Skip to main content
  • অর্থনীতি
  • বাংলাদেশ
  • আন্তর্জাতিক
  • খেলা
  • বিনোদন
  • ফিচার
  • ইজেল
  • মতামত
  • অফবিট
  • সারাদেশ
  • কর্পোরেট
  • চাকরি
  • প্রবাস
  • English
The Business Standard বাংলা

নেকড়ে থেকে কুকুর! বাস্তব দুনিয়ার এক অসম্ভব ‘মেটামরফোসিস’

নেকড়ে থেকে কুকুর হওয়ার এই পথ তাই কেবল একটি প্রাণীর গৃহপালিত হয়ে ওঠার গল্প নয়। এটি দুই প্রজাতির দীর্ঘ সহাবস্থানের কাহিনি। আর সেই গল্পের প্রথম দৃশ্যটি কেমন ছিল, তা জানতে চান বিজ্ঞানীরা। তাই তো আজও হাজার হাজার বছরের পুরোনো হাড়, দাঁত ও জিনের ভেতর খুঁজে ফিরছেন সে ঘটনার সাক্ষী-সাবুদ।
নেকড়ে থেকে কুকুর! বাস্তব দুনিয়ার এক অসম্ভব ‘মেটামরফোসিস’

ইজেল

পারভেজ নূরী
18 August, 2026, 10:55 pm
Last modified: 18 August, 2026, 10:59 pm

Related News

  • দেহভাষায়ও লাগে ভ্রু-পল্লবের দোলা
  • বডি ল্যাঙ্গুয়েজ বা দেহভাষার বিজ্ঞান ও আধুনিক মানুষের আগমন বৃত্তান্ত 
  • একই মানসিক যন্ত্রণায় ঋত্বিক ঘটক ও বিনয় মজুমদার
  • কবি নজরুলের ৫০ বছর ধরে বাক্সবন্দী ছবি, প্রথম প্রকাশ্যে এল টিবিএসের হাত ধরে
  • মানুষের মডেলের বদলে কেন ফুল আঁকতেন ভ্যান গঘ?

নেকড়ে থেকে কুকুর! বাস্তব দুনিয়ার এক অসম্ভব ‘মেটামরফোসিস’

নেকড়ে থেকে কুকুর হওয়ার এই পথ তাই কেবল একটি প্রাণীর গৃহপালিত হয়ে ওঠার গল্প নয়। এটি দুই প্রজাতির দীর্ঘ সহাবস্থানের কাহিনি। আর সেই গল্পের প্রথম দৃশ্যটি কেমন ছিল, তা জানতে চান বিজ্ঞানীরা। তাই তো আজও হাজার হাজার বছরের পুরোনো হাড়, দাঁত ও জিনের ভেতর খুঁজে ফিরছেন সে ঘটনার সাক্ষী-সাবুদ।
পারভেজ নূরী
18 August, 2026, 10:55 pm
Last modified: 18 August, 2026, 10:59 pm

ফ্রানৎস কাফকার মেটামরফোসিসে গ্রেগর সামসা এক সকালে ঘুম থেকে উঠে আবিষ্কার করে, তার শরীর বদলে গেছে। মানুষ থেকে সে পরিণত হয়েছে এক অচেনা প্রাণীতে। পরিবর্তনটা ঘটেছে এক রাতের মধ্যে। ঘুমের পর্দা সরতেই তার সামনে দাঁড়িয়ে গেছে এক নতুন শরীর। এক নতুন অস্তিত্ব। 

কুকুরের গল্প অবশ্য এমন আকস্মিক নয়। কোনো এক সকালে একটা নেকড়ে ঘুম থেকে উঠে দেখেনি যে সে কুকুর হয়ে গেছে। তার শরীর বদলেছে ধীরে ধীরে। স্বভাব বদলেছে আরও ধীরে। মানুষের সঙ্গে তার দূরত্ব কমেছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে। একসময় যে প্রাণী মানুষকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখত নেকড়ে। সেই নেকড়ের  বংশধর মানুষের পাশে এসে বসেছে। ভাব হয়েছে। মানুষের নির্দেশ শুনেছে। তার সঙ্গে শিকারে গেছে। এমনকি মৃত্যুর পর মানুষের পাশেই শুয়ে থেকেছে। 

এই দীর্ঘ রূপান্তরের শুরু কোথায়, কখন, কীভাবে—আজও বিজ্ঞানীরা তার উত্তর খুঁজছেন। রহস্যটা আরও বিস্ময়কর এই কারণে যে নেকড়ে ছিল বড়, বুনো, বিপজ্জনক মাংসাশী প্রাণী। মানুষ যার সঙ্গে একই শিকারের জন্য প্রতিযোগিতা করত। ম্যামথ, হরিণ, ঘোড়া কিংবা অন্য বড় প্রাণীর পেছনে ছুটতে গিয়ে মানুষ ও নেকড়ে প্রায় একই খাদ্যভান্ডারের ওপর নির্ভর করত। অথচ সেই প্রাণীই একসময় হয়ে উঠল মানুষের সবচেয়ে বিশ্বস্ত সঙ্গী।

নেকড়ে থেকে কুকুর হওয়ার এই পথ তাই কেবল একটি প্রাণীর গৃহপালিত হয়ে ওঠার গল্প নয়। এটি দুই প্রজাতির দীর্ঘ সহাবস্থানের কাহিনি। আর সেই গল্পের প্রথম দৃশ্যটি কেমন ছিল, তা জানতে চান বিজ্ঞানীরা। তাই তো আজও হাজার হাজার বছরের পুরোনো হাড়, দাঁত ও জিনের ভেতর খুঁজে ফিরছেন সে ঘটনার সাক্ষী-সাবুদ।

অস্ট্রিয়ার উলফ সায়েন্স সেন্টারের প্রাণী আচরণবিজ্ঞানী জসোফিয়া বিরানি এই রহস্যের খুব কাছ থেকে মুখোমুখি হয়েছেন। তাঁর কাছে নেকড়ে আর কুকুর কোনো দূরের গবেষণার বিষয় নয়। ২০০৮ সাল থেকে তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা দুই প্রজাতির প্রাণীকে প্রায় জন্মের পর থেকেই লালন-পালন করছেন। তারা যখন মানুষের যত্ন ছাড়া নিজেরাই বাঁচার মতো বড় হয়নি, তখন থেকেই তাদের সঙ্গে গবেষকদের পরিচয়। বোতলে দুধ খাওয়ানো হয়েছে। দিনরাত পরিচর্যা করা হয়েছে। তাদের আচরণ লক্ষ করা হয়েছে। মানুষকে তারা কীভাবে দেখে, নির্দেশে কীভাবে সাড়া দেয়, অন্য প্রাণীর সঙ্গে কীভাবে সম্পর্ক তৈরি করে—সবকিছুই পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। গবেষণাকেন্দ্রে চারটি নেকড়ের দল এবং চারটি কুকুরের দল রয়েছে। প্রতিটি দলে দুই থেকে ছয়টি প্রাণী। গবেষকেরা নেকড়ে ও কুকুর—দুই জাতের প্রাণীকেই সাধারণ নির্দেশ মানতে শিখিয়েছেন। তারা দড়ি ধরে মানুষের সঙ্গে হাঁটে। কম্পিউটারের পর্দায় নাক দিয়ে নির্দিষ্ট জায়গায় স্পর্শ করে বুদ্ধিমত্তার পরীক্ষায় অংশ নেয়। বাইরে থেকে দেখলে নেকড়ে ও কুকুরকে যেন একই প্রশিক্ষণের ভেতর দিয়ে যাওয়া দুই শিক্ষার্থী মনে হয়।

কিন্তু বছরের পর বছর মানুষের সঙ্গে বসবাস, মানুষের হাতে বড় হওয়া এবং মানুষের নির্দেশে কাজ শেখার পরও তাদের মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য রয়ে গেছে। নেকড়েদের ভেতরের স্বাধীনতাটা যায়নি। তারা মানুষের সঙ্গে থাকতে পারে, মানুষের কথা শুনতে পারে, পরীক্ষায় অংশ নিতে পারে। কিন্তু সুযোগ পেলেই মনে করিয়ে দেয়—তারা এখনো নেকড়ে।

বিরানি একটি সহজ পরীক্ষা দিয়ে পার্থক্যটা বোঝান। টেবিলে এক টুকরো গোশত রেখে একটি কুকুরকে বলা যায়, 'না!' মানে ধরো না। কুকুরটি সাধারণত থেমে যাবে। নেকড়েকে একই কথা বললে সে মানুষের চোখের দিকে তাকিয়ে গোশতের খণ্ডটি নিয়ে যাবে। এই দৃশ্য বিরানি একাধিকবার দেখেছেন। নেকড়ে যেন মানুষের নিষেধ বুঝতে পারে, কিন্তু তা মানার প্রয়োজন বোধ করে না। 'একটা বড় মাংসাশী প্রাণী যদি তোমার সঙ্গে থাকে এবং এভাবে আচরণ করে, সেটা চলবে না,' বলেন তিনি। 'তুমি এমন প্রাণী চাও, যে কুকুরের মতো। যে "না" শুনে থেমে যাবে।'

ধারণা করা হয় যে, বর্তমানে আমাদের পরিচিত সব কুকুরই নেকড়ের এমন এক প্রজাতি থেকে বিবর্তিত হয়ে এসেছে যা এখন বিলুপ্ত।

কুকুরের এই আনুগত্যের পেছনে তাদের সামাজিক কাঠামোরও ভূমিকা থাকতে পারে। গবেষকেরা দেখেছেন, নেকড়ের দল তুলনামূলকভাবে সমতাভিত্তিক। প্রভাবশালী নেকড়ে দাঁত বের করে গর্জালেও নিচের সারির নেকড়ে খাবার ছেড়ে সরে যায় না। তারা পাশাপাশি খেতে পারে। কুকুরের দল অন্য রকম। সেখানে কর্তৃত্ব অনেক বেশি কঠোর। অধস্তন কুকুর সাধারণত প্রভাবশালী কুকুরের সঙ্গে একই সময়ে খেতে যায় না। মানুষকে কোনো কাজে সাহায্য করার ক্ষেত্রেও কুকুর যেন অপেক্ষা করে—কী করতে হবে, মানুষ বলুক।

কিন্তু স্বাধীনচেতা, নিজের সিদ্ধান্তে চলা নেকড়ে কীভাবে এমন প্রাণীতে পরিণত হলো, যে মানুষের নির্দেশের অপেক্ষায় থাকে? আর এই পরিবর্তনে প্রাচীন মানুষের ভূমিকা কী ছিল? বিরানির নিজেরও সহজ কোনো উত্তর নেই। মানুষ কীভাবে এই কাজটি করেছিল, তা তিনি বারবার কল্পনা করার চেষ্টা করেন। কিন্তু সেই প্রথম রূপান্তরের দৃশ্যটি যতবারই মনে আনতে চান, ততবারই তা তাঁর কল্পনার আড়ালে মিলিয়ে যায়।

কুকুরের উৎপত্তির রহস্য এ কারণেই অন্য গৃহপালিত প্রাণীর চেয়ে বেশি জটিল। ভেড়া, গরু, মুরগি কিংবা গিনিপিগের ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীরা মোটামুটি জানেন কখন, কোথায় এবং কেন মানুষ তাদের গৃহে পালন করতে শুরু করেছিল। মানুষের প্রয়োজন ছিল খাবার হাতের কাছে রাখা। কিন্তু কুকুরের ক্ষেত্রে সেই যুক্তি খাটে না। কেন মানুষ একটি বড় বন্য মাংসাশী প্রাণীকে নিজের বসতির কাছে আসতে দিল? কেন তাকে খেদিয়ে না দিয়ে কাছে টেনে নিল? কুকুরই তো ছিল মানুষের প্রথম গৃহপালিত প্রাণী।

তবু গত কয়েক বছরে রহস্যের কিছু কিছু দরজা খুলেছে। বিজ্ঞানীরা এখন প্রায় নিশ্চিত যে কুকুর আজকের ধূসর নেকড়ের বংশধর নয়। তারা এসেছে এমন এক নেকড়ের বংশ থেকে, সে নেকড়ের বংশ লোপ পেয়েছে। আরও নিশ্চিত হওয়া গেছে, এই রূপান্তর কৃষির পরে নয়, তার আগেই শুরু হয়েছিল। মানুষ সে সময় শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করে। সে ছিল শিকারি-সংগ্রাহক।

ঠিক কখন, কোথায় এবং একবারেই এই পরিবর্তন ঘটেছিল কি না, তা এখনো জানা যায়নি। আগের গবেষণাগুলোও একমত ছিল না। ১৯৯৭ সালের একটি জিনগত গবেষণা কুকুরের গৃহপালনের বয়স প্রায় ১ লাখ ৩৫ হাজার বছর বলে মনে করেছিল। পরে একই দলের গবেষকেরা উৎপত্তিস্থল হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের কথা বলেন। ২০০৯ সালে ১,৫০০ আধুনিক কুকুরের ডিএনএ বিশ্লেষণ করে বলা হয়, গৃহপালন শুরু হয়েছিল দক্ষিণ চীনে, ১৬,৩০০ বছরেরও কম আগে। ২০১৩ সালের আরেক গবেষণা প্রাচীন ও আধুনিক কুকুর-নেকড়ের মাইটোকন্ড্রিয়াল জিনোম তুলনা করে উৎপত্তি ইউরোপে, ৩২ হাজার থেকে ১৯ হাজার বছর আগে বলে।

অক্সফোর্ডের বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানী গ্রেগার লারসনের মতে, এসব গবেষণার সীমাবদ্ধতা ছিল আধুনিক কুকুরের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা। মানুষ হাজার হাজার বছর ধরে কুকুরকে পৃথিবীর এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে নিয়ে গেছে এবং তাদের মধ্যে প্রজনন ঘটিয়েছে। ফলে কোন অঞ্চলে তাদের গৃহপালন শুরু হয়েছিল, সেই পুরোনো জিনগত চিহ্ন অনেক আগেই মুছে গেছে। নেকড়ের ক্ষেত্রেও সমস্যা আরও বড়। তারা পৃথিবীর বিশাল অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ভেড়া বা মুরগির পূর্বপুরুষেরা তুলনামূলক ছোট এলাকায় বাস করত বলে তাদের উৎপত্তি খুঁজে পাওয়া সহজ।

বিজ্ঞানীদের ধারণা, কুকুর তৈরিতে হয়তো ভৌগোলিকভাবে দূরে থাকা নেকড়ের একাধিক গোষ্ঠীর অবদান ছিল। অর্থাৎ কুকুরের গৃহপালন হয়তো পৃথিবীর একটিমাত্র জায়গায়, একবারেই ঘটেনি। শূকরও দুবার গৃহপালিত হয়েছিল—একবার নিকটপ্রাচ্যে, আরেকবার ইউরোপে। কুকুরের ক্ষেত্রেও তেমন কিছু ঘটেছিল কি না, তার ইঙ্গিত মিলছে বেলজিয়াম, চেক প্রজাতন্ত্র ও দক্ষিণ-পশ্চিম সাইবেরিয়ায় পাওয়া কিছু রহস্যময় জীবাশ্মে। এগুলোর বয়স ৩৩-৩৬ হাজার বছর। তাদের শরীরে নেকড়ে ও কুকুর—দুইয়েরই বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। ফলে প্রশ্ন উঠছে, এগুলো কি নেকড়েকে কুকুরে পরিণত করার অন্তত তিনটি আলাদা প্রাচীন প্রচেষ্টার চিহ্ন? তবে শুধু হাড়ের গড়ন দেখে সেই প্রশ্নের নিশ্চিত উত্তর দেওয়া যায় না। এই প্রাণীগুলোই শেষ পর্যন্ত আজকের কুকুরের পূর্বপুরুষ কি না, তা জানতে হলে তাদের জিনগত সূত্রও খুঁজে দেখতে হবে।

এই রহস্যের সমাধানে লারসন ও তাঁর সহকর্মীরা পৃথিবীর নানা প্রান্তের হাজার হাজার প্রাচীন ও আধুনিক কুকুর-নেকড়ের ডিএনএ বিশ্লেষণ করছেন। পাশাপাশি ব্যবহার করছেন জ্যামিতিক মরফোমেট্রিক্স—হাড়ের গড়নকে সংখ্যায় প্রকাশ করে বিভিন্ন প্রাণীর শারীরিক বৈশিষ্ট্য তুলনা করার একটি পদ্ধতি। এত দিন কুকুর আর নেকড়েকে আলাদা করার সময় গবেষকেরা মূলত মুখের আগার দৈর্ঘ্য এবং ক্যানাইন দাঁতের আকারের দিকে তাকাতেন। ক্যানাইন নামটির মধ্যেই অবশ্য কুকুরের গল্প লুকিয়ে আছে। শব্দটি এসেছে লাতিন ক্যানিস থেকে, যার অর্থ কুকুর। তাই ক্যানাইন দাঁত বলতে মূলত কুকুরের দাঁতের মতো দেখতে সেই লম্বা, ধারালো দাঁতকেই বোঝানো হয়—বাংলায় যাকে বলা যায় শ্বদন্ত। কুকুরের মুখ সাধারণত নেকড়ের চেয়ে ছোট, শ্বদন্তও তুলনামূলক ছোট এবং দাঁতগুলো মুখের ভেতর বেশি ঘনভাবে সাজানো। কিন্তু শুধু এই কয়েকটি বৈশিষ্ট্য দিয়ে হাজার হাজার বছরের পুরোনো কোনো প্রাণী কুকুরের পূর্বপুরুষ কি না, তা সব সময় নিশ্চিত হওয়া যায় না। নতুন জ্যামিতিক পদ্ধতিটি তাই হাড়ের আরও সূক্ষ্ম বাঁক, গড়ন ও অনুপাত মেপে এমন পার্থক্য খুঁজবে, যা চোখে সহজে ধরা পড়ে না। এর ফলে কুকুরের গৃহপালনের ইতিহাসের ছবিটিও আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে।

মানুষের সঙ্গে কুকুরের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক কখন শুরু হয়েছিল, সে প্রশ্নে অবশ্য একটি উত্তর এখন অনেকটাই পরিষ্কার। কুকুরের গৃহপালন কৃষিবিপ্লবের আগেই ঘটেছিল। মানুষ তখনো শিকারি-সংগ্রাহক। সময়টা আনুমানিক ১৮,৮০০ থেকে ৩২ হাজার বছর আগে। কৃষির বড় আকারের সূচনা হয়েছিল প্রায় ১২ হাজার বছর আগে মধ্যপ্রাচ্যে।

কিন্তু এখানেই নতুন প্রশ্ন: শিকারি-সংগ্রাহকেরা কীভাবে নেকড়েকে কুকুর বানাল? নাকি তারাই কিছু করেনি? প্রথম দিককার কুকুর, যারা তখন কুকুরের চেয়ে নেকড়ের সঙ্গেই বেশি মিল, নিজেরাই কি মানুষের কাছে এসেছিল?

আধুনিক মানুষ আফ্রিকা থেকে ইউরোপে পৌঁছেছিল প্রায় ৪৫ হাজার বছর আগে। তখন সেখানে ধূসর নেকড়ে ছাড়াও আরও কয়েক ধরনের নেকড়ে ছিল। তাদের মধ্যে এমন নেকড়েও ছিল, যারা ম্যামথের মতো বিশাল প্রাণী শিকার করত। নেকড়েরা তখন পৃথিবীর অন্যতম সফল ও অভিযোজনক্ষম ক্যানিড। তুন্দ্রা, তৃণভূমি, মরুভূমি, বন, উপকূল—প্রায় সব ধরনের পরিবেশেই তারা টিকে ছিল। আর মানুষ ও নেকড়ের প্রতিযোগিতাও ছিল তীব্র। দুজনেরই শিকার ছিল ম্যামথ, হরিণ, অরক্স, লোমশ গণ্ডার, অ্যান্টিলোপ ও ঘোড়া।

তবু কোনো এক নেকড়ে-গোষ্ঠী মানুষের কাছাকাছি থাকতে শুরু করেছিল। প্রথমে হয়তো কারণটা ছিল খুব সাধারণ—খাবার।

লারসনের ধারণা, মানুষ ইচ্ছা করে নেকড়েকে পোষ মানায়নি, অন্তত শুরুতে নয়। নেকড়েরাই হয়তো মানুষের শিবির অনুসরণ করতে শুরু করেছিল। যেমন পিঁপড়ে খাবারের গন্ধে রান্নাঘরে ঢোকে, তেমনি নেকড়ে মানুষের ফেলে দেওয়া খাবারের কাছে আসত। মানুষের ভয় ধীরে ধীরে কমেছে, নেকড়ের ভয়ও। একসময় তৈরি হয়েছে পারস্পরিক সুবিধার সম্পর্ক। নেকড়ে শিকার খুঁজে দিতে পারে, মানুষ শিকারের গোশতের ভাগ দিতে পারে।

নোভোসিবির্স্কের রুপালি শেয়ালের দীর্ঘ পরীক্ষাও এই ধারণাকে কিছুটা সমর্থন করে। শুধু মানুষের প্রতি কম ভয় পাওয়া শেয়াল বেছে নিয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্ম প্রজনন করানো হয়েছিল। পরে এমন শেয়াল তৈরি হয়, যারা মানুষ দেখলে খাঁচার পেছনে লুকিয়ে থাকে না; বরং ছুটে এসে মানুষকে অভ্যর্থনা জানায়। হয়তো নেকড়ের ক্ষেত্রেও ভয় কমে যাওয়াই ছিল প্রথম পরিবর্তন।

কিন্তু প্রেডমোস্তির প্রায় ২৭ হাজার বছরের পুরোনো বসতির হাড়গুলো এই গল্পে অস্বস্তিকর প্রশ্ন তোলে। সেখানে পাওয়া কয়েকটি ক্যানিডের খুলি নেকড়ের মতো নয়। তাদের মুখের আগা ছোট, মস্তিষ্ক থাকার অংশটুকু চওড়া এবং দাঁত ঘন। এগুলো গৃহপালনের প্রথম শারীরিক লক্ষণ হতে পারে। কিন্তু তারা ম্যামথের গোশত খেত না, যদিও মানুষ তখন ম্যামথই খাচ্ছিল। হাড়ের রাসায়নিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, তারা খেত রেইনডিয়ার। তাদের দাঁত ভাঙা, মুখে গুরুতর আঘাতের চিহ্নও ছিল। অনেক ক্ষত পরে শুকিয়েছিল।

জীবাশ্মবিদ মিয়েটজে জার্মঁপ্রে তাই অন্য একটি দৃশ্য কল্পনা করেন। মানুষ হয়তো প্রাপ্তবয়স্ক নেকড়েকে মেরে তাদের শাবক ধরে শিবিরে আনত। প্রাণীগুলোকে বেঁধে রাখা হতো, মানুষের না-খাওয়া খাবার খাওয়ানো হতো, এমনকি প্রজননও করানো হতো। উদ্দেশ্য ছিল আচার-অনুষ্ঠানে বলি দেওয়ার জন্য প্রাণী প্রস্তুত রাখা। ম্যামথের হাড়ে ক্যানিডের দাঁতের চিহ্ন না থাকাও ইঙ্গিত দেয়, তারা মানুষের ফেলে দেওয়া খাবারের সন্ধানে স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়াত না।

প্রেডমোস্তিতে একটি কুকুরের খুলির দাঁতের মধ্যে মৃত্যুর পর সম্ভবত ম্যামথের হাড়ের টুকরো ঢুকিয়ে চোয়াল বন্ধ করে রাখা হয়েছিল। জার্মঁপ্রের ধারণা, এর সঙ্গে শিকার বা পরজীবনের কোনো আচার জড়িত ছিল। একটি শিশুর কঙ্কালের কাছেও কুকুরের নিচের চোয়াল পাওয়া গেছে। অর্থাৎ প্রাণীগুলো মানুষের কাছে কোনো না কোনো বিশেষ অর্থ বহন করত।

যাযাবর জাতি এখনও ভেড়ার পাল পাহারায় কুকুরকে বিশ্বস্ত মনে করে।

তবে প্রেডমোস্তির প্রাণীদের সবাই কুকুর বলে মানেন না। কেউ কেউ  তাদের 'উলফ-ডগ' বলেন। কেউ কেউ বলেন নেকড়ে। তাদের শারীরিক গড়ন ও জিনগত পরিচয় এখনো নিশ্চিত নয়। জার্মঁপ্রে অবশ্য তাদের 'প্যালিওলিথিক কুকুর' বলতে চান। তাঁর মতে, মানুষের সঙ্গে তাদের কোনো ধরনের সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সেটি বন্ধুত্বের ছিল না। 'সেই সম্পর্ক পরে এসেছে।'

সেই 'পরে'র গল্পটাই কুকুরের বিবর্তনে বড় মোড়।

প্রায় ১৪ হাজার বছর আগের জার্মানির বন-ওবারকাসেল থেকে পাওয়া একটি প্রাণী এখন পর্যন্ত সবচেয়ে পুরোনো নির্দ্বিধায় স্বীকৃত কুকুর। তার কঙ্কাল পাওয়া গিয়েছিল প্রায় ৫০ বছর বয়সী এক পুরুষ ও ২০ থেকে ২৫ বছর বয়সী এক নারীর কবরের সাথে। মানুষ তখন কুকুরকে শুধু ব্যবহারযোগ্য প্রাণী হিসেবে দেখছিল না। তাকে পরিবারের সদস্য হিসেবেও দেখা শুরু হয়েছিল।

ফিলিস্তিনের আইন মালাহার প্রায় ১২ হাজার বছরের পুরোনো এক শিকারি-সংগ্রাহক বসতিতে পাওয়া সমাধি সম্পর্কটিকে আরও স্পষ্ট করে। এক বৃদ্ধ মানুষের কঙ্কাল কাত হয়ে শুয়ে আছে। তার বাঁ হাতের নিচে মাথা, হাতটি আলতো করে রাখা একটি চার-পাঁচ মাস বয়সী কুকুরছানার ওপর। প্রেডমোস্তির প্রাণীদের মতো এই কুকুরছানার শরীরে আঘাতের চিহ্ন নেই। মনে হয়, তাকে সযত্নেই মানুষের পাশে শোয়ানো হয়েছিল।

এ ধরনের মানব-কুকুর সমাধি তখনো বিরল। কিন্তু প্রায় ১০ হাজার বছর আগে কুকুরকে কবর দেওয়ার রীতি দ্রুত বাড়তে থাকে। অন্য কোনো প্রাণীকে মানুষ এত নিয়মিতভাবে নিজেদের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার অংশ করেনি। মানুষের চোখে কুকুরের অবস্থান বদলে গিয়েছিল। সম্ভবত এই সময়েই কুকুর মানুষের সামাজিক সংকেত পড়ার বিশেষ দক্ষতা অর্জন করছিল। মুখের অভিব্যক্তি বোঝা, আঙুলের ইশারা অনুসরণ করা, চোখে চোখ রাখা। মানুষের সঙ্গে চোখে চোখ রাখলে কুকুর ও মালিক—দুজনের শরীরেই বাড়ে অক্সিটোসিন, ভালোবাসার সঙ্গে যুক্ত হরমোন।

মানুষের শিকারের ধরনও তখন বদলাচ্ছিল। খোলা প্রান্তরে ম্যামথ শিকারে কুকুরের বিশেষ প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু মানুষ যখন ঘন বনে হরিণ ও বুনো শূকরের মতো ছোট শিকার ধরতে শুরু করল। কুকুর হয়ে উঠল অসাধারণ সহকারী। অন্তত ১৫ হাজার বছর আগে, সম্ভবত তারও আগে, ইউরোপ, এশিয়া ও আমেরিকার শিকারি-সংগ্রাহকেরা বেঁচে থাকার জন্য কুকুরের শিকারি দক্ষতার ওপর নির্ভর করতে শুরু করে। কুকুর তাজা পায়ের ছাপ খুঁজে পেত, শিকারির পথ দেখাত, শিকারকে আটকে রাখত।

তখনই মানুষ তাদের অন্য চোখে দেখতে শুরু করে। এবং কুকুরের কবরগুলো ছিল বলি বা নিছক আচার নয়; ছিল শ্রদ্ধার সমাধি। কুকুরের সাথে রাখা হতো গেরুয়া, পাথরের ফলক, ছুরি—শিকারের সরঞ্জাম।

সুইডেনের স্কেটেহলমে প্রায় সাত হাজার বছরের পুরোনো একটি কবর এই সম্পর্কের অসাধারণ উদাহরণ। সেখানে বহু মানুষের সঙ্গে কয়েকটি কুকুরকে কবর দেওয়া হয়েছিল। একটি কুকুরকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছিল। তাকে কাত করে শোয়ানো, কোমরের কাছে চকমকি পাথরের টুকরো, পাশে লাল হরিণের শিং ও খোদাই করা পাথরের হাতুড়ি, শরীরে লাল গেরুয়া। কেন তাকে এত সম্মান দেওয়া হয়েছিল জানা নেই। তবে সম্ভবত সে ছিল অসাধারণ শিকারি এবং কুকুরটি লালন-পালন করা মানুষটি পোষা প্রাণীর মৃত্যুতে শোক করেছিল।

কুকুর তখন শুধু শিকারের সঙ্গী নয়, পাহারাদারও। প্রায় আট হাজার বছর আগে ডেনমার্কের এক বসতিতে তিন আকারের কুকুর পাওয়া গেছে—ছোট, মাঝারি ও বড়। মাঝারিগুলো শিকারি কুকুরের মতো গড়নের। বড়গুলো গ্রিনল্যান্ডের স্লেজ কুকুরের আকারের, প্রায় ৭০ পাউন্ড ওজনের; সম্ভবত বোঝা টানা ও বহনের কাজে ব্যবহৃত হতো। সব কুকুরই আবার ঘেউ ঘেউ করে শিবির পাহারা দিতে পারত।

তারপর এল কৃষি। আর কৃষির সঙ্গে কুকুরের ভাগ্য আবার বদলে গেল।

শিকারি-সংগ্রাহকদের সমাজে যেখানে কুকুরের অসংখ্য সমাধি পাওয়া যায়, প্রাচীন কৃষিভিত্তিক বসতিতে সেই সমাধি প্রায় অদৃশ্য। পেরির ভাষায়, পার্থক্যটা খুবই স্পষ্ট। কৃষির বিস্তারের সঙ্গে কুকুর আর আগের মতো প্রয়োজনীয় থাকল না। অনেক জায়গায় মানুষ তাদের খেতেও শুরু করল।

কুকুরের সাথে আমাদের সম্পর্ক হাজার হাজার বছরের। সবচেয়ে প্রাচীন বলে প্রমাণিত কুকুরের জীবাশ্মটি ১৪,০০০ বছরেরও বেশি পুরোনো বলে ধারণা করা হয়। এখানে, একটি পাথরের কফিনের গায়ে আঁকা ছবিতে দেখা যাচ্ছে, একজন মানুষ তার কুকুরকে নিয়ে যাচ্ছেন।

তবে সব কৃষিজীবী সমাজই কুকুর-খাদকে পরিণত হয়নি। যারা পশুপালন করত, তারা কুকুরকে পাল পাহারা দেওয়ার কাজে ব্যবহার করত। দক্ষ কুকুরের মর্যাদাও থাকত মৃত্যুর পর। ২০০৬ সালে পেরুর লিমার কাছে এক হাজার বছরের পুরোনো এক সমাধিক্ষেত্রে মানুষের কবরের পাশে ৮০টি মমি-করা কুকুর পাওয়া যায়। তারা চিরিবায়া জনগোষ্ঠীর লামা পাহারা দিত। প্রায় ৩০টি কুকুর সূক্ষ্ম লামার পশমের কম্বলে জড়ানো ছিল। তাদের মুখের কাছে রাখা ছিল লামা ও মাছের হাড়। শুষ্ক আবহাওয়ায় তাদের লোম ও দেহাবশেষও সংরক্ষিত হয়েছিল। দেখতে তারা আজকের লিমার ছোট রাস্তার কুকুরগুলোর মতো। তবে তাদের সঙ্গে আধুনিক কুকুরের সরাসরি বংশগত সম্পর্ক নেই।

লারসন ও তাঁর সহকর্মীরা এসব প্রাচীন কুকুরের হাড় ও ডিএনএও পরীক্ষা করছেন। কারণ, ইউরোপ বা এশিয়ার প্রাচীন কুকুর থেকে আমেরিকার প্রাচীন কুকুরদের বংশধারা অনুসরণ করলে বোঝা যেতে পারে, কুকুর গৃহপালনের ঘটনা একবার ঘটেছিল, নাকি একাধিকবার। এখন পর্যন্ত তাঁরা ৩,০০০-এর বেশি নেকড়ে, কুকুর এবং মাঝামাঝি বৈশিষ্ট্যের অন্যান্য ক্যানিডের নমুনা বিশ্লেষণ করেছেন। বিশ্বের ৫০ জনের বেশি বিজ্ঞানী এই কাজে মগ্ন হয়ে আছেন।

হয়তো খুব শিগগির জানা যাবে, কোথায় এবং কখন নেকড়ে কুকুরের পথে যাত্রা শুরু করেছিল। লারসনের আশা, গবেষকেরা উত্তরের খুব কাছাকাছি পৌঁছে যাবেন। কিন্তু 'কীভাবে'—এই প্রশ্নটির উত্তর হয়তো তখনো পুরোপুরি পাওয়া যাবে না।

কারণ, নেকড়ে এক সকালে ঘুম থেকে উঠে কুকুর হয়ে যায়নি। তার রূপান্তরের কোনো নির্দিষ্ট সকাল ছিল না। কোনো একক মুহূর্তও ছিল না। যেদিকে আঙুল তুলে বলা যায়—এইখানেই নেকড়ের শেষ। কুকুরের শুরু। 'নেকড়ের হলো শেষ, কুকুরের হলো শুরু'।

কুকুরের শরীর বদলেছে ধীরে ধীরে। স্বভাব বদলেছে আরও ধীরে। মানুষের সঙ্গে তার সম্পর্কও বদলেছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে। কোথাও সে হয়তো মানুষের ফেলে দেওয়া খাবারের গন্ধে শিবিরের কাছে এসেছিল। দূরে দাঁড়িয়ে মানুষের গতিবিধি দেখেছিল। তারপর একদিন আরও কাছে এসেছিল। কোথাও হয়তো মানুষই তাকে ধরে এনেছিল, তার শাবককে তুলে নিয়েছিল নিজের বসতিতে। কোনো প্রাণীকে বেঁধে রাখা হয়েছে, কোনো প্রাণীকে মানুষের খাবার দেওয়া হয়েছে, কোনো প্রাণী হয়তো মানুষের আচার-অনুষ্ঠানে বলি হয়েছে। আবার হাজার হাজার বছর পরে অন্য কোনো কুকুরকে দেখা গেছে মানুষের মৃতদেহের পাশে শুয়ে থাকতে। কোথাও সে শিকারসঙ্গী হয়েছে, কোথাও পাহারাদার, কোথাও বোঝা বহনের সহকারী। মানুষ তার নাকের ওপর ভরসা করেছে, তার পায়ের ছাপ অনুসরণ করেছে, তার ঘেউ ঘেউ শুনে বিপদের আভাস পেয়েছে। ধীরে ধীরে মানুষ শুধু তার শরীরকে নয়, তার আচরণকেও বদলে দিয়েছে। আর কুকুরও মানুষকে পড়তে শিখেছে। তার মুখের অভিব্যক্তি বুঝতে শিখেছে। আঙুলের ইশারা অনুসরণ করতে শিখেছে। চোখে চোখ রাখতে শিখেছে। শেষ পর্যন্ত এমন এক প্রাণীতে পরিণত হয়েছে, যে মানুষের সবচেয়ে ছোট অথচ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশটিও বোঝে—'না'। নিষেধ সে বুঝে এবং মান্য করে।

কাফকার গ্রেগর সামসার মতো এখানে কোনো এক সকালে চূড়ান্ত রূপান্তর ঘটেনি। এই মেটামরফোসিস ছিল ধীর, প্রায় অদৃশ্য। এমন ধীর যে যারা সেই পরিবর্তনের অংশ ছিল, তারাও হয়তো বুঝতে পারেনি তারা ইতিহাসের একটি নতুন সম্পর্ক তৈরি করছে। প্রথম যে নেকড়েটি মানুষের শিবিরের পাশে এসে খাবার খুঁজেছিল, সে জানত না তার বহু দূরের বংশধরেরা একদিন মানুষের ঘরের দরজায় বসে থাকবে। যে শিকারি হয়তো কোনো নেকড়ের শাবককে ধরে নিজের শিবিরে এনেছিল, সে-ও জানত না সেই বন্দী প্রাণীর বহু প্রজন্ম পরে মানুষ কুকুরের জন্য আলাদা কবর খুঁড়বে। যে মানুষ একসময় নেকড়েকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখত, একদিন সেই মানুষই তার ওপর শিকারের সাফল্য নির্ভর করবে। তার মৃত্যুতে শোক করবে। তাকে নিজের মৃতদের পাশে শুইয়ে দেবে। অর্থাৎ এই পরিবর্তন একমুখীও ছিল না। নেকড়ে কুকুর হয়েছে, কিন্তু তাকে কুকুর বানাতে গিয়ে মানুষও বদলেছে। মানুষ শিখেছে অন্য একটি প্রজাতির সঙ্গে বসবাস করতে। তার সংকেত বুঝতে। তার ক্ষমতার ওপর নির্ভর করতে। তাকে আদেশ করতে, আবার তার ইশারাও অনুসরণ করতে। একসময় যে প্রাণী মানুষের কাছ থেকে খাবার চুরি করত, সে-ই পরে মানুষের সঙ্গে খাবার ভাগ করেছে। যে প্রাণী মানুষের শিকারের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল, সে-ই পরে শিকার খুঁজে দিতে সাহায্য করেছে। আর যে প্রাণী একদিন মানুষের জন্য বিপদের প্রতীক ছিল, তার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে মানুষ একসময় শোক করেছে।

হয়তো কুকুরের সবচেয়ে বড় রহস্য এখানেই। বিজ্ঞান একদিন হয়তো আরও অনেক উত্তর দেবে। গবেষকেরা হয়তো প্রাচীন ডিএনএ মিলিয়ে বলতে পারবেন, কুকুরের পূর্বপুরুষ কোন বিলুপ্ত নেকড়ে ছিল। হাজার হাজার হাড়ের গড়ন বিশ্লেষণ করে হয়তো নির্ধারণ করতে পারবেন, কোথায় প্রথম পরিবর্তনের চিহ্ন দেখা দিয়েছিল। একাধিক গোষ্ঠী থেকে কুকুরের জন্ম হয়েছিল, নাকি একটি নির্দিষ্ট জায়গা থেকেই সেই যাত্রা শুরু হয়েছিল—সেটিও হয়তো জানা যাবে। এমনকি কোন সময়ের মধ্যে এই রূপান্তর ঘটেছিল, তার সীমাও আরও স্পষ্ট হবে। কিন্তু তারপরও একটি প্রশ্ন থেকে যেতে পারে। সেই প্রথম মুহূর্তে কী ঘটেছিল? কে কাকে বেছে নিয়েছিল—মানুষ নেকড়েকে, নাকি নেকড়ে মানুষকে?

তাই কুকুরের জন্ম শুধু একটি বন্য প্রাণীর গৃহপালিত হয়ে ওঠার গল্প নয়। এটি দুই প্রজাতির দীর্ঘ মেটামরফোসিস। এখানে কোনো এক সকালে শরীর বদলে যায়নি। বদলেছে সম্পর্ক। বদলেছে আচরণ। বদলেছে প্রয়োজন। বদলেছে বিশ্বাস। আর শেষ পর্যন্ত বদলে গেছে দুজনেই। নেকড়ে কুকুর হয়েছে। কিন্তু সেই রূপান্তরের শেষে মানুষও আর আগের মানুষটি থাকেনি।

সূত্র: সায়েন্টিফিক আমেরিকান 

Related Topics

টপ নিউজ

ইজেল / নেকড়ে / নেকড়ে সদৃশ কুকুর / কুকুর / ফ্রানৎস কাফকা / প্রাণী

Comments

While most comments will be posted if they are on-topic and not abusive, moderation decisions are subjective. Published comments are readers’ own views and The Business Standard does not endorse any of the readers’ comments.

MOST VIEWED

  • রবি মোবাইল নেটওয়ার্ক টাওয়ার। ছবি: সংগৃহীত
    দেশব্যাপী ৪জি নেটওয়ার্ক আধুনিকায়ন সম্পন্ন করল রবি
  • ছবি: সংগৃহীত
    পাটের পর এবার বাংলাদেশি পিইটি আমদানিতে অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরোপের উদ্যোগ ভারতের; টনপ্রতি ২১৮ ডলার পর্যন্ত নেওয়ার সুপারিশ
  • অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। স্কেচ: টিবিএস
    এক বছরের মধ্যে শেয়ারবাজারের চেহারা বদলে যাবে: অর্থমন্ত্রী
  • ফাইল ছবি: সংগৃহীত
    গাজীপুর নয়, ঢাকার তাঁতীবাজার থেকে পালিয়েছিলেন ‘পিচ্চি রাজা’, দুই পুলিশ গ্রেপ্তার
  • শাল গাছ থেকে গুবরে পোকা সংগ্রহ করা হচ্ছে। ছবি: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস
    বন বাঁচাতে ১ লাখ ৪০ হাজার গাছ কেটে ফেলছে ভারত—কারণ কী?
  • ইলাস্ট্রেশন: টিবিএস
    চট্টগ্রাম বিমানবন্দরকে আঞ্চলিক এভিয়েশন হাবে পরিণত করতে ৩০০ মিলিয়ন ডলারের ফাস্ট-ট্র্যাক প্রকল্পের উদ্যোগ সরকারের

Related News

  • দেহভাষায়ও লাগে ভ্রু-পল্লবের দোলা
  • বডি ল্যাঙ্গুয়েজ বা দেহভাষার বিজ্ঞান ও আধুনিক মানুষের আগমন বৃত্তান্ত 
  • একই মানসিক যন্ত্রণায় ঋত্বিক ঘটক ও বিনয় মজুমদার
  • কবি নজরুলের ৫০ বছর ধরে বাক্সবন্দী ছবি, প্রথম প্রকাশ্যে এল টিবিএসের হাত ধরে
  • মানুষের মডেলের বদলে কেন ফুল আঁকতেন ভ্যান গঘ?

Most Read

1
রবি মোবাইল নেটওয়ার্ক টাওয়ার। ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশ

দেশব্যাপী ৪জি নেটওয়ার্ক আধুনিকায়ন সম্পন্ন করল রবি

2
ছবি: সংগৃহীত
আন্তর্জাতিক

পাটের পর এবার বাংলাদেশি পিইটি আমদানিতে অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরোপের উদ্যোগ ভারতের; টনপ্রতি ২১৮ ডলার পর্যন্ত নেওয়ার সুপারিশ

3
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। স্কেচ: টিবিএস
অর্থনীতি

এক বছরের মধ্যে শেয়ারবাজারের চেহারা বদলে যাবে: অর্থমন্ত্রী

4
ফাইল ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশ

গাজীপুর নয়, ঢাকার তাঁতীবাজার থেকে পালিয়েছিলেন ‘পিচ্চি রাজা’, দুই পুলিশ গ্রেপ্তার

5
শাল গাছ থেকে গুবরে পোকা সংগ্রহ করা হচ্ছে। ছবি: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস
আন্তর্জাতিক

বন বাঁচাতে ১ লাখ ৪০ হাজার গাছ কেটে ফেলছে ভারত—কারণ কী?

6
ইলাস্ট্রেশন: টিবিএস
বাংলাদেশ

চট্টগ্রাম বিমানবন্দরকে আঞ্চলিক এভিয়েশন হাবে পরিণত করতে ৩০০ মিলিয়ন ডলারের ফাস্ট-ট্র্যাক প্রকল্পের উদ্যোগ সরকারের

The Business Standard
Top

Contact Us

The Business Standard

Main Office -4/A, Eskaton Garden, Dhaka- 1000

Phone: +8801847 416158 - 59

Send Opinion articles to - oped.tbs@gmail.com

For advertisement- sales@tbsnews.net

Copyright © 2022 THE BUSINESS STANDARD All rights reserved. Technical Partner: RSI Lab