আর্থিক সংকটে থাকা বেঙ্গল গ্রুপের ‘সুইসোটেল’ ভবন ৮০০ কোটি টাকায় কিনছে পূবালী ব্যাংক
নতুন প্রধান কার্যালয় স্থাপনের জন্য আর্থিক সংকটে থাকা বেঙ্গল গ্রুপের কাছ থেকে নির্মাণাধীন ২৬ তলা একটি ভবন ৮০০ কোটি টাকায় কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পূবালী ব্যাংক।
ভবনটি মূলত বেঙ্গল গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান বেঙ্গল হোটেলস অ্যান্ড রিসোর্টস পাঁচতারকা 'সুইসোটেল ঢাকা' প্রকল্প হিসেবে নির্মাণ করছিল।
বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) শেয়ারবাজারে প্রকাশিত এক মূল্যসংবেদনশীল তথ্যে (পিএসআই) পূবালী ব্যাংক জানায়, ঢাকার তেজগাঁও লিংক রোডে অবস্থিত 'সুইস টাওয়ার' নামে পরিচিত নির্মাণাধীন ভবন এবং এর সঙ্গে থাকা ৫৭ দশমিক ৬৪ কাঠা জমি তারা কিনবে।
এই ক্রয়মূল্যের মধ্যে আয়কর অন্তর্ভুক্ত থাকলেও ভ্যাট অন্তর্ভুক্ত নয়। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর অনুমোদনের পরই লেনদেনটি কার্যকর হবে।
বেঙ্গল গ্রুপের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, পাঁচতারকা সুইসোটেল ঢাকা ২০২১ সালে চালু হওয়ার কথা ছিল। হোটেলটিতে ৩৫০টি অতিথিকক্ষ ও স্যুট, ছয়টি রেস্তোরাঁ ও বার, ৯৫০ বর্গমিটারের ইভেন্ট স্পেস (যার মধ্যে ৫০০ বর্গমিটারের একটি বলরুম রয়েছে) এবং সুইমিং পুলসহ স্পা ও অন্যান্য বিনোদন সুবিধা থাকার পরিকল্পনা ছিল।
আর্থিক চাপে ভবন বিক্রিতে বাধ্য বেঙ্গল গ্রুপ
বেঙ্গল গ্রুপের একজন কর্মকর্তা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গাজীপুরে তাদের তিনটি কারখানায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় কোম্পানিটির প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।
তিনি বলেন, গ্রুপটির চেয়ারম্যানসহ শীর্ষ কর্মকর্তারা কাজে ফিরতে না পারায় ব্যবসায়িক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
তিনি বলেন, 'ব্যাংক থেকে নতুন করে অর্থায়ন পাওয়া যাচ্ছিল না। ফলে বাকি কার্যক্রম চালিয়ে নিতে নগদ অর্থের প্রয়োজন ছিল। এই আর্থিক সংকট মোকাবিলায় আমরা নির্মাণাধীন হোটেলটি বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছি।'
কোম্পানির আরেক কর্মকর্তা জানান, ভবন বিক্রি থেকে পাওয়া অর্থের একটি বড় অংশ ব্যাংকের ঋণ পরিশোধে ব্যয় করা হবে।
দীর্ঘমেয়াদে ব্যয় সাশ্রয়ের আশা পূবালী ব্যাংকের
পূবালী ব্যাংকের প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা (সিএফও) মোহাম্মদ লিটন মিয়া দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, ব্যাংকের সব কার্যালয় এক ছাদের নিচে আনা গেলে ভাড়া বাবদ ব্যয় কমবে, পাশাপাশি কার্যক্রমের দক্ষতাও বাড়বে।
তিনি বলেন, '৬৭ বছরের পুরোনো এই ব্যাংকের কার্যক্রমে সমন্বয় ও দক্ষতা বাড়ানোর লক্ষ্যেই ভবনটিতে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।'
বর্তমানে প্রধান কার্যালয় ও অন্যান্য অফিসের ভাড়া বাবদ প্রতি মাসে ব্যাংকটির ১ কোটি ৫০ লাখ থেকে ২ কোটি টাকা ব্যয় হয়।
ব্যাংকটির আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, এই অধিগ্রহণের পুরো অর্থই সংরক্ষিত মুনাফা (রিটেইনড আর্নিংস) থেকে দেওয়া হবে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকটির সংরক্ষিত মুনাফার পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ২২৭ কোটি টাকা।
যদিও ভবনটির কাঠামোগত নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে, তবে অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জা ও অন্যান্য 'ফিট-আউট' কাজের জন্য আরও ২০০ থেকে ২৫০ কোটি টাকা ব্যয় হবে বলে ব্যাংকটির ধারণা। এতে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ১ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাবে।
প্রায় ৫ লাখ বর্গফুট আয়তনের ভবনটিতে বর্তমানে ব্যাংকের প্রয়োজন প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার বর্গফুট। সব কার্যালয় একত্র করলে প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার বর্গফুট জায়গা ব্যবহার হবে। বাকি অতিরিক্ত জায়গা কীভাবে ব্যবহার করা হবে, সে বিষয়ে পরে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
লিটন মিয়া বলেন, অভ্যন্তরীণ কাজ শেষ হওয়ার পর দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে নতুন ভবনে কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হবে। তখন ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় মতিঝিল থেকে তেজগাঁও লিংক রোডে স্থানান্তর করা হবে।
নতুন প্রধান কার্যালয়ের খোঁজে
পূবালী ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, গত দুই থেকে তিন বছর ধরে নতুন প্রধান কার্যালয়ের জন্য জমি বা উপযুক্ত ভবন খুঁজছিল ব্যাংকটি। এ জন্য বিভিন্ন সময়ে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রস্তাব আহ্বান করা হয়েছিল।
সেই আহ্বানের জবাবে নির্মাণাধীন ভবনটির মালিকপক্ষ প্রস্তাব দেয়। একাধিক প্রস্তাব মূল্যায়নের পর ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভবনটি কেনার অনুমোদন দেয়। পর্ষদের মতে, অবস্থান ও সুযোগ-সুবিধার দিক থেকে এটি ব্যাংকের প্রয়োজনের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ।
লিটন মিয়া বলেন, মতিঝিলে বর্তমানে অফিস ভাড়া প্রতি বর্গফুট ৮০ থেকে ৯০ টাকা। ভবনের বার্ষিক অবচয়ের হার (ডেপ্রিসিয়েশন) ২ শতাংশ ধরে হিসাব করলে প্রায় ৫০ বছরে এই বিনিয়োগের অর্থ উঠে আসতে পারে। পাশাপাশি ভাড়া বাবদ ব্যয় সাশ্রয় হওয়ায় ব্যাংকের মুনাফাও বাড়বে।
শক্তিশালী আর্থিক ফলাফল
২০২৫ সালে পূবালী ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা হয়েছে ৫ হাজার ১৬৬ কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা বেশি।
ওই বছর ব্যাংকটি ৮৭১ কোটি টাকা প্রভিশন সংরক্ষণ করে ১ হাজার ৭৯ কোটি টাকা নিট মুনাফা করেছে। ২০২৪ সালে নিট মুনাফা ছিল ৭৬২ কোটি টাকা। সে হিসাবে এক বছরে ব্যাংকটির মুনাফা বেড়েছে প্রায় ৪২ শতাংশ।
২০২৪ অর্থবছরের জন্য ব্যাংকটি ৩০ শতাংশ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে, যার মধ্যে ১৫ শতাংশ নগদ এবং ১৫ শতাংশ বোনাস শেয়ার।
বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) শেয়ারবাজারে ব্যাংকটির শেয়ারের দাম ২ দশমিক ১১ শতাংশ কমে ৩৭ টাকা ১০ পয়সায় লেনদেন শেষ হয়েছে।
