‘আমি নিজেও ভুক্তভোগী’: শিল্পখাতে বেপরোয়া চাঁদাবাজির তথ্য তুলে ধরলেন বিটিএমএ সভাপতি
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের শিল্পাঞ্চলগুলোতে নতুন প্রভাবশালী গ্রুপ নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল। গত ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর—কিছু এলাকায় এসব নেটওয়ার্কের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন মেরুকরণ, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন কারখানা মালিকেরা।
তারা জানান, নির্বাচনের পর থেকে চাঁদাবাজি, ঝুটসহ শিল্পবর্জ্য জবরদখল, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হুমকি, ট্রাক ছিনতাই ও মব সৃষ্টি করে ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনা মারাত্মক রূপ নিয়েছে।
এমনকি বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল নিজেই চাঁদাবাজির শিকার হয়েছেন বলে জানিয়েছেন।
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে তাঁর পেপার ও বোর্ড কারখানায় পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়ে বিটিএমএ সভাপতি বলেন, পণ্যবাহী ট্রাক নিয়মিতভাবে চলাচলে বাধা দেওয়া হচ্ছে এবং বাজারমূল্যের চেয়ে কম দামে পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য করা হচ্ছে।
টিবিএসকে তিনি বলেন, "আমরা আমাদের পণ্যবাহী ট্রাক পাঠাতে পারছি না। ১০ টাকার মালামাল ৮ টাকায় তাদের কাছে বিক্রি করতে বলে…প্যাকেজ ডিল করতে বলে। স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মদদে লোক নিয়োগ দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে, মব তৈরি করে চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে।"
তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, "এসব পরিস্থিতি আগামীতে আরো প্রকট হবে।"
অভিযোগ দিয়েছে দুই প্রতিষ্ঠান
ভালুকার দুটি প্রধান প্রতিষ্ঠানের দায়ের করা অভিযোগপত্রের অনুলিপি দেখেছে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড।
এনভয় টেক্সটাইলসের প্রশাসন বিভাগের উপ-মহাব্যবস্থাপক সারোয়ার হোসেনের পক্ষ থেকে ময়মনসিংহের শিল্পাঞ্চল পুলিশ ও স্থানীয় থানায় গত ১১ জুলাই দেওয়া এক অভিযোগে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির প্রধান গেইটের সামনে থেকে একটি ট্রাক একদল দুর্বৃত্ত জোরপূর্বক ছিনতাই করে নিয়ে যায়। পরবর্তীতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অবহিত করার পর ট্রাকটি রাতে উদ্ধার হয়।
এতে ময়মনসিংহ জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক যুগ্ম সাংগঠনিক সম্পাদক ইব্রাহিম খলিল, একই দলের নেতা সোহাগ মিয়া ও তাদের আরো কয়েকজন সহযোগী জড়িত বলে অভিযোগ করা হয়।
এতে আরো বলা হয়, "অভিযুক্তরা কারখানা থেকে ওয়েস্টজ মালামাল (ঝুট) বের না করার জন্য প্রকাশ্যে হুমকি দেয়। এছাড়া প্রতিষ্ঠানের নির্মাণকাজে ব্যবহৃত নির্মাণসামগ্রী কারখানায় প্রবেশে বাধা দিয়ে আসায় নির্মাণকাজ বন্ধ হয়ে গেছে।" এই অবস্থায়, প্রতিষ্ঠানটি ওই এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করার অনুরোধ জানিয়েছে।
ডিএমপির গুলশান বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনারের কাছে জমা দেওয়া এসকিউ গ্রুপের কান্ট্রি হেড ওয়ারিসুল আবিদ স্বাক্ষরিত পৃথক এক অভিযোগে জানানো হয়, নতুন এক ভেন্ডরকে ঝুট ডিসপোজালের দায়িত্ব দেওয়া হয়, এবং ৪ জুলাই থেকে ঝুট অপসারণের কথা ছিল। কিন্তু দুঃখজনকভাবে স্বল্প সময়ের মধ্যে কিছু ঘটনা ঘটে যায়।
অভিযোগে বলা হয়, ৩ জুলাই, ২০২৬ তারিখ রাতে ঢাকায় কোম্পানির প্রশাসন বিভাগের মহাব্যবস্থাপক এফএম নিয়াজ ইলাহী খানের বাসভবনে তাঁর এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের প্রাণনাশের স্পষ্ট হুমকি দিয়ে অজ্ঞাতনামা এক চিঠি পাঠানো হয়।
এতে আরও বলা হয়, "প্রায় একই সময়ে নিম্নস্বাক্ষরকারী (ওয়ারিসুল আবিদ) অজ্ঞাত এক ব্যক্তির কাছ থেকে টেলিফোনে একটি হুমকি পান, যেখানে কোম্পানির ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তের সাথে সংশ্লিষ্টতার জন্য তাকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়।" এছাড়া নতুন ভেন্ডরের ঝুট বের করার নির্ধারিত দিনে কারখানার প্রধান ফটকের বাইরে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো হয়, যার ফলে কারখানার অভ্যন্তরে শ্রমিক-কর্মচারীদের মধ্যে ভীতির সৃষ্টি হয় বলেও জানানো হয়।
অভিযোগে আরও বলা হয়, ৫ জুলাই এক অজ্ঞাত ব্যক্তি নিয়াজ এলাহীর বাসভবনে গিয়ে কেয়ারটেকারের মাধ্যমে পুনরায় হুমকি দেয়। এসব ঘটনার পর প্রতিষ্ঠানটি ভালুকা থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) ও এজাহার দায়ের করেছে বলে জানিয়েছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ব্যবসা-বান্ধব পরিবেশ সুনিশ্চিত করার বিষয়ে বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের যে প্রতিশ্রুতি ছিল, এসব ঘটনা তার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
তিনি বলেন, "এসব অপকর্ম অবিলম্বে বন্ধ করা না হলে তা আত্মঘাতী প্রমাণিত হবে এবং একপর্যায়ে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। এসব কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে দলটির পক্ষ থেকে অবিলম্বে স্পষ্ট সাংগঠনিক বার্তা দেওয়া উচিত, পাশাপাশি প্রশাসনকে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিতে হবে।"
হুমকি ও ট্রাক ছিনতাইয়ের অভিযোগ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের
টিবিএস ১২ জন শিল্পোদ্যোক্তার সঙ্গে কথা বলেছে। তাদের মধ্যে ছয়জন জানিয়েছেন, নিজেদের তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল বা পেপার মিলের ওয়েস্টেজ বা শিল্পবর্জ্য স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলোর কাছে বিক্রি করতে তারা বাধ্য হচ্ছেন; কেউ কেউ সরাসরি চাঁদাবাজির শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছেন।
অন্য চারজন জানান, তারা স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠীর কাছে বর্জ্য বিক্রি করছেন, তবে এই ব্যবস্থা নিয়ে তাদের কোনো অভিযোগ নেই। বাকি দুজন জানান, তারা এমন কোনো চাপের মুখে পড়েননি; তবে তাদের দুজনকেই ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা থাকা প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
তবে প্রতিশোধ বা প্রতিহিংসার আশঙ্কায় কোনো কারখানা মালিকই নিজেদের নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আশুলিয়ার ইয়ারপুর ইউনিয়নের একটি টেক্সটাইল মিলের মালিক টিবিএসকে বলেন, "প্রায় এক মাস আগে স্থানীয় যুবদলের পরিচয় দিয়ে এক ব্যক্তি তিন দফায় আমার কারখানায় এসে কর্মকর্তাকে বলেছে, তাকে ছাড়া অন্য কাউকে যাতে ওয়েস্টেজ (ঝুট) না দেওয়া হয়।"
কারখানার মালিক বলেন, "তিনি হুমকি দিয়েছিলেন, যদি আমরা অন্য কারো কাছে ওয়েস্টেজ বিক্রি করি, তাহলে কোনো ট্রাক কারখানা প্রাঙ্গণ ছেড়ে যেতে দেওয়া হবে না।" তিনি আরও জানান, স্থানীয় এক বিএনপি নেতা হস্তক্ষেপে কিছুদিনের জন্য থেমে ছিল। কয়েকদিন আগে ওই ব্যক্তি আবার কারখানায় এসেছে।"
"এভাবে চলতে থাকলে ব্যবসা করা যাবে না" –জানিয়ে তিনি বলেন, "আমার নাম বা কারখানার নাম প্রকাশ পেলে কারখানা আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দিতে পারে।"
খোঁজ নিয়ে টিবিএস জেনেছে, অভিযুক্ত ওই ব্যক্তির নাম রিপন শিকদার। যোগাযোগ করা হলে রিপন নিজেকে স্থানীয় যুবদল নেতা হিসেবে পরিচয় দেন এবং অভিযোগ অস্বীকার করেন।
তিনি বলেন, "এই ব্যবসা সব সময়ই রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণে ছিল। আগে আওয়ামী লীগ যুক্ত ছিল। এমনকি এখনও কিছু আওয়ামী লীগ কর্মী এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। আমরা কাউকে জোর করছি না।"
গাজীপুরের বার্ষিক ৫০ কোটি ডলারের বেশি রপ্তানি আয় থাকা একটি পোশাক তৈরি কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক, তিনিও নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, "আগেও আমাদের ঝুট দিতে হতো, এখনও হচ্ছে। তবে নির্বাচনের পর এই উৎপাত আরও বেড়েছে। ১০ টাকার জিনিসের দাম এক টাকা দিচ্ছে। তবু ঝামেলা এড়াতে বা মানসম্মানের ভয়ে দিতে হচ্ছে।"
তিনি বলেন, "আগের সরকারের সময় যারা ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ করতো, তাদের কাছ থেকে তাও কিছু হেল্প পেতাম। এখনকার এসব ব্যক্তিদের কাছ থেকে তাও পাচ্ছি না" –উল্লেখ করে তিনি বলেন, "এসব কারণে সরকারের অনেক ভালো অর্জন ম্লান হচ্ছে।"
অপর একজন উদ্যোক্তা, যার কারখানা ধামরাইয়ে—তিনি বলেন, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ঝুট এখন স্থানীয় সূতিপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রামিজুর রহমান চৌধুরীর লোকজনকে দিতে হচ্ছে।
রামিজুর রহমান স্থানীয় লোকজন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করলেও—কোনো ধরনের অনিয়মের কথা অস্বীকার করেছেন। যোগাযোগ করা হলে টিবিএসকে তিনি বলেন, "যখন যারা ক্ষমতায় থাকে তারা নেয় (ঝুট)। আমাদের লোকজনও নিচ্ছে। তবে কিনে নিচ্ছে।"
অভিযোগ অস্বীকার ভালুকার অভিযুক্তদের
ভালুকার ঘটনাগুলোর জন্য স্থানীয় কয়েকজন ব্যবসায়ী বিএনপির স্থানীয় সংসদ সদস্য ফখর উদ্দিন আহমেদ বাচ্চুকে (ময়মনসিংহ-১১) দায়ী করেছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি পোশাক কারখানার মালিক, যার একটি কারখানাতেই প্রায় ১২,০০০ শ্রমিক কর্মরত, টিবিএসকে বলেন, "শুধু গার্মেন্টস বা শিল্প কারখানাই নয়, গরুর খামারও তার (বাচ্চু) তার হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছে না।"
প্রসঙ্গত, নানা অনিয়মের অভিযোগে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে বিএনপি থেকে একবার বহিস্কৃত হয়েছিলেন তিনি। তার ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা বেআইনি কর্মকাণ্ডে জড়িত—এমন অভিযোগে গত ১৮ জুলাই নতুন করে তাঁকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে বিএনপি।
যোগাযোগ করা হলে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ফখর উদ্দিন আহমেদ বাচ্চু। এনভয় টেক্সটাইলসের অভিযোগে নাম থাকা ইব্রাহিম খলিলের পক্ষে সাফাই গেয়ে বাচ্চু বলেন, কোনো অনিয়মে খলিলের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না।
বাচ্চু বলেন, "তিনিই এনভয় টেক্সটাইলের ট্রাকটি এক ঘন্টার মধ্যে উদ্ধার করে দিয়েছেন।"
ইব্রাহীম খলিল অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, "ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশের এসপি গাড়িটি উদ্ধার করার ক্ষেত্রে আমার সহযোগিতা চাইলে, আমি গাড়িটি উদ্ধারে সহযোগিতা করেছি।"
তিনি বলেন, "এখানে সব কারখানায় এই ব্যবসায়ের সাথে (ঝুট) লোকাল (স্থানীয়) কেউ না কেউ জড়িত আছে। এখানে আওয়ামী লীগের কিছু লোকজন এনভয় টেক্সটাইলে ব্যবসা এখনও নিয়ন্ত্রণ করছে। এখন দেশ পরিবর্তন হয়েছে, আমাদের লোকজন যদি ব্যবসা-বাণিজ্য করতে চায়– এটা অন্যায়ের কিছু নয়।"
তবে তিনি স্বীকার করেছেন, প্রতিষ্ঠানটিকে নিজেদের লোকজনকে ব্যবসা দেওয়ার জন্য তিনি বলেছেন। "কিন্তু তারা আমাদের ব্যবসা দেবে না। তারা ১৭ বছর ধরে আওয়ামী লীগের লোকজনকে দিয়ে ব্যবসা করাচ্ছে।"
এদিকে এসকিউ গ্রুপের মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ভালুকা থানার ওসি জাহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, "মামলার তদন্ত চলছে। এপর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি।" এর বাইরে তিনি আর কিছু বলতে চাননি।
