দুর্ঘটনা থেকে জন্ম নিয়েছে যে ভাস্কর্য
টিএসসি আর শামসুন্নাহার হলের মাঝের সড়কদ্বীপ সময় কাটানোর জন্য বেশ জনপ্রিয় এখন। এর পাশ দিয়ে প্রতিদিন শত শত মানুষের যাতায়াত। অনেকে এসে বসেন বেঞ্চগুলোতে। গল্পগুজব চলে। ছিন্নমূল মানুষেরা রাতে আশ্রয় নেন। রিকশাওয়ালা-হকারদেরও বেশ আনাগোনা। তবে এসব অবসর আর আনন্দ-আড্ডায় মাঝেও দ্বীপটার দিকে তাকালে মনে হয়, একটি দুর্বিষহ মুহূর্ত যেন থমকে আছে এখানে।
দ্বীপের ঠিক মাঝে পড়ে আছে দুমড়েমুচড়ে যাওয়া একটি মাইক্রোবাস। গাড়িটি অদ্ভুত। ভাঙাচোরা গাড়ির পাশ দিয়ে ঝুলছে ৫টি হাত। আসেপাশে ছড়িয়ে আছে গাড়ির যন্ত্রাংশ। বসার আসনগুলো গাড়ি থেকে বিচ্ছিন্ন। তার ওপর নিশ্চুপ বসে আছে মাটির তৈরি পাখি। গাড়ির ভেতর তাকালে দেখা যায়, সেখানেও লোহা ফুড়ে বেরিয়ে এসেছে ৫ জোড়া হাত।
সব মিলিয়ে এই স্থানটিতে 'কেবলি দৃশ্যের জন্ম' হচ্ছে প্রতিটি মুহূর্তে।
একটি স্মারকের জন্ম
১৩ আগস্ট, ২০১১। চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ তার সহকর্মীদের নিয়ে মানিকগঞ্জ গিয়েছিলেন। উদ্দেশ্য, নতুন চলচ্চিত্র কাগজের ফুল-এর সম্ভাব্য লোকেশন দেখা। সেই যাত্রায় তার সঙ্গে ছিলেন প্রথিতযশা সাংবাদিক মিশুক মুনীর। ছিলেন আরও কয়েকজন সহকর্মী-বন্ধু।
ফেরার পথে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয় তাদের বহনকারী মাইক্রোবাস। দশ আরোহীর মধ্যে ঘটনাস্থলেই নিহত হন তারেক মাসুদ, মিশুক মুনীরসহ পাঁচজন। যারা প্রাণে বেঁচে যান, তাদের মধ্যে ছিলেন তারেক মাসুদের স্ত্রী ও সহকর্মী ক্যাথরিন মাসুদ, শিল্পী ঢালী আল মামুন এবং তার স্ত্রী শিল্পী দিলারা বেগম জলি।
এই দুর্ঘটনার স্মৃতি জীবন্ত করে রাখার উদ্যোগ নেন ক্যাথরিন মাসুদ। তিনি শরণ নেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিল্পী ঢালী আল মামুনের। এখান থেকেই শুরু হয় এক ব্যতিক্রমী শিল্পযাত্রা। মর্মান্তিক দুর্ঘটনার সাক্ষী মাইক্রোবাস ধীরে ধীরে রূপ নিতে থাকে একটি স্মারকে; শোক, স্মৃতি আর সড়ক নিরাপত্তার এক শিল্পভাষ্যে।
সেই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছিলেন ঢালি আল মামুন নিজেও। মৃত্যুকে খুব কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতাই পরে তিনি রূপ দিয়েছেন এই ভাস্কর্যে। "আমি আমার এক স্থপতি বন্ধুকে যুক্ত করে একটা কোলাবোরেটিভ ওয়ার্ক হবে ঠিক করলাম। উনি ল্যান্ডস্কেপ ডিজাইনটা করবেন, আর আমি স্থাপনাটা, কোথায় কীভাবে থাকবে সেটা করব। এইভাবে কাজটা ডেভলপ করে," বলেন তিনি।
এই স্মৃতি স্থাপনার স্থাপত্য নকশা প্রণয়নে তাকে সাহায্য করেছিলেন সালাউদ্দিন আহমেদ। দুর্ঘটনার তিন বছর পর, ২০১৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয় । ১৯ নভেম্বর সকলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয় ভাস্কর্যটি।
অন্য অনেক জায়গা রেখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ই কেন? প্রথমে শাহবাগ মোড়ে করার প্রস্তাব পেয়েছিলেন শিল্পীরা। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অব্যবহৃত জায়গাকেই বেছে নেওয়া হয়।
"এখানে করার উদ্দেশ্য হচ্ছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশের ভবিষ্যত প্রজন্মের বসবাস। তাদের মধ্যে যাতে এক ধরনের সচেতনতা তৈরি হয় এবং একইসাথে এক শিল্পকর্মের সাথে পরিচয় করানো যায়," বললেন ঢালি আল মামুন।
দুর্ঘটনার বিভীষিকা, হারিয়ে যাওয়া সহযাত্রীদের স্মৃতি আর মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসার ভার, সব মিলিয়েই গড়ে উঠেছে এই শিল্পকর্ম। এটি ছিল চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদের ব্যক্তিগত মাইক্রোবাস। স্থাপনাটি তার কাজের প্রতিও একধরনের শ্রদ্ধার্ঘ্য।
যেমনটা বলেছিলেন ক্যাথরিন মাসুদ, "আমরা তারেক মাসুদ, মিশুক মুনির ও তাদের শেষ যাত্রায় সাথী হওয়া আরও তিনজন এবং সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত সবার স্মৃতির উদ্দেশ্যে স্থানটি উৎসর্গ করেছি। এটি জনশিল্পের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট যেমন, ঠিক তেমনই এটিই তারেক মাসুদের কাজকে শ্রদ্ধা জানানোর একটি উপায়।"
কী বলতে চায় এই ভাস্কর্য
সড়ক দ্বীপটি ত্রিভূজাকৃতির। পুরো জায়গা জুড়েই 'অবজেক্ট ও স্পেস' এর ব্যবহারে স্থাপনাটি নির্মাণ করা হয়েছে। গাড়িটির যন্ত্রাংশের সঙ্গে পরিবেশের উপাদান মিশে একাকার হয়েছে। স্থানের এই বিশেষ বৈশিষ্ট ভাস্কর্যটির অর্থ নির্মাণে সাহায্য করেছে বলে মনে করেন ঢালী আল মামুন।
"এই স্থাপনাকে আমি বলি 'ত্রিপল এম'। এটা একইসাথে মেমোরিয়াল, মনুমেন্ট এবং মিউজিয়াম। একটা গাড়িরও কিন্তু আত্মপ্রদান এখানে রয়েছে, একটা একটা অটোমোবাইল ডিজাইনেরও ডিসপ্লে আছে এখানে," বলেন তিনি।
তার মতে, ভাস্কর্যটি দুর্ঘটনায় হারিয়ে ফেলা মানুষের স্মৃতির স্মারক। আবার এটিই সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধের বার্তা দেয়া এক স্থাপনা। আবার জাদুঘরও।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের শিক্ষক দীপ্তি দত্ত এই ভাস্কর্য নিয়ে গবেষণামূলক কাজ করেছেন। তার 'মুক্ত বাতায়ন স্মরণিকা জাদুঘর: স্মারক দুর্ঘটনা' বইয়ে ঢালী আল মামুন, নকশাকার সালাউদ্দিন আহমেদ, ও ক্যাথরিন মাসুদের দীর্ঘ আলাপ স্থান পেয়েছে। সেই কথোপকথনে উঠে এসেছে এই স্থাপনার নানান দিক ও দর্শন।
"আমি চেয়েছিলাম পুরো গাড়িটাকেই র্যাপিং করে ফেলতে। এমন ভাবে করতে, যেন পুরো গাড়িটি নিজেই যেন আহত।… গাড়িটার মধ্যে যে ভায়োলেন্সটি ছিল আফটার অক্সিডেন্ট, সেটাকে আমি ডিকোড করতে চেয়েছিলাম," দীপ্তি দত্তকে বলেছিলেন ঢালী আল মামুন।
তবে সেটি না করলেও দুর্ঘটনার ভয়াবহতা তিনি দেখিয়েছেন অন্য ফর্মে। গাড়ি থেকে ঝুলে থাকা ৫টি হাত এসেছে নিহতদের রেফারেন্স হিসেবে। গাড়ির ভেতরে থাকা হাতগুলো এমন ভাবে রাখা, একটি নির্দিষ্ট জায়গায় না দাঁড়ালে সেটি দেখা যাবে না। এই হাতগুলো ঘটে যাওয়া 'ভায়োলেন্স'কেই যেন ফুটিয়ে তুলেছে।
স্থাপনায় পাখির উপস্থিতিও চোখে পড়ার মতো। জীবন্ত পাখির আনাগোনা তো আছেই। ভাস্কর্যের বিভিন্ন অংশে জায়গা করে নিয়েছে মাটির তৈরি পাখিও। বিষয়টি অবশ্য বিস্ময়ের নয়। 'মাটির ময়না'র নির্মাতার স্মৃতি ঘিরে নির্মিত স্থাপনায় পাখি তো আসবেই!
নির্মাণের সময় ভাস্কর্যে দুটি গানের পঙ্ক্তি লেখা ছিল, যদিও এখন সেগুলো আর দেখা যায় না। দুটি গানেই রূপক হিসেবে পাখির কথা এসেছে। এ প্রসঙ্গে শিল্পী ঢালি আল মামুন বলেন, "দুই বন্ধু মিশুক এবং তারেক। তারেকের লেখা গান—'পাখিটা বন্দি আছে দেহের খাঁচায়'। অন্য গানটা (মানুষ আমি, আমার কেন পাখির মতো মন) ওটা ছিল মিশুকের খুবই প্রিয় গান।"
ভাস্কর্যটি প্রাসঙ্গিকভাবেই একটি সড়কের পাশে স্থাপন করা হয়েছে। চারপাশে মানুষের সম্পৃক্ততা বাড়াতে চেয়েছিলেন শিল্পী। বসার বেঞ্চ যুক্ত করা হয়েছে। হাঁটার জন্য বানানো হয়েছে র্যাম্প।
গাড়িটির একদিক বন্ধ, অন্যদিক রাখা হয়েছে খোলা। এখানে একাধিক গাছ রয়েছে। একটি গাছও কাটা হয়নি। এগুলোই আলাদা দৃষ্টিভঙ্গি এনে দিয়েছে শিল্পকর্মে। গাছের মধ্যে দিয়ে বেরিয়ে আসা জায়গাটাকেই কাজে লাগানো হয়েছে কৌশলে।
"এখানে শুধু আমার এই গাড়ি বা আমার অবজেক্টগুলো গুরুত্বপূর্ণ নয়। সেখানে নুড়ি পাথরগুলো গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে বসার সিটগুলো গুরুত্বপূর্ণ", দীপ্তি দত্তকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন শিল্পী।
সব মিলিয়ে 'স্মারক দুর্ঘটনা' শুধু পাঁচজন নিহত মানুষের স্মৃতির স্মারক হয়ে থাকে না। ভাঙা গাড়ি ও হাতগুলো যেমন দুর্ঘটনার ভয়াবহতা তুলে ধরে, অন্যদিকে পাখি, গাছ ও খোলা জায়গা জীবন ও মুক্তির কথা বলে। এই স্থাপনা মৃত্যু্র পাশপাশি শোনায় জীবনের গল্পও।
স্মারকের বাস্তব পাঠ এখন কেমন
পলান দাশ প্রায় ১০ বছর যাবত ঢাকায় আছে। প্রায়ই টিএসসির পাশ দিয়ে উদ্যানে যান। তার মতে, স্মারক দুর্ঘটনার এই গাড়িটি মুক্তিযুদ্ধের সময়কার। "৭১ সালের এইটা। আমি আসার পর থেকেই দেখতেছি। আমি আরেকজনকে জিজ্ঞেস করছিলাম, সেও বললো যুদ্ধের সময়ে আগুন দিয়া পুড়াইছিলো, সেই গাড়ি," বলেন তিনি।
এই উন্মুক্ত শিল্পকর্মটি সম্পর্কে এমন ভুল ধারণা অনেকেরই। রিকশাচালক মোহাম্মাদ মতিয়ার জানালেন, টিএসসির মোড়ে একটা সড়ক দুর্ঘটনা হয়েছিল। তাতে এক সাংবাদিক মারা যান। সেই ঘটনার স্মরণেই গাড়িটি এখানে রাখা হয়েছে। আঙ্গুল দিয়ে দুর্ঘটনার স্থানটিও দেখিয়ে দিলেন তিনি। এই ভাঙাচোরা গাড়িটি এখানে রাখাকে বড়লোকের বিলাসিতা হিসেবে দেখছেন তিনি। "বড়লোকেরা যদি কয়, এই তালগাছটা এইখানে রাখবো, তাই পারবে। আমার মতো লোকেরা সেইটা পারবে?," বললেন তিনি।
শ্রমজীবী মানুষের কথা বাদ দিলেও, অনেক শিক্ষার্থীদের মধ্যেও স্পষ্ট ধারণা নেই ভাস্কর্যটি নিয়ে। সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী আরিফুর রহমান জানালেন, তিনি প্রায় প্রতিদিনই টিউশন করাতে যান এই ভাস্কর্যের পাশ দিয়ে। কৌতুহল জেগেছে, কিন্তু এখনও জানেন না এটা সম্পর্কে। জানার খুব বেশি চেষ্টা করেছেন, তা-ও নয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চলচ্চিত্র সংসদ প্রতিবছর ১৩ আগস্ট এই স্মৃতি ভাস্কর্যে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। সন্ধ্যায় নিহতদের স্মরণে প্রদীপ প্রজ্বলন করা হয় এখানে। বছরে বাকি সময়ে তেমন কোনো কার্যক্রম চোখে পড়ে না।
তবে মানুষের এই ভিন্ন পর্যবেক্ষণ বা উদাসীনতা শিল্পীকে ভাবায়নি। "কেউ দেখবে যে, ওহ গাড়িটা ভেঙ্গে গেছে। একটা ভাঙ্গাচোরা গাড়ি এখানে এনে রেখে দিয়েছে। কারো কাছে মনে হতে পারে, ওহ না, এই ভাঙাচোরা গাড়ির মধ্যেই একটা ভোকাবোলারি আছে। কারো কাছে আরও জিনিসপত্র দেখার পর মনে হতে পারে, এটা শুধু ভাঙা গাড়ি না, আরও কিছু থাকতে পারে। আবার কারো কিছুই মনে হবে না। ইটস আ গেম," বলেন ঢালী আল মামুন।
স্মৃতির মতোই মিলিয়ে যাচ্ছে স্মারক
এক যুগ পেরিয়ে আজ স্মারক দুর্ঘটনা যেন নিজেই আরেকটি দুর্ঘটনার শিকার। যে স্থাপনাটি একসময় থমকে দাঁড়াতে বাধ্য করত পথচারীকে, আজ সেটিই ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলছে তার আবেদন।
গাড়ির গায়ে জমেছে ধুলো আর ময়লার স্তর। কোথাও রঙ উঠে গেছে, কোথাও ধাতব অংশে পড়েছে সময়ের ক্ষতচিহ্ন। একসময় দর্শনার্থীদের জন্য যে নামফলকটি স্থাপন করা হয়েছিল, সেটিও আর নেই। ফলে অনেকে চাইলেও জানতে পারেন না, কেন এই দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া গাড়িটি এখানে রাখা হয়েছে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভাস্কর্যের বিভিন্ন অংশও হারিয়ে গেছে। চুরি হয়ে গেছে মাটির পাখি। ফলে স্থাপনাটির প্রতীকী ভাষা যেমন ক্ষয়ে গেছে, তেমনি কমে এসেছে এর নান্দনিক আবেদনও। এর অন্যতম কারণ নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, মনে করেন শিল্পী।
"এই রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বটা আমরা চেয়েছিলাম যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নেবে। ক্যাথরিন ওদের একটা ফাউন্ডেশন থেকে কয়েক বছর এটার মেনটেনেন্স করেছে। পরবর্তীতে এটার তো একটা লোকবল ইত্যাদি প্রয়োজন হয়, সেটা আর হয়নি। আর আমাদের প্রত্যাশা ছিল যে যেহেতু এটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, তরুণ প্রজন্ম এক ধরনের সম্পৃক্ততা অনুভব করবে। তারা যে জীবনযাপন করে, তারমধ্যে এক ধরনের সৌন্দর্যবোধ, সেনসিবিলিটি, সংবেদনশীলতা থাকবে। এগুলো হয়তো হয়নি," বলেন ঢালী আল মামুন।
তিনি আরও জানান, এর মধ্যে সংস্কার করার চেষ্টা করেছিলেন ক্যাথরিন মাসুদ। তবে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা অনেক উদ্যোগই আটকে দেয়।
স্থাপনাটি আজকাল অনেকপথচারী একটি শিল্পকর্ম বা স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে নয়, বরং পরিত্যক্ত একটি দুর্ঘটনাগ্রস্ত গাড়ি হিসেবেই দেখেন। কেউ এর আশপাশে ময়লা ফেলে যান, কেউ বসার জায়গা বানান। তাদের কেউ জানতেই পারেন না, এই ভাঙা ধাতুর শরীরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এক বেদনাময় অধ্যায়। তবে কি 'পাবলিক আর্ট' ধারণাটি এখানে ব্যর্থ হলো?
"এক প্রকার তো ব্যর্থ হয়েছেই। যেকোনো ব্যর্থতা তো একটা শিক্ষা। ব্যর্থতা থেকেই তো আমাদের শিক্ষা গ্রহণ করতে হয়। এই ব্যর্থতার মধ্যে দিয়ে আমার এক ধরনের সমাজ পাঠ হয়েছে," বলেন শিল্পী।
ক্যাথরিন মাসুদ দীপ্তি দত্তকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, "আমার দৃষ্টিতে জনশিল্প, শিল্পী বা স্রষ্টার সঙ্গে সাধারণ মানুষের পারস্পরিক আস্থা ও সম্মানের ধারণার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে।" তিনি জনশিল্পের ঝুঁকির কথাও বলেছিলেন সেসময়।
"জনশিল্পের চ্যালেঞ্জটি গ্রহণের যে যে ধকল, তা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কাঠামোকে ওলটপালট করে দেয়। উপকরণ বাছাই ও তার স্থান নির্ধারণ এমনভাবে করতে হয়, যাতে জনসাধারণের প্রবেশাধিকার ও নান্দনিক বিবেচনাবোধের মধ্যে একটা ভারসাম্য বজায় থাকে।"
কিন্তু সে ভারসাম্য রক্ষা পায়নি। মানুষ এই ভাস্কর্যের পাশ দিয়ে হেঁটে যায়, কিন্তু জানতে পারে না, এই ভাঙা গাড়িটি একসময় তারেক মাসুদ, মিশুক মুনীরসহ পাঁচটি জীবনের শেষ যাত্রার সাক্ষী ছিল। তারা জানতে পারে না, একজন বেঁচে ফেরা শিল্পী নিজের ক্ষত দিয়ে তৈরি করেছিলেন এই স্মৃতি।
ভাস্কর্যটি হয়তো একদিন পুরোপুরি ক্ষয়ে যাবে। কিন্তু তার আগে কি আমরা তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করব?
ছবি: জুনায়েত রাসেল/টিবিএস