গ্যাস-সংকট নিয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা চান আন্তর্জাতিক ক্রেতারা, শিগগিরই পরিস্থিতি উন্নতির আশ্বাস বিজিএমইএ-র
বাংলাদেশের চলমান গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি এবং যথাসময়ে তৈরি পোশাকের শিপমেন্ট নিশ্চিত করার বিষয়ে আশ্বস্ত হতে চেয়েছে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা। তবে তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকেরা জানিয়েছেন, আগামী ৮ আগস্টের পর শিল্প কারখানায় গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে এবং ১৪ আগস্টের দিকে তা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশে চলমান গ্যাসসংকটের মধ্যে রপ্তানি আদেশ নির্ধারিত সময়ে উৎপাদন ও জাহাজীকরণ করা সম্ভব হবে কি না—এ নিয়ে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর বাড়তে থাকা উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে গতকাল (৪ আগস্ট) ঢাকায় ক্রেতাদের সংগঠন বায়ার্স ফোরাম বাংলাদেশ–এর প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে বসেছিল বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ)।
টিবিএস-কে বৈঠকে উপস্থিত ব্যক্তিরা জানান, উৎপাদনে বিঘ্নের মুখে পড়া কারখানাগুলোর ক্ষেত্রে প্রয়োজন অনুযায়ী এক থেকে দুই সপ্তাহ পর্যন্ত চালান পাঠাতে বিলম্বের সুযোগ দিতে ঢাকায় অবস্থানরত ক্রেতা প্রতিনিধিদের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছে বিজিএমইএ। এ সুবিধা প্রতিটি ক্ষেত্রে আলাদাভাবে (কেস-বাই-কেস ভিত্তিতে) বিবেচনারও আহ্বান জানানো হয়েছে।
জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে হালনাগাদ তথ্য চান ক্রেতারা
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বৈঠকে উপস্থিত একটি বিদেশি ব্র্যান্ডের এক প্রতিনিধি জানান, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর প্রতিনিধিরা বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করার জন্য সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং সেই পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়নের সময়সীমা সম্পর্কেও বিস্তারিত জানতে চেয়েছেন।
পুমার বাংলাদেশ কান্ট্রি ম্যানেজার মঈন হায়দার চৌধুরী বলেন, ক্রেতারা মূলত জানতে চেয়েছিলেন বর্তমান গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি কখন নাগাদ স্বাভাবিক হবে।
তিনি বলেন, 'বায়ার্স ফোরামের প্রতিনিধিরা জানতে চেয়েছিলেন বর্তমান গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি কখন স্বাভাবিক হবে।'
তিনি জানান, বৈঠকে বিজিএমইএ-র পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, বিকল হয়ে যাওয়া একটি ভাসমান স্টোরেজ ও রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট (এফএসআরইউ) আগামী ৬-৭ আগস্টের মধ্যে মেরামত সম্পন্ন হবে বলে আশা করা হচ্ছে, যার পর গ্যাস পরিস্থিতির উন্নতি হতে শুরু করবে।
মঈন আরও জানান, ক্রেতাদের অবহিত করা হয়েছে যে আগামী ১৮ থেকে ২৪ মাসের মধ্যে আরেকটি ভাসমান স্টোরেজ ও রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট স্থাপন করা হবে। এ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করার জন্য ব্যবসায়ী মহল সরকারকে একটি স্থলভিত্তিক তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) স্টোরেজ সুবিধা স্থাপনের জন্য জোর দাবি জানিয়েছে। একই সাথে ক্রেতারা গ্যাস সরবরাহ পুনরুদ্ধারের অগ্রগতির বিষয়ে নিয়মিত আপডেট দেওয়ারও অনুরোধ জানিয়েছেন।
বৈঠকে বিজিএমইএ জানিয়েছে যে, গ্যাস সংকট দেশের সব শিল্প এলাকায় সমানভাবে প্রভাব ফেলেনি। অংশগ্রহণকারীদের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলের কারখানাগুলো তুলনামূলকভাবে কম সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে, যেখানে ঢাকা, গাজীপুর, সাভার এবং ময়মনসিংহে গ্যাস সংকট অত্যন্ত তীব্র।
বৈঠকে উপস্থিত ইউরোপের একটি শীর্ষ ব্র্যান্ডের ঢাকার কার্যালয়ের এক প্রতিনিধি আলোচনার সারসংক্ষেপ দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড (টিবিএস)-কে জানান। সেই সারসংক্ষেপ অনুযায়ী, গ্যাসসংকটের কারণে ডিবিএল গ্রুপ-এর কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে—এমন দাবি সঠিক নয় বলে বৈঠকে জানায় বিজিএমইএ।
ক্রেতারা সরকারের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা কৌশল সম্পর্কেও আরও বিস্তারিত ব্যাখ্যা চান।
এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবুর সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তা সম্ভব হয়নি।
তবে এর আগে দিনের শুরুতে ঢাকার গুলশানে এক অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে বাবু বলেন, সরকার শিল্প খাতকে আশ্বস্ত করেছে যে আগামী দুই বছরের মধ্যে দেশের জ্বালানি পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হবে, যার ফলে ব্যবসায়ীরা নতুন বিনিয়োগ পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যেতে পারবেন।
বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, 'সরকার বলেছে দুই বছরের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে। তবে একটি সংগঠন হিসেবে আমরা সরকারের সাথে যোগাযোগ শুরু করার জন্য দুই বছর অপেক্ষা করব না। আমরা প্রতি মাসে এর অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করব এবং উন্নয়ন কাজের খোঁজখবর রাখব।'
তিনি আরও জানান, তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে তৈরি পোশাক কারখানাগুলোতে পণ্য উৎপাদন প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কমে গেছে।
তিনি বলেন, 'গ্যাস সংকটের কারণে আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে, তবে আমাদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো ক্রেতাদের আস্থা বজায় রাখা।'
তিনি আরও যোগ করেন, 'এ কারণেই আমরা বায়ার্স ফোরামের প্রতিনিধিদের সাথে বৈঠক করছি বর্তমান জ্বালানি পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে, তাঁদের কাছ থেকে আমরা কী প্রত্যাশা করি তা নিয়ে আলোচনা করতে এবং কীভাবে আমরা যৌথভাবে এই পরিস্থিতি সামাল দিতে পারি তা অনুসন্ধান করতে।'
বিজিএমইএ-র সূত্রগুলো জানিয়েছে, শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের প্রতিনিধিরা সশরীরে বৈঠকে অংশ নিয়েছিলেন, আবার অনেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়েছিলেন।
ক্রেতাদের উদ্বেগ বাড়ছে, বলছেন রপ্তানিকারকেরা
পোশাক রপ্তানিকারকেরা বলছেন, চলমান গ্যাসসংকটের কারণে বাংলাদেশ নির্ধারিত সময়ে রপ্তানি পণ্যের চালান পাঠাতে পারবে কি না—এ নিয়ে বিদেশি ক্রেতাদের উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে।
তিনজন রপ্তানিকারক টিবিএস-কে জানান, বিদেশি ক্রেতারা তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে চেয়েছেন, রপ্তানি আদেশ অনুযায়ী পণ্য সময়মতো পাঠানো সম্ভব হবে কি না।
প্রতি বছর প্রায় ৩৫ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানিকারক স্প্যারো গ্রুপ-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলাম বলেন, তাদের প্রায় সব ক্রেতাই ই-মেইলের মাধ্যমে বর্তমান পরিস্থিতির সর্বশেষ তথ্য জানতে চেয়েছেন।
তিনি বলেন, 'তারা খুবই উদ্বিগ্ন, বিশেষ করে যাদের বড় অর্ডার রয়েছে।' তিনি আরও যোগ করেন, 'আমরা তাদের যতই আশ্বস্ত করার চেষ্টা করি না কেন, তারা কেবল আমাদের আশ্বাসের ওপর নির্ভর করবেন না। তারা নিজেদের মতো করে স্বাধীনভাবে পরিস্থিতি যাচাই করছেন।'
শোভন ইসলাম জানান, ক্রেতারা কারখানার অপারেশনাল বা উৎপাদন ডেটা সংগ্রহ করছেন, এমনকি কিছু কমপ্লায়েন্স টিম জেনারেটর ব্যবহারের রেকর্ড পরীক্ষা করতে সরাসরি কারখানাগুলোও পরিদর্শন করেছে।
তিনি বলেন, 'যদি গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি না হয়, তবে কিছু ক্রেতা তাদের রপ্তানি অর্ডার অন্য দেশে স্থানান্তরিত করতে পারেন।'
উল্লেখ্য, বিশ্বের ৩ হাজারেরও বেশি আন্তর্জাতিক ক্রেতা, ব্র্যান্ড এবং রিটেইলার বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক আমদানি করে থাকে। এদের মধ্যে এইচঅ্যান্ডএম, মার্কস অ্যান্ড স্পেন্সার ইন্ডিটেক্স, প্রাইমার্ক, সিঅ্যান্ডএ, লিডল, কিক, ম্যাঙ্গো, নেক্সট, এলপিপি, মাটালান , ওয়ালমার্ট , গ্যাপ, টার্গেট, পিভিএইচ, লেভি স্ট্রস, ভিএফ কর্পোরেশন, নাইকি, আন্ডার আর্মার এবং আমেরিকান ঈগল আউটফিটার্স অন্যতম।
