কবি নজরুলের ৫০ বছর ধরে বাক্সবন্দী ছবি, প্রথম প্রকাশ্যে এল টিবিএসের হাত ধরে
টিভোলী ফটোগ্রাফিকস নামে শাহবাগে একটা স্টুডিও ছিল। পিজি হাসপাতালের এক্সটেনশন বিল্ডিংয়ে যে বিপণিবিতান, তার নিচতলায় ছিল টিভোলী নামে একটি কসমেটিকসের দোকান। তার ওপরের তলায়ই ছিল টিভোলী ফটোগ্রাফিকস। ঠিকানা-১৩ শাহবাগ, ঢাকা। জিল্লুর রহমান নামের এক সৌখিন আলোকচিত্রী জাপানের ফুজি কালার থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে এসে স্বাধীনতার পরের বছর এই স্টুডিওটা স্থাপন করেন। স্টুডিডিওটার তখন বেশ নামডাক। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়, পিজি হাসপাতাল, চারুকলা ও রেডিও বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ লোকজন এই স্টুডিওতে ছবি তুলতে আসতেন। জয়নুল-কামরুলের মতো ধীমান শিল্পীরা ছবি তুলতে এসে এখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প-গুজব করতেন, আড্ডা দিতেন। সেই সময় টিভোলীতে ফটোগ্রাফার হিসেবে কাজ শুরু করেন ২৩ বছরের এক তরুণ—নাম স্বপন সাহা। মিষ্টি ব্যবহারের জন্য পিজি হাসপাতালের ডাক্তার, নার্স কিংবা চারুকলার শিল্পী-শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাঁর খুব ভাব। টিভোলীতে কাজ করার সুবাদে এই আলোকচিত্রী কবি কাজী নজরুল ইসলামের বেশ কিছু ছবি তোলার সুযোগ পান। নজরুলের সেই দুর্লভ ছবি আর নেগেটিভ পঞ্চাশ বছর ধরে তাঁর বাসায় বাক্সবন্দী হয়ে পড়েছিল।
স্বপন সাহার বয়স এখন ৭৩ বছর। সপরিবারে থাকেন ঢাকার হাতিরপুলে। গত ১৪ জুলাই রাতে তাঁর বাসায় যাই। গল্প করতে করতে হঠাৎ তিনি কবি নজরুলের গুপ্ত রত্নভান্ডারের প্রসঙ্গ আনেন। নজরুলের এই ছবিগুলোকে তিনি তাঁর সেরা সম্পদ বলে মনে করেন। স্বপন সাহা বলতে শুরু করলেন, জীবনের একেবারে উপান্ত সময়ে কবি নজরুল পিজি হাসপাতালের ১১৭ নম্বর কেবিনে ভর্তি ছিলেন। ওই সময় পিজি হাসপাতালের যেকোনো অনুষ্ঠান কিংবা ছবি তোলার প্রয়োজনে মাঝেমধ্যেই তাঁর ডাক পড়ত। তিনি অন্তত তিনবার কবি নজরুলের ছবি তোলার সুযোগ পান। প্রথমবার তিনি কবির যে ছবি তোলেন, আন্ডার একপোজড হওয়ার কারণে আলোকসংবেদনশীল কাগজের গায়ে তা কখনো পরিস্ফুটিত হওয়ার সুযোগ লাভ করেনি। পরের বার তিনি যে ছবিগুলো তুললেন, যতটা সময় নজরুলের সান্নিধ্য পেলেন; তা তাঁর জীবনের সবচেয়ে সেরা মুহূর্ত। ওই দিন ছিল ১৯৭৬ সালের ১৯ জুন। নেগেটিভের প্যাকেটের গায়ে তিনি দিন-তারিখ লিখে রেখেছিলেন। ফলে ওই দিনটার কথা তাঁর স্পষ্ট মনে আছে। সর্বশেষ তিনি নজরুলের ছবি তোলেন ওই বছরের জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময়ে। কবির সঙ্গে ওই দিনই তাঁর শেষ দেখা। তবে শেষ দিনের ছবিগুলো তাঁর মনঃপূত হয়নি।
পাঁচ দশক আগের ঘটনা মনে করে স্বপন সাহা বেশ স্মৃতিকাতর হলেন। ১৯৭৬ সালের জুন মাসের মাঝামাঝি সময়ে এক সকালে পিজি হাসপাতালের এক কর্মচারী টিভোলী স্টুডিওতে এলেন। স্বপন সাহাকে বললেন, 'আজ কবি নজরুলের ছবি তুলতে হবে।' বিদ্রোহী কবির ছবি তোলার ডাক পাবেন, এ কথা তাঁর কল্পনায়ও ছিল না। হাসপাতালের কঠোর নিরাপত্তার ভেতর কবির ছবি তোলা তখন দুরূহ ব্যাপার। পত্রিকার ফটোগ্রাফারদেরও ছবি তোলার অনুমতি মিলত না সহজে। কিন্তু এত সহজে কবির ছবি তোলার সুযোগ পাবেন, এই আনন্দে তিনি মহা উত্তেজিত। ছোটবেলায় যাঁর কবিতা বইয়ে পড়েছেন, তাঁর ছবি তুলতে পারা যা-তা ব্যাপার না, বিশাল ভাগ্যও লাগে! ইয়াশিকা ওয়ান হানড্রেট ফোর জি ক্যামেরাটা কাঁধে নিয়ে তিনি দ্রুত ছুটলেন পিজি হাসপাতালের দোতালায়। ১১৭ নম্বর কেবিনের একটা বেডে শুয়ে আছেন কবি। একাকী রুমে সুনসান নীরবতা। রুমটা বেশ অন্ধকার। রুমের দক্ষিণে যে বারান্দা, তা দিয়ে আলো আসে না। এত কম আলোতে ছবি তোলা বেশ কঠিন। ছবি হবে না জেনেও ক্যামেরাটা হাতে রেখে নিঃশ্বাস বন্ধ করে তিনি টুইন লেন্স রিফলেক্সের শাটার চাপলেন। ডার্করুমে ঢুকে কেমিক্যালে ফিল্ম ডুবিয়ে সেইভ লাইটে দেখলেন নেগেটিভের পুরো জমিন পুরো অন্ধকার। ভয়ে ভয়ে সে কথা জানালেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে।
কয়েক দিন পরের ঘটনা। পিজি হাসপাতালের ওই লোক আবার আসলেন। বলেলেন, 'আগামীকাল কবির ছবি তুলতে হবে। ছবি তোলার জন্য যা যা দরকার, সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।' বাসায় গিয়ে উত্তেজনায় স্বপন সাহার ঘুম আসে না। ছোট ভাই তপন সাহা এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে ফরিদপুর থেকে কয়েক দিনের জন্য তাঁর বাসায় বেড়াতে এসেছেন। শুনে তিনিও বললে যাবেন। সকালে দুই ভাই মিলে কবির জন্য ফুলের মালা কিনলেন। তারপর স্টুডিওতে গিয়ে ক্যামেরায় লোড করলেন নতুন আগফা ফিল্ম। সঙ্গে নিলেন পপুলার ফ্ল্যাশ। স্বপন সাহার সহকারী বিমল সেন আগে থেকেই তৈরি। নির্দিষ্ট সময়ের আগেই তাঁরা হাসপাতালে গিয়ে পৌঁছলেন। তাঁদের দেখে এক নার্স হাসতে হাসতে বললেন, 'আজ ছবি তুলতে কোনো ঝামেলা হবে না। আজ কবির মন বেশ ফুরফুরা।'
কেবিনে ঢুকে স্বপন সাহার মনে হলো—এ তিনি কী দেখছেন! আজ রুমটায় পর্যাপ্ত আলো। একটা সাদা কাপড়ের কাভার লাগানো কাঠের চেয়ারে রাজসিক ভঙিতে স্থির বসে আছেন কবি। ক্লিন সেভ। ডাগর ডাগর চোখে অদ্ভুত দৃষ্টি। মিটমিট করে হাসছেন আর বিড়বিড় করে কী যেন বলার চেষ্টা করছেন। মুখে বিরক্তির কোনো ছাপ নাই। গায়ে শুভ্র সুন্দর পাঞ্জাবি ও লুঙ্গি। খালি পা, পায়ের নিচে তুলতুলে নরম কুশন। কবির পেছনে সাদা দেয়াল। ডানপাশে একটা টুল। তাতে একটা পিতলের ফুলদানি। কারুকার্যমণ্ডিত সেই ফুলদানিতে বেশ কিছু তাজা ফুল। ফুলের সুগন্ধ নাকে এসে লাগছে। কবিকে লাগছে গ্রিক ভাস্কর্যের মতো। মনে হচ্ছে স্বর্গ এসে ভর করেছে পিজি হাসপাতালের ১১৭ নম্বর কেবিনে।
কবিকে যে সার্বক্ষণিক দেখভাল করতেন ডা. নাজিমুদৌলা চৌধুরী। ছবি তোলার আগে তিনি বললেন, 'ক্যামেরা দেখলে কবি খেপে যান। ফ্ল্যাশ জ্বলে উঠলে খুব বিরক্ত হন। তাই সাবধানে ছবি তুলতে হবে।' শুনে ঘাবড়ে গেলেন স্বপন সাহা। কিন্তু ক্যামেরা তাক করতেই ঘটল ভিন্ন ঘটনা। কবি ফ্যালফ্যাল করে তাকালেন। তাঁর মুখে বিরক্তির লেশমাত্র নেই। কবির এমন মায়াবি আচরণে স্বপন সাহার বুকে বল ফিরে এল। তিনি প্রথমে কবির একটা ফুল ফিগারের ছবি তুললেন। তারপর ধীরে ধীরে ক্লোজ-আপ। পরে দুই পাশ থেকে প্রোফাইল। সব ছবিতেই ফ্ল্যাশ ব্যবহার করলেন। সাত-আটটি ছবি তোলার পর তিনি কবির গলায় ফুলের মালা পরিয়ে দিলেন। যখন মালা পরিয়ে দিচ্ছেন তখন স্বপন সাহার চোখে চোখ রাখলেন কবি। কবির চোখে অন্য রকম উদারতা। মুখে স্মিত হাসি। স্বপন সাহার মনে হলো, কবির চেহারায় তিনি যেন তাঁর দাদু (মায়ের বাবা) গয়ানাথ সাহার অবয়ব দেখতে পেলেন। একটা ঘোরলাগাা মুহূর্ত তৈরি হলো। কবির সঙ্গে তাঁর এই অপূর্ব মুহূর্তটা ক্যামেরায় ধরলেন বিমল সেন।
ফুলের মালায় কবিকে অপূর্ব লাগছিল। স্বপন সাহা কবির একটা ফুল ফিগারের ছবি তুললেন। এরপর ক্যামেরাটা নিচে ধরলেন, তখন কবি কী মনে করে যেন ওপরের দিকে তাকালেন। মনে হলো অসীমায় চোখ রেখে তিনি যেন অপ্রার্থিব কোনো কিছুর সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করছেন কিংবা ফিরে গেছেন পেছনে ফেলে আসা সুদূর অতীতের কাছে। অফিশিয়াল ছবি তোলা পর্ব শেষ। তখন ডা. নাজিমুদৌলা চৌধুরী কবির পাশে গিয়ে বসলেন। মায়া আর শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে তিনি কবির দিকে তাকালেন। দুজনের এই অন্তরঙ্গ মুহূর্তের সঙ্গী হলেন স্বপন সাহাও। তিনি কবির বাঁ পাশে গিয়ে বসলেন। কবি মুখ ঘুরিয়ে তাঁর দিকে তাকালেন। কবি, আলোকচিত্রী আর চিকিৎসকের এই ত্রিমাত্রিক মায়াময় মুহূর্ত ক্যামেরায় ধরতে ভুল করলেন না বিমল সেন। কবির সঙ্গে তপন সাহা ও বিমল সেনেরও ছবি তোলা হলো। এসব ছবি তোলার পরপরই ফিল্ম শেষ! কেমন করে ঘণ্টাখানেক সময় চলে গেল, টের পাওয়া গেল না।
সেদিন মিডিয়াম ফরমেট ফিল্মে ১২টি ছবি তুলেছিলেন স্বপন সাহা। তখন একরোল সাদাকালো ফিল্মে ১২টি ছবি তোলা যেত। সেদিন পাকা খেলোয়াড়ের খুব মেপে মেপে এক্সপোজার দিতে হয়েছিল। দুপুরে স্টুডিওতে ফিরে স্বপন সাহা ও বিমল সেন ডার্করুমে ঢুকলেন। ডেভেলপের পর দেখলেন চকচকে সব নেগেটিভ! আনন্দে লাফিয়ে উঠলেন স্বপন সাহা। সেই আনন্দে তিনি বিমলকে জড়িয়ে ধরলেন। দুজনে মিলে কোয়াটার সাইজ পেপারে কবির চারটি ছবি প্রিন্ট করলেন। কী জীবন্ত ছবি! যেন ফ্রেমের ভেতর থেকে থেকে বেরিয়ে এসে কবি এখনই তাঁর খাতায় লিখবেন—'আমি চির-বিদ্রোহী বীর—আমি বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠিয়াছি একা চির-উন্নত শির!' পরের দিন পিজি হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. নূরুল ইসলামের কার্যালয়ে গিয়ে ছবিগুলো পৌঁছে দিলেন। ছবি দেখে সবাই মহাখুশি।
পরের মাসে মাঝামাঝি সময়ে আবার ছবি তোলার ডাক পড়ল। ধূসর পাঞ্জাবি আর চেকের লুঙ্গি পরিহিত কবি তাঁর বেডের পাশের সোফায় বসে আছেন। মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। চোখ দুটো ধূসর। বিড়বিড় করে কিছু বলতে চাচ্ছেন। চেহারায় বেশ রুক্ষভাব। তাই দুই-তিনটি ছবি তুলে স্বপন সাহার মনে হলো, আজ ছবি তোলার মোক্ষম সময় না। তিনি বিমল সেনের হাতে ক্যামেরা দিয়ে কবির পাশে গিয়ে বসলেন। খুব সন্তর্পণে কবির ডান হাতটা ধরলেন। কবি আজ তাঁর দিকে তাকাচ্ছেন না। হাতটা ছাড়িয়ে নিতে চাইছেন। মুখে খানিকটা অস্বস্তি। কবিকে বেশ ক্লান্ত মনে হলো। তাই কবির নীরবতায় ব্যাঘাত না ঘটিয়ে ক্যামেরা গুটিয়ে নিলেন স্বপন সাহা।
মাসখানেক পর টিভোলীতে এসেই তিনি কবির প্রয়াণের খবর পেলেন। এই খবরে তাঁর মাথায় বাজ ভেঙে পড়ল। শুনলেন, কবিকে দাফন করা হবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের সামনে। তাই ক্যামেরা নিয়ে স্বপন সাহা ছুটলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে। কিন্তু ওই দিন রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম ও সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানসহ দেশের শীর্ষ ব্যক্তিরা সেখানে উপস্থিত ছিলেন। ফলে ভিআইপি প্রটোকলের কারণে তিনি আর কাছে ভিড়তে পারলেন না। ভীষণ মন খারাপ করে ফিরলেন টিভোলীতে। পরের দিন গেলেন কবির সমাধি প্রাঙ্গণে। সমাধির ওপর রাখা ফুলগুলো যেন শোকে কাতর। নিস্তব্ধ কবরের সামনে গিয়ে তাঁর চোখে নীরব কান্নার বান বয়ে গেল। কানে বাজতে থাকল কবির সেই অমর সুধা—'মসজিদেরই পাশে আমায় কবর দিও ভাই।' সমাধির পাশে মসজিদের নয়নাভিরাম মিনারটি যেন ভাদ্রের মেঘময় আকাশের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মিনারটাকে পেছনে রেখে প্রিয় কবির শেষ ঠিকানার দৃশ্যটা আঁকলেন সেলুলয়েডের রুপালি রসায়নে।
স্বপন সাহা ছবি পরিস্ফুটনের কাজে বেশ পারদর্শী ছিলেন। ১৯৮২ সালে তিনি ডার্করুমের সফট লাইটে কবির ছবি নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট শুরু করলেন। কবির সেই অপার্থিব দৃষ্টি আর শেষ ঠিকানার দৃশ্য—এই দুটি নেগেটিভ সুপার ইমপোজ করে একটা ছবি বানালেন। এর ছবি তৈরি করতে তাঁর দীর্ঘ সময় ও অসংখ্য পেপার নষ্ট হলো। শেষ পর্যন্ত তিনি ঠিকঠাকভাবে ছবিটা ফটো পেপারের নরম ইমালশনে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছিলেন। ছবিটা ওই বছর বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক সোসাইটির [বিপিএস] বার্ষিক আলোকচিত্র প্রতিযোগিতায় 'ফটোগ্রাফার অব দ্য ইয়ার' পুরস্কারও জিতেছিল। পরে নজরুল ইনস্টিটিউটের এক কর্তাব্যক্তি ছবিটা তাঁর কাছ থেকে চেয়ে নিয়েছিলেন। বিপিএসের আলোকচিত্র প্রতিযোগিতায় জমা দেওয়ার আগে স্বপন সাহার গুরু আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আলোকচিত্রশিল্পী ও চিত্রগ্রাহক আনোয়ার হোসেন কবির এই অনবদ্য ছবিটার নাম দিয়েছিলেন 'দ্য ডিফাইন্ড'।