গ্যাস সংকটে ৮৭% নিটওয়্যার রপ্তানিকারকের শিপমেন্টে বিলম্ব, ছাড় দিতে বাধ্য হয়েছেন ৬০%: জরিপ
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) এক জরিপ অনুসারে, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে প্রায় ৫৫ শতাংশ নিট পোশাক রপ্তানিকারক তাদের রপ্তানি আদেশ বাতিল বা কমে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন।
গতকাল এই জরিপের ফল প্রকাশ করে সংগঠনটি জানায়, ২০ জুলাই থেকে শুরু হওয়া গ্যাস সংকট এবং পরবর্তীতে বিদ্যুৎ সংকটের কারণে দেশের নিট পোশাক রপ্তানিকারকদের ৮৭ শতাংশই সময়মতো শিপমেন্ট করতে ব্যর্থ হয়েছেন। বিলম্বের কারণে বিদেশি ক্রেতাকে ডিসকাউন্ট দিতে বাধ্য হয়েছেন পায় ৬০ শতাংশ রপ্তানিকারক।
বিকেএমইএর ৮০০টি সক্রিয় রপ্তানিমুখী সদস্য কারখানার মধ্যে ১৩৪টি কারখানা থেকে তথ্য সংগ্রহ করে এই জরিপ পরিচালনা করা হয়েছে।
জরিপে উঠে এসেছে, উত্তরদাতাদের মধ্যে ৭৫ শতাংশ গ্যাস সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, আর ৯০ শতাংশ বিদ্যুৎ ঘাটতির কারণে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার মুখে পড়েছেন।
২০২৬ সালের ২১ জুলাই থেকে ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পরিচালিত এই জরিপ অনুযায়ী, এই সময়ে গ্যাসের চাপ স্বাভাবিকের চেয়ে ৭৮ শতাংশ কম ছিল।
বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান টিবিএসকে বলেন, 'গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘাটতির কারণে প্রায় সব উত্তরদাতাই সংকটে পড়েছেন। উৎপাদন এক-তৃতীয়াংশ থেকে অর্ধেক পর্যন্ত কমে গেছে। এর ফলে শিপমেন্টে বিলম্ব, অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যয় ও সরবরাহকারীদের সঙ্গে ব্যবসার ক্ষেত্রে ক্রেতাদের আস্থার অভাবসহ বিভিন্ন নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।'
নিজের কারখানার পরিস্থিতি জানাতে গিয়ে ফতুল্লা অ্যাপারেলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এহসান বলেন, 'গ্যাস সংকটের কারণে সময়মতো কাঁচামাল না পাওয়ায় আমরা প্রায় ৫০ হাজার ডলার মূল্যের রপ্তানি পণ্য বিমানে পাঠাতে বাধ্য হয়েছি। এতে আমাদের বিপুল লোকসান হয়েছে।'
নারায়ণগঞ্জভিত্তিক ও ইউএস-জিবিসি সনদপ্রাপ্ত এই সবুজ কারখানার মালিক এহসান আরও বলেন, 'আমরা আরেকটি পণ্যের চালান সময়মতো পাঠাতে পারিনি। রপ্তানি আদেশটি বাতিল হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছি। আদেশ বাতিল এড়াতে এখন আমাদের ইইউয়ের ক্রেতাদের সঙ্গে আলোচনা করছি। এছাড়া কারখানার কার্যক্রম চালু রাখতে আমাদের বাড়তি খরচ করে ডিজেল কিনতে হয়েছে।'
তিনি আরও বলেন, 'কাঁচামালের অভাবে কাজ না থাকা সত্ত্বেও আমাদেরকে শ্রমিকদের প্রায় ১৪ দিনের মজুরি দিতে হয়েছে।'
বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেমও রপ্তানি আদেশ হারিয়েছেন। কারণ ক্রেতারা তার কারখানার সঙ্গে ব্যবসা করতে আস্থা হারিয়েছে।
হাতেম টিবিএসকে বলেন, 'প্রত্যাশিত ৬২ লাখ পিস টি-শার্টের অর্ডারের বিপরীতে আমরা ৪০ লাখ পিসের অর্ডার পেয়েছি, যা প্রত্যাশিত পরিমাণের চেয়ে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কম। চলমান জ্বালানি সংকটের আশঙ্কায় ক্রেতারা বাংলাদেশি সরবরাহকারীদের সঙ্গে ব্যবসায় আস্থা হারাচ্ছেন; ফলে পূর্ণাঙ্গ আদেশ দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করছেন।'
জরিপে বলা হয়েছে, প্রায় ৯২ শতাংশ কারখানাকে বিকল্প জ্বালানির জন্য বাড়তি খরচ গুনতে হয়েছে। একইসঙ্গে প্রায় সমপরিমাণ কারখানা গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটের কারণে কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়ার কথা জানিয়েছে।
তিন-চতুর্থাংশের বেশি কারখানার মালিক জানিয়েছেন, তাদের কারখানায় আংশিকভাবে উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়েছে। এছাড়া ভিন্ন ভিন্ন কারণে কারখানা পুরোপুরি বন্ধ রাখতে হয়েছে বলে জানিয়েছেন ৭ শতাংশ মালিক।
ফজলে শামীম এহসান বলেন, 'এই জরিপে প্রমাণিত হয়েছে যে, এই সাময়িক জ্বালানি সংকটে কোনো কারখানা বন্ধ হয়নি।
'এই জরিপ থেকে আরও প্রমাণিত যে, সরকারের নীতিগত সহায়তা পাওয়া গেলে, এই সাময়িক সমস্যা থেকে উত্তরণ সম্ভব।'
প্রায় ৮৯ শতাংশ কারখানা মালিক বলেন, এ সংকট বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা হারানোর ঝুঁকি অনেকটাই বাড়িয়ে দিয়েছে।
প্রতি ১০ রপ্তানিকারকের মধ্যে ৬ জন জানিয়েছেন, উদ্ভূত পরিস্থিতি তাদের ঋণখেলাপি হওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলেছে।
উত্তরদাতাদের অর্ধেকেরও বেশি জানিয়েছেন, তাদের রপ্তানি আদেশ বাতিল হয়েছে কিংবা কমে গেছে, যা দেশের নিট পোশাক রপ্তানি খাতে দীর্ঘদিনের জ্বালানি ঘাটতির প্রভাবকেই ফুটিয়ে তোলে।
কক্সবাজারে একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) বিকল হয়ে পড়ায় ২১ জুলাই থেকে দেশে দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস সংকটের সৃষ্টি হয়।
এই প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত দেশের প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোতে গ্যাস সংকট অব্যাহত ছিল। তবে চট্টগ্রামের স্থানীয় উদ্যোক্তারা জানান, সেখানকার পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। এছাড়া সিলেট ও ভোলার কারখানাগুলোতেও গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক ছিল।
তবে এসব এলাকার বাইরে দেশজুড়ে বিভিন্ন শিল্পকারখানা ও আবাসিক গ্রাহকরা তখনও তীব্র গ্যাস সংকটের মুখে ছিলেন।
বিদ্যুতের লোডশেডিং এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, শিল্পাঞ্চলগুলোতে দিনে সাত থেকে নয় ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে।
সোমবার প্রধানমন্ত্রী ব্যবসায়ী নেতাদের আশ্বস্ত করে জানান, ওইদিন রাত থেকেই গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হবে।
এদিকে পোশাক খাতের মালিকরা রপ্তানি আদেশ কমে যাওয়ার কথা বললেও, ঢাকায় অবস্থানরত অন্তত চারটি ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা সম্প্রতি টিবিএসকে বলেছেন, তাদের পণ্যের ক্রয়াদেশ স্বাভাবিক রয়েছে। এমনকি একজন ক্রেতা প্রতিনিধি জানান, তারা সম্প্রতি বাংলাদেশে ব্যবসার পরিধি আরও বাড়িয়েছেন।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যমতে, জুলাই ও আগস্টে বাংলাদেশের সার্বিক রপ্তানি পরিস্থিতির চিত্র বেশ আশাব্যঞ্জক ছিল।
