচীন শিলাচিত্র রয়েছে। এসব শিলাচিত্র থেকে একসময় এই অঞ্চলে কোন কোন প্রজাতি ও কী ধরনের বাস্তুতন্ত্র ছিল, তার প্রমাণ পাওয়া যায়। স্থানীয় প্রজাতিগুলো ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে নেওয়া পুনরুদ্ধার কার্যক্রমে এসব তথ্য সহায়তা করছে।
'রিওয়াইল্ড অ্যারাবিয়া' কর্মসূচির আওতায় পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টা করা ২৩টি প্রজাতির মধ্যে ১৪টি প্রজাতি ইতোমধ্যে পুনরুদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে পারস্য ওনাগারসহ ছয়টি প্রজাতি সফলভাবে বংশবিস্তারও করেছে।
রিজার্ভ কর্তৃপক্ষের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হলো এমন আবাসস্থল পুনরুদ্ধার করা, যেখানে স্থানীয় শিকারি প্রাণী বসবাস করতে পারবে। যেমন-আরবীয় চিতাবাঘ, চিতা ও সিংহ।
জালুমিস বলেন, 'সৌদি আরবের বিশাল পরিসর, দূরদর্শী নেতৃত্ব এবং সুস্পষ্ট কৌশলগত দিকনির্দেশনা রয়েছে। ওনাগার সংরক্ষণে আঞ্চলিক কেন্দ্র হয়ে উঠতে দেশটি দ্রুত অভিজ্ঞতা ও সাফল্যের রেকর্ড তৈরি করছে।'
প্রকৃতি সংরক্ষণে কাজ করা রয়্যাল সোসাইটি ফর দ্য কনজারভেশন অব নেচারের সঙ্গে অংশীদারত্বের মাধ্যমে ২০২৪ সালের এপ্রিলে জর্ডান থেকে কয়েকটি ওনাগার সৌদি আরবে আনা হয়।
জর্ডানের শওমারি ওয়াইল্ডলাইফ রিজার্ভ থেকে ৯৩৫ কিলোমিটার স্থলপথ পাড়ি দিয়ে সৌদি রিজার্ভে পৌঁছায় সাতটি ওনাগার। এর মধ্যে পাঁচটি স্ত্রী ও দুটি পুরুষ।
প্রাণীগুলোকে আনার কিছুদিন পর জর্ডানে গর্ভধারণ করা একটি স্ত্রী ওনাগার একটি শাবকের জন্ম দেয়। তবে পরে আরও দুটি গর্ভধারণ ব্যর্থ হয়। এর মধ্যে একটি ঘটনায় একটি স্ত্রী অনাগারের মৃত্যু হয়।
প্রায় ১১ মাস গর্ভধারণের পর ওনাগারের শাবককে জন্মের ১৫ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যে দাঁড়াতে এবং মায়ের দুধ পান শুরু করতে হয়। রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা ও বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় কলোস্ট্রাম বা শালদুধ পেতে এটি জরুরি।
বর্তমানে পালটিতে প্রাপ্তবয়স্কসহ পাঁচটি স্ত্রী ও তিনটি পুরুষ ওনাগার রয়েছে। সৌদি আরবে এটিই এখন একমাত্র ওনাগারের পাল।
পারস্য ওনাগার ইকুয়াস হেমিওনাস প্রজাতির একটি উপপ্রজাতি। এটি ঘোড়া পরিবারের অন্যতম প্রাচীন সদস্য। প্রায় ৪০ লাখ বছর আগে এর উৎপত্তি হয়।
এই প্রজাতির পাঁচটি উপপ্রজাতি রয়েছে। এর মধ্যে একটি সিরীয় ওনাগার একসময় আরব উপদ্বীপে ১০০টি পর্যন্ত প্রাণীর পাল নিয়ে বিচরণ করত। কিন্তু শিকার ও আবাসস্থল ধ্বংসের কারণে এটি বিলুপ্ত হয়ে যায়।
জানা মতে, শেষ সিরীয় ওনাগারটিকে ১৯২০-এর দশকের শুরুর দিকে ইরাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। বন্দিদশায় থাকা সর্বশেষ প্রাণীটি ১৯২৭ সালে ভিয়েনা চিড়িয়াখানায় মারা যায়। পারস্য ওনাগার হলো সিরীয় অনাগারের সবচেয়ে কাছের জীবিত আত্মীয়।
জালুমিস বলেন, 'একটি মাত্র প্রজাতি একা কোনো বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার করতে পারে না। তবে একটি আকর্ষণীয় ও প্রতীকী প্রজাতির ফিরে আসা পরিবেশগত ও সাংস্কৃতিক—দুই দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।'
ওনাগার রক্ষার জন্য স্থানীয় উদ্ভিদ, উন্মুক্ত ভূখণ্ড এবং বন্যপ্রাণীর চলাচলের পথও সুরক্ষিত রাখা প্রয়োজন।
জালুমিস বলেন, তাই ওনাগারের সফল বংশবিস্তারকে বৃহত্তর ভূপ্রকৃতি পুনরুদ্ধারের অগ্রগতির একটি সূচক হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর অর্থ হলো রিজার্ভজুড়ে বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার হচ্ছে।
এই প্রকল্প সৌদি আরবের বৃহত্তর সংরক্ষণ প্রচেষ্টার অংশ। দেশটি ২০৩০ সালের মধ্যে তার স্থল ও সামুদ্রিক এলাকার ৩০ শতাংশ সুরক্ষিত করার লক্ষ্যে কাজ করছে।
বন্যপ্রাণীর পরিযায়ী প্রজাতি সংরক্ষণসংক্রান্ত কনভেনশনের স্বাক্ষরকারী সৌদি আরব ২০১৮ সালের শুরুর দিকে সংরক্ষিত স্থলভূমির পরিমাণ প্রায় ৪ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৮ শতাংশ করেছে। একই সময়ে সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকার পরিমাণও প্রায় ২ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৬ শতাংশ হয়েছে।
বেশ কয়েকটি জাতীয় কর্মসূচির মাধ্যমে বন্য পরিবেশ থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া বা গুরুতর হুমকির মুখে থাকা প্রজাতিগুলো পুনরুদ্ধারের কাজ চলছে।
জর্ডানের রয়্যাল সোসাইটি ফর দ্য কনজারভেশন অব নেচারের সঙ্গে অংশীদারত্বের মাধ্যমে প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান রয়্যাল রিজার্ভ আরও একটি স্ত্রী ওনাগার পেয়েছে। এই নতুন প্রাণীটি দুটি পৃথক প্রজনন পাল গড়ে তোলার পরিকল্পনায় সহায়তা করবে। এতে জিনগত বৈচিত্র্য বাড়বে এবং দীর্ঘমেয়াদে অনাগারের সংখ্যা টিকে থাকার সক্ষমতা শক্তিশালী হবে।
রিজার্ভ কর্তৃপক্ষ এমন একটি প্রাথমিক ওনাগারের পাল গড়ে তুলতে চায়, যা ভবিষ্যতে সৌদি আরব ও পুরো অঞ্চলে ওনাগার পুনরুদ্ধারে সহায়তা করতে পারবে।
জালুমিস বলেন, সংরক্ষণে সাফল্য শুধু কতগুলো প্রাণী প্রকৃতিতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, তা দিয়ে মাপা উচিত নয়। বরং শেষ পর্যন্ত মানুষের হস্তক্ষেপ ছাড়াই প্রাণীগুলো স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকতে পারছে কি না, সেটি গুরুত্বপূর্ণ।
ওনাগার এ ক্ষেত্রে একটি সূচক হিসেবে কাজ করে। কারণ বেঁচে থাকার জন্য এদের বিস্তৃত উন্মুক্ত ভূখণ্ড, সুস্থ স্থানীয় উদ্ভিদ এবং পরস্পর সংযুক্ত অভিবাসনপথ প্রয়োজন। যেসব পরিবেশে ওনাগার টিকে থাকতে পারে, সেসব পরিবেশে একই আবাসস্থলের অন্যান্য প্রজাতিও টিকে থাকতে পারে।
জালুমিস বলেন, 'আমাদের লক্ষ্য হলো ১০ বছর পর এমন পরিস্থিতি তৈরি করা, যখন সংরক্ষিত প্রকৃতিক এলাকা বোঝাতে কোনো সাইনবোর্ডের প্রয়োজন হবে না; প্রকৃতিই নিজের পরিচয় দেবে।'
আগামী ২৫ বছরে রিজার্ভ কর্তৃপক্ষ আরবের প্রতীকী বন্যপ্রাণীর স্বনির্ভর জনসংখ্যা গড়ে তুলতে চায়। পুনরুদ্ধার করা চারণভূমিতে এসব প্রাণীর পাল বিচরণ করবে এবং শিকারি প্রাণীগুলো তাদের এলাকায় ফিরে আসবে।
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে পুরো অঞ্চলের সংরক্ষিত এলাকাগুলোর মধ্যে পরিবেশগত করিডর বা সংযোগপথ তৈরি করা। এর মাধ্যমে বন্যপ্রাণীর জনসংখ্যা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া ঠেকানো হবে এবং একটি পরস্পর সংযুক্ত ভূপ্রকৃতি তৈরি হবে।
