আমাদের যেটা মারা গেছে, সেটার জানাজা-টানাজা করেন; ওইটাকে ইস্যু করেন: নাছিরকে ফোনালাপে নানক
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে নিহত এক আন্দোলনকারীকে আওয়ামী লীগের কর্মী বানিয়ে এবং জানাজা দিয়ে 'ইস্যু' তৈরির জন্য চট্টগ্রামের সাবেক মেয়র আ.জ.ম নাছির উদ্দীনকে নির্দেশ দিয়েছিলেন সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক।
সেই ফোনালাপে যুক্ত ছিলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে এমন একটি চাঞ্চল্যকর ফোনালাপের রেকর্ড জমা দেওয়া হয়েছে।
রোববার (৯ আগস্ট) জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সাত শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের তৃতীয় দিনে এই কল রেকর্ডটি দাখিল করা হয়। ট্রাইব্যুনাল-২ এর প্যানেলে প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে বেশ কয়েকটি কল রেকর্ড উপস্থাপনের পাশাপাশি নানক-নাছির ও ওবায়দুল কাদেরের এই কথোপকথনটি সামনে আনা হয়।
প্রসিকিউশনের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম। তার সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ, জহিরুল আমিন, সহিদুল ইসলাম সরদার, সুলতান মাহমুদ ও মার্জিনা রায়হান।
প্রসিকিউশনের দাবি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই চট্টগ্রামের সাবেক মেয়র নাছির উদ্দীনকে ফোন করেন জাহাঙ্গীর কবির নানক। ফোনের শুরুতেই ওবায়দুল কাদের কথা বলেন। নাছির তখন জানান, চট্টগ্রামের মুরাদপুরে সংঘর্ষে তিনজন মারা গেছেন। এর মধ্যে একজনকে নিজেদের লোক বলে দাবি করেন নাছির। তখন ওপার থেকে তাকে নির্দেশ দেওয়া হয়— ওই লাশ নিয়ে জানাজা পড়িয়ে একটি 'ইস্যু' তৈরি করতে।
তবে প্রসিকিউশন আদালতকে জানায়, এমন নির্দেশ পাওয়ার পরও আওয়ামী লীগ কোনো ইস্যু তৈরি করতে পারেনি। কারণ অনুসন্ধানে দেখা যায়, নিহত ব্যক্তি তাদের দলের কেউ ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন সাধারণ ছাত্র-জনতার একজন। ফলে পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর তারা ওই লাশ নিয়ে আর কোনো তৎপরতা চালায়নি।
ফোনালাপের বিস্তারিত
উপস্থাপিত ফোনালাপের শুরুতে কিছু হইচই শোনা গেলেও পরবর্তীতে ওবায়দুল কাদের ও আ.জ.ম নাছিরের কথা স্পষ্ট হয়। তাদের কথোপকথন ছিল নিম্নরূপ:
ওবায়দুল কাদের: হ্যালো, নাছির কি করতেছ?
নাছির: জি ভাই, কাল থেকে তো ফাইট করছি। আজকেও তো ওই ইয়া না, সারাদিনই মারামারি। এখনও চলছে।
ওবায়দুল কাদের: ইউনিভার্সিটি কি ওই শিবিরের...?
নাছির: না, বিশ্ববিদ্যালয় গেছে না না না না...বিশ্ববিদ্যালয় পুরোপুরি একদম নিয়ন্ত্রণে আছে। ১০০ ভাগ নিয়ন্ত্রণে। বিশ্ববিদ্যালয় না। ওখান থেকে এখন টাউনে...।
ওবায়দুল কাদের: ইউনিভার্সিটি, চিটাগং কলেজ...?
নাছির: না না, এগুলো সব নিয়ন্ত্রণে। টাউনের ছোট একটা জায়গায় মুরাদপুর। ওদের সঙ্গে ফাইট হচ্ছে। ওরা বিভিন্ন জায়গা থেকে আইসা ওখানে গত প্রায় ২টা থেকে শুরু হইয়া এখনও পর্যন্ত চলছে। ওইখানে...।
ওবায়দুল কাদের: ওটা মুরাদপুর এক জায়গায়?
নাছির: মুরাদপুর একটা জায়গায়... ছোট্ট একটা জায়গায়। ওইখানে ওই একপাশে ওরা... আর পুরো চট্টগ্রাম পুরো কন্ট্রোলে। পুরো চট্টগ্রাম একদম ইউনিভার্সিটি...।
ওবায়দুল কাদের: আচ্ছা ঠিক আছে, তুমি... কথা বলো। (এরপর ফোন নানককে দেওয়া হয়)
নাছির: আমি একদম দিচ্ছি। নিশ্চিন্তে থাকেন, ১০০ ভাগ নিশ্চিন্তে থাকেন। ইনশাআল্লাহ।
জাহাঙ্গীর কবির নানক: হ্যাঁ, নাসির?
নাছির: জি জি, স্লামালাইকুম।
জাহাঙ্গীর কবির নানক: কি অবস্থা?
নাছির: আমাদের এখানে পুরোপুরি ঠিক আছে। পুরো চট্টগ্রামে শুধু মুরাদপুর একটা জায়গায় শিবির ওই দিকে একটা অবস্থান নিছে। ওরা ওইখানে ফাইট করে এই পর্যন্ত তিনজন মারা গেছে। বুঝছেন? ওইখানে গোলাগুলি চলতেছে।
জাহাঙ্গীর কবির নানক: তিনজন কারা? কারা মারা গেল?
নাছির: পথচারী আছে, ওদের একজন আছে, আমাদেরও একজন আছে। আর প্রচুর ইনজিউরি হইছে। প্রচুর ইনজিউরড হইছে। বুঝছেন না? প্রচুর দুই পক্ষেরই হইছে ওইখানে। আমরা একপাশে আছি।
জাহাঙ্গীর কবির নানক: নাছির ভাই?
নাছির: জি জি জি।
জাহাঙ্গীর কবির নানক: আমাদের যেটা মারা গেছে, সেটার জানাজা-টানাজা করেন। ওইটাকে ইস্যু করেন।
নাছির: ওইটাকে একটু ইস্যু করার চেষ্টা করতেছি। ওইটা এখন মেডিকেলে পাঠাইছে। ওইটা কনফার্ম করে, কনফার্ম করে তারপর ইয়া করবে।
জাহাঙ্গীর কবির নানক: ওইটাকে ইস্যু করেন, ওইটাকে ইস্যু করেন, হ্যাঁ? বি অ্যালার্ট, ওদের কিন্তু খুব খারাপ মতলব। বি অ্যালার্ট।
নাছির: হ্যাঁ, আর একটা বলি; আর সব পুরো একদম ১০০ পার্সেন্ট। ভার্সিটি থেকে আমি মানা করে দিছি যে, তোমরা ওখানেই থাকো। ভার্সিটি সবদিকে ঠিক আছে। ঠিক আছে, ১০০ ভাগ নিয়ন্ত্রণে, একদম ১০০ ভাগ নিয়ন্ত্রণে, ১০০ ভাগ। আর চট্টগ্রাম শহরের সব জায়গায়, একটা জায়গায় ছোট্ট একটা জায়গায়...।
জাহাঙ্গীর কবির নানক: আচ্ছা থ্যাংক ইউ... থ্যাংক ইউ... থ্যাংক ইউ...।
নাছির: থ্যাংক ইউ।
প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম জানান, এই মামলায় প্রসিকিউশনের আরও দুই দিন যুক্তিতর্ক চলবে। এরপর রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবীরা তাদের বক্তব্য উপস্থাপন করবেন।
উল্লেখ্য, এই মামলায় ওবায়দুল কাদের ও জাহাঙ্গীর কবির নানক ছাড়াও অন্য আসামিরা হলেন— আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগ সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক ওয়ালি আসিফ ইনান। বর্তমানে এই সাতজনই পলাতক রয়েছেন।
