হিমবাহ ধস থেকেই নেপালে প্রাণঘাতী আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধস, বলছেন বিশেষজ্ঞরা
তিব্বত সীমান্তের কাছে নেপালে গতকাল বুধবার ভয়াবহ এক আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধস ঘটেছে। ভয়াবহ এই বিপর্যয়ের নেপথ্যে হিমবাহ ধস থাকতে পারে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। কৃত্রিম উপগ্রহ বা স্যাটেলাইট পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান 'প্ল্যানেট ল্যাবস'-এর পাঠানো ছবি বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা এ কথা জানিয়েছেন।
তারা জানান, একটি হিমবাহের নিম্নাংশ ভেঙে শত শত মিটার নিচের উপত্যকায় আছড়ে পড়ার ফলে—এই মর্মান্তিক বিপর্যয় ঘটেছে।
ঠিক কী কারণে হিমবাহটি ধসে পড়ল, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে নেপালের সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, ওই অঞ্চলে ঠিক কয়েক মিনিট আগে আঘাত হানা একটি ভূমিকম্প এর পেছনে দায়ী হতে পারে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) পরবর্তীতে জানায়, যে কম্পন অনুভূত হয়েছিল, তা মূলত হিমবাহের বরফ ও পাথর ভেঙে পড়া এবং পরবর্তীতে তা বিপুল বেগে নিচে নেমে আসার ফলে সৃষ্ট ভূকম্পন তরঙ্গ।
এপর্যন্ত প্রায় ১৭০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তবে নেপাল ও চীন—দুই দেশের কর্তৃপক্ষই আশঙ্কা করছে যে, মোট প্রাণহানির সংখ্যা এর থেকেও অনেক বেশি হতে পারে। এই দুর্যোগের পর অন্তত ৭০০ জন বিদেশী নাগরিকসহ প্রায় ১,৫০০ মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।
দুর্যোগের আগের ও পরের স্যাটেলাইট ছবি পর্যালোচনা করে রয়টার্স জানিয়েছে, যে সবুজ পাহাড়ি ঢাল দুর্যোগের আগে ঘটনাস্থলে দৃশ্যমান ছিল, তা এখন বাদামী রঙের ধ্বংসাবশেষ ও পলিমাটির নিচে চাপা পড়ে গেছে।
ভারতের সিকিম ইউনিভার্সিটির ইঞ্জিনিয়ারিং জিওলজির অধ্যাপক বিক্রম গুপ্ত বলেন, "এটা নিশ্চিত যে ঘটনার শুরুতেই হিমবাহের অগ্রভাগের (স্নআউট) একটি বড় অংশ ধসে পড়েছিল—যার সঙ্গে বিশাল পরিমাণ পাথর ও পলি যুক্ত হয়ে তীব্র গতিতে নিচে নেমে আসে।"
কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ক্যালগারির সহযোগী অধ্যাপক ও ভূবিজ্ঞানী ড্যান শুগার বলেন, স্যাটেলাইট ছবি দেখে মনে হচ্ছে দুর্যোগের আগের ২৪ ঘণ্টায় ওই এলাকায় বিপুল বরফ গলেছিল।
তিনি বলেন, " 'এ উপত্যকার কিছু হিমবাহ গতকালও (গত মঙ্গলবার) বরফে ঢাকা ছিল। কিন্তু দুর্ঘটনার দিন সেগুলোর ওপর শুধু উন্মুক্ত বরফস্তর দেখা যাচ্ছে। এর সহজ অর্থ হলো, যদিও আমি এখনো আবহাওয়াকেন্দ্রের কোনো তথ্য পাইনি, সেখানকার আবহাওয়া সম্ভবত হঠাৎ আরও উষ্ণ হয়ে উঠেছিল।'
২০২৩ সালে জাতিসংঘ জানায়, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে গত ৩০ বছরে নেপালের বরফাবৃত পর্বতগুলো তাদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বরফ হারিয়েছে। শীর্ষ দুটি কার্বন নিঃসরণকারী দেশ—ভারত ও চীনের মাঝখানে অবস্থিত হওয়ায় নেপালের হিমবাহগুলো আগের দশকের তুলনায় গত দশকে ৬৫ শতাংশ দ্রুত গতিতে গলেছে।
ড্যান শুগার বলেন, "প্ল্যানেট ল্যাবসের সকালের স্যাটেলাইট ছবিতে আমি দেখতে পাচ্ছি, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৫,২০০ মিটার উঁচুতে থাকা হিমবাহের নিচের অংশটি ভেঙে প্রায় ১,২০০ মিটার নিচের উপত্যকায় আছড়ে পড়েছে।"
এই দুর্যোগের পেছনে অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণও অন্যতম কারণ হতে পারে জানিয়ে তিনি বলেন, "এতে জলবায়ু পরিবর্তনের কতটা ভূমিকা ছিল, তা নিশ্চিতভাবেই আমরা অদূর ভবিষ্যতে খতিয়ে দেখব।"
'আইস-রক অ্যাভালাঞ্চ' বা বরফ-পাথরের ধস
নেপালের রসুয়া নামের পাহাড়ি জেলাটির জনসংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এ এলাকায় বেশ কয়েকটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প রয়েছে।
নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নেপাল-চীন সীমান্ত ক্রসিং থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার (১২ মাইল) উত্তর-পূর্বে একটি ভূমিধসের কারণে লেন্দে নদীতে এ 'হিমবাহ-মিশ্রিত বন্যা' দেখা দেয়।
প্রাথমিক প্রতিবেদনে ভূকম্পনের কারণে তুষারধস এবং এর জেরে এ বন্যা হতে পারে বলে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল। তবে ওই সংস্থার ভূতত্ত্ববিদ প্রকাশ পোখরেল জানান, ভূমিকম্পই এ ট্র্যাজেডির মূল কারণ কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
প্ল্যানেট ল্যাবসের ছবিগুলো পর্যালোচনা করে প্রকাশ পোখরেল বলেন, 'নেপাল অংশে একটি বরফ ও পাথরের ধসের কারণেই আকস্মিক বন্যা হয়েছে।'
হিন্দুকুশ হিমালয় অঞ্চলজুড়ে বন্যা, ভূমিধস, বরফধস এবং খরার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের হার ও তীব্রতা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। 'ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট' জানিয়েছে, এই অঞ্চলে পানি, ভূমি ও বায়ুমণ্ডলের দ্রুত পরিবর্তন মানুষের জীবনযাত্রার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সংস্থাটি গতকাল জানায়, গতকালের আকস্মিক বন্যার ফলে ভোটে কোশি ও ত্রিশূলী নদী অববাহিকায় তীব্রগতিতে পানি, পলি ও বিশালাকার পাথর বয়ে গেছে। এর ফলে ভাটির দিকে গালছি এলাকায় নদীর পানির স্তর মাত্র ৩০ মিনিটের মধ্যে প্রায় ৯ মিটার (৩০ ফুট) পর্যন্ত বেড়ে যায়।
এ বন্যা ও ভূমিধসকে ২০১৫ সালের প্রাণঘাতী ভূমিকম্পের পর নেপালের সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ বলা হচ্ছে।
