একটি পাখির জীবনের মূল্য প্রশাসনের কাছে এক টাকা: প্রশ্নবিদ্ধ মনুষ্যত্ব আর মানবিকতা
হাজারো রঙের বর্ণচ্ছটায় পৃথিবী যেন এক অপূর্ব ক্যানভাস, আর তার অন্যতম সৌন্দর্যের অলংকার পাখি। ভোরের আলো কিংবা আকাশে ডানা মেলে তারা উড়ে বেড়ায় মুক্তির প্রতীক হয়ে। তাদের কন্ঠের মাধুর্যে মিশে থাকে প্রকৃতির সুর; যে সুর পৃথিবীকে করে তোলে আরও সুন্দর, আরও প্রাণবন্ত। তবে এত সৌন্দর্যের পরও তারা অনন্য অবদান রাখে দেশের অর্থনীতিতে, যা আমাদের একেবারে অজানা এবং উপেক্ষিত।
পুরো পৃথিবীতে পাখিরা অর্থনীতিতে প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি ডলার অবদান রাখছে। কিন্তু তা যেমন কোনোদিন হিসাব করা হয়নি, তেমনি আমাদের দেশের মতো দেশগুলোর তৃণমূলের অনেকটাই আজও বন্যপ্রাণী তথা পাখিদের গুরুত্ব নিয়ে সচেতন না, যার ফলে আজও ঘটছে পাখি হত্যাযজ্ঞ।
অতি সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমে আসা আমাদের সুজলা-সুফলা দেশে একসাথে ৫০০ পাখি হত্যার খবর পুরো জাতিকে শুধু হতবাকই করেনি, মর্মাহতও করেছে। পাখিপ্রেমীদের মধ্যে তুলেছে নিন্দার ঝড়।
গতকাল সকালে স্থানীয় পর্যায়ে খবর নিয়ে জানলাম, প্রত্যক্ষদর্শীরা পাখিদের খেতে ছটফট করতে দেখেছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে অসুস্থ ও মুমূর্ষু পাখিগুলোকে তুলে নিয়ে জবাই করে খাওয়ার তথ্যও এসেছে।
গ্রামীণ পরিবেশে যে পাখিরা আমাদের ফসলের খেতকে পোকামাকড় থেকে রক্ষা করে, বীজের বিস্তরণ ঘটায়, খেতের আগাছা খায়, ফসল রক্ষা করে, সেই পাখিদের বিষ খাইয়ে মেরে ফেলা হয়েছে চুয়াডাঙ্গার দামুরহুদায়।
চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলায় ফসলি জমিতে ক্ষতিকর বিষ ও বিষাক্ত কীটনাশক ব্যবহারের কারণে পাঁচ শতাধিক দেশীয় পাখির মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। ১৬ আগস্ট উপজেলার দর্শনা পারকৃষ্ণপুর-মদনা ইউনিয়নের দক্ষিণপাড়া ও মাদনা গ্রামের মাঠে এই পরিবেশবিধ্বংসী মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে।
স্থানীয় কৃষকরা জমিতে ঘাস ও পোকা দমনের নামে অসচেতনভাবে বিষমিশ্রিত ধান ও কীটনাশক ছিটানোর ফলে শালিক, চড়ুই ও ঘুঘুসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি সেই খাবার খেয়ে মাঠের মধ্যেই মারা যায়।
ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর দামুড়হুদার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনে অপরাধীকে ৫০০ টাকা জরিমানা করাসহ ভবিষ্যতে এমন কাজ না করার মুচলেকা নেন। অর্থাৎ একটি পাখির জীবনের মূল্য হিসেবে ১ টাকা জরিমানা ধরা হয়েছে।
এখানে একটি বিষয় উল্লেখযোগ্য: এতগুলো প্রাণী হত্যার পর প্রশাসন কীভাবে এই লঘু শাস্তি দিতে পারে, তা নিয়ে সব সচেতন মহলে সমালোচনা তৈরি হয়েছে। কারণ ২০২৬ সালের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইনে শাস্তির বিধান ভিন্ন।
চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদায় এই নির্মম পাখিহত্যার ঘটনাটি আমাদের সমাজে বিপন্ন মানবতা এবং মানবিকতাকেই তীব্রভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে। অবুঝ ও নিরীহ প্রাণীদের প্রতি মানুষের এমন নিষ্ঠুর আচরণ দেখিয়ে দেয়, কেবল নিজেদের সামান্য আর্থিক লাভ বা ফসলের সুরক্ষার জন্য আমরা কতটা বিবেকহীন এবং অমানবিক হয়ে উঠতে পারি।
প্রকৃতির পরম বন্ধু এই পাখিরা যখন মানুষের পাতা বিষাক্ত টোপ খেয়ে যন্ত্রণায় ছটফট করে মারা যায়, তখন মানুষের 'শ্রেষ্ঠ জীব' বা আশরাফুল মাখলুকাত দাবির নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং জীবপ্রেমের যে মানবিক শিক্ষা আমাদের সংস্কৃতিতে রয়েছে, এই ঘটনা তার চরম অবমাননা। আইন প্রয়োগ করে হয়তো অপরাধীকে শাস্তি দেওয়া সম্ভব, কিন্তু মানুষের মনে যদি সহমর্মিতা ও মানবিক বোধ জাগ্রত না হয়, তবে প্রকৃতির এমন নীরব কান্না কোনোভাবেই থামানো যাবে না।
অর্থনীতি ও কৃষি খাতে দেশীয় পাখিদের অবদান অত্যন্ত নিবিড়, যার ফলে চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদায় পাখিহত্যার ঘটনাটি গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরোক্ষ আঘাত। ফসলের মাঠের প্রধান শত্রু, যেমন মাজরা পোকা, লেদা পোকা ও বিভিন্ন ক্ষতিকর কীট প্রাকৃতিকভাবে দমন করতে শালিক ও চড়ুইয়ের মতো পাখিরা প্রধান ভূমিকা পালন করে, যা কৃষকদের অতিরিক্ত রাসায়নিক কীটনাশক কেনার বিশাল খরচ বাঁচিয়ে দেয়।
একইসাথে ঘুঘু ও চড়ুই পাখির দল প্রাকৃতিকভাবে উদ্ভিদের পরাগায়ন ঘটিয়ে ফসলের ফলন বাড়ায় এবং ফল খেয়ে মলত্যাগের মাধ্যমে দূর-দূরান্তে বিনামূল্যে বনায়ন ও ফলদ বৃক্ষের বিস্তার ঘটায়।
এছাড়া মাঠের ফসল নষ্টকারী ইঁদুর দমনেও ক্ষেতের চারপাশের শিকারী পাখিদের ভূমিকা অপরিসীম, যা কৃষকের কোটি কোটি টাকার ফসল রক্ষা করে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা সুসংহত রাখে। সর্বোপরি পাখিরা জমিতে বিষাক্ত কীটনাশকের প্রয়োজনীয়তা কমিয়ে পরিবেশ ও পানিদূষণ থেকে রক্ষা করে, যা পরোক্ষভাবে মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি ও দেশের চিকিৎসা খাতের পেছনে বিশাল অর্থনৈতিক অপচয় রোধ করতে সাহায্য করে। কিন্তু মহাজ্ঞানী মানুষ এই গুরুত্ব বুঝতে অক্ষম।
দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি এবং সময়ের দাবি। চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদার মতো ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত পর্যায়ের মানুষের মধ্যে বন্যপ্রাণী ও পরিবেশের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে সঠিক ধারণার অভাব রয়েছে। অধিকাংশ কৃষকই জানেন না, পাখিরা ফসলের ক্ষতি করে না, বরং ক্ষতিকর পোকা খেয়ে ফলন বাড়াতে সাহায্য করে।
গ্রামীণ পর্যায়ে বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন সম্পর্কে সাধারণ মানুষের স্পষ্ট ধারণা নেই, যার ফলে তারা অজান্তেই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। তাই ইউনিয়ন পরিষদ, স্থানীয় প্রশাসন এবং কৃষি বিভাগের মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলের হাট-বাজার, স্কুল ও ধর্মীয় উপাসনালয়গুলোতে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো উচিত।
প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষকে সম্পৃক্ত করে জীববৈচিত্র্য রক্ষার এই আন্দোলন গড়ে তুলতে না পারলে আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদ এবং গ্রামীণ অর্থনীতি চিরতরে হুমকির মুখে পড়বে।
- আশিকুর রহমান সমী: প্রভাষক, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
- মোসা. সাজিয়া আফরিন: প্রভাষক, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
