চট্টগ্রামে সরবরাহ কমেছে ৪৫ শতাংশ, রান্নার চুলা থেকে কারখানার চুল্লীতে গ্যাসের তীব্র সংকট
চট্টগ্রামে গ্যাস সরবরাহ প্রায় ৪৫ শতাংশ কমে যাওয়ায় কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (কেজিডিসিএল) আওতাধীন ৬ লাখের বেশি গ্রাহক চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। আবাসিক রান্নার চুলা থেকে শিল্পকারখানার চুল্লী, সিএনজি স্টেশন, হোটেল-রেস্তোরাঁ—সবখানেই দেখা দিয়েছে তীব্র গ্যাস সংকট। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দিনে কয়েক দফা লোডশেডিং। ফলে শিল্প উৎপাদন, পরিবহন, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে নেমে এসেছে চরম ভোগান্তি ও দুর্ভোগ।
এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর শুরু সংকট
গত ২১ জুলাই কক্সবাজারের মহেশখালীতে মার্কিন প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে (এফএসআরইউ) অগ্নিকাণ্ডের পর থেকেই চট্টগ্রামে গ্যাস সরবরাহ কমতে শুরু করে। তবে রোববার (২ আগষ্ট) থেকে সংকট আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে বলে জানিয়েছে কেজিডিসিএল। গ্যাসের স্বল্পচাপের কারণে নগরীর অধিকাংশ এলাকায় রান্না করা কঠিন হয়ে পড়েছে। একই সময়ে বিদ্যুৎ ঘাটতি বেড়ে যাওয়ায়— অনেক এলাকায় প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা লোডশেডিংও করতে হচ্ছে।
দেশে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের জন্য কক্সবাজারের মহেশখালীতে দুটি ভাসমান টার্মিনাল রয়েছে। এর একটি পরিচালনা করে মার্কিন প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেট এনার্জি এবং অন্যটি সামিট এলএনজি টার্মিনাল। চট্টগ্রামের গ্যাস সরবরাহ মূলত এই দুটি টার্মিনালের ওপর নির্ভরশীল। এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়, যার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে চট্টগ্রামে।
বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ কর্পোরেশন- পেট্রোবাংলার উৎপাদন ও বিপণন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, মহেশখালীতে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের সম্মিলিত রিগ্যাসিফিকেশন সক্ষমতা ১,১০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালের সক্ষমতা ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট এবং সামিট এলএনজি টার্মিনালের সক্ষমতা ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট। তবে স্বাভাবিক অবস্থায়ও দুটি টার্মিনাল সাধারণত পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালিত হয় না; বেশিরভাগ সময় ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ সক্ষমতায় চালানো হয়। কেবল তীব্র সংকটের সময় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত সক্ষমতায় পরিচালনা করা হয়।
পেট্রোবাংলার উপ-মহাব্যবস্থাপক (উৎপাদন ও বিপণন) প্রকৌশলী মোহা. মাহমুদুল হাসান টিবিএসকে বলেন, অনানুষ্ঠানিকভাবে আমরা জানতে পেরেছি মহেশখালীর এক্সিলারেট এনার্জির এলএনজি টার্মিনালে আগামীকাল (মঙ্গলবার) পুনরায় কার্যক্রম শুরু হতে পারে। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য পাওয়া যায়নি।
তিনি আরও বলেন, ২১ জুলাই এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালে দুর্ঘটনার পর থেকে সেটি পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। বর্তমানে শুধু সামিটের এলএনজি টার্মিনাল চালু আছে, যেখান থেকে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে পাঠানো হচ্ছে।
কেজিডিসিএলের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম অঞ্চলে স্বাভাবিক সময়ে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। সংকট শুরুর আগে প্রতিষ্ঠানটি প্রতিদিন প্রায় ২৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পেলেও— রে তা কমে ২২৫ থেকে ২৩০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে আসে। রোববার থেকে বরাদ্দ আরও কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১৯৪ মিলিয়ন ঘনফুটে। অর্থাৎ বর্তমানে দৈনিক গ্যাসের ঘাটতি ১৫৬ মিলিয়ন ঘনফুট, যা মোট চাহিদার প্রায় ৪৫ শতাংশ।
কেজিডিসিএলের উপ-মহাব্যবস্থাপক (প্রকৌশল) মোহাম্মদ রফিক খান টিবিএসকে বলেন, "গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় আমাদের কাছেও বরাদ্দ কম এসেছে। আমরা বড় শিল্প গ্রাহকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করছি এবং জরুরি প্রয়োজন ছাড়া গ্যাসের ব্যবহার কমানোর অনুরোধ করছি। আবুল খায়ের গ্রুপ, বিএসআরএম, কেএসআরএম, পিএইচপিসহ বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার কমাতে বলা হয়েছে। বড় গ্রাহকেরা কিছুটা ব্যবহার কমালে— সেই গ্যাস অন্যান্য শিল্প, সিএনজি স্টেশন ও আবাসিক গ্রাহকদের মধ্যে সরবরাহ করা সম্ভব হবে। এটি একটি জাতীয় সংকট। সবাইকে ধৈর্য ধরতে হবে।"
সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ লাইন, হোটেল-রেস্তোরাঁ-আবাসিকেও গ্যাসের হাহাকার
আজ সোমবার (৩ আগষ্ট) নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বায়েজিদ এলাকার এস আলম সিএনজি ফিলিং স্টেশনের সামনে প্রায় এক কিলোমিটারজুড়ে গাড়ির দীর্ঘ সারি। গ্যাসের চাপ কম থাকায়, একটি গাড়িতে গ্যাস নিতে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক বেশি সময় লাগছে। ফলে শত শত যানবাহন ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকছে।
লাইনে অপেক্ষমাণ একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের গাড়িচালক আব্দুল হামিদ টিবিএসকে বলেন, "সকাল ১০টা থেকে লাইনে আছি। আস্তে আস্তে লাইন সামনে এগোচ্ছে। গ্যাসের চাপ নেই বললেই চলে। কখন গ্যাস পাব, সেটাও নিশ্চিত নই। জানি না আমাদের ভাগ্যে কী আছে।"
বায়েজিদ ফিলিং স্টেশনে এলাকায় যাত্রীদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা আসতেই যাত্রীদের মধ্যে হুড়োহুড়ি দেখা যায়। বায়েজিদ এলাকার বাসিন্দা কল্যাণ বড়ুয়া টিবিএসকে বলেন, "ব্যক্তিগত কাজে নিউ মার্কেটে যাব। কিন্তু গ্যাস সংকটের কারণে গাড়ি পাওয়া যাচ্ছে না। আধা ঘণ্টার বেশি সময় ধরে অপেক্ষা করছি। একটি গাড়ি আসলেই সবাই একসঙ্গে উঠতে চাইছে।"
একই চিত্র দেখা গেছে নাসিরাবাদ শিল্প এলাকার সেনা সিএনজি ফিলিং স্টেশনেও। সেখানে লাইনে থাকা সিএনজিচালক আরিফ হায়দার বলেন, "লাইন ধরে গ্যাস নেব, নাকি যাত্রী পরিবহন করব- সেটাই বুঝতে পারছি না। আমাদের ভোগান্তির যেন শেষ নেই।"
মুরাদপুরের ফসিল পেট্রোল পাম্পের ব্যবস্থাপক মো. ফখরুদ্দীন ইসলাম শিমুল টিবিএসকে বলেন, "গ্যাসের চাপ কম থাকায় স্বাভাবিকভাবে গ্যাস সরবরাহ করা যাচ্ছে না। এর মধ্যে বিদ্যুৎ চলে গেলে পুরো কার্যক্রমই বন্ধ হয়ে যায়। সাধারণত পাম্প স্টেশনে গ্যাসের চাপের রিডিং ২২০ থাকে। এখন তা ১৫০ থেকে ১৭০-এর মধ্যে ওঠানামা করছে। ফলে গাড়িতে গ্যাস দিতে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি সময় লাগছে।"
গ্যাস সংকটের কারণে নগরীতে সিএনজিচালিত যানবাহনের সংখ্যাও কমে গেছে। এতে অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী ও সাধারণ যাত্রীরা চরম বিপাকে পড়েছে।
শুধু পরিবহন নয়, হোটেল-রেস্তোরাঁ ব্যবসাও পড়েছে সংকটে। নগরীর কাজীর দেউড়ির খোয়াজা হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টের ক্যাশিয়ার মোহাম্মদ আসলাম টিবিএসকে বলেন, "পাঁচ-ছয় দিন ধরে গ্যাসের সমস্যা চলছে। বসে তো থাকতে পারি না। তাই লাকড়ি ও সিলিন্ডার গ্যাস দিয়ে রান্না করছি। লাকড়ি ব্যবহারের কারণে হোটেল নোংরা হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু উপায় নেই। ভোগান্তি বাড়লেও খাবারের দাম বাড়াইনি।"
সিএনজি স্টেশন ও হোটেল-রেস্তোরাঁর পাশাপাশি এর প্রভাব পড়েছে নগরীর আবাসিক এলাকাতেও। নগরীর হামজারবাগ এলাকার বাসিন্দা মোস্তফা সাদাত টিবিএসকে বলেন, "সকালে আমাদের বাসায় রান্নার জন্য খালা (বুয়া) এসেছিলেন। কিন্তু গ্যাস না থাকায় রান্না না করেই চলে যান। পরে বাইরে গিয়ে দুপুরের খাবার খেতে হয়েছে। কয়েকদিন ধরেই গ্যাসের তীব্র সংকট চলছে। সকালে কিছুক্ষণ গ্যাস এলেও— চাপ এত কম থাকে যে ঠিকমতো রান্না করা যায় না।"
গ্যাসের স্বল্পচাপে ব্যাহত শিল্প উৎপাদন
গ্যাসের স্বল্পচাপের প্রভাব পড়েছে বড় শিল্পকারখানার উৎপাদনেও। বিএসআরএমের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর (ডিএমডি) তপন সেনগুপ্ত টিবিএসকে বলেন, "কারখানায় গ্যাসের চাপ কমে গেলে উৎপাদন ব্যাহত হয়। তখন বিকল্প হিসেবে ফার্নেস অয়েল ব্যবহার করতে হয়। কিন্তু ফার্নেস অয়েলের দাম গ্যাসের তুলনায় তিন গুণেরও বেশি। ফলে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।"
তিনি আরও বলেন, "বেশিরভাগ সময় গ্যাসের চাপ স্বাভাবিকের অর্ধেকেরও কম থাকে। অনেক সময় একেবারেই গ্যাস থাকে না। এতে উৎপাদন পরিকল্পনা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।"
বিজেএমইএ'র সাবেক পরিচালক খন্দকার বেলায়েত হোসেন টিবিএসকে বলেন, "এতদিন গ্যাসের চাপ কম থাকলেও গতকাল থেকে পরিস্থিতি আরও অবনতি হয়েছে। এতে পোশাক কারখানার আয়রন সেকশনে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি দীর্ঘক্ষণ লোডশেডিংয়ের কারণে জেনারেটর চালিয়ে উৎপাদন সচল রাখতে হচ্ছে যার ফলে বাড়ছে উৎপাদন খরচ।"
সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ৩০০ মেগাওয়াট লোডশেডিং
গ্যাস সংকটের পাশাপাশি বিদ্যুৎ পরিস্থিতিরও অবনতি হয়েছে। নগরীর মুরাদপুর, বহদ্দারহাট, হামজারবাগসহ নগরের বিভিন্ন এলাকায় গত ২৪ ঘণ্টায় তিন থেকে চার ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হয়েছে বলে জানিয়েছেন বাসিন্দারা।
মুরাদপুর এলাকার বাসিন্দা নেজাম উদ্দিন বলেন, "গ্যাসের সংকট তো আছেই। সকালে ও রাতে প্রায়ই বিদ্যুৎ থাকে না। গরমে বাচ্চাদের ঘুমাতে খুব কষ্ট হচ্ছে।"
চট্টগ্রাম বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) প্রধান প্রকৌশলী কামাল উদ্দিন আহমেদ টিবিএসকে বলেন, "আজ (সোমবার) বিকেল ৪টায় চট্টগ্রামে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল প্রায় ১ হাজার ২৫০ মেগাওয়াট। বিপরীতে সরবরাহ করা হয়েছে প্রায় ৯৫০ মেগাওয়াট। ফলে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট লোডশেডিং করতে হয়েছে। দিনের বিভিন্ন সময়ে চাহিদা পরিবর্তনের কারণে লোডশেডিংয়ের পরিমাণও ওঠানামা করে।"
কেজিডিসিএলের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির আওতায় মোট গ্রাহক ৬ লাখ ২,৪০৬। এর মধ্যে গৃহস্থালী গ্রাহক ৫ লাখ ৯৮ হাজার ৬ জন, শিল্প গ্রাহক ১ হাজার ১৯৯, বাণিজ্যিক ২ হাজার ৯১১, কেপটিভ পাওয়ার ইউনিট ২০৯টি, সিএনজি স্টেশন ৭০টি, বিদ্যুৎকেন্দ্র ৫টি এবং সার কারখানা ৪টি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্যাস সরবরাহ প্রায় অর্ধেকে নেমে আসায় শুধু আবাসিক গ্রাহকই নন— শিল্প, বিদ্যুৎ, পরিবহন ও বাণিজ্যিক খাত মিলিয়ে কেজিডিসিএলের আওতাধীন, ৬ লাখের বেশি গ্রাহক প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই সংকটের শিকার হচ্ছেন। দ্রুত এলএনজি সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি জনদুর্ভোগ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
সার্বিক বিষয়ে জানতে রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিজিসিএল) এলএনজি ডিভিশনের মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মো. শফিকুল ইসলামের সাথে যোগযোগ করা হলে তিনি মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
