ছয় মাসে ২.২৩ কোটি গাছ রোপণ করেছে সরকার, বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রার ৪৩% অর্জন
দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম ছয় মাসে সারাদেশে ২ কোটি ২২ লাখ ৬৮ হাজার গাছের চারা রোপণ করেছে সরকার। এটি সরকারের বার্ষিক ৫ কোটি ১৪ লাখ ৮৮ হাজার ৯৩০টি চারা রোপণের লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৪৩.২৫ শতাংশ।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বন বিভাগসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মোট ১১টি সরকারি সংস্থা এ বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছে।
সরকারের প্রথম ছয় মাসের অর্জন মূল্যায়নের অংশ হিসেবে এসব তথ্য সংকলন করা হয়েছে। এ পর্যালোচনায় নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলোর বাস্তবায়ন অগ্রগতিও অন্তর্ভুক্ত আছে।
চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠন করে বিএনপি। দলটির নির্বাচনী ইশতেহারের অন্যতম প্রতিশ্রুতি ছিল, ক্ষমতায় গেলে পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছের চারা রোপণ করা হবে।
গত ১৩ জুন কক্সবাজারের ডুলাহাজারার মালুমঘাট সংরক্ষিত বনে গর্জন গাছের চারা রোপণের মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশব্যাপী ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। তবে এর আগেই বিভিন্ন এলাকায় বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম শুরু হয়েছিল।
এর আগে ১৬ মার্চ দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলায় দেশব্যাপী নদী, খাল ও জলাধার খনন ও পুনঃখনন কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী।
এ উদ্যোগের অংশ হিসেবে খাল খননের পাশাপাশি বাঁধ নির্মাণ ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিও রাখা হয়।
এ সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, "আমি দেশের সবার কাছে আহ্বান জানাব, আপনার সন্তানের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে, আপনার সন্তান যেন একটি সুন্দর পরিবেশে বুক ভরে শ্বাস নিতে পারে—এই বিষয়টি মাথায় রেখে আজ থেকে প্রত্যেকে যার যেখানে সম্ভব সেখানে একটি করে গাছের চারা রোপণ করবেন।"
বৃক্ষরোপণে এগিয়ে বন অধিদপ্তর
তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় মাসে সবচেয়ে বেশি গাছ রোপণ করেছে বন অধিদপ্তর। এ সময়ে সংস্থাটি ১ কোটি ১৯ লাখ ২৮ হাজার ৪৪২টি গাছ রোপণ করেছে। ২০২৬ সালে বন অধিদপ্তরের ৩ কোটি ৫০ লাখ গাছ রোপণের পরিকল্পনা রয়েছে।
দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গাছ রোপণ করেছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। ছয় মাসে বিভাগটি ৭১ লাখ ৬৪ হাজার ১৩৫টি গাছ রোপণ করেছে। তাদের বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রা ১ কোটি ২ লাখ ৫৯ হাজার ৭৬০টি।
এ ছাড়া কৃষি মন্ত্রণালয় ১৮ লাখ ৩৭ হাজার ৭২৯টি, বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশন ৩ লাখ ৭৫ হাজার ৩৭৫টি, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় ২ লাখ ৮৮ হাজার ৬৭টি এবং সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ ২ লাখ ৮৫ হাজার ৯৯৪টি গাছ রোপণ করেছে।
অন্যদিকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় ২ লাখ ৭১ হাজার ১২১টি, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ৭৪ হাজার ৪১১টি, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় ২৯ হাজার ৫৫৭টি, সেতু বিভাগ ৯ হাজার ৪০৩টি এবং রেলপথ মন্ত্রণালয় ৩ হাজার ৭৬৬টি গাছ রোপণ করেছে।
প্রধানমন্ত্রীর পরিবেশ, বন ও জলবায়ুবিষয়ক বিশেষ সহকারী এবং পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির প্রধান ড. সাইমুম পারভেজ টিবিএসকে বলেন, "সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান মিলে গত ছয় মাসে প্রায় আড়াই কোটি গাছ রোপণ করেছে। এর বাইরে এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর হিসাব অনুযায়ী, তাদের উদ্যোগে আরও প্রায় ৪০ লাখ গাছ লাগানো হয়েছে।"
তিনি বলেন, "আগামী আগস্ট-সেপ্টেম্বরের মধ্যে আরও ২ কোটি ম্যানগ্রোভ চারার জন্য একটি প্রকল্প তৈরি হচ্ছে। সব মিলিয়ে এ বছর সরকারের অভ্যন্তরীণভাবে প্রায় ৫ কোটি গাছ রোপণের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। সেই লক্ষ্যের কাছাকাছি পৌঁছানো সম্ভব হবে বলে আশা করছি।"
অঞ্চল ও মাটির ধরন অনুযায়ী প্রজাতি নির্ধারণ
বিভিন্ন এলাকার ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য, মাটির ধরন ও পরিবেশের সঙ্গে মিল রেখে গাছের প্রজাতি নির্বাচন করেছে সরকার। পাহাড়ি এলাকা, উপকূল, নদীর চর, বিল, বাঁধের ধারে, পুকুরপাড় এবং শিক্ষা ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের জমির জন্য আলাদা প্রজাতির গাছ নির্ধারণ করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের পাহাড়ের ওপরের অংশে গর্জন, গামার, চাম্পা, চিকরাশি, সেগুন, তেলসুর, উড়িয়াম, আমলকি, পাইন্যাগোল বা লুকলুকি, কনক, ধারমারা ও বাঁশজাতীয় গাছকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
পাহাড়ের মধ্যঢাল থেকে পাদদেশ পর্যন্ত এলাকায় গর্জন, গামার, কালাকড়ই, চাপালিশ, শিলকড়ই, সেগুন, তেলসুর, চাম্পা, শিমুল, ছাতিয়ান, জারুল, ঢাকিজাম, পিতরাজ, লোহাকাঠ, হরীতকী, আমলকি, বহেরা, অর্জুন, বাঁশ ও বেতসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ রোপণের কথা বলা হয়েছে।
পাহাড়ি নিচু ও জলাভূমি এলাকায় পুতিজাম, ঢেপাজাম, কালজাম, পিটালি, ডুমুর, শিমুল, কালাকড়ই, মান্দার, হিজল, বট, অশ্বত্থ, জিগা, কাঞ্চন, বাঁশ, বেত ও কদমসহ বিভিন্ন প্রজাতি নির্ধারণ করা হয়েছে।
উপকূলের নতুন চর ও ম্যানগ্রোভ এলাকায় কেওড়া, বাইন, কাঁকড়া, গরান ও গোলপাতা লাগানোর কথা বলা হয়েছে। আর উপকূলীয় উঁচু চর, যেখানে ম্যানগ্রোভ জন্মায় না, সেখানে বাবলা, ঝাউ, সনবলই, সাদাকড়ই, কালাকড়ই, জারুল ও রেইনট্রির মতো গাছ লাগানোর প্রস্তাব রয়েছে।
নদীর বুকে জেগে ওঠা নতুন চরে ঝাউ, লোনা-ঝাউ, পিটালি, কড়চ ও পানিবিরিয়াস ধরনের গাছকে উপযোগী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
অন্যদিকে বিল বা বছরে দুই-তিন মাস পানিতে ডুবে থাকা এলাকায় হিজল, করচ, বিয়াস, পিটালি, জারুল, মান্দার, বরুণ, পলাশ, কদম, চালতা, পুতিজাম, চেচাপাম, পিতরাজ ও অর্জুন লাগানোর কথা বলা হয়েছে।
বাঁধের ধারে তাল, খেজুর, বাবলা, খৈয়া বাবলা, পুনিয়াল, নারিকেল, ঝাউ, জারুল, জাম ও কদম লাগানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পুকুরের ধারে নারিকেল, তাল, সুপারি, খেজুর, পেয়ারা, জাম্বুরা, লেবু, আম ও কাঁঠালসহ বিভিন্ন ফলদ ও বনজ গাছ লাগানোর কথা বলা হয়েছে।
এ ছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস ও হাসপাতাল এলাকায় নারিকেল, তাল, কাঠবাদাম, আম, জাম, কাঁঠাল, পেয়ারা, জাম্বুরা, গাব, নিম, চম্পা, মেহগনি, তেলসুর, জারুল, সোনালু, পলাশ, কৃষ্ণচূড়া, বকুল, অশোক ও নাগেশ্বরসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ রোপণে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
