অতীত অভিজ্ঞতা ভালো নয়: বিদেশি উদ্ধারকারী দল পাঠানোর প্রস্তাবে প্রত্যাখ্যান নেপালের, চায় অর্থ সহায়তা
নেপালে বুধবারের আকস্মিক বন্যায় এ পর্যন্ত ৪৭২ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। বিদেশি নাগরিকসহ এখনও নিখোঁজ আছেন ১ হাজারের বেশি মানুষ। এ অবস্থায় বাংলাদেশ, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপানের মতো দেশগুলো উদ্ধারকারী পাঠাতে প্রস্তাব দিয়েছিল নেপালকে। তবে নেপাল সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছে। নিজস্ব নিরাপত্তা সংস্থাগুলোই এই অভিযান সামলাতে সক্ষম বলে জানিয়েছে দেশটি।
এর বদলে, নেপাল নগদ অর্থ সহায়তা চাইছে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পুনর্গঠন পর্যায়ে বাড়তি আর্থিক ও অন্যান্য সহায়তা চাওয়া হবে। আর উদ্ধারকারী দল পাঠানোর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের কারণ অতীত অভিজ্ঞতা।
কয়েকটি দেশ এরই মধ্যে আর্থিক সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে। পাশাপাশি আরও অনেক দেশ তল্লাশি, উদ্ধার, পুনর্বাসন ও পুনর্গঠন কার্যক্রমে নেপালকে সাহায্য করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
নেপাল পুলিশের তথ্যমতে, বুধবার থেকে নিখোঁজ রয়েছেন ১৭৮ জন ভারতীয়, ৬৫ জন আমেরিকান, ৫১ জন মালয়েশিয়ান, ৫৩ জন ইউক্রেনীয়, ৩৩ জন ব্রিটিশ, ৩৫ জন অস্ট্রেলীয় ও ২৫ জন কানাডীয় নাগরিক। এর বাইরে আরও প্রায় তিন ডজন দেশের নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন।
চীনা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নেপালে অন্তত ১০০ জন চীনা নাগরিকের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। অন্যদিকে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বন্যায় আটকে পড়া ২০০-র বেশি ভারতীয় নাগরিক উদ্ধারের অপেক্ষায় রয়েছেন।
নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা থেকে নিজস্ব তল্লাশি ও উদ্ধারকারী দল পাঠানোর জন্য তাদের সরকারের কাছে একাধিক আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক অনুরোধ এসেছে। তবে নেপাল সরকার তাদের জানিয়েছে, তাদের নিজস্ব নিরাপত্তা সংস্থাগুলোই এই অভিযান পরিচালনা করতে সক্ষম।
ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশের কর্মকর্তারা তল্লাশি ও উদ্ধার কার্যক্রমে সহায়তা করার জন্য তাদের নিজস্ব দল পাঠানোর অনুমতি চেয়ে সরকারের কাছে অনুরোধ করেছিলেন।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ২০১৫ সালের ভূমিকম্পের অভিজ্ঞতার আলোকেই নেপাল সরকার এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ওই সময় বিদেশি তল্লাশি ও উদ্ধারকারী দলের ঢল এবং দেশগুলোর মধ্যকার প্রতিযোগিতার কারণে সমন্বয় ও ব্যবস্থাপনায় মারাত্মক সমস্যা দেখা দিয়েছিল।
নেপালের সেনাবাহিনী ও পুলিশের সুপারিশের ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বন্যার পর শত শত ভারতীয় নাগরিক নিখোঁজ বা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লে ভারত সরকার নেপালে তাদের ন্যাশনাল ডিজাস্টার রেসপন্স ফোর্স মোতায়েনের অনুমতি চেয়েছিল। কিন্তু নেপাল সরকার সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে।
নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই কর্মকর্তা বলেন, 'আমরা চীন ও অন্যান্য দেশ থেকেও একই ধরনের অনুরোধ পেয়েছিলাম, কিন্তু অনুরোধগুলো ফিরিয়ে দিতে হয়েছে।'
এদিকে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত বিদেশি নাগরিকদের সহায়তা করার জন্য দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি ইমার্জেন্সি রেসপন্স টিম গঠন করেছে। দলটি মন্ত্রণালয়ের ভেতরে প্রধান সমন্বয়কারীর দায়িত্ব পালন করবে। এটি বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত, নিখোঁজ অথবা বন্যা পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত বিদেশি নাগরিকদের তল্লাশি, উদ্ধার, তথ্য যাচাই ও কনস্যুলার সহায়তা দেওয়ার কাজ করবে।
নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল বৃহস্পতিবার মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত যুগ্ম-সচিবদের নির্দেশ দিয়েছেন, তারা যেন বিদেশি সরকারগুলোর সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ বজায় রাখেন এবং তাদের নিখোঁজ নাগরিকদের বিষয়ে নিয়মিত হালনাগাদ তথ্য প্রদান করেন।
এছাড়া বিদেশে অবস্থিত নেপালের মিশনগুলোকে কেবল 'প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলের' মাধ্যমেই আর্থিক সহায়তা সংগ্রহের নির্দেশ দিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বৃহস্পতিবার জানান, ভারত নেপালে ৪৭.৫ টনেরও বেশি ত্রাণসামগ্রী পাঠিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও বিশ্বব্যাংক ইতোমধ্যে আর্থিক সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) প্রেসিডেন্ট মাসাতো কান্ডা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলে, তিনি প্রধানমন্ত্রী বলেন্দ্র শাহের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানিয়েছেন যে এডিবি নেপাল ও নেপালের জনগণের পাশে রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে বলেছেন, নেপাল সরকারকে মানবিক সহায়তা দিতে যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তুত রয়েছে।
বিদেশে অবস্থিত নেপালি দূতাবাস ও মিশনগুলোও বন্যাদুর্গত জনগোষ্ঠীর উদ্ধার, ত্রাণ ও পুনর্বাসনের জন্য আর্থিক সহায়তা চেয়ে বিবৃতি জারি করেছে।
