মানুষের মডেলের বদলে কেন ফুল আঁকতেন ভ্যান গঘ?
১৮৮৬ সালের এক গ্রীষ্ম। প্যারিসের একটি ভাড়া ফ্ল্যাটে ছোট ভাই থিওর সঙ্গে থাকতেন ডাচ চিত্রশিল্পী ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ। থিও তখন আন্তর্জাতিক শিল্পকর্ম বিপণন প্রতিষ্ঠান 'বুসো, ভ্যালাদোঁ অ্যান্ড সি'তে কাজ করছেন। সেই গ্রীষ্মেই ভ্যান গঘের ছবিতে এল এক বড় পরিবর্তন। যেন হঠাৎ করেই তিনি আবিষ্কার করলেন রঙের এক নতুন জগৎ। ফুলদানিতে সাজানো সাধারণ সব ফুলকে বিষয় করে একের পর এক আঁকলেন ৩৫টি স্থিরচিত্র। ক্যানভাসে সেই ফুলগুলো ধরা দিল উজ্জ্বল, তীব্র আর প্রাণবন্ত রঙে—যেখানে প্রতিটি পাপড়িই যেন নিজস্ব আলোয় জ্বলছে।
ফুলের এই সাধারণ ছবিগুলোই কিন্তু ভ্যান গঘের পুরো জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। ফুল আঁকতে আঁকতেই তিনি রঙের এমন এক জাদুকরী ব্যবহার রপ্ত করেছিলেন, যা পরবর্তী সময়ে তাঁকে 'স্টারি নাইট' কিংবা 'আমন্ড ব্লসম'-এর মতো বিশ্ববিখ্যাত মাস্টারপিসগুলো আঁকার পথ দেখিয়েছিল।
প্যারিসে আসার আগে ভ্যান গঘ বেলজিয়ামের অ্যান্টওয়ার্পের এক আর্ট একাডেমিতে কয়েক মাস কাটিয়েছিলেন। নেদারল্যান্ডসের বাস্তবতাবাদী ঘরানার সেই চেনা নিয়মে তাঁর শিল্পীজীবনের শুরু হলেও তাঁর মন আর সেখানে টিকছিল না। তিনি স্পষ্ট বুঝতে পারছিলেন, শিল্পের নতুন এক দুনিয়া তৈরি হচ্ছে প্যারিসে। সমসাময়িক তরুণ শিল্পীরা কীভাবে কাজ করছেন, তা কাছ থেকে দেখতে আর নিজের একটা আলাদা শৈলী তৈরি করতেই তিনি প্যারিসে আসার সিদ্ধান্ত নেন। এর পেছনে আরেকটি বড় কারণ ছিল শিল্পী ফার্নান্দ কোরমঁর স্টুডিওতে কাজ শেখার তীব্র আগ্রহ।
১৮৮৬ সালের ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে প্যারিসে এসে তিনি কোরমঁর স্টুডিওতে যোগও দেন। তবে বাঁধাধরা সেই নিয়মে তাঁর মন বসেনি; কয়েক সপ্তাহের মাথায় তিনি স্টুডিও ছেড়ে দেন। কিন্তু প্যারিসে আসার সিদ্ধান্তটা তাঁর জীবনে মোটেও বিফলে যায়নি। বরং এখানেই শুরু হয়েছিল ভ্যান গঘের আসল রূপান্তর।
প্যারিস ভ্যান গঘের শিল্পজীবনে এক যুগান্তকারী মোড় এনে দেয়। এখানে এসেই তিনি ক্লদ মনে আর এদগার দেগার মতো শিল্পীদের কাজ প্রথম দেখার সুযোগ পান। তাদের ক্যানভাসে আলো আর উজ্জ্বল রঙের বাহার, ভ্যান গঘকে ছবির সম্পূর্ণ নতুন এক জগতের সন্ধান দেয়। একই সঙ্গে তিনি বুঝতে পারেন, তিনি এত দিন যে বাস্তবতাবাদী ধারার পেছনে ছুটেছেন, আধুনিক দুনিয়ায় তা অনেকটাই সেকেলে হয়ে পড়েছে।
শুধু নতুন ছবি দেখাই নয়, অল্প দিনের মধ্যেই প্যারিসের বেশ কয়েকজন তরুণ ও প্রথাবিরোধী শিল্পীর সঙ্গে তাঁর দারুণ বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। এর মধ্যে ছিলেন পল গগ্যাঁ, অঁরি তুলুজ-লোত্রেক, এমিল বার্নার্ড আর পল সিনিয়াকের মতো প্রতিভাবান সব শিল্পী। ভ্যান গঘ তাদের এই আড্ডাকে নাম দিয়েছিলেন 'পেইন্টার্স অব দ্য পেতিত বুলেভার্ড'। বন্ধুদের প্রত্যেকের কাজের ধরন ও ভাবনা ছিল একেবারেই আলাদা, আর ভ্যান গঘ তাদের সবার কাজ থেকেই একটু একটু করে শিখছিলেন। ঠিক এই সময়েই ইউরোপে ঊনবিংশ শতাব্দীতে বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিল জাপান থেকে আসা কাঠের ব্লকে ছাপা বিশেষ চিত্রকর্ম 'ইউকিয়ো-ই'। ভ্যান গঘের চিত্ররীতি নির্মাণে এই জাপানি প্রিন্টগুলোর প্রভাব ছিল প্রবল।
কিন্তু ইউরোপীয় শিল্পের এমন বৈপ্লবিক আবহে দিন কাটালেও ভ্যান গঘের নিজের জীবনের বাস্তবতা মোটেই রঙিন ছিল না। ভাইয়ের সঙ্গে এক ফ্ল্যাটে থাকায় থাকার খরচটা কোনোমতে চলে যেত ঠিকই, কিন্তু তাঁর কোনো স্থায়ী চাকরি ছিল না। বেঁচে থাকার একমাত্র সম্বল ছিল নিজের আঁকা ছবি বিক্রি করা। তিনি ভেবেছিলেন, প্যারিসের বড় বাজারে হয়তো তাঁর ছবি ভালোই সমাদর পাবে। কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন—প্যারিসের আধুনিক রুচির তুলনায় তাঁর কাজ তখনো ঠিক মানানসই হয়ে ওঠেনি।
সংসারের সব খরচ আর টাকার টানাটানি তাই নিজের কাঁধে তুলে নিলেন ছোট ভাই থিও, আর ভিনসেন্ট তাঁর সমস্ত মন আর সময় ঢেলে দিলেন শুধুই ছবি আঁকার পেছনে। তাঁর খুব ইচ্ছে ছিল মানুষের অবয়বচিত্র বা 'ফিগার পেইন্টিং'-এ হাত পাকানোর। অ্যান্টওয়ার্পের আর্ট একাডেমি আর কোরমঁর স্টুডিওতে মূলত এই মানুষ আঁকা নিয়েই তিনি কাজ করছিলেন। কিন্তু জীবন্ত কোনো মানুষকে মডেল হিসেবে বসিয়ে ছবি আঁকা ছিল বেশ খরচের ব্যাপার।
পকেটে টান থাকায় ভ্যান গঘকে বাধ্য হয়ে অন্য পথ খুঁজতে হলো। আর ঠিক তখনই তাঁর নজর গেল নানা রঙের ফুলের দিকে। ফুল ছিল খুব সহজলভ্য, আর হাতের কাছে পাওয়া এই সাধারণ ফুলগুলোই ভ্যান গঘের জন্য দারুণ কাজের জিনিস হয়ে উঠল—সবচেয়ে বড় কথা, ফুলগুলো শুধু ছবি আঁকার বিষয় ছিল না, ভ্যান গঘের কাছে তা হয়ে উঠেছিল রঙের ব্যাকরণ শেখার এক চমৎকার পাঠশালা।
১৮৮৪ সালের দিকে তিনি শার্ল ব্লাঙ্ক নামের এক লেখকের রঙের বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব নিয়ে লেখা একটি বই পড়েন। সেখানে 'পরিপূরক রঙের' (কমপ্লিমেন্টারি কালারস) দারুণ এক ব্যাখ্যা ছিল। সহজ কথায়, এমন কিছু রং আছে যা পাশাপাশি বসালে একে অপরের উজ্জ্বলতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয় এবং ক্যানভাসে সবচেয়ে তীব্র বৈপরীত্য তৈরি করে। ব্লাঙ্কের বইয়ের একটি রঙের চক্রে (কালার হুইল) মুখোমুখি থাকা এই রংগুলোকে দেখানো হয়েছিল—হলুদের বিপরীতে বেগুনি, লালের বিপরীতে সবুজ আর নীলের বিপরীতে কমলা।
প্যারিসে আসার আগেই রঙের এই নিয়ম ভ্যান গঘের ভাবনার জগৎ ওলটপালট করে দিয়েছিল। ১৮৮৫ সালেই ভাই থিওকে এক চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন, 'রং নিজেই নিজের মধ্যে কিছু প্রকাশ করে।' ফরাসি রোমান্টিক চিত্রশিল্পী ওজেন দ্যলাক্রোয়ার কাজের প্রতি তাঁর গভীর মুগ্ধতা ছিল, কারণ দ্যলাক্রোয়া নিজের ক্যানভাসে এই রঙের তত্ত্ব খুব চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলতেন। রঙের এই নিয়মকানুন ভ্যান গঘ আগে থেকেই জানতেন ঠিকই, কিন্তু প্যারিসে আসার পরই তিনি এসব উজ্জ্বল রংকে নিজের মতো করে ব্যবহার করার সাহস পান।
প্যারিসে বসে রঙের এই তত্ত্ব হাতে-কলমে পরখ করে নেওয়ার জন্য ফুলদানির ফুলগুলোই ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় ভরসা। মডেলের পেছনে ঢালার মতো টাকা নেই, তাই রঙের রসায়ন বুঝতে তিনি ফুল নিয়ে পরীক্ষা চালাতে শুরু করলেন। ১৮৮৬ সালের পুরো গ্রীষ্মকাল জুড়ে ভ্যান গঘ ভীষণ এক উন্মাদনা নিয়ে এই কাজ করেন এবং একে একে ৩৫টি স্থিরচিত্র এঁকে ফেলেন। এই সিরিজের মধ্যে 'ভেস উইথ গ্ল্যাডিওলি অ্যান্ড চায়নিজ অ্যাস্টার্স' এবং 'ভেস উইথ জিনিয়াস অ্যান্ড জেরেনিয়ামস'-এর মতো ছবিগুলো বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কতটা ভালোবাসা আর আগ্রহ নিয়ে তিনি এই ফুলের ছবিগুলো আঁকছিলেন, তা জানা যায় ১৮৮৬ সালের অক্টোবরে লেখা তাঁর একটি চিঠি থেকে:
'আর এখন আমি নিজে কী করছি সে প্রসঙ্গে বলি—মডেলদের পারিশ্রমিক দেওয়ার মতো টাকা আমার ছিল না, থাকলে হয়তো পুরোপুরি অবয়বচিত্র বা ফিগার পেইন্টিংয়েই নিজেকে সঁপে দিতাম। তবে কেবল ফুল—লাল পপি, নীল কর্নফ্লাওয়ার আর মায়োসোটিস এঁকে রঙের একগুচ্ছ অনুশীলন করেছি। সাদা ও গোলাপি গোলাপ, হলুদ চন্দ্রমল্লিকা—কমলার সঙ্গে নীলের, সবুজের সঙ্গে লালের এবং হলুদের সঙ্গে নীলাভ-বেগুনির তীব্র বৈপরীত্য খোঁজার চেষ্টা করেছি; দুই চরম বৈপরীত্যের মাঝে মেলবন্ধন ঘটাতে চেয়েছি ভাঙা ও কোমল রঙের শেড দিয়ে। কোনো ম্যাড়মেড়ে ধূসর নয়, ক্যানভাসে আমি ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছি এক প্রদীপ্ত ও তীব্র রঙের রূপ।'
চিঠিতে ভ্যান গঘ বেশ খোলামেলাভাবেই বুঝিয়েছিলেন তিনি আসলে কী করতে চাইছেন। তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল ক্যানভাসে বিভিন্ন রঙের একটা সুন্দর ভারসাম্য তৈরি করা। লক্ষ করার মতো বিষয় হলো, তিনি কিন্তু নিজের এই কাজগুলোকে স্রেফ ফুলের ছবি বলেননি; সোজাসুজি নাম দিয়েছিলেন 'কালার স্টাডিজ' বা রঙের পাঠ। অর্থাৎ সচেতনভাবেই যে তিনি রঙের ব্যাকরণ নিয়ে পরীক্ষা চালাচ্ছিলেন, তা এখান থেকেই স্পষ্ট বোঝা যায়।
শুধু রঙের মেলবন্ধনই নয়, আঁকার নানা রকম নতুন কৌশল নিয়েও পরীক্ষা চালাচ্ছিলেন তিনি। যেমন তাঁর 'ফ্রিটিলারিস ইন আ কপার ভেস' ছবিটির কথা বলা যায়। এই ছবিতে তিনি তখনকার একেবারে নতুন এক ঘরানা—'পন্তিলিজম' বা বিন্দু বিন্দু রঙের ছোঁয়ায় ছবি আঁকার রীতি ব্যবহার করেন, যার পথিকৃৎ ছিলেন নব্য-ইমপ্রেশনিস্ট শিল্পী জর্জ স্যোরা। ভ্যান গঘ মূলত ছবিটির পটভূমি বা ব্যাকগ্রাউন্ড ফুটিয়ে তুলতে ছোট ছোট বিন্দু আর ড্যাশের এই বিশেষ কৌশল কাজে লাগিয়েছিলেন।
পরিচিত মানুষেরা তখন প্রায়ই ভ্যান গঘকে নানা জাতের ফুল উপহার পাঠাতেন। আর ফুল হাতে পাওয়ামাত্রই তিনি দেরি না করে ক্যানভাসে তা এঁকে ফেলতে বসে যেতেন। বাড়তি কোনো খরচ ছাড়াই ক্যানভাসে নানা রঙের বৈচিত্র্য আর আলোর সাথে তাদের বোঝাপড়া পরখ করে নেওয়ার জন্য এই সাধারণ ফুলগুলোর চেয়ে ভালো উপায় আর কী হতে পারত!
শিল্পবোদ্ধারা আজ একবাক্যে স্বীকার করেন—নেদারল্যান্ডসের শুরুর দিকের সেই বিষণ্ন ও অন্ধকার প্যালেট ছেড়ে ভ্যান গঘ যে পরবর্তী সময়ে পরিণত বয়সের উজ্জ্বল, তীব্র আর জাদুকরী রঙের দুনিয়ায় প্রবেশ করেছিলেন, তার রূপান্তরটা ঘটেছিল মূলত প্যারিসের এই ফুল আঁকার হাত ধরেই।
প্যারিসে ভ্যান গঘের শিল্পশৈলী গড়ে ওঠার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রেখেছিলেন ফরাসি শিল্পী আদলফ মন্তিসেলি। ১৮৮৬ সালের গ্রীষ্মে প্যারিসে মন্টিসেলির কাজ দেখার সুযোগ পান ভ্যান গঘ। আর সেখান থেকেই চিত্রকর্মে ব্রাশ ব্যবহারের এক ভিন্ন পদ্ধতির সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটে।
মন্তিসেলির আঁকার ঢং ছিল কিছুটা রুক্ষ আর তীব্র। তবে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো—তিনি ক্যানভাসে রঙের বেশ পুরু ও ভারী প্রলেপ দিতেন। মন্তিসেলির আঁকা 'ফ্লাওয়ার্স ইন আ ব্লু ভেস' ছবিটি ভ্যান গঘের মনের গভীরে দাগ কাটে। সেখান থেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি তাঁর ফুলের ক্যানভাসগুলোতে রঙের ভারী স্তর বা 'ইম্পাস্তো' কৌশলের পরীক্ষা শুরু করেন। এই 'ইম্পাস্তো' কৌশলটি কিন্তু পরে ভ্যান গঘের সারা জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে, যা তিনি আমৃত্যু আর কখনো ছাড়েননি।
যেমন তাঁর আঁকা 'ভেস উইথ চায়নিজ অ্যাস্টার্স অ্যান্ড গ্ল্যাডিওলি' ছবিটির কথাই ধরা যাক। ডাচ পর্বের ছবিগুলোর তুলনায় এখানে ভ্যান গঘের রং অনেক বেশি উজ্জ্বল ও প্রাণবন্ত। ফুলের পাপড়িতে তিনি এত পুরু করে রং তুলেছেন যে সেগুলো ক্যানভাসের ওপর প্রায় উঠে এসেছে বলে মনে হয়। কাছ থেকে দেখলে প্রতিটি তুলির আঁচড় আলাদা করে বোঝা যায়।
১৮৮৫ সালে আঁকা তাঁর বিখ্যাত 'দ্য পটেটো ইটার্স'-এর তুলনায় এই ফুলগুলোর ক্যানভাস ছিল অনেক বেশি প্রাণবন্ত। শিল্পরীতির এই নতুন পরীক্ষার সঙ্গে ফুল যেন একেবারে খাপে খাপ মিলে গিয়েছিল। কারণ, ফুল তো আর বেশি দিন তাজা থাকে না; পাপড়িগুলো শুকিয়ে বা ঝরে যাওয়ার আগেই দ্রুততম সময়ে তার সতেজ রূপ ক্যানভাসে বন্দী করতে হতো। আর সে কারণেই ভ্যান গঘকে তুলি চালাতে হতো অদ্ভুত এক ক্ষিপ্রতায়।
১৮৮৮ সালে নিজের তুলির ব্যবহার নিয়ে ভ্যান গঘ অত্যন্ত অকপটে লিখেছিলেন: 'তুলির টানের ক্ষেত্রে আমি কোনো বাঁধাধরা নিয়মকানুনের ধার ধারি না; এলোমেলো আঁচড়ে ক্যানভাসে রং ছুঁয়ে যাই এবং তা অবিকল সেভাবেই রেখে দিই—রঙের পুরু স্তর কিংবা ক্যানভাসের কোনো কোনো জায়গা রং না ছুঁয়ে খোলা ফেলে রাখা...'
ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকেও প্যারিসের বাজারে ফুলের স্থিরচিত্রের বড় কদর ছিল। তৎকালীন আর্ট মার্কেটে এই ঘরানার ছবিগুলোর ভালো চাহিদা ছিল এবং অনেক তরুণ শিল্পী কেবল ফুলের ছবি বিক্রি করেই জীবিকা নির্বাহ করতেন।
অ্যান্টওয়ার্প কিংবা প্যারিস—কোথাও নিজের একটা ছবিও বিক্রি করতে না পেরে ভ্যান গঘ তখন তীব্র অর্থকষ্টে ভুগছিলেন। ফলে ছবির একটা নির্ভরযোগ্য ক্রেতা খুঁজে পাওয়ার জন্য তাঁর ভেতর একধরনের ছটফটানি ছিল। কিন্তু কাজটা মোটেও সহজ ছিল না। কারণ, আধুনিক বাজারের ক্রেতারা ঠিক কী ধরনের ছবি পছন্দ করেন, তা তিনি সবে বুঝতে শুরু করেছেন; তা ছাড়া নিজের মতো কোনো শৈলীও তখন পর্যন্ত তিনি তৈরি করে উঠতে পারেননি।
আপাতদৃষ্টে ফুলের স্থিরচিত্র আঁকাকে এই আর্থিক দৈন্যদশা থেকে মুক্তির উপায় মনে হলেও কাজ করতে করতে তিনি আবিষ্কার করেন যে রঙের তত্ত্ব ও তুলির আচরণের পরীক্ষা চালানোর জন্য এটিই সেরা মাধ্যম। তবে নিয়তির নির্মম পরিহাস, জীবিত অবস্থায় এই ছবিগুলোর একটিও বিক্রি করতে পারেননি এই মহান শিল্পী।
তখনকার দিনে শিল্পীদের মধ্যে কোনো একটি নির্দিষ্ট ফুলকে নিজের 'স্বাক্ষর' বানিয়ে নেওয়ার বেশ চল ছিল। আর্ট মার্কেটে ভিড়ের মাঝে নিজেকে আলাদা করে চেনাতে এবং সাধারণ সমঝদারদের কাছে নিজস্ব এক স্বকীয়তা তুলে ধরতে অনেকেই এমনটি করতেন। ভ্যান গঘও তাঁর আঁকা দুটো সূর্যমুখী ছবির ফুলদানির গায়ে স্পষ্ট করে নিজের নাম সই করেছিলেন। শুধু তা-ই নয়, ফুলটির ওপর নিজের এই অধিকারের কথা তিনি সগর্বে জানিয়েছিলেনও। ১৮৮৯ সালের জানুয়ারিতে বন্ধু পল গগ্যাঁকে লেখা এক চিঠিতে ভ্যান গঘ বেশ জোর দিয়েই বলেছিলেন: 'জেনিনের যদি থাকে পিওনি আর কোস্টের যদি থাকে হলিহক—তবে সবার আগেই কিন্তু আমি নিজের করে নিয়েছি এই সূর্যমুখীকে।'
আঁকার নতুন সব কৌশল আর রঙের ব্যাকরণে নিজেকে ঋদ্ধ করে ১৮৮৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি প্যারিস ছাড়েন। ফরাসি রাজধানীর টানা দুই বছরের ব্যস্ততা আর কোলাহলে বড্ড হাঁপিয়ে উঠেছিলেন তিনি; মন চাইছিল শান্ত কোনো গ্রামীণ পরিবেশ। সেই খোঁজে তিনি পাড়ি জমান দক্ষিণ ফ্রান্সের ছোট্ট শহর আর্লেসে। এখানকার ঝকঝকে রোদ, চারপাশের বর্ণিল প্রকৃতি আর অদ্ভুত এক নির্জনতা ভ্যান গঘকে নতুন উদ্যমে কাজ করার নিখাদ অনুপ্রেরণা জোগায়।
প্রোভঁসের সেই চড়া রোদের নিচে চারপাশের রঙের রূপ দেখে মুগ্ধ ভ্যান গঘ তখন চিঠির পর চিঠি লিখতে লাগলেন থিওকে। ১৮৮৮ সালের মে মাসে ভাইকে পাঠানো এক চিঠিতে তিনি লেখেন: 'এখানকার বহু বিষয়ের প্রকৃতি দেখতে হুবহু হল্যান্ডের মতোই—পার্থক্য কেবল রঙে। প্রখর সূর্য যেখানে আলো ঢালছে, সেখানেই যেন সালফার ছড়িয়ে আছে।'
পরবর্তী সময়ে ফুল নিয়ে তিনি আরও কিছু কালজয়ী ছবি আঁকেন, যার মধ্যে 'ওলিয়্যান্ডারস', 'আইরিসেস' এবং 'রোজেস' অন্যতম। তবে আর্লেসের দিনগুলো ভ্যান গঘকে মডেল নিয়ে কাজ করার বহু প্রতীক্ষিত সুযোগটিও এনে দেয়। তবে এরা কেউ পেশাদার মডেল ছিলেন না; ছিলেন তাঁর চেনা-পরিচিত খুব সাধারণ মানুষ—যেমন স্থানীয় ডাকপিয়ন জোসেফ রুল্যাঁ, তাঁর স্ত্রী অগাস্টিন রুল্যাঁ কিংবা বেলজিয়ামের চিত্রশিল্পী ওজেন বক।
এসব প্রতিকৃতিতে ভ্যান গঘের রং ও তুলির ব্যবহার আরও পরিণত হয়ে ওঠে। প্যারিসে ফুল আঁকতে গিয়ে রং নিয়ে যে পরীক্ষা শুরু করেছিলেন, আর্লেসে এসে তারই অনেকটা পূর্ণতা পেয়েছিল। ফুলের পাপড়ি থেকে মানুষের মুখ—সবকিছুকেই তিনি রং ও তুলির নিজস্ব ভাষায় দেখতে শুরু করেন। আর এভাবেই ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে সেই স্বতন্ত্র শিল্পশৈলী, যা তাঁকে আধুনিক ইউরোপীয় চিত্রকলার অন্যতম অনন্য শিল্পীতে পরিণত করেছে।