পুকুর, খাল ও পাহাড় সংরক্ষণে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নতুন মহাপরিকল্পনা
শনিবার (১ আগস্ট) মহানগর মহাপরিকল্পনা ২০২৫-২০৫০-এর খসড়া প্রকাশ করেছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। এতে পরিকল্পনাধীন এলাকায় প্রায় ৪০ হাজার পুকুর ও অন্যান্য জলাশয় সংরক্ষণের জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় চট্টগ্রামের ওপর চাপ কমাতে পরিকল্পনায় 'ওয়ান সিটি, টু টাউনস' ধারণা, নতুন বাস ও ট্রাক টার্মিনাল, খাল পুনরুদ্ধার এবং আধুনিক পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার প্রস্তাব করা হয়েছে।
আনোয়ারা, বাকলিয়া ও আগ্রাবাদের জন্য পৃথক ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যানও (ড্যাপ) রয়েছে প্রস্তাবে। পাশাপাশি উন্নয়ন বিকেন্দ্রীকরণে মহানগর এলাকাকে ছয়টি প্রশাসনিক অঞ্চলে ভাগ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
খসড়া মহাপরিকল্পনায় জাতীয় উদ্যানের আদলে দুই থেকে তিনটি বড় পার্ক নির্মাণের রয়েছে। পাশাপাশি জাতীয় কবরস্থানের আদলে একটি কবরস্থান এবং একটি কেন্দ্রীয় ঈদগাহের জন্য জমি সংরক্ষণের প্রস্তাবও করা হয়েছে।
চট্টগ্রামে কর্তৃপক্ষের মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে পরিকল্পনাটি উপস্থাপন করে সিডিএ চেয়ারম্যান বেলায়েত হোসেন বলেন, "অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারণে চট্টগ্রামের পাহাড়, খাল, নদী ও প্রাকৃতিক পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমাদের লক্ষ্য একটি সবুজ, বাসযোগ্য ও টেকসই নগর গড়ে তোলা।"
আগামী ২ আগস্ট থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৬০ দিন নাগরিকেরা সরাসরি বা অনলাইনে মতামত, আপত্তি ও সংশোধনী প্রস্তাব জমা দিতে পারবেন। পরিকল্পনা চূড়ান্ত করার আগে সিডিএ এসব মতামত পর্যালোচনা করবে।
প্রস্তাবিত সংরক্ষণ তালিকায় নগরের প্রায় ৪ হাজার ৬০০ পুকুর অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। প্রথমবারের মতো এসব জলাশয়ের একটি ডিজিটাল ডেটাবেসও তৈরি করেছে কর্তৃপক্ষ।
বেলায়েত হোসেন বলেন, "মহাপরিকল্পনা শুধু কাগজে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। জনসচেতনতা, প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় এবং আইনের প্রয়োগের মাধ্যমেই একটি পরিকল্পিত ও বাসযোগ্য চট্টগ্রাম গড়ে তোলা সম্ভব।"
তিনি জানান, চট্টগ্রামের প্রথম মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয় ১৯৬১ সালে। পরে ১৯৯৫ ও ২০০৮ সালে আরও দুটি পরিকল্পনা করা হয়।
তিনি আরও বলেন, "২০২৫-২০৫০ মেয়াদের চতুর্থ মহাপরিকল্পনাকে বাস্তবসম্মত করতে জনমতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে।"
সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে ৩৫ কোটি ৮৭ লাখ টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে। এর আওতা ১ হাজার ২৫৫ বর্গকিলোমিটার। এর মধ্যে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের পুরো এলাকা, আশপাশের পৌরসভা ও উপজেলা এবং ভবিষ্যতে নগরায়ণের সম্ভাবনা রয়েছে—এমন এলাকাও অন্তর্ভুক্ত।
পরিকল্পনায় ধাপে ধাপে প্রকল্পের অগ্রাধিকার, বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়, পাহাড় ও জলাশয়ের ডিজিটাল নথি, ভূমিকম্পজনিত লিকুইফেকশন ঝুঁকির মানচিত্র এবং ১৫টি খাতে ৭৭টি নীতি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
পাহাড় সংরক্ষণ ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা
পরিকল্পনায় উন্মুক্ত স্থান, কৃষিজমি, পাহাড় ও জলাশয় সংরক্ষণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
এতে নগরের প্রায় ১৮ বর্গকিলোমিটার অক্ষত পাহাড়ি এলাকা এবং পুরো পরিকল্পনাধীন এলাকার ১৮৪ বর্গকিলোমিটার পাহাড়ি এলাকা সংরক্ষণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
খসড়ায় পাহাড়ি এলাকায় কী ধরনের স্থাপনা নির্মাণ করা যাবে, সেগুলোর উচ্চতা কত হবে এবং কোন ধরনের উন্নয়ন অনুমোদন পেতে পারে—সে বিষয়েও নির্দেশনা রাখা হয়েছে।
পরিকল্পনায় চট্টগ্রামের জন্য প্রথম ভূমিকম্পজনিত লিকুইফেকশন ঝুঁকির মানচিত্র অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ভূমিকম্পের সময় পানিসিক্ত মাটি শক্তি হারালে মাটি লিকুইফেকশনের ঘটনা ঘটে।
সিডিএর তথ্যমতে, পাহাড়ি এলাকা বাদে পরিকল্পনাধীন এলাকার ৩০ শতাংশের বেশি এ ঝুঁকিতে রয়েছে। তাই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় উঁচু ভবনের পরিবর্তে কম ঘনত্বের উন্নয়নের প্রস্তাব করা হয়েছে।
পরিকল্পনার ৭৭টি নীতির আওতায় পরিবহন, ভূমি ব্যবহার, আবাসন, পরিবেশ, পানিসম্পদ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সামাজিক অবকাঠামোসহ বিভিন্ন খাত অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
ছয়টি প্রশাসনিক অঞ্চল গঠনের প্রস্তাব
খসড়া মহাপরিকল্পনায় জিইসি, মুরাদপুর, মেডিকেল কলেজ এলাকা ও কাট্টলগঞ্জসহ জনবহুল এলাকায় হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অতিরিক্ত কেন্দ্রীভবন নিয়ন্ত্রণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
আবাসিক ভবনের অনুমোদন নিয়ে পরিচালিত হাসপাতাল এবং নিজস্ব পার্কিং সুবিধা নেই—এমন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তাব করেছে সিডিএ।
সরকারি অর্থায়নের ওপর নির্ভরতা কমাতে পরিকল্পনায় সরকার, ভূমির মালিক ও ডেভেলপারদের অংশগ্রহণে ত্রিপক্ষীয় উন্নয়ন মডেলের প্রস্তাব করা হয়েছে।
এ ছাড়া উন্নয়ন অধিকার হস্তান্তর (ট্রান্সফার অব ডেভেলপমেন্ট রাইটস), ল্যান্ড পুলিং, গাইডেড ল্যান্ড ডেভেলপমেন্ট এবং ল্যান্ড রিঅ্যাডজাস্টমেন্টের মতো ব্যবস্থাও পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
বাস্তবায়ন তদারকিতে কমিটি
সিডিএর উপপ্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ ও নতুন মহাপরিকল্পনা প্রকল্পের পরিচালক আবু ঈসা আনসারি বলেন, পরিকল্পনাটির প্রধান পরিবর্তন হলো সমন্বিত উন্নয়নব্যবস্থা।
তিনি বলেন, "আগে বিভিন্ন সংস্থা নিজেদের পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রকল্প বাস্তবায়ন করত। খসড়া পরিকল্পনায় নগর ও নগরের বাইরের এলাকার জন্য পৃথক সমন্বয় কমিটি গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে।"
কমিটিগুলো প্রকল্পগুলো মহাপরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, প্রস্তাবিত অগ্রাধিকার অনুসরণ করছে কি না এবং সময়মতো শেষ হচ্ছে কি না, তা তদারকি করবে বলে জানান তিনি।
আনসারি জানান, পরিকল্পনায় প্রকল্প বাস্তবায়নকে তিনটি পর্যায়ে ভাগ করা হয়েছে—২০২৬-২০৩৫, ২০২৬-২০৪০ এবং ২০৪১-২০৫০।
তিনি আরও বলেন, প্রকল্পগুলোর দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা এবং সম্ভাব্য অর্থায়নের উৎসও পরিকল্পনায় চিহ্নিত করা হয়েছে।
