যুক্তরাষ্ট্র থেকে এসে বাংলাদেশের ফুটবলে আলো ছড়াচ্ছেন সুলিভান ভাইয়েরা, স্বপ্ন বিশ্বকাপ খেলার
অনুশীলনে গিয়ে জীবনে মাত্র দুবার পানেনকা শট নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন রোনান সুলিভান। পৃথিবীর অন্য প্রান্তে নেওয়া দুবারের সেই চেষ্টার মধ্যে একটি শট লেগেছিল ক্রসবারে। এতে তার যমজ ভাই ডেকলান বিন্দুমাত্র অবাক হননি, যখন রোনান তার দিকে ফিরে বললেন—দক্ষিণ এশীয় ফুটবল ফেডারেশনের (সাফ) অনূর্ধ্ব-২০ চ্যাম্পিয়নশিপের গোলশূন্য ফাইনালের টাইব্রেকারে পঞ্চম ও জয়সূচক পেনাল্টিটি তিনি চিপ শটেই নিচ্ছেন। অনলাইনে কোটি কোটি মানুষের চোখ তখন ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার সেই রোমাঞ্চকর লড়াইয়ে।
সেন্ট জোসেফ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডরমিটরির সোফায় ভাইয়ের পাশে বসে স্মৃতির পাতায় ডুব দিয়ে ডেকলান বলেন, 'ওর মুখে এটা বলারও প্রয়োজন ছিল না। আমি পুরোটা সময় জানতাম ও সেটাই করতে যাচ্ছে। জয়সূচক শেষ পেনাল্টি শটটা পেলে ও যে ওটাই করবে, তা আমার জানা ছিল। ও এমনই।'
কিছু মুহূর্ত পরেই বলটি নিখুঁত ছন্দে প্রতিপক্ষের জালে গিয়ে আছড়ে পড়ে। আর ৩ এপ্রিল মালদ্বীপের মালের স্টেডিয়ামে উপস্থিত হাজার হাজার দর্শক ফেটে পড়েন উদযাপনে।
রোনান বলেন, 'পরিস্থিতিটা এভাবে শেষ হবে—কেউ আমাকে আগে বললে বিশ্বাসই করতাম না।'
'সেভ বাংলাদেশ ফুটবল' নামের একটি ফ্যান পেজের সঙ্গে ইনস্টাগ্রামে বার্তা আদান-প্রদানের মাধ্যমে শুরু হয়েছিল এ যাত্রা। দুই বছরেরও কম সময়ের মধ্যে উদযাপিত হলো এই অনূর্ধ্ব-২০ শিরোপা।
রোনান স্মৃতিচারণ করে বলেন, 'একা একা উড়ে মালদ্বীপে যাওয়াটা দারুণ এক অভিজ্ঞতা ছিল। সেখানকার পানির রঙ এত নীল, জীবনে এমন রূপ কখনো দেখিনি। যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির ওশান সিটিতে গেলে দেখি ঘোলা পানি, আর সেটাই এতদিন আমাদের সবচেয়ে প্রিয় জায়গা ছিল। কিন্তু মালদ্বীপের পানি দেখে আমাদের চোখ ছানাবড়া হয়ে যায়, মনে হচ্ছিল 'দ্য ওয়াটারবয়' সিনেমার সেই বিশেষ পানির মতো... এটা যেন শুধুই মালদ্বীপের পানি।'
গল্পটি যেন হলিউডের কোনো চিত্রনাট্য থেকে নেওয়া। ফিলাডেলফিয়ার দুই কিশোর, যাদের নামও পুরোপুরি আইরিশ ঘরানার। টুর্নামেন্টের আগে বাংলাদেশের অনূর্ধ্ব-২০ দলে ট্রায়াল দিতে আসার আগে তারা কখনো বাংলাদেশে পা রাখেননি। এরপর তারা দেশের রাজধানী ঢাকায় ফিরে আসে বিজয়ী হিসেবে। গণমাধ্যমের তুমুল আগ্রহ সামলাতে তারা কয়েক দিন সময় দেয়। এরপর কয়েক দিন কেটে যায় ঘুরে বেড়ানো, খাবার উপভোগ করা এবং দাদির সঙ্গে সময় কাটানোর মধ্য দিয়ে।
তবে ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে ১৮১তম অবস্থানে থাকা, প্রায় ১৮ কোটি মানুষের দেশ বাংলাদেশের জন্য এটি হয়তো নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে। জাতিসংঘের হিসাবে, বাংলাদেশের প্রবাসী জনগোষ্ঠী বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম। এর বিশাল অংশ দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে থাকলেও যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের বড় সংখ্যক প্রবাসী রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইতালিতেও এই প্রবাসীদের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। পশ্চিমা বিশ্বের অন্যান্য জায়গাতেও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে বাংলাদেশি জনগোষ্ঠী।
ডেকলান বলেন, 'আমার মনে হয়, অনেকে আমাদের এই অভিজ্ঞতা দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছে। এখন হঠাৎ করেই অনেক বিদেশি খেলোয়াড় বাংলাদেশের হয়ে খেলতে আগ্রহী হচ্ছে। ইংল্যান্ডের ভালো মানের একাডেমিগুলোতে খেলা বেশ কয়েকজন কিশোর ফুটবলারের আগ্রহ দেখছি। বিশ্বজুড়েই আমাদের প্রতিভা ছড়ানো আছে, এখন শুধু সেগুলোকে কাজে লাগানোর অপেক্ষা।'
সুলিভান ও তার ভাইয়ের নাম এখন বাংলাদেশ, যুক্তরাষ্ট্র এবং তার বাইরেও বেশ পরিচিত। ঠিক একইভাবে পরিচিত যুক্তরাষ্ট্র জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক থমাস ডুলি। এক আমেরিকান সেনাসদস্যের সন্তান ডুলি জার্মানিতে বেড়ে ওঠেন ও পেশাদার ফুটবল খেলে ঘটনাক্রমে মার্কিন জাতীয় দলে যোগ দেন। অনূর্ধ্ব-২০ দল ট্রফি নিয়ে ফেরার সাত সপ্তাহ পর বাংলাদেশের জাতীয় দলের প্রধান কোচ হিসেবে তার নাম ঘোষণা করা হয়। কোচিং জীবনের অধিকাংশ সময় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় কাটানো ডুলি সেখান থেকেই শুনেছিলেন ফুটবলপ্রেমী এক দেশের কথা, এখন সেই দেশকেই নতুন বিশ্বকাপ চক্রে নেতৃত্ব দিচ্ছেন তিনি।
ডুলি দ্য গার্ডিয়ানকে বলেন, 'আমরা শুধুই সমর্থকদের একটি দেশ হয়ে আছি। আমাদের এতে পরিবর্তন আনতে হবে। আমাদের ফুটবল খেলার দেশ হতে হবে। এটাই হওয়া দরকার এবং সে জন্য আমাদের পথ খুঁজে বের করতে হবে।'
রোনান, ডেকলান এবং তাদের অন্য দুই ভাই—কোয়েন ও ক্যাভান (দুজনেই ফিলাডেলফিয়া ইউনিয়নের অ্যাটাকার)—যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানির পাশাপাশি বাংলাদেশের হয়ে খেলার যোগ্য ছিলেন। কোয়েন গত গ্রীষ্মেই মার্কিন মূল দলে জায়গা করে নিয়েছেন এবং ম্যানচেস্টার সিটিতে যোগ দেওয়ার অপেক্ষায় থাকা ক্যাভান আমেরিকান ফুটবলের অন্যতম সেরা উদীয়মান তারকা। ফলে সুলিভান যমজ ভাইদের বাংলাদেশের দিকে ঝুঁকে পড়ার সম্ভাবনাটাই ছিল বাস্তবসম্মত।
ডেকলান বলেন, 'সবকিছুর শুরু একটা ইনস্টাগ্রাম মেসেজ দিয়ে, যা ভাবলে সত্যিই অবিশ্বাস্য মনে হয়। মেসেজটি এসেছিল 'সেভ বাংলাদেশ ফুটবল' অ্যাকাউন্ট থেকে।' পাসপোর্ট হওয়ার আগেই একটা ফ্যান পেজ থেকে অনুশীলন ক্যাম্পে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব পেয়ে প্রথমে বেশ বিভ্রান্ত হয়েছিলেন রোনান ও ডেকলান। তবে খুব দ্রুতই তারা বুঝতে পারেন, পেজটি বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের অনুমোদিত একটি মাধ্যম। পরবর্তীতে সাফ অনূর্ধ্ব-২০ টুর্নামেন্টে খেলার আগ্রহ জানালে তারা সুলিভান ভাইদের সঙ্গে বাফুফে সহ-সভাপতি ফাহাদ করিমের যোগাযোগ করিয়ে দেয়।
রোনান বলেন, 'কলেজ শুরুর আগে হাতে কিছুটা সময় ছিল। গিয়ে খেলা, দেশের প্রতিনিধিত্ব করা এবং সংস্কৃতির অংশ হওয়াটা দারুণ হতো।' কিন্তু পরের তিন মাস কেটেছে এক চরম ব্যস্ত ও জটিল প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে; বিশেষ করে তাদের মায়ের বাংলাদেশি পাসপোর্ট না থাকায় প্রক্রিয়াটি বেশ কঠিন ছিল বলে জানান তারা। তবে মার্চে নিউইয়র্ক থেকে দিল্লি এবং দিল্লি থেকে ঢাকায় উড়ে আসেন দুই ভাই—যা তাদের জীবনের দীর্ঘতম সফর।
তবে ঢাকায় পা রেখে তারা কোনো লাল গালিচা সংবর্ধনা পাননি। চূড়ান্ত দলে তাদের জায়গা পাওয়ার কোনো নিশ্চয়তাও ছিল না। ৩০ জনেরও বেশি খেলোয়াড় নিয়ে শুরু হওয়া সেই ক্যাম্পে যোগ দেন তারা, যার মধ্যে প্রবাসী আরও তিন খেলোয়াড় ছিলেন। তাদের কথা সুলিভানরা আগেই জানতেন এবং তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করাও সহজ ছিল। দলের ম্যানেজারও ইংরেজিতে কথা বলতেন, কিন্তু মাঠের খেলায় ভাষার একটা বাধা থেকেই যেত বলে জানান তারা।
রোনান বলেন, 'বিদেশ থেকে এলে শুরুতে বল পাওয়া কঠিন হয়, কারণ আপনি ভাষা বোঝেন না এবং হয়তো দলের বাকিরা আপনার আসাকে খুব একটা ইতিবাচকভাবে দেখেও না। কিন্তু আপনি কয়েকবার বল পেয়ে নিজের দক্ষতার প্রমাণ দিতে পারলে পরিস্থিতি সহজ হয়ে যায়।' কয়েক দিনের অনুশীলনের পরই তারা চূড়ান্ত দলে জায়গা পাওয়ার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠেন এবং দলের সবার সঙ্গে সম্পর্কটাও গাঢ় হতে থাকে বলে জানান রোনান।
বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়দের নিজেদের জাতীয় দল বেছে নেওয়ার অধিকারের বিষয়ে ডুলি অত্যন্ত দৃঢ় অবস্থানে রয়েছেন। এশিয়ায় তার কোচিংয়ের যাত্রা শুরু হয়েছিল ফিলিপাইনে। সেখানে বিদেশে জন্ম নেওয়া খেলোয়াড়দের জাতীয় দলে নেওয়ার বিরোধিতা করা অনেক সমর্থকের আপত্তিকে তিনি গুরুত্ব দেননি। বাংলাদেশ জাতীয় দলের দায়িত্ব নেওয়ার পরও তিনি দলের সংস্কৃতি নিয়ে আশাবাদী। বিশেষ করে লেস্টার সিটির মিডফিল্ডার হামজা চৌধুরীর নেতৃত্ব ও বিনয়কে তিনি তুলে ধরেন।
ডুলি বলেন, 'হামজার আগমনে সবাই ভীষণ খুশি হয়েছিল এবং খেলোয়াড়রা বোঝে—আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ফুটবলাররা তাদের উন্নতির প্রেরণা হতে পারে। তাদের মানসিকতা, কাজের প্রতি নিষ্ঠা—সবকিছুই তরুণদের শেখার বড় উৎস।'
বিদেশে যত বেশি খোঁজা হচ্ছে, তত বেশি প্রতিভাবান খেলোয়াড়ের সন্ধান মিলছে। সেটা হয়তো বড় কোনো ইউরোপীয় লিগে নয়, তবে এমন এক পর্যায়ে যা দলের সামগ্রিক মান বাড়াতে সক্ষম। তবে এখানে এক ধরনের ভারসাম্য রক্ষা করা প্রয়োজন বলে জানান তিনি। খেলোয়াড় সংক্রান্ত হাজার হাজার বার্তা পান ডুলি, তবে বাজেট সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, 'আমাদের সতর্ক থাকতে হবে।'
তিনি যোগ করেন, 'ফ্রি-কিক নেওয়ার ছবি পাঠালেই যে কেউ ভালো ফুটবলার হয়ে গেল, বা আমাদের সাহায্য করতে পারবে—তা নয়। আমাদের দেশেও ভালো খেলোয়াড় আছে, যাদের আমরা সহজেই কাজে লাগাতে পারি। আমরা এমন কোনো খেলোয়াড়ের পেছনে দুই-তিন হাজার ডলার খরচ করব না, যে এসে বেঞ্চে বসে থাকবে। যদি নতুন কোনো খেলোয়াড় সত্যিই আমাদের সাহায্য করতে পারে, তবেই তাকে আনা হবে। তা না হলে সেই অর্থ স্থানীয় ফুটবলারদের পেছনে ব্যয় করে যদি দুই সপ্তাহের জন্য দিনে দুবার করে নিবিড় প্রশিক্ষণ দেওয়া যায়, তবে তাদের মান অনেক বেশি উন্নত হবে।'
ডুলি মনে করেন, একটা সম্ভাবনাময় দলকে দিয়ে যদি মাঠে কঠোর পরিশ্রম করানো যায় এবং খেলার বিষয়ে তাদের ভাবনাকে কিছুটা বদলে দেওয়া যায়, তবে ভুলের পরিমাণ কমিয়ে এনে দলের সার্বিক মান ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত উন্নত করা সম্ভব। তার বিশ্বাস, ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে ১৫০-এর ঘরে যাওয়া বাংলাদেশের জন্য অবশ্যই অর্জনযোগ্য। অবশ্য এর চেয়েও অনেক বড় একটি স্বপ্ন রয়েছে।
চার সুলিভান ভাইয়ের ইনস্টাগ্রাম পোস্টের কমেন্ট সেকশন বহু বছর ধরেই বাংলাদেশি পতাকার স্টিকারে ভরে আছে। মালদ্বীপে থাকা অবস্থায় যমজ দুই ভাই ফোনে সেসব দেখছিলেন। অনলাইনে তাদের নিয়ে আলোচনা তখন যেন অন্য এক উচ্চতায় পৌঁছে গেছে। বিশেষ করে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিষয়টি তাদের নজরে পড়ে।
রোনান বলেন, 'তারা আমাকে নিয়ে এমন এডিট করছিল, যেখানে আমাকে ভারতীয় পতাকার মতো রং করা একটি কুকুর হাঁটাতে দেখা যাচ্ছে। ব্যাপারটা ছিল বেশ পাগলামিপূর্ণ। নিশ্চিতভাবেই সেখানে প্রচুর উত্তাপ ছিল। অনেক টানটান উত্তেজনা ছিল।'
তারা জানান, মালদ্বীপে সমর্থকদের সেই উন্মত্ততা মাঠে তাদের এমন এক পরিবেশের মুখোমুখি করেছিল, যা তারা আগে কখনো অনুভব করেননি। সেই অবাস্তব অভিজ্ঞতার রেশ ছড়িয়ে পড়ে ঢাকায় তাদের সংবর্ধনাতেও।
ডেকলান বলেন, 'সেটা অনেক কিছু ছিল। অনেক ফুল পেয়েছি, অনেক মানুষের সঙ্গে দেখা হয়েছে। আমার মনে হয়, বাংলাদেশে আমাদের দলটাই তখন নতুন হট টপিক হয়ে উঠেছিল।' সত্যিই, ঢাকার রাস্তায় হাঁটার সময়ও সুলিভান যমজ ভাইদের আলাদা করে নজরে পড়তে হতো। ডেকলানের ভাষায়, 'আমরা সাদা, অন্তত সেখানকার সবার চোখে।'
তিনি বলেন, 'আমরা অনেক মানুষের সঙ্গে দেখা করেছি, আর ট্রফিটা দেশে আনায় সবাই অনেক বেশি খুশি ও কৃতজ্ঞ ছিল। সবাই সত্যিই ভীষণ উচ্ছ্বসিত ছিল। আমেরিকায় যুব ফুটবলে এমন কিছু দেখা যায় না।'
জুনে সান মারিনোর বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচ খেলতে জাতীয় দল যখন বিমানবন্দর থেকে রওনা হয়, তখন ডুলিকে বিদায় জানাতে সেখানে যে পরিমাণ গণমাধ্যমকর্মী উপস্থিত ছিলেন, সিনিয়র জাতীয় দলের ক্ষেত্রে এমন দৃশ্য প্রায় কোথাও দেখা যায় না।
ডুলি বলেন, 'আমি ভাবছিলাম, আমরা বিশ্বকাপে যাচ্ছি। আমি বলছিলাম, এটা অসাধারণ। আর আমরা যদি বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করি, তখন কী দৃশ্য হবে—তা আমি কল্পনাই করতে পারি না।'
রোনান বলেন, 'আমার মনে হয়, আমরা যদি বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করি, তাহলে পুরো দেশই যেন বিস্ফোরিত হবে।'
শুনতে বিষয়টি হয়তো অবাস্তব মনে হয়। ভারতীয় উপমহাদেশের কোনো দেশই এখন পর্যন্ত কোনো বিশ্বকাপেই খেলতে পারেনি। আন্তর্জাতিক ফুটবল নিয়ে বাংলাদেশের উন্মাদনা এখনো দক্ষিণ আমেরিকার দুই পরাশক্তির দিকেই বেশি ঝুঁকে থাকে।
তবে পুরুষদের বিশ্বকাপে আরও দল যুক্ত হওয়ার কথা হচ্ছে এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে একটি সেতু তৈরি হচ্ছে, তখন বাংলাদেশে এই খেলাটির সামনে নতুন এক সম্ভাবনার দ্বার খুলছে। উপমহাদেশের কোনো দেশ বিশ্বকাপে জায়গা করে নিতে পারলে সেই সম্ভাবনা আরও বড় হবে। আন্তর্জাতিক খেলাধুলায় অন্য দেশ থেকে খেলোয়াড় নেওয়া এখন বেশ সাধারণ বিষয়। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এর মাধ্যমে যে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে, তা বেশ বিরল।
ডেকলান বলেন, 'যখনই আমি ৬৪ দলের বিশ্বকাপের কথা ভাবি, তখন মনে হয়, 'দেখো, আমরা যদি এই সব খেলোয়াড়কে নিয়ে আসতে পারি, তাহলে আমাদের যোগ্যতা অর্জনের সুযোগ আছে। এটাই স্বপ্ন। এটাই চূড়ান্ত লক্ষ্য।'
সম্ভাব্য নতুন খেলোয়াড় হিসেবে তিনি তার বন্ধু, ফিলাডেলফিয়া ইউনিয়ন একাডেমির সাবেক সতীর্থ ও পেন স্টেটের উইঙ্গার নেহান হাসান এবং স্ট্যানফোর্ডের স্ট্রাইকার ট্রেভর ইসলামের নাম উল্লেখ করেন। ভবিষ্যতে এমন আরও অনেক খেলোয়াড় পাওয়া যাবে বলেও আশা করেন তিনি।
ডুলি বলেন, যোগ্য খেলোয়াড়দের নিয়ে, 'আমাদের তাদের বোঝাতে হবে। তাদের বলতে হবে, তারা সত্যিই এই দেশে নিজেদের একটা উত্তরাধিকার রেখে যেতে পারে।'
নিজের পরিকল্পনায় পরবর্তী সম্ভাব্য খেলোয়াড় হিসেবে ডুলি ১৯ বছর বয়সী উইঙ্গার ও ফুলহাম একাডেমির খেলোয়াড় ফারহান ওয়াহিদ এবং ইংল্যান্ডের চতুর্থ স্তরের লিগে খেলা ২৫ বছর বয়সী অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার লুই ওয়াটসনের কথা উল্লেখ করেন। চৌধুরী ও নিউইয়র্ক কসমসের গ্রীষ্মকালীন নতুন চুক্তি করা কানাডায় জন্ম নেওয়া মিডফিল্ডার শামিত শোমে এই দলের মূল ভিত্তি। গোলরক্ষক পজিশনও শক্তিশালী করা হবে দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে জানান ডুলি।
শরতের প্রীতি ম্যাচগুলোর পর জাতীয় দলের পরবর্তী বড় পরীক্ষা হবে নভেম্বরে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিতব্য সিনিয়র পর্যায়ের সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ। বাংলাদেশ এই টুর্নামেন্টে মাত্র একবার, ২০০৩ সালে স্বাগতিক হিসেবে শিরোপা জিতেছে। এটিই ডুলির প্রধান লক্ষ্য। তবে এরপর দেশের ফুটবলের উন্নয়নে আরও সক্রিয়ভাবে কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে তার।
তার দৃষ্টিতে, এটি ওপর থেকে নিচের দিকে এগিয়ে নেওয়ার মতো একটি উদ্যোগ। জাতীয় দলের সাফল্যই মানুষের আগ্রহ, পৃষ্ঠপোষকতা ও বিনিয়োগ বাড়াবে। এর মাধ্যমে একটি কার্যকর কাঠামো গড়ে উঠবে, যেখানে যুব একাডেমিগুলো থেকে খেলোয়াড় উঠে এসে প্রাপ্তবয়স্কদের লিগে খেলবে।
ঢাকার অভিজাত গুলশান এলাকায় একটি অ্যাপার্টমেন্টে ওঠার আগ পর্যন্ত ডুলি একটি হোটেলেই থাকছেন। জানালা দিয়ে তিনি ঘনবসতিপূর্ণ বহুতল ভবনগুলো দেখেন। তবে তার আক্ষেপ, আশপাশে মাত্র এক-দুটি স্কুল রয়েছে, যেখানে ফুটবল খেলার মাঠ আছে। পরবর্তী প্রজন্মের জন্য এটিই আরও বড় চ্যালেঞ্জ—অবকাঠামো, সংস্কৃতি ও মানসিকতার পরিবর্তন।
তিনি বলেন, 'আমরা চাই, শিশুরা আর্জেন্টিনার সমর্থক হতে না চেয়ে খেলোয়াড় হতে চাইবে, যারা আর্জেন্টিনার বিপক্ষে, ব্রাজিলের বিপক্ষে খেলবে।'
