চলতি অর্থবছরে ৪১ লাখ পরিবারের মায়ের হাতে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হবে: প্রধানমন্ত্রী
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, চলতি অর্থবছরেই দেশের প্রায় ৪১ লাখ পরিবারের মায়ের হাতে হাতে ফ্যামিলি কার্ড তুলে দেওয়া হবে। বাঁশখালী উপজেলাতেও প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার পরিবার এই সুবিধার আওতায় আসবে।
রোববার (৯ আগস্ট) চট্টগ্রামের বাঁশখালী উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ মাঠে চট্টগ্রাম জেলার সাম্প্রতিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের লক্ষ্যে আয়োজিত 'গৃহ হস্তান্তর, অনুদান ও ত্রাণসামগ্রী বিতরণ' অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, 'নির্বাচনে আমরা যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, সরকার গঠনের এক মাসের মধ্যেই আমরা তার বাস্তবায়ন শুরু করেছি। ফ্যামিলি কার্ডের পাইলট প্রকল্পের কাজ সফলভাবে শেষ হয়েছে এবং চলতি মাসের ১৬ তারিখ থেকে মূল কাজ শুরু হতে যাচ্ছে। সমগ্র বাংলাদেশে এই বছর ২০২৬-২৭ অর্থবছরে আমরা প্রায় ৪১ লাখ পরিবারের মায়ের হাতে আমরা এই ফ্যামিলি কার্ড ইনশা আল্লাহ তুলে দেব। বাঁশখালী উপজেলাতেও প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার পরিবার এই সুবিধার আওতায় আসবে।'
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, 'মা-বোনদের জন্য ফ্যামিলি কার্ডের পাশাপাশি কৃষকদের জন্যও চালু করা হচ্ছে কৃষক কার্ড, যা সাধারণ কৃষকের পাশাপাশি লবণ চাষীরাও পাবেন। লবণ চাষীদের অর্থনৈতিক সচ্ছলতা ফেরাতে লবণের নতুন মূল্য নির্ধারণের ঘোষণাও শিগগিরই দেওয়া হবে। যার ফলে লবণ চাষী ভাইদের আর আগের মতো কষ্ট পোহাতে হবে না।'
দেশের প্রতিটি পরিবারের সার্বিক কল্যাণ ও সামাজিক সুরক্ষার কথা তুলে ধরে সরকার প্রধান বলেন, 'জনগণ আমাদের নির্বাচিত করেছে, তাই সরকারের মূল দায়িত্ব হলো জনগণের পাশে থাকা। সুখে-দুঃখে দেশের মানুষের পাশে থাকা, মা-বোনদের পাশে থাকা, দেশের সন্তানদের লেখাপড়ার ব্যবস্থা করা, অসুস্থ মানুষদের যথাযথ চিকিৎসার ব্যবস্থা করা এবং নারী-পুরুষ নির্বিশেষে তরুণ-যুব সমাজের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা।'
এ সময় প্রধানমন্ত্রী দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতি অব্যাহত রাখতে এবং শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারীদের ব্যাপারে দেশবাসীকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, 'বিগত কিছুদিন ধরে কিছু মানুষ বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে। তাদের ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে, যেন তারা কোনোভাবে বিশৃঙ্খলা বা বিভ্রান্তি সৃষ্টির সুযোগ না পায়। বিভ্রান্তকারীরা বিভ্রান্তি ছড়িয়ে নিজেদের মতো চলে যাবে, কিন্তু দিনশেষে ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশের জনগণ।'
সংসদে সরকারের পরিকল্পনা উপস্থাপনের প্রসঙ্গ তুলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'বিএনপি সরকার জাতীয় সংসদে বিদ্যুৎ, জ্বালানিসহ সার্বিক উন্নয়ন পরিকল্পনা উপস্থাপন করবে। বিরোধী দল বা অন্য কারও যদি কোনো পরিকল্পনা থাকে, তা জনগণের সামনে উপস্থাপন করুন। কিন্তু বিভ্রান্তিকর কথা বলে দেশে বিশৃঙ্খলা তৈরি করবেন না এবং জনগণের শান্তি নষ্ট করবেন না। দেশ স্বাধীন হয়েছে ৫০ বছরের বেশি সময় আগে; এখন আর পেছনে তাকানোর সুযোগ নেই, এখন কাজ করার ও দেশ গড়ার সময়।'
চট্টগ্রামকে অর্থনৈতিক করিডোর হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'আজ সকালে আমি মাতারবাড়ীসহ চট্টগ্রামের মহেশখালী ও মীরসরাই অঞ্চল পরিদর্শন করেছি। বিশাল সমুদ্র আমাদের জাতীয় সম্পদ। চট্টগ্রাম অঞ্চলকে কেন্দ্র করে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা হচ্ছে। সম্প্রতি চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষ অঞ্চলের ব্যবস্থা করা হয়েছে, যেখানে বহু শিল্প-কারখানা গড়ে উঠবে এবং হাজার হাজার যুবকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।'
স্বাস্থ্যসেবা খাতের সংস্কার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, 'বর্তমানে উপজেলা পর্যায়ে থাকা ৫০ শয্যার হাসপাতালগুলোকে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে ১০১ শয্যায় উন্নীত করা হবে, যাতে তৃণমূলের মানুষ পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাসেবা পান।'
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত নিয়ে তারেক রহমান বলেন, 'বিগত স্বৈরাচার আমলে এই দেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতকে হাতে গোনা কিছু ব্যক্তির হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল, যা এই দেশের মানুষের পক্ষে ছিল না। কিছু মানুষের সুবিধার জন্য অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা এই ব্যবস্থাকে জনগণের স্বার্থে পুনর্গঠন করতে কিছুটা সময় প্রয়োজন। আমরা এরই মধ্যে এই কাজ শুরু করেছি। ইনশাআল্লাহ, আগামী ১০ বছরে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা কেমন হবে- সেই প্রস্তাবনা আমরা জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করব।"
তিনি বলেন, আমরা এমন পরিকল্পনা নিচ্ছি, যাতে স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল, মিল-কারখানা কিংবা বাসাবাড়ি- সব জায়গায় মানুষ যেন ঠিকভাবে বিদ্যুৎ পায়, এবং গাড়ি-মোটরসাইকেলসহ সবকিছুতে মানুষ যেন সহজে গ্যাস পেতে পারে।
সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে চট্টগ্রামের নেতৃত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী স্থানীয়দের ধৈর্য ধারণ ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সহযোগিতার আহ্বান জানিয়ে বলেন, 'আপনাদের চট্টগ্রাম থেকে আমরা দুইজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে সরকারের দুইটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিয়েছি- একটি অর্থ মন্ত্রণালয়, আরেকটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। যে অঞ্চলের দুইজন ব্যক্তি এত গুরুত্বপূর্ণ দু'টি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আছেন, সেই এলাকার উন্নয়ন কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না, ইনশাআল্লাহ।'
তারেক রহমান বলেন, 'আর পিছনে পড়ে থাকা যাবে না। এখন একটি লক্ষ্য, একটি উদ্দেশ্য, তা হলো জনগণের জীবনমান উন্নত করা। দেশের ভাগ্যের পরিবর্তন করা। আমরা জনগণের জন্য যেসব পরিকল্পনা গ্রহন করেছি তাতে আপনাদের সমর্থন থাকতে হবে। কারণ আমরা সবসময় বলি, বিএনপির সকল ক্ষমতার উৎস হচ্ছে জনগণ। জনগণের সমর্থন থাকলে আমরা জনগণের স্বার্থে যতগুলো কর্মসূচি নিয়েছি সবগুলো বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হব।'
প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'আমরা চাই বাংলাদেশের ২০ কোটি মানুষের ৪০ কোটি শ্রমিকের হাতকে কর্মশক্তিতে রূপান্তর করতে। যাতে করে প্রত্যেকটি মানুষ দেশ গঠনে ভূমিকা রাখতে পারে, যাতে করে প্রত্যেকটি মানুষ পরিশ্রমের মাধ্যমে নিজের এবং পরিবারের ভাগ্যের পরিবর্তন করতে পারে।'
তিনি বলেন, 'আসুন আজকের এই জনসভায় আমরা সেই শপথ গ্রহণ করে প্রতিজ্ঞা করি যে বাংলাদেশের মানুষ আর বিভ্রান্ত হবে না। বাংলাদেশের মানুষ এখন সামনের দিকে যাবে বাংলাদেশের মানুষ নিজেদের ভাগ্যের পরিবর্তন করবে।'
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং ত্রাণ ও দুর্যোগ প্রতিমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু। এছাড়া বিএনপির ঊর্ধ্বতন নেতৃবৃন্দ, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা এবং বিপুল সংখ্যক সাধারণ মানুষ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
'গৃহ হস্তান্তর, অনুদান ও ত্রাণসামগ্রী বিতরণ' অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য নতুন বাসগৃহ নির্মাণ কর্মসূচির আওতায় বাঁশখালীর বাহারছড়া গ্রামের একটি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের কাছে নতুন বাড়ির চাবি হস্তান্তর করেন।
নতুন বাড়ির আঙিনায় একটি মেহগনি গাছের চারাও রোপণ করেন প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারটিকে চালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য ও হাঁস-মুরগি প্রদান করেন তিনি।
