This city had a flooding problem. So it turned to an animal that had been extinct there for 400 years বন্যা সমস্যার সমাধানে ৪০০ বছর আগে বিলুপ্ত হওয়া এক প্রাণীকে ফিরিয়ে আনল এই শহর
ম্যাকডোনাল্ডস আর একটা স্ট্রিপ মল থেকে কয়েকশো ফুট দূরেই জায়গাটা। দুপাশে ব্যস্ত, দূষণে ভরা রাস্তা। ঠিক মাঝখানে গড়ে উঠছে সবুজে ঘেরা এক শহুরে জলাভূমি। আর এ কাজ করছে শহরের একডক অদ্ভুত, লোমশ বাসিন্দা: বিভার।
জায়গাটা পশ্চিম লন্ডনের ইলিং এলাকার এক প্রান্তে। প্রবল বৃষ্টি হলেই এখানে নিয়মিত বন্যা দেখা দিত। বৃষ্টির পানি ভাসিয়ে দিত স্থানীয় রাস্তাঘাট। প্লাবিত হতো লন্ডন আন্ডারগ্রাউন্ডের অংশ, অনতিদূরের গ্রিনফোর্ড টিউব স্টেশনও।
এই সমস্যা নিরসনে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ প্রথাগত ইঞ্জিনিয়ারিং প্রকল্পের পথে হাঁটার কথা ভেবেছিল। পরিকল্পনা ছিল ভারী যন্ত্রপাতি ও কংক্রিট দিয়ে কৃত্রিম জলাধার বানানোর। কিন্তু স্থানীয় একদল পরিবেশ সংরক্ষবিদের মাথায় আসে অন্য চিন্তা।
ইলিং বিভার প্রজেক্টের প্রধান, পশুচিকিৎসক ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষক শন ম্যাককরম্যাক বলেন, 'আমরা কেন প্রকৃতি-নির্ভর সমাধানের পথে কেন হাঁটছি না? বিভারদের ফিরিয়ে আনছি না কেন?'
২০২৩ সালে ইলিংয়ের প্যারাডাইস ফিল্ডস নামক ২৪ একর আয়তনের জমিতে ছেড়ে দেওয়া হয় পাঁচটি বন্য বিভারের একটি পরিবারকে। শন বলেন, 'জায়গাটা একপ্রকার বিস্মৃত ও অবহেলিতই পড়ে ছিল।' কিন্তু গত কয়েক বছরে সেই জায়গার খোলনলচেই পাল্টে গেছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে যখন ঝড় ও চরম বৈরী আবহাওয়া ক্রমেই ভয়ংকর হয়ে উঠছে, তখন সমাধান হিসেবে উঠে আসছে 'রিওয়াইল্ডিং' (বন্য পরিবেশ ফিরিয়ে আনার প্রকল্প)। এ পদ্ধতিতে প্রাণীদের সহজাত দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে আরও টেকসই ভূখণ্ড তৈরি করা হয়। তবে বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা, এ ধরনের উদ্যোগ অত্যন্ত সাবধানে নিতে হবে।
ইঞ্জিনিয়ার বিভার
প্রায় ৪০০ বছর আগে যুক্তরাজ্য থেকে বন্য বিভার বিলুপ্ত হয়ে যায়। মূলত পশম, মাংস ও সুগন্ধি গ্রন্থির নির্যাসের জন্য এদের শিকার করা হতো। ওই নিঃসরণের গন্ধ অনেকটা কস্তুরী ও ভ্যানিলার মতো। অনেকটা ভ্যানিলা ও কস্তুরীর সুঘ্রাণযুক্ত এই নির্যাস ব্যবহার করা হতো পারফিউম তৈরি ও খাবারে স্বাদ বাড়ানোর কাজে।
তবে গত কয়েক বছরে দেশটিতে বিভার ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। কারণ, আধা-জলজ এই তীক্ষ্ণদন্তী প্রাণীরা চমৎকার প্রাকৃতিক ইঞ্জিনিয়ার।
এদের মজবুত দাঁতে প্রচুর আয়রন থাকে। সে কারণেই দাঁতের রং উজ্জ্বল কমলা। এই শক্তিশালী দাঁত দিয়ে তারা অনায়াসে ডালপালা ও আস্ত গাছ কেটে ফেলতে পারে। গাছের বাকল এদের প্রধান খাদ্য। আর কাটা কাঠ দিয়ে এরা অনায়াসে বাঁধ তৈরি করে প্রাকৃতিক জলাধার গড়ে তোলে।
এসব জলাশয় বিভারদের শিকারিদের হাত থেকে বাঁচার নিরাপদ আশ্রয় দেয়। আর মানুষের জন্য এগুলো প্রাকৃতিকভাবে বন্যা নিয়ন্ত্রণের কাজ করে। বিভারদের এই ইঞ্জিনিয়ারিং পুরো এলাকাকে স্পঞ্জে পরিণত করতে পারে। ফলে বৃষ্টির সময় মাটি অনেক বেশি পানি ধরে রাখতে পায়ে। ফলে অতিরিক্ত পানি গড়িয়ে গিয়ে নিচু এলাকায় বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা অনেকটাই কমে যায়।
বিভাররা খাল খননেও ওস্তাদ। পশ্চিম লন্ডনের এ প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত না থাকা মিনেসোটা ইউনিভার্সিটির ভূগোলের সহকারী অধ্যাপক এমিলি ফেয়ারফ্যাক্স বলেন, 'এসব খাল অনেকটা ক্ষুদ্র জলধারার মতো। মাকড়সার জালের মতো এগুলো জলাশয় থেকে উপত্যকার নিচ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। বন্যার পানি অনেকটা বড় এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে দিয়ে এসব খাল ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা অনেকটাই কমিয়ে দেয়।'
চ্যাপটা লেজওয়ালা এই তীক্ষ্ণদন্তী প্রাণীরা অন্যান্য চরম আবহাওয়া থেকেও সুরক্ষা দিতে পারে। এদের তৈরি করা জলাভূমি খরায় খুব উপকারে আসে। কারণ, এই জলাশয় থেকে পানি চুইয়ে আশপাশের শুকনো এলাকায় ছড়িয়ে পড়তে পারে। সিএনএনকে ফেয়ারফ্যাক্স বলেন, এসব জলাভূমির কারণে মাটি এতটাই ভভেজা থাকে যে সহজে আগুন লাগে না।
ফেয়ারফ্যাক্স বলেন, বিভার নিয়ে যারা গবেষণা করেন, তাদের মধ্যে একটা রসিকতা বেশ জনপ্রিয়—'আপনার কোনো সমস্যা থাকলে তা সমাধানের জন্য একটা বিভার আছে!' তিনি বলেন, কথাটা কিছুটা অতিসরলীকরণ হয়ে গেলেও বিভাররা 'বাস্তুতন্ত্রের সুরক্ষায় অবিশ্বাস্যরকমের বিশাল অবদান রাখে।'
'বিভার বম্বিং'
লন্ডনের এই উদ্যোগ এখনও পর্যন্ত সফল। ম্যাককরম্যাক জানান, ওই এলাকায় বিভারদের দ্বিতীয় শীতকাল পেরোনোর পর দেখা গেছে, গত এক দশকের মধ্যে এই প্রথম নির্দিষ্ট ওই অঞ্চলে কোনো বন্যা হয়নি।
বিভারদের এই কর্মকাণ্ড সেখানে নানা ধরনের বাসস্থানের বৈচিত্র্যময় পরিবেশ গড়ে তুলেছে। এর ফলে পাখি, প্রজাপতি, বাদুড় য়ার স্বাদু পানির চিংড়ি ও মাছের মতো প্রাণীরাও সেখানে ভিড় জমাচ্ছে।
প্যারাডাইস ফিল্ডসে এখন আটটি পূর্ণবয়স্ক বিভার আছে। সেইসঙ্গে বসন্তে জন্ম নিয়েছে তাদের একঝাঁক ছানা, যাদের 'কিটস' বলা হয়। ম্যাককরম্যাক জানান, ছানাগুলো বাসা থেকে না বেরোনো পর্যন্ত সঠিক সংখ্যা জানা সম্ভব নয়। চলতি মাসের শেষের দিকেই তারা বাইরে পা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ব্রিটেনের বাইরে যুক্তরাষ্ট্রেও, বিশেষত করে পশ্চিমাঞ্চলে বিভার ফিরিয়ে আনার প্রকল্প প্রকল্প ক্রমশ গতি পাচ্ছে।
তবে চাইলেই যেকোনো জায়গায় বিভার ছেড়ে দেওয়া যায় না বলে জানান ফেয়ারফ্যাক্স। জলাভূমি তৈরি করে নিজেদের বাসস্থান গড়ে তোলার জন্য তাদের পর্যাপ্ত খাবার, পানি ও জায়গার প্রয়োজন। এলাকার আশপাশের মানুষদেরও এই প্রাণীদের বিষয়ে সহনশীল হতে হবে। আর বিভাররা যদি মানুষের তৈরি অবকাঠামোর খুব কাছাকাছি নিজেদের ইঞ্জিনিয়ারিং শুরু করে দেয়, তখন পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার প্রস্তুতি আগে থেকেই রাখতে হবে স্থানীয়দের।
তবে সবাই যে বিভারদের এই রিওয়াইল্ডিংয়ে সমর্থক, তা নয়। বিশেষ করে ইলিং প্রকল্পের মতো নিয়মতান্ত্রিক উপায়ের বাইরে গিয়ে যখন বেআইনিভাবে এদের ছাড়ার ঘটনা ঘটে, তখন তীব্র আপত্তি ওঠে। ইউনিভার্সিটি অভ লিডসের পরিবেশ সংরক্ষণবিদ্যার অধ্যাপক জর্জ হোমস বলেন, লুকিয়ে বিভার ছাড়ার এই কৌশলকে অনেক সময় 'বিভার বম্বিং' বলা হয়।
কৃষক ও জমির মালিকদের জন্য বিভাররা সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। নদীর পাড়ে এরা যেসব সুড়ঙ্গ খোঁড়ে, সেগুলো বেশ বড় আকারের হতে পারে। সেখানে গবাদিপশু থেকে শুরু করে কৃষিকাজের ভারী যন্ত্রপাতি পর্যন্ত আটকে যেতে পারে। এছাড়া কৃষিজমি ও অন্যান্য অবকাঠামো প্লাবিত হওয়ার প্রবল আশঙ্কা তো আছেই। বিভারদের বন্য পরিবেশে ফেরানোর ক্ষেত্রে স্থানীয়দের এই বিরোধিতার দিকটি নিয়ে সম্প্রতি এক গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন করেছেন হোমস।
সিএনএনকে তিনি বলেন, 'কৃষক (ও অন্যরা) বিভারদের দেখছেন এমন এক অনাহূত জিনিস হিসেবে, যা তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।'
বিভারদের ফিরিয়ে আনার যে ইতিবাচক দিক রয়েছে, তা স্বীকার করেন হোমস। তবে একইসঙ্গে সতর্ক থাকার পরামর্শও দেন তিনি।
এই অধ্যাপক বলেন, 'অনেকেই প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, বিভাররা জাদুর মতো সমস্যার সমাধান করে ফেলবে। কিন্তু আমার মনে হয়, তারা এমন সব প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন যা শেষ পর্যন্ত রক্ষা করা সম্ভব নয়।'
ফেয়ারফ্যাক্স বলেন, এই বিরোধিতার কারণ তিনি বোঝেন। 'যে জলপথের উপর আমরা নির্ভরশীল, তার প্রকৌশলগত সিদ্ধান্ত ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব ৭০ পাউন্ড ওজনের পুকুরের ইঁদুর-জাতীয় প্রাণীর ওপর ছেড়ে দেওয়াটা শুনতে আসলেই হাস্যকর লাগে,' বলেন তিনি।
তবে তিনি এ-ও মনে করিয়ে দেন, এই বিভাররাই লক্ষ লক্ষ বছর ধরে বাস্তুতন্ত্রের নিখুঁত ইঞ্জিনিয়ারিং করে আসছে। উপযুক্ত জায়গায় 'জলাভূমি তৈরির জন্য তাদের ওপর ভরসা করা উচিত আমাদের—কারণ এটাই তাদের বিশেষত্ব।'
ইলিংয়ের স্থানীয় বাসিন্দারা অবশ্য ব্যাপারটাকে বেশ ইতিবাচকভাবে নিয়েছেন। সিএনএন যেদিন সেখানে গিয়েছিল, সেদিন ডজনখানেক মানুষ ম্যাককরম্যাকের কাছে এসে জানতে চাইছিলেন বিভারদের দেখা মিলবে কি না। একদল মানুষ কাজের শেষে বেঞ্চে বসে বিয়ারে চুমুক দিতে দিতে বিভার খুঁজছিলেন। বিভারদের তৈরি বাঁধের পাশ দিয়ে হেঁটে স্কুল থেকে বাড়ি ফিরছিল একদল শিশু। আবার একদল বন্যপ্রাণীপ্রেমী মেতে উঠেছিলেন 'বিভার সাফারি'-তে।
ম্যাককরম্যাক বলেন, একটি জনবহুল শহরকে বিভার ফিরিয়ে আনার জন্য খুব একটা আদর্শ জায়গা মনে না-ও হতে পারে। তবে শহরাঞ্চলে প্রকৃতিকে ফিরিয়ে আনার সুবিধা প্রচুর। 'বিভারদের সঙ্গে সহাবস্থান করাটা যে খুব একটা অবাস্তব বা পাগলাটে ভাবনা নয়, আমরা এখানে সেটাই প্রমাণ করছি।'