ইমরান খান মুক্তি পেলে পাকিস্তানের সেনাপ্রধানের সঙ্গে বিরোধে জড়াবেন না: ঘনিষ্ঠ সহযোগী
কারাগারে বন্দি পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান মুক্তি পেলে দেশটির সামরিক বাহিনী কিংবা সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল সৈয়দ আসিম মুনিরের সঙ্গে সরাসরি কোনো বিরোধে জড়াবেন না বলে রয়টার্সকে জানিয়েছেন তার অন্যতম ঘনিষ্ঠ এক সহযোগী। চলতি সপ্তাহে একটি আইনি অগ্রগতির পর সেনাপ্রধান আসিম মুনিরকে 'সহানুভূতির হাত' বাড়িয়ে দেওয়ার উপযোগী ব্যক্তিত্ব হিসেবে তুলে ধরেছেন ওই সহযোগী।
পাকিস্তানের সর্বোচ্চ আদালত ইমরান খানকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে স্থানান্তরের নির্দেশ দেওয়ার পর এমন মন্তব্য করা হলো। বিষয়টিকে ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) অবস্থানের একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বছরের পর বছর ধরে পিটিআই সমর্থকেরা সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে আসছে। সামরিক নেতৃত্বের সঙ্গে বিরোধের জের ধরে ২০২৩ সালে ইমরান খানকে কারারুদ্ধ করার পেছনে মুনিরকেই মূল কারিগর বলে মনে করেন দলের সমর্থকেরা। সাবেক ক্রিকেট তারকা ইমরান খান নিজেও মুনিরকে 'মানসিকভাবে অস্থিতিশীল' বলে অভিহিত করেছেন।
তবে গত বুধবার এক সাক্ষাৎকারে পিটিআইয়ের মুখপাত্র ও ইমরান খানের সহযোগী জুলফিকার বুখারি সেনাবাহিনীর সঙ্গে পিটিআইয়ের সমঝোতায় আসার সবচেয়ে শক্তিশালী সংকেত দেন। এর মাধ্যমে পাকিস্তানের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম তীব্র এক টানাপোড়েন শিথিল হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, যদিও ইমরান খান নিজে এই সমঝোতা চান কি না—তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।
ইমরান খানকে 'উদার ও মহানুভব' হিসেবে উল্লেখ করে বুখারি বলেন, 'ধরে নেওয়া যাক কালকে যদি ইমরান খান মুক্তি পান, তবে তিনি এমন কোনো কাজ করবেন না যা রাষ্ট্রের ক্ষতি করে।'
তিনি আরও বলেন, 'এর মানে এই নয় যে আপনি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে, সামরিক নেতার সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে পড়বেন। নিজের ক্ষোভ ও কষ্টকে আপনাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। দেশের বৃহত্তর স্বার্থে আপনাকে তা সহ্য করতে হবে।'
বুখারীর এই মন্তব্যের প্রতিক্রিয়া জানতে পাকিস্তান সরকার ও সামরিক বাহিনীর সঙ্গে অবিলম্বে যোগাযোগ করা হলেও কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। সামরিক বাহিনী অবশ্য অতীতে একাধিকবার জানিয়েছে যে তারা রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করে না, অন্যদিকে সরকারের ভাষ্য মতে ইমরান খানের মামলাগুলো সম্পূর্ণ আদালতের আওতাধীন।
ইমরানের চিন্তাভাবনা ভিন্ন হতে পারে বলে বিশ্লেষকদের সতর্কতা
গত মঙ্গলবার দেশটির সুপ্রিম কোর্ট ৭৩ বছর বয়সী ইমরান খানকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কারাগার থেকে একটি বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরের নির্দেশ দেন। বিশ্লেষকদের মতে, সাময়িকভাবে হলেও সেনাবাহিনী ও পিটিআইয়ের মধ্যকার উত্তাপ কমানোর ক্ষেত্রে এই সিদ্ধান্তকে একটি প্রথম পদক্ষপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সুপ্রিম কোর্টের এই রায়কে 'আশার নতুন আলো' হিসেবে বর্ণনা করে বুখারি জানান, হাসপাতালের সামনে কর্মী ও নেতাদের জড়ো না হওয়ার যে নির্দেশনা আদালত দিয়েছেন, পিটিআই তা পুরোপুরি মেনে চলবে। তবে বৃহস্পতিবার বিকেল পর্যন্ত ইমরান খানকে হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়নি এবং এর আগে কারিগরি ত্রুটির কারণে প্রত্যাখ্যাত আবেদনটি সরকার আবারও পুনর্বিবেচনার জন্য জমা দেবে কি না—তা অস্পষ্ট ছিল।
পিটিআই ও সামরিক বাহিনীর মধ্যে আনুষ্ঠানিক কোনো আলোচনা চলছে না উল্লেখ করে বুখারি সেনাপ্রধান আসিম মুনিরকে পাকিস্তানের সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যক্তি হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।
বুখারি বলেন, সেনাপ্রধান যদি 'কোনো এক শুভ সকালে' ঘুম থেকে উঠে ভাবেন যে—'অনেক হয়েছে, এখন আমাকে জাতির অভিভাবক হিসেবে ভূমিকা রাখতে হবে', তবে তিনি দেশের ওপর 'সহানুভূতির হাত' বুলিয়ে দিতে পারেন। বুখারি যোগ করেন, 'আমার বিশ্বাস, সেক্ষেত্রে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সব রাজনৈতিক বন্দি মুক্তি পেয়ে যাবেন।'
তবে বিশ্লেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, গ্রেপ্তারের হাত থেকে বেঁচে যাওয়া পিটিআইয়ের বর্তমান নেতৃত্বের সঙ্গে ইমরান খানের নিজস্ব চিন্তাভাবনার তফাত থাকতে পারে। পাকিস্তান কর্তৃপক্ষের কঠোর পদক্ষেপের কারণে দলটির প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো অনেকটাই ভেঙে পড়েছে এবং সাবেক শীর্ষ নেতাদের অনেকেই এখনো কারাগারে বন্দি রয়েছেন।
আটলান্টিক কাউন্সিলের সিনিয়র ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান জানান, 'যতক্ষণ পর্যন্ত ইমরান খান কারাগারে আছেন, ততক্ষণ রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য যেকোনো আলোচনা বা বোঝাপড়ায় পিটিআইয়ের বিদ্যমান নেতৃত্ব ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নিতে সক্ষম কি না—তা বলা কঠিন।'
