সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরলেও গতি আসেনি পুনরুদ্ধারে
ছয় মাস আগে ব্যাপক জন-প্রত্যাশার মধ্যে দায়িত্ব নেয় বিএনপি সরকার। তবে শুরু থেকেই সরকারকে এগোতে হয়েছে একটি নাজুক অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর দিয়ে। অর্থনীতির এই দুর্বল অবস্থা অবশ্য বিএনপি ক্ষমতায় আসার অনেক আগেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের সময় বাংলাদেশের অর্থনীতি ইতোমধ্যেই গভীর সংকটে ছিল। ব্যাংকগুলো ভুগছিল তারল্য সংকটে, খেলাপি ঋণ বেড়ে আর্থিক খাতের গভীর দুর্বলতাও সামনে এসে পড়ে, মূল্যস্ফীতি ছিল ঊর্ধ্বমুখী, বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে চলছিল অস্থিরতা; একইসঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও নেমে গিয়েছিল অস্বস্তিদায়ক পর্যায়ে।
দায়িত্ব নেওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকার সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফেরানো, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনা এবং অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত ও বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে ব্যাংকিং, রাজস্ব, বাণিজ্যসহ গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে দীর্ঘদিনের অপেক্ষমাণ সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেয়।
এ লক্ষ্যে বেশ কয়েকটি কমিশন, টাস্কফোর্স ও কমিটিও গঠন করা হয়। এসব উদ্যোগ থেকে বিপুলসংখ্যক সুপারিশ ও প্রতিবেদন তৈরি হয়। তবে দেড় বছরের মেয়াদে সেগুলোর বাস্তবায়ন ছিল খুবই সীমিত।
এদিকে অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তাও কাটেনি। ক্ষমতাচ্যুত রাজনৈতিক সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কারখানা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে মব সহিংসতা ও হামলার ঘটনায় বিনিয়োগকারীদের আস্থা নষ্ট হয় এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ বাড়ে।
এ অবস্থায় বেসরকারি খাতের বড় অংশ বিনিয়োগে সতর্ক অবস্থানে ছিল। তাদের প্রত্যাশা ছিল, নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বাড়বে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি হবে।
শেষ পর্যন্ত জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং তারেক রহমানের নেতৃত্বে প্রায় ২০ বছর পর ক্ষমতায় ফেরে বিএনপি। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়। তবে তাদের যাত্রা শুরু হয় ক্রমেই কঠিন হয়ে ওঠা বৈশ্বিক পরিস্থিতির মধ্যে।
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে তেলের দামে অস্থিরতা দেখা দেয়। একই সময়ে বাংলাদেশের নিজস্ব জ্বালানি সংকটও গভীর হতে থাকে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং আমদানি ব্যয় বেড়ে সরকারের আর্থিক চাপের পাশাপাশি ব্যবসার খরচও বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিএনপি সরকারের ১৮০ দিন পার হওয়ার পর এখন প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির চিত্র এখন কেমন?
অর্থনীতির কয়েকটি ক্ষেত্রে উন্নতির স্পষ্ট লক্ষণ রয়েছে। রেমিট্যান্স প্রবাহ শক্তিশালী রয়েছে, বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতা ফিরেছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও তুলনামূলক নিরাপদ অবস্থানে পৌঁছেছে। এসব অগ্রগতি লেনদেনের ভারসাম্য ও বৈদেশিক খাতের ওপর তাৎক্ষণিক চাপ কিছুটা কমিয়েছে।
তবে সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এখনো নাজুক। রপ্তানি প্রবৃদ্ধি এখনও দুর্বল, আমদানি ব্যয় বেড়ে বাণিজ্য ঘাটতি আরও বৃদ্ধি পেয়েছে, মূল্যস্ফীতি এখনো উচ্চ পর্যায়ে এবং ব্যাংকগুলো তারল্য ও সুশাসনের সংকটে ভুগছে। রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধিও ধীরগতির, বৈদেশিক সহায়তার প্রবাহ গতি হারাচ্ছে, অন্যদিকে বাড়ছে ঋণ পরিশোধের চাপ।
অর্থাৎ অর্থনীতির বৈদেশিক খাতের দৃশ্যমান কিছু দুর্বলতা কমলেও প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তিগুলো এখনো তুলনামূলক দুর্বল।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, নতুন একটি সরকারের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড মূল্যায়নের জন্য ছয় মাস খুবই অল্প সময়, বিশেষ করে যখন সেই সরকার কয়েক বছর ধরে জমতে থাকা কাঠামোগত সমস্যা উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে। তবে ব্যবসায়ীদের জন্য পুরোনো সমস্যা আর নতুন চ্যালেঞ্জের মধ্যে পার্থক্য খুব একটা স্বস্তি দিচ্ছে না।
তাদের তাৎক্ষণিক উদ্বেগ বরং বাড়ছে। বাড়তে থাকা জ্বালানি সংকট, ঋণ ও ব্যবসা পরিচালনার উচ্চ ব্যয়, রপ্তানি আদেশ কমে যাওয়া এবং দুর্বল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি—সব মিলিয়ে বিনিয়োগের সিদ্ধান্তে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
ব্যবসায়ী নেতারা কয়েক দফায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে এসব উদ্বেগের কথা তুলে ধরেছেন। প্রধানমন্ত্রী তাদের কথা শুনেছেন এবং সমস্যাগুলো একে একে সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন। কিছু নিয়মনীতি শিথিলতা ও নীতিগত উদ্যোগের মাধ্যমে ব্যবসা সহজ করার ইঙ্গিতও দিয়েছে সরকার।
তবে অর্থনীতির মৌলিক সমস্যাগুলো নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
তারপরও প্রথম ছয় মাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করেছে সরকার। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অর্থনীতির বৈদেশিক খাতে যে তীব্র চাপ ছিল, তা এখন অনেকটাই কমেছে। তবে স্থিতিশীলতা আর পুনরুদ্ধার এক বিষয় নয়।
ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের জন্য এখন মূল বিষয় হলো, সরকার এই স্থিতিশীলতাকে কাজে লাগিয়ে মূল্যস্ফীতি কমাতে, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে, ঋণ পাওয়া সহজ করতে, রপ্তানি বাড়াতে এবং বেসরকারি বিনিয়োগে গতি ফেরাতে পারে কি না সেটি খতিয়ে দেখা। কারণ নতুন কর্মসংস্থান তৈরির জন্য বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি।
নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার ছয় মাস পর বাংলাদেশের অর্থনীতি সংকট সামাল দেওয়ার পর্যায় থেকে ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতার দিকে এগিয়েছে। তবে অর্থনীতিকে টেকসই প্রবৃদ্ধির পথে ফেরানোর কঠিন কাজটি এখনো বাকি।
