কোটি কোটি টাকা খরচের পরও ঢাকার নদীগুলো মরছেই
ঘড়িতে সময় তখন বিকাল সাড়ে ৩টা। বাবুবাজার ব্রিজের নিচে কালো বুড়িগঙ্গার তীরে নিজের খাবারের দোকানে গ্রাহকের অপেক্ষায় বসে ছিলেন নূরজাহান খাতুন। সদরঘাটের এই এলাকায় ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ভাত, তরকারি আর ভর্তা বিক্রি করে দিনাতিপাত করছেন তিনি।
নুরজাহান যখন তার দোকানে কয়েকজন গ্রাহকের সামনে ভাতের থালা দিচ্ছিলেন, তখন পাশেই একটি ড্রেন দিয়ে পয়ঃবর্জ্য আর প্রস্রাবের গন্ধ নাকে আসছিল। ড্রেনের সেই বর্জ্য গিয়ে মিশে যাচ্ছিল নদীর কালো পানিতে।
দুর্গন্ধ এতটাই প্রকট ছিল যে সেখানে বসে খাওয়া-দাওয়া করাটা ছিল বেশ দুষ্কর। নূরজাহানের ঠিক পেছনেই নদীর তীরে ভাসছিল প্লাস্টিক বর্জ্য। দূষিত সেই পানিতেই এগিয়ে চলছিল যাত্রীবাহী লঞ্চ।
আশির দশকের শেষ দিকে বিয়ের পর ভোলার তজুমদ্দিন থেকে ঢাকায় এসেছিলেন নুরজাহান। নদীর পারেই কাটিয়ে দিয়েছেন জীবনের প্রায় চল্লিশ বছর।
পুরোনো দিনের কথা স্মরণ করে নূরজাহান বললেন, 'আগে এমন ছিল না'।
তিনি সেই দিনগুলোর কথা বলছিলেন, যখন সন্ধ্যার দিকে নদীর পাড়ে মানুষেরা ভিড় করত, ঘাটে সারি সারি লঞ্চ থাকত, জেলেরা জালভর্তি মাছ নিয়ে আসত।
নূরজাহান জানান, এখন কাস্টমারেরা বেশিক্ষণ বসতে চান না; উটকো গন্ধের জন্য দ্রুত খাওয়া শেষ করে চলে যান।
দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তিনি বললেন, 'শীতকালে গন্ধ আরও বাড়ে। মানুষ এখানে শুধু কাজের দায়ে আসে।'
নূরজাহানের পেছনের সেই কালচে পানি দেখে এখন আর বোঝার উপায় নেই যে এটি একসময় ঢাকার 'লাইফলাইন' বা প্রাণপ্রবাহ ছিল। তবে এই পরিবেশগত সংকট এখন আর শুধু একটি নদীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই।
গাবতলীতে তুরাগ নদও এখন আর আগের সেই রূপে নেই, যা সেখানকার বহু মানুষের স্মৃতিতে আজও অমলিন।
সম্প্রতি এক বিকেলে দেখা যায়, বেড়িবাঁধের পাশ দিয়ে বয়ে চলা সেই কালো পানির ওপর বিষাক্ত এক গন্ধ জমে আছে। তীরের কাছে প্লাস্টিকের বোতল আর গৃহস্থালি বর্জ্যের পাশাপাশি ভেসে আছে অসংখ্য মৃত সাকার মাছ।
স্থানীয় জেলেরা বলছেন, দেশি মাছ এখন আর পাওয়া যায় না বললেই চলে। অথচ পাশের ড্রেনগুলো দিয়ে যখন অপরিশোধিত বর্জ্য নদীতে পড়ে, তখন সাকার মাছের যেন হিড়িক পড়ে।
অবরুদ্ধ এক নদী ব্যবস্থা
যেভাবে ঢাকার চারপাশের নদীগুলো আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে, তার চেয়েও দ্রুতগতিতে দূষণ বাড়ছে।
গত ২০ বছরে যেই সরকার দেশের শাসনক্ষমতা পেয়েছে, সেই সরকারই হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করেছে। হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি স্থানান্তর, ড্রেজিং বা নদী খনন, দখল উচ্ছেদ অভিযান, নদী তীরবর্তী উন্নয়ন এবং নদী পুনরুদ্ধারের একাধিক প্রকল্প হাতে নিয়েছে।
হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি সরানোর ১০ বছর এবং প্রথম বড় পরিচ্ছন্নতা অভিযানের ২০ বছরেরও বেশি সময় পর আজও বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, ধলেশ্বরী, বালু ও শীতলক্ষ্যা মারাত্মক দূষণের শিকার।
ঢাকার চারপাশের ছয়টি প্রধান নদী মূলত একটি জটিল ও আন্তঃসংযুক্ত জলজ নেটওয়ার্কের অংশ। এখানে এক নদীর দূষণ সহজেই অন্য নদীতে ছড়িয়ে পড়ে। ব্যবসা-বাণিজ্য, যোগাযোগ, মৎস্য চাষ, কৃষি এবং নগরের ভারসাম্য রক্ষায় এই নদীগুলোর ব্যাপক ভূমিকা থাকলেও এখন এগুলো শহরের বর্জ্যের বিশাল ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে।
এই ব্যবস্থার কেন্দ্রে রয়েছে ধলেশ্বরী। বংশী নদীর পানি এসে মিশেছে এই নদীতে। আর এই ধলেশ্বরী গিয়ে মিলিত হয়েছে শীতলক্ষ্যার সঙ্গে। বংশী নদী মধুপুর গড় থেকে দক্ষিণে প্রবাহিত হয়ে সাভারের কাছে ধলেশ্বরীতে মিশেছে।
আবার তুরাগ নদী বংশী নদী কামরাঙ্গীরচরে বুড়িগঙ্গার সাথে মিলিত হয়েছে। বুড়িগঙ্গার উৎপত্তি কলাতিয়ার কাছে ধলেশ্বরী নদী থেকে। অন্যদিকে বালু নদ খালের মাধ্যমে পূর্ব দিকের নদীগুলোকে যুক্ত করে ডেমরার কাছে শীতলক্ষ্যায় মিশেছে।
এভাবে ঢাকার চারপাশ জুড়ে একটি নিরবচ্ছিন্ন নদীপথ তৈরি হয়েছে। ফলে পানি ও দূষণ সহজেই পুরো অববাহিকায় ছড়িয়ে পড়ে।
পরিবেশগত গবেষণায় প্রাক্কলন করা হয়েছে যে, ঢাকা ও এর আশেপাশে প্রতিদিন ১০০ কোটি লিটারের বেশি বর্জ্য পানি উৎপন্ন হয়। পর্যাপ্ত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং বর্জ্য শোধন সক্ষমতা না থাকায় এই বিশাল পরিমাণ বর্জ্যের সিংহভাগ নদীতে মিশছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. এনায়েত হোসেন দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে যখন নদীর পানি কমে যায় এবং দূষকগুলোর ঘনত্ব বেড়ে যায়, তখন এর ফলাফল আরও প্রকট হয়ে ওঠে।
তিনি গৃহস্থালির অপরিশোধিত বর্জ্য, শিল্প কারখানার রাসায়নিক বর্জ্য, বর্জ্যের স্তূপ এবং নৌযান থেকে নির্গত তেল ও বর্জ্যকে দূষণের প্রধান উৎস হিসেবে চিহ্নিত করেন। তার মতে, টেক্সটাইল, ওষুধ, প্রিন্টিং, রাসায়নিক এবং ট্যানারি শিল্প এই ক্ষতির জন্য মূলত দায়ী।
রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের (আরডিআরসি) ২০২৫ সালের জানুয়ারির এক গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার নদীগুলোর দূষণের উৎস গত পাঁচ বছরে ৬০৮টি থেকে বেড়ে ১ হাজার ২৪টি হয়েছে।
অর্থাৎ, দূষণের উৎস বেড়েছে ৬৮ শতাংশ।
গবেষণায় ১০২টি শিল্প বর্জ্যের লাইন সরাসরি নদীতে দূষক ফেলছে বলে শনাক্ত করা হয়েছে। এছাড়া ৭৫টি পৌর সুয়ারেজ লাইন এবং ২১৬টি বেসরকারি ক্ষুদ্র সুয়ারেজ লাইন সরাসরি নদীতে বর্জ্য ফেলছে।
বুড়িগঙ্গার দূষণ এখন আগের চেয়েও স্পষ্ট। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, এটি বিশ্বের অন্যতম দূষিত নদী। এখানে প্রতিদিন ৬০ হাজার ঘনমিটারের বেশি বিষাক্ত বর্জ্য ফেলা হয়।
২০২৪ সালে আরডিআরসির 'ঢাকা নদীসমূহের দূষণ চিত্র' শীর্ষক আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, কামরাঙ্গীরচর থেকে ফরাসগঞ্জ ব্রিজ পর্যন্ত মাত্র ৬ কিলোমিটার এলাকায় ২৫১টি পাইপলাইন দিয়ে সরাসরি কাঁচা পয়ঃবর্জ্য নদীতে পড়ছে। এটি বাংলাদেশের অন্যতম দূষিত এই নদীর মোট দূষণের প্রায় ৪০ শতাংশের জন্য দায়ী।
নিউমার্কেট, আজিমপুর, লালবাগ, চকবাজার, বংশাল, কাপ্তান বাজার, লক্ষ্মীবাজার এবং পুরান ঢাকার একাংশের পয়ঃবর্জ্য ও বৃষ্টির পানি বুড়িগঙ্গায় গিয়ে পড়ে। এছাড়া বেসরকারি মালিকানাধীন অনেক কালভার্ট দিয়েও আবাসিক এলাকার বর্জ্য নদীতে সরাসরি গিয়ে পড়ছে।
আরডিআরসির সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ এজাজ ২০২৪ সালে বলেছিলেন, মাত্র ২৫-৩০ কোটি টাকার একটি ক্ষুদ্র প্রকল্পের মাধ্যমে এই লাইনগুলোকে পাগলা সুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টে (এসটিপি) ঘুরিয়ে দেওয়া সম্ভব। তিনি বিভিন্ন স্থানে ছোট ও মাঝারি মানের এসটিপি স্থাপনেরও প্রস্তাব দিয়েছিলেন।
তবে এ বিষয়ে ঢাকা ওয়াসার উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (গবেষণা, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) মো. আজিজুল হকের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান।
তিনি বলেন, 'আমি আপনাকে এ ধরনের তথ্য দিতে পারব না।' তিনি ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে লিখিত আবেদন করার পরামর্শ দেন। তবে ইমেইল এবং একাধিকবার ফোন করার পরেও ব্যবস্থাপনা অফিস থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
অন্যান্য গবেষণায়ও এই বাস্তুসংস্থান ধ্বংসের এক করুণ চিত্র উঠে এসেছে।
বুয়েটের ২০২৩ সালের এক গবেষণায় বুড়িগঙ্গা ও তুরাগের পানি পরীক্ষা করে দেখা গেছে, তুরাগের পানিতে বায়োলজিক্যাল অক্সিজেন ডিমান্ড (বিওডি) ১১২ থেকে ১৬৫ মিলিগ্রাম প্রতি লিটার এবং বুড়িগঙ্গায় ৭৫ থেকে ১৭৪ মিলিগ্রাম। উভয় মাত্রাই জলজ প্রাণীর বেঁচে থাকার জন্য নির্ধারিত সীমার চেয়ে বহুগুণ বেশি।
উল্লেখ্য, উচ্চ বিওডি মানে হলো পানিতে থাকা জৈব উপাদান পচনের জন্য অক্সিজেন খরচ করে ফেলছে, যার ফলে মাছ অক্সিজেন সংকটে মারা যাচ্ছে এবং বাস্তুতন্ত্র ভেঙে পড়ছে।
২০২৪ সালে 'বাংলাদেশ জার্নাল অব বোটানি'-তে প্রকাশিত এক গবেষণায় বুড়িগঙ্গা ও এর শাখা নদীগুলোতে শিল্প বর্জ্যের প্রভাব পরীক্ষা করা হয়। গবেষকরা কামরাঙ্গীরচর এবং হাজারীবাগ এলাকায় পানি, মাটি ও উদ্ভিদের নমুনায় ক্রোমিয়াম, ক্যাডমিয়াম, আয়রন এবং দস্তার মতো ভারী ধাতুর বিপজ্জনক উপস্থিতি পেয়েছেন। এই ফলাফল হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি সরানোর সেই মূল উদ্দেশ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। অর্থাৎ ট্যানারি সরানো হলেও দূষণ মোটেও কমেনি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বরং দূষণ এখন আরও বড় নদী নেটওয়ার্কে ছড়িয়ে পড়েছে। হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি সরানোর পর বুড়িগঙ্গার দূষণের ধরনে বদলেছে ঠিকই, কিন্তু কাঁচা পয়ঃবর্জ্য আসা বন্ধ হয়নি। অন্যদিকে সাভার, আশুলিয়া, টঙ্গী, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চলগুলো প্রতিদিন যে বিশাল পরিমাণ বর্জ্য উৎপাদন করছে, তা চারপাশের নদী ব্যবস্থায় গিয়ে মিশছে।
ট্যানারি স্থানান্তর ও এর বৈপরীত্য
সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য হলো হাজারীবাগ থেকে সাভারের হেমায়েতপুরে ধলেশ্বরী নদীর তীরে ট্যানারি শিল্প স্থানান্তর। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই শিল্পনগরী থেকে অন্তত চারটি বড় সুয়ারেজ লাইন সরাসরি নদীর মূল ধারার সাথে যুক্ত করা হয়েছে।
সাভার ট্যানারি শিল্পনগরী (এসটিআইই) প্রতিদিন ১৫ হাজার ঘনমিটারের বেশি অপরিশোধিত বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলছে। অবকাঠামো নির্মাণের পর থেকে ৫০০ কোটি টাকার বেশি খরচ করা হলেও কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধন কেন্দ্রটি (সিইটিপি) এখনো আংশিকভাবেও কার্যকর নয়।
ট্যানারি ছাড়াও টেক্সটাইল ও ডাইং শিল্পই ১৬০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নদীর সবচেয়ে বড় দূষণকারী। সাভার-আশুলিয়া বেল্টে তৈরি পোশাক শিল্পের সাথে যুক্ত প্রায় ৪০০ কারখানা রয়েছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মাশুরা শাম্মী জানান, গত কয়েক দশকে ধলেশ্বরী ও কর্ণতলী নদীর পাড়ে এই শিল্প কারখানাগুলো গড়ে উঠেছে।
তিনি বলেন, বেশিরভাগ কারখানারই হয় বর্জ্যশোধন ব্যবস্থা নেই, অথবা তারা ইটিপি কার্যকরভাবে চালায় না। এই ধ্বংসযজ্ঞ বন্ধে ইটিপি সচল রাখা এখন সময়ের দাবি।
১৯৯৫ সালের পরিবেশ সংরক্ষণ আইন এবং ১৯৯৭ সালের বিধি অনুযায়ী, তরল বর্জ্য উৎপাদনকারী শিল্পগুলোর জন্য ইটিপি স্থাপন ও পরিচালনা এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নেওয়া বাধ্যতামূলক। বর্জ্য শোধন না করে তা ত্যাগ করা আইনত দণ্ডনীয়।
অধ্যাপক মাশুরা বলেন, 'বাস্তবে এই আইন এসব শিল্পের জন্য যেন রূপকথা মাত্র। তারা অবৈধভাবে উৎপাদন চালিয়ে নদী, খাল ও জলাশয় বছরের পর বছর ধ্বংস করে চলেছে। তাদের থামানোর আর কে আছে?'
২০২৫ সালে পরিবেশ অধিদপ্তর এই অঞ্চলের অন্তত ৩৯০টি শিল্প প্রতিষ্ঠানকে চূড়ান্ত নোটিশ দেয়। এতে বলা হয়, যাদের ইটিপি আছে তাদের সবসময় তা সচল রাখতে হবে। যদিও ৯০ শতাংশের বেশি কারখানায় এমন কোনো অবকাঠামোই নেই।
আজ ধলেশ্বরী ও এর প্রধান শাখা বংশী নদীর পানি ও জীববৈচিত্র্য শিল্পের দাপটে ধ্বংসের মুখে। সাভারের যে নদী একসময় কৃষি ও মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের প্রাণ ছিল, তা এখন সেই একই দূষণে রুদ্ধ হয়ে গেছে, যা একসময় বুড়িগঙ্গাকে ধ্বংস করেছিল।
২০২৫ সালে 'জার্নাল অব বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্সেস'-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় ধলেশ্বরীতে ভয়াবহ মাত্রার ভারী ধাতু ও অণুজীবের উপস্থিতি পাওয়া যায়। সেখানে ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়ার মাত্রা প্রতি মিলিলিটারে ১৫০ সিএফইউ পাওয়া গেছে, যেখানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদিত সীমা হলো শূন্য।
এছাড়া সীসার ঘনত্ব প্রতি লিটারে ০.০৭ মিলিগ্রাম পর্যন্ত পাওয়া গেছে, যা অনুমোদিত সীমার চেয়ে ৫ গুণ বেশি।
তুরাগ নদের চিত্রও একই। গাজীপুর ও উত্তর ঢাকার শিল্পাঞ্চল দিয়ে প্রবাহিত এই নদে টেক্সটাইল মিল, ডাইং ফ্যাক্টরি এবং ওয়াশিং প্ল্যান্টের বর্জ্য গিয়ে পড়ছে।
আরেক মূল্যায়নে দেখা গেছে, গাবতলীর কাছে শিল্প বর্জ্য, সুয়ারেজ, গৃহস্থালি বর্জ্য এবং তেলের মিশ্রণ নদীটিকে মৃতপ্রায় করে ফেলেছে।
নদী রক্ষায় ব্যয় কোটি কোটি টাকা
ঢাকার নদীগুলোর এই অবস্থার পেছনে সরকারি উদ্যোগের অভাবকে দায়ী করা যাবে না। গত দুই দশকে একের পর এক প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। ২০০০ সালে পানি উন্নয়ন বোর্ড বুড়িগঙ্গা ও নদী বন্দর উন্নয়নে ৬১ কোটি টাকার প্রকল্প নেয়। তিন বছর পর এক হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে হাজারীবাগ ট্যানারি স্থানান্তরের কাজ শুরু হয়।
পরিবেশবাদীরা বলছেন, এটি ছিল বুড়িগঙ্গার বিশাল দূষণের ক্ষুদ্র একটি অংশের মোকাবিলা মাত্র।
এরপর আরও অনেক উদ্যোগ আসে। ২০০৬ সালে বিআইডব্লিউটিএ নদী দখল রোধে সীমানা পিলার স্থাপন ও ইকো-পার্ক নির্মাণের ৩৫ কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নেয়। প্রায় ৩০০ পিলার বসানো হলেও সমালোচকদের মতে, নদীর মূল প্রবাহ ও প্লাবনভূমি বিবেচনায় না নিয়েই তা করা হয়েছিল।
২০১০ সালে পানি উন্নয়ন বোর্ড বুড়িগঙ্গা নদী পুনরুদ্ধারে ৯৪৪ কোটি টাকার প্রকল্প শুরু করে। এর মূল লক্ষ্য ছিল যমুনা থেকে পানি এনে বুড়িগঙ্গাকে সচল করা। তবে বাস্তবায়ন বিলম্ব ও অর্থ সংকটে তা সফল হয়নি।
এছাড়া বিআইডব্লিউটিএ ২১ কোটি টাকা ব্যয়ে কঠিন বর্জ্য অপসারণের কাজ করলেও লাগাতার বর্জ্য ফেলার কারণে তা বিফলে যায়।
২০১৯ সালে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যার তীরে হাঁটার পথ (ওয়াকওয়ে) ও জেটি নির্মাণে ৮৪৮ কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়। কিছু অংশ শেষ হলেও অনেক জায়গায় নতুন করে দখল ও ভরাট শুরু হয়েছে।
পেছন ফিরে তাকালে একটি সাধারণ ধরন দেখা যায়: বেশিরভাগ প্রকল্প ড্রেজিং, স্থানান্তর, সৌন্দর্যবর্ধন বা সীমানা নির্ধারণেই মনোযোগী ছিল। খুব কম প্রকল্পেই নিরবচ্ছিন্ন অপরিশোধিত পয়ঃবর্জ্য ও শিল্প বর্জ্য নিঃসরণের মূল সমস্যা সমাধানে নজর দেওয়া হয়েছিল।
রিভারাইন পিপল-এর মহাসচিব শেখ রোকন দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, গত দুই দশকে বিলিয়ন বিলিয়ন টাকা খরচ করা হয়েছে। ২০০০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে গৃহীত আটটি প্রকল্প আমরা পর্যালোচনা করেছি। দেখা গেছে, শুধু বুড়িগঙ্গা নদী উদ্ধারের নামেই অন্তত ৩ হাজার ২৯৪ কোটি টাকা বরাদ্দ ও খরচ করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, 'কিছু ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু নদীর জৈবিক পুনরুদ্ধার হয়নি। সরকার দাবি করে বুড়িগঙ্গার বড় অংশ উদ্ধার হয়েছে। কিন্তু আমাদের গবেষণায় দেখা গেছে, বিশাল অংশ আজও দখল হয়ে আছে, আর দূষণ তো প্রতিদিন চলছেই।'
রোকন জানান, বসিলা থেকে ধর্মগঞ্জ পর্যন্ত ২৫ কিলোমিটার এলাকায় তারা অন্তত ১০০টি ড্রেন শনাক্ত করেছেন, যা সরাসরি নদীতে বর্জ্য ফেলছে। এর মধ্যে ৪৭টিতে স্লুইস গেট থাকলেও কোনো শোধন ব্যবস্থা নেই। আর ৫৩টি সরাসরি পানি ফেলছে।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, 'যতক্ষণ পর্যন্ত শিল্প বর্জ্য ও সুয়ারেজ বন্ধ না হবে, ততক্ষণ ওয়াকওয়ে বা ড্রেজিং দিয়ে নদী প্রাণ ফিরে পাবে না।'
চক্র ভাঙার নতুন প্রচেষ্টা
অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা সত্ত্বেও নীতি নির্ধারকরা বলছেন, নতুন প্রজন্মের প্রকল্পগুলো ভিন্ন ফল দেবে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিশ্বব্যাংক ৩৭০ মিলিয়ন ডলারের ঋণের প্যাকেজ অনুমোদন করেছে। এই 'মেট্রো ঢাকা ওয়াটার সিকিউরিটি অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স প্রোগ্রাম'-এর লক্ষ্য হলো স্যানিটেশন উন্নত করা এবং নদী ও খালের দূষণ কমানো।
এর আওতায় প্রায় সাড়ে ৫ লাখ মানুষ আধুনিক স্যানিটেশন সেবার আওতায় আসবে। বিশ্বব্যাংকের মতে, ঢাকার ৮০ শতাংশের বেশি অপরিশোধিত বর্জ্য সরাসরি জলাশয়ে গিয়ে পড়ে এবং অর্ধেকের বেশি খাল ভরাট হয়ে গেছে।
এই উদ্যোগ সরকারের প্রস্তাবিত 'ব্লু নেটওয়ার্ক প্রোগ্রাম'-এর সাথেও যুক্ত, যা ২০৪০ সাল পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ। এতে প্রায় ৮.৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। এবারের পদ্ধতিতে আগের মতো শুধু ড্রেজিং নয়, বরং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
অতীতের প্রকল্পগুলোর ব্যর্থতা কাটিয়ে এই নতুন প্রচেষ্টা সফল হবে কি না, তার ওপরই নির্ভর করছে ঢাকার নদীগুলোর ভবিষ্যৎ।
ঢাকার চারপাশের প্রায় প্রতিটি বড় নদীই এখন আবর্জনার ভাগাড়। বুড়িগঙ্গা ছিল এই শহরের প্রাণ। আজ বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু আর শীতলক্ষ্যার অবস্থা এটাই প্রমাণ করে যে, ঢাকার সুস্বাস্থ্য তার নদীগুলোর স্বাস্থ্যের সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত।
ট্র্যাজেডি কেবল নদী দূষণে নয়, ট্র্যাজেডি হলো বছরের পর বছর বিজ্ঞানীদের সতর্কতা আর হাজার হাজার কোটি টাকার সরকারি বিনিয়োগের পরও সেই একই পুরনো সমস্যাগুলো আজও নদীর বুকে বয়ে চলেছে।