একই মানসিক যন্ত্রণায় ঋত্বিক ঘটক ও বিনয় মজুমদার
বিনয়কে গভীরভাবে পড়ার পর মনের ভেতর কেমন যেন একটা শূন্যতায় ভরে গেল। কোনো ভালো বই শেষ করার পর এমনটা প্রায়ই হয়। তাঁর 'হাসপাতালে লেখা কবিতাগুচ্ছ' বইটি প্রথম বই 'ফিরে এসো চাকা'র চেয়ে বেশ আলাদা ছিল। তবে এই বইয়ে পাওয়া যায় পাগলাগারদের ভেতরের জীবনের এক স্পষ্ট বিবরণ। বোঝা যায়, একটা মানুষকে সেখানকার পরিবেশ কতটা ছোট আর অসহায় করে ফেলে। পাশাপাশি উঠে আসে একজন কবির মনের নানা ওঠানামার ঢেউ। আমার কাছে এই বইটি 'ফিরে এসো চাকা'র চেয়েও বেশি ব্যক্তিগত মনে হয়েছিল। বইটা যখন আর বিছানার পাশে রাখা নেই, তখন ভাবলাম, সময়টা এখন আমার কীভাবে কাটবে?
এক সপ্তাহ পর হুট করেই সিদ্ধান্ত নিলাম, ঠাকুরনগর যাব। ঠাকুরনগর বিনয়ের বাবার বাড়ি। কলকাতা থেকে প্রায় চার ঘণ্টার পথ। বাংলাদেশ সীমান্তের খুব কাছাকাছি, ইছামতী নদীর পাড় ঘেঁষে গড়ে ওঠা ছোট এই শহর। আয়তনে ছোট হলেও রাজনৈতিকভাবে এলাকাটি গত কয়েক বছরে বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এর মূল কারণ মতুয়া সম্প্রদায়। এই অঞ্চলের একটা বড় অংশের ভোটার তারা। সব রাজনৈতিক দলই তাদের দিকে তাকিয়ে থাকে।
চলতি বছরের শুরুর দিকে অফিসের কাজের সূত্রেই প্রথম ঠাকুরনগরের কথা শুনি। আমাকে সেখানে একটি দায়িত্ব দিয়ে পাঠানো হয়েছিল। দেশভাগের পর নমশূদ্র সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত এই মতুয়ারা পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলা এবং উত্তর ও দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার আশপাশের এলাকায় বসবাস শুরু করেন। গত কয়েক বছরে তাদের রাজনৈতিক গুরুত্ব বেড়েছে অনেকটাই।
ঠাকুরনগরে বিনয়ের বাড়ির ব্যাপারে খোঁজখবর নিয়ে জানলাম, সেটি সাধারণ মানুষের জন্য খোলা থাকে। স্থানীয়দের একটি ট্রাস্ট এখন বাড়িটির দেখাশোনা করে। বিনয়ের প্রকাশকের কাছে ফোন করে আরও কিছু তথ্য পেলাম। ট্রাস্টের এক সদস্য শম্ভুর ফোন নম্বরও পেয়ে গেলাম। ফোনে কথা হলে শম্ভু জানালেন, 'আমি ছোটবেলা থেকেই ওনাকে চিনি। আমরা একই পাড়ায় বড় হয়েছি। ওনাকে জেঠু বলে ডাকতাম। তখন অবশ্য বুঝিনি তিনি কত বড় মাপের সাহিত্যিক। সন্ধ্যায় যখন তিনি বইয়ের দোকানে বা রেলওয়ে স্টেশনে চা খেতে আসতেন, আমরা ওনার সাথে আড্ডা দিতাম বা ওনার গল্প শুনতাম।'
বিষয়টি নিয়ে কথা বলার জন্য আমি মিহিরকে ফোন করলাম। বললাম, 'আমি ঠাকুরনগরে বিনয়ের বাড়িতে যাওয়ার কথা ভাবছি, তুই যাবি?'
মিহির বলল, 'বলিস কী! সত্যি যাবি সেখানে? না রে, এখন কাজের অনেক চাপ। তুই যা, কোনো সাহায্য লাগলে বলিস।'
ভাবছিলাম ঠাকুরনগর যাওয়ার সাথে অফিসের কাজটাকেও মিলিয়ে নেব কি না। ইচ্ছে করলেই তা করা যেত। বিশেষ করে মতুয়া সম্প্রদায়ের বয়োজ্যেষ্ঠ প্রতিনিধি বীণাপানি দেবীর ছবি তোলার কাজটা সেরে নেওয়া যেত। কিন্তু কেন যেন মন থেকে তা চাইছিল না। বিনয়কে পড়ার পর থেকেই এক অচেনা বিষাদ আমাকে ঘিরে ধরেছিল। মনের ভেতরে বারবার মনে হচ্ছিল, কবি হিসেবে তিনি বোধহয় তাঁর প্রাপ্য সম্মান পাননি। যখন আমি তাঁর কবিতা, তাঁর অসামান্য প্রতিভা আর অদ্ভুত জীবনের গল্পের সন্ধান পাই, তত দিনে তিনি আর বেঁচে নেই। তাঁর বাড়িতে যাওয়াটা যেন তাঁর জীবনের কোনো বাস্তব স্পর্শ পাওয়ার চেষ্টা। সেটা না হলে তাঁকে নিয়ে আমার পড়াটাই যেন অসম্পূর্ণ থেকে যেত।
অফিস থেকে ছুটি নিলাম। সাড়ে ১১টার দিকে বাবার গাড়ি নিয়ে রওনা হলাম। সাথে ড্রাইভার প্রশান্ত। পথে প্রশান্তের সাথে কথা বলতে গিয়ে জানলাম, ঠাকুরনগরের ঠিক পাশেই তার গ্রাম। হাইওয়ে ধরে যাওয়ার পথে নানা ছোট ছোট শহর আর গ্রাম চোখে পড়ছিল। প্রশান্ত তখন আমাকে সেই জায়গাগুলোর ছোট ছোট গল্প আর সেখানকার সেরা খাবারদাবারের কথা শোনাচ্ছিল। শেষমেশ যখন ঠাকুরনগরের কাছাকাছি পৌঁছালাম, তখন বেলা তিনটে বেজে গেছে। শহরের বাইরে এসে একটু দাঁড়ালাম। চারপাশের সবুজ রূপটা দেখার জন্য। শহর ছেড়ে মাত্র কয়েক ঘণ্টার দূরত্বে প্রাকৃতিক দৃশ্য কতটা বদলে যেতে পারে। তা ভেবে প্রতিবারই অবাক হই। চারপাশের এই সবুজের যেন কোথাও শেষ নেই।
গাড়িটি এবার মূল যশোর রোড ছেড়ে একটি ছোট মেঠোপথে ঢুকল। রাস্তার দুইপাশে বিস্তীর্ণ সরিষাখেত। কাছেই ইছামতী নদী থেকে ভেসে আসা মৃদু বাতাসে সরিষা ফুলগুলোকে সোনালি দোলা দিচ্ছিল। সরু পথের দুপাশে কলাগাছ আর উঁচু উঁচু সুপারিগাছের সারি। আমাদের গাড়ি যখন পার হচ্ছিল, ছোট ছোট শিশু আর মাঝবয়সী সাইকেল আরোহীরা থেমে পড়ছিলেন। আর হাত নেড়ে নেড়ে আমাদের স্বাগত জানাচ্ছিলেন।
সেপ্টেম্বর মাসে যশোর রোডে অবস্থান করার বিষয়টি আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করল। হঠাৎ মনে পড়ে গেল প্রিয় কবি অ্যালেন গিন্সবার্গের কথা, আর তাঁর সেই বিখ্যাত কবিতা 'সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড'। যশোর রোড কেবল একটি রাস্তা নয়, একটি অনুভূতির নাম। গিন্সবার্গের সেই পঙক্তিগুলো নিজের অজান্তেই আমার ঠোঁটে ভেসে উঠল:
শত শত চোখ আকাশটা দেখে, শত শত শত মানুষের দল,
যশোর রোডের দুধারে বসত বাঁশের ছাউনি কাদামাটি জল।
কাদামাটি মাখা মানুষের দল, গাদাগাদি করে আকাশটা দেখে,
আকাশে বসত মরা ইশ্বর, নালিশ জানাবে ওরা বল কাকে।
ঘরহীন ওরা ঘুম নেই চোখে, যুদ্ধে ছিন্ন ঘর বাড়ী দেশ,
মাথার ভিতরে বোমারু বিমান, এই কালোরাত কবে হবে শেষ।
...
[ইংরেজি থেকে অনুবাদ: খান মোহাম্মদ ফারাবী]
'প্রশান্ত দূরে হাত উঁচিয়ে ইছামতী নদীর প্রবাহ দেখানোর চেষ্টা করছিল। 'খবর'কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মলয় রায়চৌধুরী একটি গল্প বলেছিলেন। পৈতৃক ভিটেমাটিতে যাওয়ার আকুলতায় বিনয় নাকি ইছামতী নদীর পানি হেঁটে পার হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। মলয়দার কথাগুলো এখন মনে পড়ছে: 'ভেবে দেখো, একটা আস্ত নদী হেঁটে পার হওয়ার চেষ্টা! মানুষটার মনের অবস্থা তখন কেমন ছিল, তা কি বোঝা সম্ভব? এই হারানোর বেদনা কতটা গভীর, তা বোঝা কঠিন। ভারতজুড়ে একমাত্র পাঞ্জাব ছাড়া অন্য কোনো রাজ্য এই যন্ত্রণা বুঝতে পারবে না। কোনো না কোনোভাবে এই দুঃখ এখনো আমাদের এবং আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে ঘিরে রেখেছে।'
একজন মানুষ নদী হেঁটে পার হওয়ার চেষ্টা করছেন, এটা ভেবে অবাক হয়েছিলাম। মলয়দাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, 'কিন্তু নদী পার হতে যাবেন কেন? বৈধ পথে কেন গেলেন না? ভিসা করে বাস, ট্রেন বা বিমানে তো যেতে পারতেন?'
মলয়দা উত্তর দিয়েছিলেন, 'মানুষ যখন প্রবল আবেগে উত্তাল হয়ে ওঠে, তখন সে মনে করে সেই জায়গার ওপর তার অধিকার জন্মগত। মাটি, পানি সবই তখন একান্ত নিজের মনে হয়। এমন অবস্থায় সাধারণ বুদ্ধিশুদ্ধি কাজ করে না। বিমানে করে পদ্মার ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়ার সময় ঋত্বিক ঘটক যে কেঁদে ফেলেছিলেন, সে কথা কি তোমার মনে নেই?'
আমি বললাম, 'ঋত্বিক ঘটকের এই গল্পটা তো আমার জানা ছিল না, মলয়দা।'
মলয়দা বললেন, 'কলেজে পড়ার সময় আমরা (ইন্ডিয়ান পিপলস থিয়েটার অ্যাসোসিয়েশন বা ভারতীয় গণনাট্য সংঘ) আইপিটিএর নাটকের শো দেখতে যেতাম। থিয়েটার হলে প্রায়ই তাদের সাথে দেখা হতো।' সাংবাদিক সত্তা দিয়ে আমি তখনো বুঝে উঠতে পারছিলাম না কেন বিনয় নদী পার হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন—একবার নয়, অন্তত তিনবার। তবে হারানোর কষ্ট এবং তার বেদনার ভার আমি বুঝতে পারতাম। চলতি বছরের শুরুর দিকে মতুয়াদের নিয়ে কাজ করার সময় আমি এমন অনেকের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম, যারা বহু বছর আগে সীমান্ত পার হয়ে এখানে এসে বসতি গড়েছেন। সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময় তারা কেঁদে ফেলেছিলেন। এত বছর পরেও সেই হারানোর ক্ষত তাদের মনে গেঁথে ছিল। প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হওয়ার পর, মূল পাতায় সাক্ষাৎকারের সাথে আমার তোলা ছবিগুলো ছাপা হলে অফিসে বহু অচেনা মানুষের ফোন আসতে থাকে। তারাও একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা শোনাতে চাইছিলেন। অবশ্য অন্য রকম কিছু ফোনও এসেছিল। তারা এই মানুষদের অবস্থান জানতে চাইছিল, যাতে তাদের ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া যায়। ঘটনাটি যেভাবে মানুষের মনোযোগ টেনেছিল, তা আমার মনে দীর্ঘস্থায়ী দাগ কেটে যায়।
আমি প্রশান্তকে বিনয়ের বাড়ির পথ ছেড়ে অন্যদিকে গাড়ি ঘোরাতে বললাম। আমরা এবার ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের নো-ম্যান্স ল্যান্ড এলাকার দিকে এগোলাম। গাড়ি থেকে নেমে দেখলাম একটা ছোট রাস্তা। কয়েকটি দোকান ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। সেনাসদস্যরা টহল দিচ্ছে। মাইকে গান বাজছে। আর ভ্যানচালকেরা জিনিসপত্র বিক্রি করছে। তারের বেড়ার ওপাশে দূরে তাকালাম, যেখানে একসময় আমার পূর্বপুরুষদেরও ভিটেমাটি ছিল। সত্যি বলতে সেখানে কী দেখার আশা করেছিলাম জানি না—হয়তো কোনো সাইনবোর্ড বা সশস্ত্র প্রহরীর দীর্ঘ সারি। কিন্তু তেমন কিছুই ছিল না। দুটি যে আলাদা দেশ, তার কোনো চিহ্নই সেখানে নেই। চোখে পড়ল কেবল মাইলের পর মাইল বিস্তৃত সবুজ মাঠ। কাজের সূত্রে আমি বাংলার দুই পারেই ঘুরেছি। বেশির ভাগ জায়গাতেই বাংলাদেশের সাথে সীমান্ত বেশ শিথিল মনে হয়েছে, অনেক জায়গায় তো কোনো বেড়াও নেই। আমি নিজে দেশভাগ দেখিনি, তবে সীমান্তের এত কাছে বসবাসকারী বিনয় ঠিক কী ধরনের মানসিক অবস্থার মধ্য দিয়ে গিয়েছেন, তা সহজেই অনুভব করতে পারছিলাম। রাস্তার ওপারে বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সের (বিএসএফ) জওয়ানদের টহল দিতে দেখলাম। বুঝলাম এখানে মিলিটারি জ্যামার সক্রিয়। বিএসএফ একজন জওয়ান ধীরে ধীরে সাইকেল চালিয়ে আমার পাশ দিয়ে গেল। তাঁর সাইকেলে ঝুলছিল একটি ছোট রেডিও। সেখান থেকে মোহাম্মদ রফির কণ্ঠ হালকা সুরে ভেসে আসছিল—'সভি কুছ লুটা কর হুয়ে হাম তুমহারে/ কে হ্যায় জিত উসকি জো দিল আজ হারে...' (সব হারিয়েই আমি হলাম তোমার/ জিত তো তারই, আজ যে হৃদয় হারাল..)
(বিনয়ের কবিতার পঙক্তি, 'জাগতিক সফলতা নয়, শয়নভঙ্গির মতো/অনাড়ষ্ট সহজবিকাশ সকল মানুষ চায়।' অনন্ত প্রশ্ন, বিনয় কী তা পেয়েছিল?
[মৈত্রেয়ী চৌধুরীর নতুন উপন্যাস 'লেটার্স ফ্রম দ্য অ্যাসাইলাম: এ নভেল অব আর্ট, ম্যাডনেস অ্যান্ড মেমোরি' থেকে নেওয়া। এবং স্ক্রলইন]
ভাষান্তর: আমিল বতুল