চাচাতো-খালাতো ভাই-বোনদের মধ্যে বিয়ে: সন্তানদের যেসব স্বাস্থ্যঝুঁকি রয়েছে
ব্র্যাডফোর্ডের এক ব্যস্ত সারিবদ্ধ বাড়িতে তিন বোন প্রাণবন্তভাবে গল্প করছেন। আজ তাদের ঘরে বিশেষ দিন—একজন বিউটিশিয়ান সোফায় বসে তাদের চুল ও মেকআপ ঠিক করে দিচ্ছেন। হাসি-আনন্দে ঘর ভরে উঠেছে। দৃশ্যটি যেন জেন অস্টিনের কোনো উপন্যাসের মতো। মনে হচ্ছে, তিনজন প্রাণবন্ত তরুণী মনখুলে গল্প করছেন।
অস্টিনের উপন্যাসের মতোই, তাদের কথাবার্তায় বিয়ের প্রসঙ্গ উঠে আসে প্রায়ই।
তারা প্রস্তুতি নিচ্ছেন আসন্ন পারিবারিক বিয়ের জন্য, যেখানে বর ও কনে চাচাতো ভাই-বোন। অনেকের কাছে বিষয়টি অস্বাভাবিক মনে হতে পারে, তবে তাদের পরিবার ও ব্র্যাডফোর্ডের কিছু অঞ্চলে এটি বেশ প্রচলিত। বিবিসিতে এমনই একটি বিষয় উঠে এসেছে।
২৯ বছর বয়সী আয়েশা তিন বোনের মধ্যে সবচেয়ে বড়। তিনিও ২০১৭ সালে তার চাচাতো ভাইকে বিয়ে করেন। তাদের দুটি সন্তান রয়েছে এবং তাদের দাম্পত্য জীবন সুখের, বলে জানান তিনি। তখন এটি একেবারেই স্বাভাবিক মনে হয়েছিল তার জন্য। তাদের মা, যিনি পাকিস্তানি অভিবাসী, ধরে নিয়েছিলেন যে তার তিন মেয়েই একইভাবে বিয়ে করবে।
২৬ বছর বয়সী সালিনা তিন বোনের মধ্যে সবচেয়ে ছোট। তিনি জানান, তিনি এই প্রথা ভেঙে দিয়েছেন। তিনি ভালোবেসে বিয়ে করেছেন, যা তাদের পরিবারে ব্যতিক্রম। পরিবারের বাইরে থেকে জীবনসঙ্গী বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। সালিনা বলেন, তিনি প্রাণবন্ত ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী। তাই চাচাতো ভাইকে বিয়ে করা তাকে কখনোই আকর্ষণ করেনি।
এরপর আছেন ২৭ বছর বয়সী মালিকা। তিনি মেজো বোন। তিনি এখনো অবিবাহিত এবং ইতোমধ্যেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে তিনি পরিবারে মধ্যে কাউকে বিয়ে করবেন না।
মালিকা বলেন, "আমি মাকে বলেছিলাম। তবে এ কারণে আমি আমার বোনদের জাজ করবো না। কিন্তু আমি এটা করব না।"
তিনি জানান, শিক্ষা তার জন্য অনেক সুযোগ তৈরি করেছে। এতে তার দৃষ্টিভঙ্গিও বদলেছে। তিনি বলেন, "আগে, শিক্ষিত হলেও তা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ কম ছিল। সবাই বিয়ের কথাই ভাবত। কিন্তু এখন মানসিকতার অনেক পরিবর্তন এসেছে।"
উদ্বেগজনক নতুন তথ্য
যুক্তরাজ্যসহ পুরো ইউরোপে কাজিনদের মধ্যে বিয়ে নিয়ে নজরদারি বাড়ছে। চিকিৎসকরা সতর্ক করছেন। তারা বলেন, কাজিনদের মধ্যে বিবাহিত দম্পতিদের সন্তানদের মধ্যে বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকি দেখা দিতে পারে।
এবার ব্র্যাডফোর্ড থেকে আসা নতুন কিছু তথ্য এই বিতর্ককে আরও জোরালো করছে।
শহরটির একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা বর্ন ইন ব্র্যাডফোর্ড গবেষণার ১৮তম বছরে প্রবেশ করেছেন। এটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ চিকিৎসা গবেষণা, যেখানে ২০০৭ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে ব্র্যাডফোর্ডের ১৩ হাজারের বেশি নবজাতককে পর্যবেক্ষণ করা হয়। এরপর তাদের শৈশব থেকে কৈশোর এবং এখন প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার সময়গুলো খুব নিবিড়ভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি ছয়জন শিশুর মধ্যে একজনের বাবা-মা ভাই-বোন এবং তারা বেশিরভাগই ব্র্যাডফোর্ডের পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত। এটি চাচাতো ভাই-বোনের মধ্যে বিয়ের স্বাস্থ্যগত প্রভাব নিয়ে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা হয়ে উঠেছে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে প্রকাশিত তথ্য অনুসারে ভাই-বোনের মধ্যে বিয়ের প্রভাব পূর্বের ধারণার চেয়েও বিস্তৃত হতে পারে।
রক্ত সম্পর্কিত বাবা-মায়ের কারণে সন্তানের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ার সবচেয়ে সুস্পষ্ট কারণ হলো অবনতিমূলক জিনগত ব্যাধি যেমন সিস্টিক ফাইব্রোসিস বা সিকেল সেল রোগ। জীববিজ্ঞানী গ্রেগর মেনডেলের জিনতত্ত্ব অনুযায়ী, যদি উভয় বাবা-মা কোনো নির্দিষ্ট অবনতিমূলক জিন বহন করে, তাহলে তাদের সন্তানের সেই রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা এক-চতুর্থাংশ বা ২৫ শতাংশ।
যখন বাবা-মা চাচাতো ভাই-বোন হন তখন তাদের একই জিন বহনের সম্ভাবনা বেশি থাকে। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রথম চাচাতো ভাই-বোনের সন্তানের অবনতিমূলক রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা ৬ শতাংশ যেখানে সাধারণ জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে এটি মাত্র ৩ শতাংশ।
কিন্তু ব্র্যাডফোর্ডের এই গবেষণা আরও বিস্তৃত পরিসরে বিষয়টি বিশ্লেষণ করেছে এবং নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছে।
গবেষকরা কেবল নির্দিষ্ট কোনো অবনতিমূলক রোগের উপস্থিতি দেখেননি। বরং, তারা বিভিন্ন পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করেছেন। সেখানে শিশুদের ভাষা ও বাকশক্তির বিকাশ, চিকিৎসাসেবা গ্রহণের হার এবং তাদের স্কুলের ফলাফল পর্যন্ত নানা বিষয়ে পর্যবেক্ষণ চালিয়েছেন।
এরপর, দারিদ্র্য ও বাবা-মায়ের শিক্ষার প্রভাব বাদ দিয়ে কেবল 'কনসাংগুইনিটি' অর্থাৎ রক্তসম্পর্কিত বাবা-মায়ের সন্তান হওয়ার প্রভাবটি আলাদাভাবে বোঝার জন্য একটি গাণিতিক মডেল ব্যবহার করা হয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, দারিদ্র্যের মতো বিষয়গুলোর প্রভাব নিয়ন্ত্রণ করার পরও ব্র্যাডফোর্ডে চাচাতো ভাই-বোনের সন্তানদের কথা ও ভাষাগত সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা ১১ শতাংশ সেখানে আত্মীয় না এমন বাবা-মায়ের সন্তানের ক্ষেত্রে এই হার ৭ শতাংশ।
এছাড়া, চাচাতো ভাই-বোনের সন্তানের "ভালো পর্যায়ের বিকাশ" (ইংল্যান্ডের পাঁচ বছর বয়সী সব শিশুর জন্য নির্ধারিত একটি সরকারি মূল্যায়ন) অর্জনের সম্ভাবনা ৫৪ শতাংশ, সেখানে সম্পর্কহীন বাবা-মায়ের সন্তানের ক্ষেত্রে এটি ৬৪ শতাংশ।
তাদের স্বাস্থ্যগত দুর্বলতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার হার থেকে। চাচাতো ভাই-বোনের সন্তানেরা বছরে গড়ে চারবার প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য চিকিৎসকের কাছে যান, যা সম্পর্কহীন বাবা-মায়ের সন্তানের তুলনায় এক-তৃতীয়াংশ বেশি। কারণ তাদের ক্ষেত্রে এই সংখ্যা তিনবার।
যা বিশেষভাবে লক্ষণীয়, তা হলো যেসব শিশু ইতোমধ্যেই কোনো নির্দিষ্ট অবনতিমূলক রোগে আক্রান্ত, তাদের হিসাব থেকে বাদ দেওয়ার পরও পরিসংখ্যানগুলো ইঙ্গিত দেয় যে, কনসাংগুইনিটি বা রক্ত সম্পর্কিত বাবা-মায়ের সন্তান হওয়া, এমন শিশুদেরও প্রভাবিত করতে পারে যাদের মধ্যে নির্দিষ্ট কোনো অবনতিমূলক রোগ নেই।
ব্র্যাডফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক এবং গবেষণার প্রধান লেখক নিল স্মল বলেন, "যদি সব অবনতিমূলক রোগে আক্রান্ত শিশুরা গড়ের চেয়ে বেশি বার চিকিৎসকের কাছে গিয়ে থাকেন, তবুও কনসাংগুইনাস শিশুদের মধ্যে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের বিস্তৃত প্রবণতা কেবল এই কারণেই ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়।"
তিনি আরও বলেন, "এই গবেষণা আরও এক্সাইটিং কারণ এটি হস্তক্ষেপ ও চিকিৎসা কার্যক্রমকে আরও নিখুঁতভাবে লক্ষ্যভিত্তিক করার সুযোগ করে দেয়"।
বাড়ছে উদ্বেগ
নিঃসন্দেহে এটি কেবল একটি গবেষণা এবং ব্র্যাডফোর্ডের জনসংখ্যা পুরো যুক্তরাজ্যের প্রতিনিধিত্ব করে না।
তবে, এটি বিজ্ঞানীদের মধ্যে বাড়তে থাকা উদ্বেগকে আরও জোরালো করেছে, যা ইতোমধ্যে ইউরোপজুড়ে নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। স্ক্যান্ডিনেভিয়ার দুটি দেশ ইতোমধ্যে চাচাতো ভাই-বোনের বিয়ে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
নরওয়েতে এই প্রথা গত বছরই অবৈধ হয়েছে, আর সুইডেনে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে আগামী বছর থেকে।
যুক্তরাজ্যে কনজারভেটিভ পার্টির পার্লামেন্ট সদস্য রিচার্ড হোল্ডেন একটি ব্যক্তিগত বিল উত্থাপন করেছেন। সেখানে চাচাতো ভাই-বোনের বিয়ে নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এটি বিদ্যমান অবৈধ বিবাহের তালিকায় যুক্ত হবে (যেখানে বাবা-মা, সন্তান, সহোদর ও দাদা-দাদি/নানা-নানির মধ্যে বিবাহ নিষিদ্ধ)। তবে লেবার সরকার জানিয়েছে, তারা এ বিষয়ে "কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপের পরিকল্পনা" করছে না।
বর্তমানে, যুক্তরাজ্য জেনেটিক কাউন্সেলিং নীতিই অনুসরণ করছে। তারা সেখানে চাচাতো ভাই-বোন দম্পতিদের সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে অবহিত করা হয় এবং গর্ভাবস্থায় বাড়তি স্ক্রিনিং করানোর পরামর্শ দেওয়া হয়।
তবে শিশুদের স্বাস্থ্যের বিষয়ে উদ্বেগ এবং এনএইচএস-এর ওপর বাড়তি চাপের প্রেক্ষাপটে, কিছু গবেষক বলছেন, আরও কার্যকর পরামর্শদানের ব্যবস্থা প্রয়োজন। অন্যদিকে, কেউ কেউ বলছেন, এখনই সময় স্ক্যান্ডিনেভিয়ান উদাহরণ অনুসরণ করার এবং একটি কঠিন ও বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নেওয়ার।
যুক্তরাজ্যের বেশিরভাগ মানুষের কাছে চাচাতো ভাই-বোনের সঙ্গে বিবাহের ধারণা এখন বেশ অস্বাভাবিক মনে হতে পারে। তবে এটি সবসময় এমন ছিল না।
বিবর্তনবাদের জনক চার্লস ডারউইন তার চাচাতো বোন এমা ওয়েজউডকে বিয়ে করেছিলেন। তাদের সন্তান ভিক্টোরিয়ান যুগের বিজ্ঞানী স্যার জর্জ ডারউইন একসময় অনুমান করেছিলেন যে ১৯শ শতকের ব্রিটিশ অভিজাত শ্রেণির প্রতি ২০টি বিবাহের মধ্যে একটি ছিল চাচাতো ভাই-বোনের মধ্যে।
এমনই এক উদাহরণ ছিলেন রানি ভিক্টোরিয়া, যিনি তার চাচাতো ভাই প্রিন্স অ্যালবার্টকে বিয়ে করেছিলেন। বিখ্যাত উপন্যাস ওয়াদারিং হাইটস-এও এমন কাহিনির একাধিক কাল্পনিক উদাহরণ রয়েছে।
২০তম শতকের মধ্যে চাচাতো ভাই-বোনের মধ্যে বিবাহের হার কমে প্রায় ১ শতাংশে নেমে আসে। তবে এটি এখনও কিছু দক্ষিণ এশীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে তুলনামূলকভাবে বেশি।
দুই বছর আগে প্রকাশিত বর্ন ইন ব্র্যাডফোর্ড গবেষণার সর্বশেষ তথ্যানুসারে, ব্র্যাডফোর্ডের তিনটি শহরাঞ্চলীয় ওয়ার্ডে পাকিস্তানি সম্প্রদায়ের মায়েদের মধ্যে প্রায় অর্ধেকই তাদের চাচাতো বা মামাতো-ফুপাতো ভাইয়ের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন।
"সামষ্টিক" প্রভাব
যারা এই প্রথা নিষিদ্ধ করতে চান, তাদের জন্য জনস্বাস্থ্যের যুক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ডিসেম্বরে নিজের প্রস্তাবিত বেসরকারি বিল ঘোষণার সময় রিচার্ড হোল্ডেন চাচাতো ভাই-বোনের সন্তানদের মধ্যে জন্মগত ত্রুটির উচ্চ ঝুঁকির বিষয়টি তুলে ধরেন। পরবর্তীতে টকশোতে তিনি এমন তথ্যের দিকে ইঙ্গিত করেন, যা দেখায় যে চাচাতো ভাই-বোনের সন্তানদের মধ্যে শিশুমৃত্যুর হার বেশি, পাশাপাশি মস্তিষ্ক, হৃৎপিণ্ড ও কিডনির বিভিন্ন সমস্যা তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। তিনি আরও ব্যাখ্যা করেন, যখন প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই প্রথা চলতে থাকে, তখন এর স্বাস্থ্যগত প্রভাব আরও সমষ্টিগত ও ক্রমবর্ধমান হতে থাকে।
শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি অন্যতম কারণ এটি। এর জন্য গবেষক ও ফারোস ফাউন্ডেশন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সহ-প্রতিষ্ঠাতা প্যাট্রিক ন্যাশ আত্মীয়ের মধ্যে বিবাহ নিষিদ্ধ দেখতে চান। গত বছর অক্সফোর্ড জার্নাল অব ল' অ্যান্ড রিলিজিয়ন-এ প্রকাশিত এক প্রবন্ধে তিনি লেখেন, এই প্রথা নিষিদ্ধ হলে 'তাৎক্ষণিক' স্বাস্থ্যগত উন্নতি দেখা যাবে, বিশেষ করে যেখানে এটি প্রচলিত। তিনি বলেন, "আত্মীয়ের মধ্যে বিবাহ নিষিদ্ধ করা হলে জনস্বাস্থ্যে নাটকীয় উন্নতি ঘটবে এবং এর ফলে কোনো নেতিবাচক স্বাস্থ্য প্রভাব পড়বে না।"
ব্র্যাডফোর্ডের বাস্তব পরিস্থিতি কিছুটা মিশ্র। ব্র্যাডফোর্ড টিচিংস হাসপাতালের পরামর্শক নিওনেটোলজিস্ট ও গবেষক অধ্যাপক স্যাম ওডি শহরটিতে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে কাজ করছেন। এই সময়কালে তিনি বহু গুরুতর জিনগত রোগ পর্যবেক্ষণ করেছেন। তিনি বলেন, 'আমি বিভিন্ন মারাত্মক ত্বকের রোগ, মস্তিষ্কজনিত রোগ, পেশিজনিত রোগ দেখেছি।' তার মতে, এটি 'তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট' ছিল যে ব্র্যাডফোর্ডে এসব রোগ অন্যান্য স্থানের তুলনায় বেশি দেখা যাচ্ছে।
তিনি কিছু করুণ ঘটনার কথা মনে করে বলেন, " কিছু পরিবার একের পর এক সন্তানকে একই জিনগত রোগের কারণে হারিয়েছে। এটা অত্যন্ত বেদনাদায়ক এবং পরিবারের জন্য মানসিকভাবে মেনে নেওয়া খুবই কঠিন।"
একই পূর্বপুরুষ
তবে অধ্যাপক স্যাম ওডি মনে করেন, ব্র্যাডফোর্ডে জিনগত স্বাস্থ্যঝুঁকির মূল কারণ কেবল কাজিন ভাইবোনের মধ্যে বিয়ে নয় বরং এন্ডোগ্যামি নামে পরিচিত একটি অনুরূপ প্রক্রিয়া, যেখানে মানুষ সাধারণত নিজেদের ঘনিষ্ঠ সম্প্রদায়ের মধ্যেই বিয়ে করে। তিনি বলেন, একটি সুনির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক গড়ে উঠলে সাধারণ পূর্বপুরুষ এবং একই ধরনের জিন ভাগাভাগি করার সম্ভাবনা বেশি থাকে। এটি কেবল কাজিনদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।
এন্ডোগ্যামি কেবল যুক্তরাজ্যের পাকিস্তানি সম্প্রদায়ের মধ্যে দেখা যায় না। এটি যুক্তরাজ্যের ইহুদি সম্প্রদায়ের মধ্যেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী আমিশ সম্প্রদায় এবং ফরাসি-কানাডীয়দের মধ্যেও এটি লক্ষ করা যায়।
অধ্যাপক ওডি বলেন, "প্রায়ই দেখা যায় যে নির্দিষ্ট পারিবারিক সম্পর্ক শনাক্ত করা সম্ভব নয়। তবে কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মধ্যে একটি জিন বেশি সাধারণভাবে পাওয়া যায়। এই কারণেই বাবা-মা উভয়েই ওই ক্ষতিগ্রস্ত জিন বহন করতে পারেন।"
তিনি আরও বলেন, "শুধু চাচাতো ভাইবোনের মধ্যে বিয়েকেই ব্র্যাডফোর্ড বা পাকিস্তানি সম্প্রদায়ের অতিরিক্ত রিসেসিভ রোগের মূল কারণ হিসেবে দেখানো একটি অতিসরলীকরণ। এন্ডোগ্যামি এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।"
শিক্ষার শক্তি
বিয়েতে নিষেধাজ্ঞার পরিবর্তে অধ্যাপক ওডি শিক্ষার গুরুত্বের ওপর জোর দেন। তিনি একে 'জেনেটিক সচেতনতা' বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, "আমাদের সঙ্গে কথা বলা অনেকের মধ্যেই এই শব্দটি বারবার উঠে এসেছে।"
ব্র্যাডফোর্ডে দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তানি সম্প্রদায়ের মানুষকে তাদের জেনেটিক ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন করতে একটি প্রচারণা চালানো হচ্ছে। দম্পতিদের তাদের পারিবারিক চিকিৎসকের কাছ থেকে বিশেষ পরামর্শ দেওয়া হয়; গর্ভাবস্থার ক্লাসগুলোতে প্রত্যাশিত মায়েদের সঙ্গে এই সংক্রান্ত তথ্য বলা হয়।
অন্তত ব্র্যাডফোর্ডে, কিছু মানুষ এই বার্তা গ্রহণ করছে। বোনদের বাড়িতে ফিরে গেলে দেখা যায়, আমরা যাদের সঙ্গে কথা বলেছি, তারা সবাই মনে করে যে কাজিন বিয়ে নিয়ে ধারণাগুলো ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে, বিশেষ করে স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে বাড়তি সচেতনতার কারণে।
তারা শহরের প্রান্তিক ম্যানিংহাম এলাকায় বাস করেন। এখানে প্রতিবেশীদের মধ্যে এক ধরনের আত্মীয়তার অনুভূতি আছে। সব ঘরের দরজাই খোলা থাকে। সেখানে শিশুরা রাস্তায় খেলাধুলা করে। মাঝে মাঝে তাদের হাসির শব্দ ঘরের ভেতর ভেসে আসে।
যিনি প্রেম করে বিয়ে করেছেন সালিনা বলেন, "'এটা ধীরে ধীরে ঘটবে। এই পরিবর্তন দ্রুত আনা সম্ভব নয়। আমাদের মা যখন পাকিস্তান থেকে এখানে এলেন, তখন তিনি খুবই তরুণ ছিলেন। তার কিছু নির্দিষ্ট মতামত ছিল, কিন্তু তা বদলেছে কারণ তিনি আমাদের ভালোবাসেন। আমি শুধু তাকে বোঝালাম, মা, কাজিনকে বিয়ে করার জন্য চাপ দিলে এতে আপনার কী লাভ?"'
তার বড় বোন মালিকাও একই মত পোষণ করেন। তিনি বলেন, "এটার সঙ্গে সামাজিক মাধ্যমেরও সম্পর্ক আছে, যেখানে আমরা বিভিন্ন মানুষের সংস্পর্শে আসি। নতুন সংযোগ তৈরি হয়।বাবা-মায়ের নজরের বাইরে গিয়ে অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করার সুযোগ মেলে।"
তিন বোনের মধ্যে সবচেয়ে বড় আয়েশাও মনে করেন না যে তার দুই সন্তান তাদের কাজিনদের বিয়ে করবে।
তিনি বলেন, "আমি যখন আমার কাজিনকে বিয়ে করি, তখন বিষয়টি নিয়ে ভিন্ন কোনো ধারণাই ছিল না। আমার বাবা-মা তাদের সংস্কৃতিতে দৃঢ় ছিলেন। কিন্তু প্রজন্মের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সংস্কৃতি কিছুটা হারিয়ে যাচ্ছে।"
তিনি তার দুই সন্তান জন্মের সময় জেনেটিক ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। তবে তাদের কারও জেনেটিক কোনো রোগ হয়নি।
তিনি বলেন, "আমরা বিষয়টি মাথায় রেখেছিলাম। তবে আমি সবসময় মনে করি, যদি কিছু হওয়ার থাকে, তাহলে তা হবেই। শিশু যদি কোনো প্রতিবন্ধকতা নিয়ে জন্মায়, তা সে কাজিনকে বিয়ে করুক বা না করুক, যেকোনো ক্ষেত্রেই হতে পারে।"
অন্তত ব্র্যাডফোর্ডে কাজিন বিবাহের হার কমছে। বর্ন ইন ব্র্যাডফোর্ড গবেষণায় অংশ নেওয়া নতুন মায়েদের মধ্যে যারা তাদের সন্তানের বাবার প্রথম কাজিন ছিলেন তাদের হার ২০০০-এর দশকের শেষের দিকে ৩৯ শতাংশ থাকলেও ২০১০-এর দশকের শেষের দিকে তা কমে ২৭ শতাংশে নেমে এসেছে।
এটি কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয় বলে মনে করেন বর্ন ইন ব্র্যাডফোর্ড প্রকল্পের প্রধান গবেষক অধ্যাপক জন রাইট। তিনি উল্লেখ করেন, যুক্তরাজ্যে কাজিন বিবাহের ঝুঁকি সম্পর্কে তার গবেষণা দল সম্প্রতি বিভিন্ন তথ্য প্রকাশ করেছে।
তিনি বলেন, "১০ বছর আগে যখন আমরা পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছিলাম, তখন স্পষ্ট ছিল যে বেশিরভাগ মানুষ এসব ঝুঁকি সম্পর্কে জানতেন না। তবে অন্য সব বাবা-মায়ের মতো তারাও চেয়েছেন তাদের সন্তানদের জন্য সেরা কিছু করতে, সুস্থ সন্তান পেতে।"
তিনি আরও বলেন, "শিক্ষাই হলো প্রথম ধাপ এবং বর্ন ইন ব্র্যাডফোর্ড গবেষণায় আমরা দেখিয়েছি যে এটি কতটা শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারে।"
'বাধ্য হয়ে বিয়ে'
স্বাস্থ্যগত উদ্বেগের পাশাপাশি, কিছু মানুষ কাজিন বিয়ে নিষিদ্ধ করার আরেকটি কারণ দেখান: এটি সামাজিক সম্প্রীতিকে প্রভাবিত করতে পারে। বিশেষ করে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোতে এই বিষয়টি বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। নরওয়েতে, যেখানে গত বছর কাজিন বিয়ে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, আইনপ্রণেতারা বলেছিলেন যে এই প্রথার সঙ্গে জোরপূর্বক বিবাহের সম্পর্ক রয়েছে, যেখানে কিছু দক্ষিণ এশীয় অভিবাসী নারী তাদের আত্মীয়দের সঙ্গে বিয়েতে বাধ্য হন।
নরওয়েজিয়ান সংবাদপত্রের সাংবাদিক টঞ্জে এগেডিয়াসের মতে, আইনপ্রণেতারা এটিকে তথাকথিত 'সম্মানজনিত' সহিংসতার সঙ্গেও সম্পর্কিত বলে বিবেচনা করেছেন।
টঞ্জে এগেডিয়াস বলেন, "পুলিশ দাবি করছে যে কাজিন বিয়ে অপরাধীদের জন্য পরিবারের মধ্যে সম্মান বজায় রাখা সহজ করে তোলে। তাদের মতে, পরিবারে বিয়ের প্রচলন সম্মানজনিত সহিংসতা ও নির্যাতনের অন্যতম কারণ।"
নরওয়ের একজন সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তা জাসমিনা হোল্টেন গত বছর নরওয়েজিয়ান সম্প্রচার সংস্থা এনআরকে-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, কাজিন বিয়েতে বাধ্য হওয়া কিছু নারী নিজেদের একটি ফাঁদে আবদ্ধ মনে করেন, কারণ তারা আত্মীয়দের ওপর আর্থিকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। এই পরিস্থিতিতে, বিচ্ছেদ মানেই সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া। তিনি বলেন, কাজিন বিয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা এই নির্যাতনমূলক চক্র ভাঙতে সহায়তা করতে পারে।
একইভাবে, সুইডেনের বিচার বিষয়ক সচিব গুনার স্ট্রোমার বলেন, তার দেশে কাজিন বিয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা নারীদের 'সম্মান রক্ষার কঠোর সামাজিক মানদণ্ড' থেকে মুক্ত করবে।
এই সংস্কৃতিগত বিতর্ক ক্রমেই গুরুত্ব পাচ্ছে। নিষেধাজ্ঞার পক্ষে থাকা ব্যক্তিরা সাধারণত কাজিন বিয়েকে সামাজিক বিভাজনের একটি মাধ্যম হিসেবে দেখেন। এটি মানুষকে মূলধারার সমাজ থেকে আলাদা করে রাখে। ফারোস ফাউন্ডেশনের ন্যাশ মনে করেন, ব্র্যাডফোর্ডের মতো এলাকায় কাজিন বিয়ের নিষেধাজ্ঞা জাতিগত বিচ্ছিন্নতা কমাতে সহায়ক হবে।
তবে অনেকে মনে করেন, কেবল কঠোর আইনের মাধ্যমে সমাজের মানুষকে একীভূত করা সম্ভব নয়। তাদের মতে, নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলেও কিছু দম্পতি অবৈধ ও নিবন্ধনবিহীন বিয়ের মাধ্যমে নিজেদের কাজিনদের সঙ্গেই বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হবেন এবং যদি সেই সম্পর্ক খারাপের দিকে যায়, তাহলে এসব নারীরা হয়ত রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।
ইংল্যান্ডের উত্তরপশ্চিম অঞ্চলের সাবেক প্রধান ক্রাউন প্রসিকিউটর নাজির আফজাল মনে করেন, 'বিবেচনাপ্রসূত আইন' কাজিন বিবাহে জোরপূর্বক বাধ্য হওয়া ব্যক্তিদের জন্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারে। তবে তিনি বলেন, "আমাদের অবশ্যই সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও ব্যক্তিগত পছন্দের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকতে হবে। কাজিন বিয়ে বিশ্বের অনেক অঞ্চলে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক চর্চা এবং যে কোনো আইন প্রণয়নে এর সামাজিক ও পারিবারিক মূল্যবোধগুলোর প্রতি সংবেদনশীল থাকা উচিত।"
আরও বিস্তৃত পরিসরে, তিনি পরামর্শ দেন যে সরকারগুলো কাজিন বিবাহে 'সর্বাত্মক নিষেধাজ্ঞা' আরোপের বদলে এ ধরনের বিবাহে প্রবেশ করা দম্পতিদের জন্য শিক্ষার সুযোগ ও জেনেটিক স্ক্রিনিং ব্যবস্থা আরও জোরদার করার বিষয়ে চিন্তা করতে পারে।
'বিভেদ সৃষ্টি করা'
কিছু মানুষের কাছে সরাসরি নিষেধাজ্ঞার ধারণাটি কিছু নির্দিষ্ট সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে লক্ষ্যবস্তু করার মতো একটি অস্বস্তিকর বিষয় বলে মনে করতে পারে। সম্মানজনিত নির্যাতন বন্ধে কাজ করা একটি দাতব্য সংস্থা কার্মা নিরভানা কাজিন বিবাহ নিষিদ্ধ করার এই প্রচেষ্টাকে 'রাজনৈতিক ফায়দা লোটার একটি মাধ্যম' হিসেবে বর্ণনা করেছে। তাদের মতে এটি 'বিদ্বেষ উসকে দেয় এবং সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে।'
রিচার্ড হোল্ডেনের উত্থাপিত বিলটি এখন হাউস অব কমন্সে দ্বিতীয়বারের মতো পড়ার অপেক্ষায় রয়েছে। সরকারের সমর্থন ছাড়া এটি পাস হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম, তবে এর অস্তিত্ব এবং স্ক্যান্ডিনেভিয়ার সাম্প্রতিক ঘটনা কাজিন বিবাহের প্রসঙ্গকে সেইসব সম্প্রদায়ের বাইরেও আলোচনায় নিয়ে এসেছে।
তবে, যারা ইতোমধ্যেই যুক্তরাজ্যে নিজের ভাই-বোনেদের বিয়ে করেছেন, তাদের জন্য জীবন আগের মতোই চলছে।
ব্র্যাডফোর্ডের সেই বাড়িতে বিউটিশিয়ান তিন বোনের চুল সাজিয়ে দিচ্ছেন। কারণ সামনে তাদের বড় বিয়ের অনুষ্ঠান রয়েছে। কাজিনকে বিয়ে করা আয়েশা নিজের প্রায় এক দশকের দাম্পত্য জীবন নিয়ে চিন্তামগ্ন। স্বামীর সঙ্গে সম্পর্কের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, "সমস্যা তো থাকবেই। আমরা একসঙ্গে অনেক কিছু পার করেছি, অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছি। তবে আমরা একসঙ্গে সুখী।"
তিনি আরও বলেন, "আমি মনে করি, প্রেমের বিয়েতেও সমস্যা থাকবে। পার্থক্য শুধু সমস্যার ধরনেরই হবে।"
