হরমুজ প্রণালির ভেতর থেকে আবার তেল রপ্তানি কার্যক্রম শুরু করেছে সৌদি আরব
গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের সময় ট্যাঙ্কার বহরে হামলার ঘটনায় সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার পর, অবশেষে হরমুজ প্রণালির ভেতর থেকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল বোঝাই (লোডিং) ও বিক্রি ফের শুরু করেছে সৌদি আরামকো। আন্তর্জাতিক শিপিং ডেটা এবং বাণিজ্য সূত্রের বরাতে বার্তাসংস্থা রয়টার্স এ তথ্য জানিয়েছে।
জাহাজ ট্র্যাকিং তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় এই জ্বালানি জায়ান্ট— খোলাবাজার বা স্পট মার্কেটে ভারী অপরিশোধিত তেল বিক্রির প্রস্তাব দেওয়ায়—আরও বেশ কয়েকটি তেলবাহী ট্যাঙ্কার হরমুজের ভেতরে তেল বোঝাইয়ের অপেক্ষায় নোঙর করে আছে।
গতকাল সোমবার পর্যন্ত পাওয়া তথ্যে জানা যায়, বিশ্বের শীর্ষ তেল রপ্তানিকারক এই প্রতিষ্ঠানটি চলতি মাসে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ উপকূলে 'শিপ-টু-শিপ' বা এক জাহাজ থেকে অন্য জাহাজে স্থানান্তরের মাধ্যমে এশিয়ার বেশ কয়েকটি শোধনাগারকে 'আরব মিডিয়াম' এবং 'আরব হেভি' গ্রেডের তেল সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছে।
হরমুজ দিয়ে সৌদি রপ্তানি ফের শুরুর এই পদক্ষেপ, বাজারে ভারী গ্রেডের তেলের তীব্র সংকট কমাতে সহায়তা করবে। এ ধরনের ভারী অপরিশোধিত তেল বা ক্রুড মূলত জাহাজের জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত রেসিডিউ ফুয়েল তৈরিতে এবং শোধনাগারে প্রক্রিয়াজাত করে পেট্রোল ও ডিজেলের মতো উচ্চমানের জ্বালানি উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়।
শিপ ট্র্যাকিং ডেটা অনুযায়ী, গত ১২ থেকে ১৬ আগস্টের মধ্যে মালয়েশিয়া প্রসপারিটি, আলজেরিয়া প্রসপারিটি ও সিঙ্গাপুর প্রসপারিটি নামের তিনটি বিশাল আকৃতির তেলবাহী জাহাজ (ভিএলসিসি)—সৌদির জুয়ায়মাহ এবং রাস তানুরা টার্মিনাল থেকে ২০ লাখ ব্যারেল করে তেল বোঝাই করেছে।
জাহাজ ট্র্যাকিং সংস্থা– ভোর্টেক্সা ও কেপলার-এর উপাত্তে দেখা যায়, বন্দর দুটি থেকে সর্বশেষ তেল বোঝাই করার পর মাঝখানে প্রায় তিন সপ্তাহের একটি দীর্ঘ বিরতি ছিল। তবে ভিএলসিসি জাহাজগুলো ঠিক কোন গ্রেডের তেল বহন করছে, সেটি তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে সৌদি আরামকো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। অন্যদিকে ভিএলসিসি জাহাজগুলোর মালিকানা প্রতিষ্ঠান 'সিনোকোর'-এর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা সাড়া দেয়নি।
কেপলার-এর প্রাথমিক তথ্য বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, চলতি মাসের শেষ দিকে হরমুজ প্রণালির ভেতর থেকে আরও অন্তত ছয়টি ভিএলসিসি সৌদি তেল বোঝাই করতে পারে।
ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহনের জন্য সিনোকোরের জাহাজের পাশাপাশি সৌদি আরামকো তাদের নিজস্ব মালিকানাধীন সৌদি ট্যাঙ্কারও ব্যবহার করতে পারে। লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জ গ্রুপের (এলএসইজি) আজ মঙ্গলবার প্রকাশ করা শিপিং তথ্যে দেখা গেছে, সৌদিভিত্তিক অপারেটর 'বাহরি'-র মালিকানাধীন সাতটি ভিএলসিসি সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমান উপকূলে ভাসমান অবস্থায় রয়েছে এবং আরও দুটি জাহাজ ফুজাইরাহের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
সিদি কেরির রুট ও লোহিত সাগরের চ্যালেঞ্জ
তবে হরমুজ দিয়ে রপ্তানি শুরু হলেও, সৌদি আরবের সার্বিক তেল রপ্তানি এখনো বেশ সীমিত। কারণ লোহিত সাগরে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের টানা অবরোধের মুখোমুখি হচ্ছে দেশটি। এর আগে ইরান যুদ্ধের সময় সৌদি আরামকো তাদের প্রধান রপ্তানি কার্যক্রমের জন্য লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরের ওপর বেশি নির্ভর করছিল। কিন্তু, সেখানেও বাধ সাধে ইরান-সমর্থিত হুথিদের অবরোধ।
বিকল্প হিসেবে মিশরের ভূমধ্যসাগরীয় সিদি কেরির বন্দর থেকে অতিরিক্ত অপরিশোধিত তেল বোঝাইয়ের প্রস্তাব দেয় সৌদি আরামকো। কিন্তু ইয়ানবু বন্দর অবরুদ্ধ হওয়ার আগে সেখান থেকে দৈনিক যে ৪০ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি হতো, সিদি কেরির দিয়ে প্রস্তাবিত তেল রপ্তানির পরিমাণ তার তুলনায় খুবই কম। তা ছাড়া বাড়তি শিপিং খরচ এবং ঘুরপথের দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার কারণে এশীয় ক্রেতারা সেখান থেকে তেল কিনতে খুব একটা উৎসাহও দেখাচ্ছে না।
কেপলারের তথ্যানুযায়ী, চলতি মাসে এশিয়ায় পাঠানোর উদ্দেশ্যে মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় ৬,৭০,০০০ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল সিদি কেরির বন্দরে বোঝাই করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে, যা বিগত তিন মাসে ছিল শূন্যের কোঠায়।
ভোর্টেক্সার চীন বাজার বিশ্লেষক এমা লি এ বিষয়ে বলেন, "এই উপাত্ত প্রমাণ করে যে এশিয়ার ক্রেতাদের জন্য সিদি কেরির বন্দরের প্রস্তাবটি হয়তো আশানুরূপ কাজ করছে না। কারণ সেখানকার ক্রেতারা—বিশেষ করে চীনা ক্রেতারা—দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রা এবং অতিরিক্ত পরিবহন খরচ নিয়ে একেবারেই সন্তুষ্ট নন।"
