গ্যাস সংকটে বিকল্প জ্বালানির দাবি: কী বলছেন এলপিজি ব্যবসায়ীরা
সারাদেশে তীব্র গ্যাস সংকট ও জাতীয় গ্রিডের নিম্ন চাপের কারণে শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে শিল্প খাতের উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসকে (এলপিজি) বিকল্প ও অন্তর্বর্তীকালীন জ্বালানি হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছে এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (লোয়াব)।
গত ২১ সেপ্টেম্বর জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের (ইএমআরডি) সচিবের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে এই দাবি জানায় সংগঠনটি। চিঠিতে শিল্পখাতে এলপিজির সহজ ও ব্যাপক ব্যবহার নিশ্চিত করতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা সংক্রান্ত এবং নীতিগত সংস্কারের একটি আট দফা প্রস্তাব পেশ করা হয়েছে।
প্রস্তাবগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—প্রশাসনিক ও আইনি জটিলতা নিরসন করা, আমদানিকৃত যন্ত্রপাতির বারবার দ্বৈত-পরীক্ষার বাধ্যবাধকতা বাতিল করা, আমদানির অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করা এবং আমদানিকৃত এলএনজি ও জাতীয় গ্রিডের গ্যাসের তুলনায় এলপিজিকে আরও সাশ্রয়ী করা।
লোয়াব সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, 'শিল্পে প্রাকৃতিক গ্যাসের সংকট ও চাপস্বল্পতায় স্বাভাবিক উৎপাদন হুমকির মুখে পড়েছে। দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কারখানার উৎপাদন সচল রাখতে এলপিজিকে বিকল্প, ব্যাক-আপ ও অন্তর্বর্তীকালীন জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের যে উদ্যোগ সরকার গ্রহণ করেছে। এই উদ্যোগকে লোয়াব অত্যন্ত ইতিবাচক বলে মনে করে।'
সংগঠনটি প্রস্তাব করেছে, আলাদাভাবে প্রতিটি কারখানাকে সরাসরি এলপিজি আমদানির সুযোগ না দিয়ে বিদ্যমান লাইসেন্সপ্রাপ্ত অভিজ্ঞ এলপিজি অপারেটরদের মাধ্যমেই যেন আমদানি, মজুত ও শিল্প সংযোগের বিষয়টি পরিচালনা করা হয়। এতে করে জ্বালানির সঠিক মান, সার্বিক নিরাপত্তা ও সরকারের তদারকি জোরদার থাকবে এবং কারখানাগুলোও দ্রুত বিকল্প সেবা গ্রহণ করতে পারবে।
দ্রুত অনুমোদনের দাবি
কারখানায় বাল্ক স্টোরেজ ট্যাংক, ভ্যাপোরাইজার, গ্যাস পাইপলাইন ও বার্নার বসানোর অনুমোদন প্রক্রিয়া নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সম্পন্ন করার আইনি কাঠামো চেয়েছে লোয়াব।
বর্তমানে এ ধরনের একটি প্ল্যান্টের অনুমোদন পেতে ১ থেকে দেড় বছর সময় লেগে যায়, যা কমিয়ে এনে একটি সুনির্দিষ্ট ও দ্রুততম সমন্বিত সময়সূচি নির্ধারণের আহ্বান জানানো হয়েছে।
পাশাপাশি, বিস্ফোরক পরিদপ্তরের (ডিওইএক্স) প্রাথমিক নকশা অনুমোদন ও স্থান পরিদর্শনের জন্য ৭ থেকে ৮ মাস অপেক্ষা না করে যেন অপারেটররা আগে থেকেই প্রয়োজনীয় স্টোরেজ ট্যাংক ও যন্ত্রপাতি আমদানি করে মজুত রাখতে পারেন—চিঠিতে সেই দাবিও তুলেছে সংগঠনটি।
লোয়াবের মতে, এ পদক্ষেপ অপারেটরদের যন্ত্রপাতির তৈরি মজুত বজায় রাখতে এবং গ্যাস সংকটে পড়া কারখানাগুলোতে এলপিজি সুবিধা স্থাপন দ্রুততর করতে সাহায্য করবে।
এর পাশাপাশি, আন্তর্জাতিক সনদপ্রাপ্ত এলপিজি স্টোরেজ ট্যাংক ও রোড ট্যাংকার আমদানির পর দেশে পুনরায় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) দিয়ে পরীক্ষা করানোর বাধ্যবাধকতা বাতিল কিংবা আরও সহজতর করার আহ্বান জানিয়েছে লোয়াব।
অটোগ্যাস লাইসেন্স
২০২৩ সালের ১৫ জুলাই থেকে অটোগ্যাস স্টেশনের নতুন লাইসেন্স দেওয়া স্থগিত রাখা হয়েছে। এই স্থগিতাদেশ অবিলম্বে তুলে নেওয়ার জন্য সরকারের কাছে আলাদাভাবে দাবি জানিয়েছে লোয়াব।
সংগঠনটি প্রস্তাব করেছে, যেসব স্টেশনের নির্মাণকাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে, তারা যদি অননুমোদিত উপায়ে অন্য সিলিন্ডার রিফিল (ক্রস-ফিলিং) না করার অঙ্গীকার দেয়, তবে তাদের বকেয়া লাইসেন্সগুলো দ্রুত ইস্যু করা উচিত।
সংগঠনটি বলেছে, এই ধরনের পদক্ষেপ নিয়ন্ত্রক সুরক্ষা বজায় রাখার পাশাপাশি দেশের এলপিজি অবকাঠামো সম্প্রসারণে সহায়তা করবে।
কর পর্যালোচনার দাবি
শিল্পখাতে এলপিজির ব্যবহার বাস্তবসম্মত ও সাশ্রয়ী করতে এলপিজি এবং সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতির ওপর আরোপিত বিদ্যমান কাস্টমস ডিউটি, ভ্যাট ও কর কাঠামো জরুরি ভিত্তিতে পুনর্নির্ধারণের দাবি জানিয়েছে লোয়াব।
সংগঠনটি উদ্বেগ জানিয়েছে, জাতীয় গ্রিড গ্যাস এবং আমদানিকৃত এলএনজির মূল্যের সাথে সামঞ্জস্য রেখে এলপিজির বর্তমান মূল্য ও কর কাঠামো ঢেলে সাজানো দরকার; কারণ গ্যাস সংকট ও নিম্ন-চাপের কারণে কারখানাগুলো এমনিতেই চরম লোকসানের মুখে পড়ছে।
প্রস্তাবিত এই প্রশাসনিক ও নীতিগত সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করা হলে শিল্প খাতের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য বিকল্প জ্বালানির পথ খুলবে, দেশীয় বিনিয়োগ সুরক্ষিত হবে এবং দেশের সার্বিক জ্বালানি নিরাপত্তাও সুসংহত হবে বলে মনে করছে লোয়াব।
উল্লেখ্য, দীর্ঘদিন ধরে পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ ও প্রয়োজনীয় গ্যাসের চাপ না থাকায় দেশের শিল্পকারখানাগুলো উৎপাদন বিপর্যয়ের মুখে রয়েছে, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক খাত ও নতুন বিনিয়োগকে ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দিয়েছে।
