মরিচ কীভাবে ‘ঝাল’ হলো
ঝাল খাওয়া মানে মরিচ খাওয়া নিয়ে ছোটবেলায় একটি ছড়া পড়েছিলাম। পুরোটা আর মনে নেই। গলার জোরে বলতে পারব না, কথাগুলো হুবহু এমন ছিল কি না। তবে ভাবটা অনেকটা এই রকম—ঝাল খেয়ে খোকাবাবু করেন হুসহাস, আর পাছে খুকু কিছু বলে ফেলে, তাই মুখ শক্ত করে বলেন, 'না, কিছু না!'
ছড়াটির মর্ম অবশ্য খুব পরিষ্কার। ঝাল খেয়ে মুখ জ্বলছে, চোখে পানি আসছে, নাক দিয়ে সর্দি ঝরছে—তবু তা স্বীকার করা যাবে না। পাশে কেউ দেখে ফেললে মান থাকে না। কিল খেয়ে কিল হজম করার মতোই, স্থান-কাল-পাত্রভেদে ঝাল খেয়ে ঝাল হজম করাটাও কখনো কখনো জরুরি হয়ে পড়ে। ছোটবেলার সেই ছড়া বোধ হয় অজান্তেই সে শিক্ষাই দিয়েছিল।
বড় হয়ে অবশ্য গল্পটা আরেকটু বদলে যায়। তখন ঝাল শুধু সহ্য করার ব্যাপার নয়। কখনো তা বাহাদুরি, কখনো অভ্যাস, কখনো স্বাদের নেশা। আবার কখনো এমনও হয়, কয়েক কেজি মরিচের ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়লে পুরো একটা শহরাঞ্চল জৈব হামলার আশঙ্কায় তোলপাড় হয়ে যায়।
তাকাই লন্ডনের দিকে।
২০০৭ সালে লন্ডনের সোহোর এক কোণে আচমকা ছড়িয়ে পড়েছিল রহস্যময় এক মেঘ। ধোঁয়ার চেয়ে তার গন্ধই ছিল বেশি। লোকজন কাশতে শুরু করল, চোখ দিয়ে পানি পড়তে লাগল। ডাকা হলো দমকল বাহিনী। ভবন খালি করা হলো, বন্ধ করে দেওয়া হলো রাস্তা।
সম্ভাব্য জৈব সন্ত্রাসী হামলার উৎস খুঁজতে দমকল কর্মীরা টানা তিন ঘণ্টা এলাকাজুড়ে তল্লাশি চালান। ক্ষতিকর গ্যাস থেকে বাঁচতে তাদের ছিল শ্বাসযন্ত্রের জন্য বিশেষ সুরক্ষা সরঞ্জাম। শেষ পর্যন্ত তারা ঢোকেন একটি থাই রেস্তোরাঁয়। সেখানে পাওয়া যায় প্রায় চার কেজি পোড়া মরিচভর্তি একটি পাত্র।
রাঁধুনি তখন তৈরি করছিলেন নাম প্রিক পাও। এটি ঘন, মাটির স্বাদমাখা, হালকা মিষ্টি একধরনের মরিচের পেস্ট। রান্নায় মসলা হিসেবে ব্যবহার করা যায়। আবার রুটি, টোস্ট বা অন্য খাবার তাতে চুবিয়ে খাওয়ার জন্য ঘন সস হিসেবেও ব্যবহার হয়। চাইলে সরাসরি টোস্টের ওপর মেখেও খাওয়া যায়।
সেই চার কেজি মরিচই শেষ পর্যন্ত লন্ডনের সোহোতে এমন কাণ্ড ঘটিয়েছিল।
মরিচ আসলে ফল। ক্যাপসিকাম গনের সোলানেসি পরিবারের উদ্ভিদে এর জন্ম। এই পরিবারটি নাইটশেড নামেও পরিচিত। মানুষের শরীরে জ্বালা-যন্ত্রণা বা প্রদাহ সৃষ্টি করে—এমন ধারণার কারণে পরিবারের উদ্ভিদগুলোকে প্রায়ই সন্দেহের চোখে দেখা হয়।
মরিচের জাত হাজার হাজার। কোনোটি ধোঁয়াটে স্বাদের, কোনোটি কস্তুরীর মতো। কোনোটি ঘাসের গন্ধমাখা, কোনোটি কাঠের মতো গভীর ও ভারী। টক কিংবা উজ্জ্বল স্বাদের পাশাপাশি চকলেট, যষ্টিমধু, তামাক, কিশমিশ, লেবু, চেরি বা ব্ল্যাকবেরির আভাসও মিলতে পারে এতে। বাংলাদেশের বাজারে অবশ্য এত রকম স্বাদ-গন্ধের মরিচ চোখেই পড়ে না। এখানে ক্যাপসিকামকেই বরং রাজার সবজি বলা চলে। স্বাদের জন্য নয়, দামের দাপটে।
কিন্তু যেসব সংস্কৃতির রান্নায় মরিচের দীর্ঘ ইতিহাস নেই, সেখানে অনেক সময় সেসব সূক্ষ্ম স্বাদ-গন্ধ আড়ালেই থেকে যায়। তাদের কাছে মরিচ প্রধানত যন্ত্রণার এক উপকরণ। তীব্র, শাস্তিমূলক। যেন মুখে নয়, সরাসরি মাথার ভেতর আগুন ধরিয়ে দেওয়ার জন্য ঝালের এক বাহন। কিন্তু মরিচের কাজ শুধু জিবে আগুন ধরানো নয়। আত্মরক্ষা থেকে গদি রক্ষা—দুই ক্ষেত্রেই তার ব্যবহার আছে। রাস্তায় বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস, আর ব্যক্তিগত হামলা ঠেকাতে পিপার স্প্রে। একটিতে রাষ্ট্র নিজের কর্তৃত্ব রক্ষা করে। অন্যটিতে মানুষ নিজেকে। দুই ক্ষেত্রেই কোথাও না কোথাও আছে মরিচের ঝাল।
অবশ্য সব মরিচ এত ঝাল নয়। আর সবার কাছেও ঝাল একই রকম লাগে না। থাই রান্নায় নাম প্রিক পাও সাধারণত স্পার চিলি দিয়ে তৈরি হয়। স্বাদে এটি তীব্র হলেও ঝালের মাত্রা তুলনামূলক মৃদু।
প্রত্নতাত্ত্বিকেরা প্রমাণ পেয়েছেন, প্রায় ৯ হাজার বছর আগে বর্তমান মেক্সিকো অঞ্চলে মানুষ বুনো মরিচ সংগ্রহ করে রান্নায় ব্যবহার করত। খ্রিষ্টপূর্ব ৪১০০ সালের মধ্যে এটি নিয়মিত খাবারের জন্য গেরস্থালি ফসল হয়ে যায়।
পশ্চিম গোলার্ধের এই ফল পরে এশিয়া ও আফ্রিকার রান্নায় জায়গা করে নেয়। কিন্তু উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের বড় অংশে—যাকে আমরা পশ্চিমা বিশ্ব বলি—মরিচকে দীর্ঘদিন বাইরের জিনিস হিসেবেই দেখা হয়েছে।
পঞ্চদশ শতকের শেষ দিকেই মরিচ ইউরোপে পৌঁছায়। চাষ শুরু হয়। তবু অষ্টাদশ ও উনিশ শতকের আগে রান্নার বইয়ে এর হাজিরা খুব একটা দেখা যায় না। ফরাসি নৃতত্ত্ববিদ এস্থার কাটজের বর্ণনা অনুযায়ী, পরে ইউরোপের অভিজাতরাই মরিচকে নিজেদের রান্নাঘরে জায়গা দেন।
যুক্তরাষ্ট্রেও মরিচের প্রতি মানুষের আগ্রহ তৈরি হয়েছে তুলনামূলক সাম্প্রতিক সময়ে। অ্যাগ্রোনমি সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণা বলছে, ১৯৮০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে মাথাপিছু মরিচ খাওয়ার পরিমাণ দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে।
যারা নিয়মিত মরিচ খান, তাদের মধ্যে শ্বেতাঙ্গ নন এমন মানুষের হার তুলনামূলক বেশি। এটি মার্কিন মলুকের বদলে যাওয়া জনসংখ্যারও একটি ইঙ্গিত। তাঁদের বয়সও সাধারণত ৬৫ বছরের নিচে। আবার অনেকেই নিজেদের 'ফুড এক্সপ্লোরার' বা খাদ্য-অন্বেষী ভাবতে পছন্দ করেন। উৎকৃষ্ট, ব্যতিক্রমী, নতুন কিংবা বিদেশি খাবার ও উপকরণ সম্পর্কে নিজেদের আগ্রহ এবং জ্ঞান নিয়ে তাঁরা বেশ গর্বিত।
মরিচপ্রিয় এই আদর্শ মার্কিন ভোক্তার ছবি দেখে মনে হতে পারে, মরিচ এখনো পুরোপুরি মূলধারার খাবার হয়ে ওঠেনি। হয়তো এটি রসনাবিলাসীদের কাক্সিক্ষত বস্তু, কিংবা একদল মানুষের বিশেষ মোহের বিষয়।
কিন্তু বিশ্বমারি বা মহামারির প্রথম বছরেই যুক্তরাষ্ট্রে হট সসের বিক্রি বেড়েছিল ২৪ দশমিক ৬ শতাংশ। নিলসেনের তথ্যেই ধরা পড়েছে সেই হিসাব। দেশজুড়ে রেস্তোরাঁর ভেতরে বসে খাওয়া বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেক মার্কিনের ভরসা ছিল নিজের রান্না। খাবারের স্বাদ বদলাতে তাদের দরকার ছিল 'স্বাদে পৌঁছানোর একটি শর্টকাট'।
প্রযুক্তিগতভাবে ঝাল কোনো স্বাদ নয়, এটি একটি অনুভূতি। মেনথলের কারণে যে শীতলতার অনুভূতি হয়, সেটিও একই ধরনের অনুভূতি। একটি মরিচ কতটা ঝাল হবে, তা নির্ভর করে ক্যাপসাইসিন নামের রাসায়নিক যৌগ এবং এর সহযোগী ক্যাপসাইসিনয়েডগুলোর উপস্থিতির ওপর। এগুলো মরিচের শাঁস ও ভেতরের সাদা অংশে থাকে।
১৯১২ সাল থেকে এই ঘনত্ব মাপা হচ্ছে স্কোভিল স্কেলে। শুরুতে পদ্ধতিটি ছিল মরিচের নির্যাসে কতটা চিনির পানি মেশালে পরীক্ষকের আর ঝাল অনুভব হবে না, তার ওপর নির্ভরশীল। এখন বিজ্ঞানীরা ব্যবহার করেন উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন তরল ক্রোমাটোগ্রাফি।
রান্নার আগে বীজ ফেলে দিলে মরিচের ঝাল কমে যায়। এমন কথা প্রায়ই আমরা শুনি। কিন্তু বীজে আসলে কোনো ক্যাপসাইসিনই থাকে না। বীজের এ ঝাল সঙ্গ দোষের ফল! মরিচের ভেতরের সাদা অংশের কাছাকাছি থাকে, তাতেই বীজের গায়ে ওই যৌগের প্রলেপ লেগে থাকতে পারে। বীজ ঝাল মনে হয়!
ক্যাপসাইসিন আমাদের শরীরের টিআরপিভি১ রিসেপ্টরকে সক্রিয় করে। এই রিসেপ্টরই ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট, অর্থাৎ প্রায় ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রা শনাক্ত করে। তাপমাত্রাটি গরমের দিনের জন্য যথেষ্ট নিষ্ঠুর মনে হতেই পারে। কিন্তু ফুটপাতে ডিম ভাজার মতো বা শরীরকে সত্যিই পুড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়।
ঝাল মরিচ খেতে গিয়ে বড় বিপত্তির ঘটনাও আছে। ২০১৬ সালে এমন এক ব্যক্তির ঘটনার কথা নথিভুক্ত হয়, যার ঘোস্ট পেপার খাওয়ার পর খাদ্যনালি ফেটে গিয়েছিল। বিশ্বের সবচেয়ে ঝাল মরিচগুলোর অন্যতম। তবে চিকিৎসকেরা বলেন, খাদ্যনালি ফাটার জন্য ক্যাপসাইসিন সরাসরি দায়ী নয়। তীব্র যন্ত্রণার প্রতিক্রিয়ায় বারবার বমি করার চেষ্টা থেকেই ঘটেছিল এই বিপত্তি।
বিজ্ঞানীরা একসময় এই প্রতিক্রিয়াকে বলতেন 'ইরিটেশন' বা জ্বালা। কিন্তু কয়েকটি হাবানেরো মরিচ খাওয়ার পর শরীর কাঁপতে কাঁপতে ঘামার অভিজ্ঞতার তুলনায় শব্দটি খানিকটা হালকাই মনে হয়। হাবানেরো বিশ্বের অন্যতম ঝাল মরিচ। এর ঝালের মাত্রা ১ লাখ থেকে ৮ লাখ ৯২ হাজার ৭০০ স্কোভিল হিট ইউনিট পর্যন্ত হতে পারে। গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস একে পৃথিবীর সবচেয়ে ঝাল মরিচ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলেও ঝাল নিয়ে এমন এক বিশ্বাসের চল আছে। তীব্র রোদের মধ্যে মাঠে কাজ করা অনেক চাষি-মজুর কড়া ঝাল খান। তাঁদের বিশ্বাস, এতে রোদের তাপ কিছুটা কম লাগে। বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা যা-ই হোক, ঝালের সাথে শরীরের এই বোঝাপড়াটা বেশ পুরোনো। প্রথমে জ্বালা, তারপর অভ্যাস। তারপর হয়তো এমন এক পর্যায় আসে, যখন সেই আগুনই আর আগের মতো আগুন বলে মনে হয় না।
আমাদের মন ধীরে ধীরে 'এটি যন্ত্রণা' বলে জোর দেওয়া বন্ধ করে। তখন আমরা আসল স্বাদের দিকে মনোযোগ দিতে পারি। হয়তো প্রথমবারের মতো টের পাই, একটি খাবারে মরিচ আর কী কী স্বাদ যোগ করছে। আগুন তখন সরে যায় পেছনের সারিতে।
বিবর্তনের দৃষ্টিতে ক্যাপসাইসিন একটি অস্ত্র। এর সাহায্যে মরিচ শিকারিদের ঠেকায়।
ব্রিটিশ সাংস্কৃতিক সমালোচক স্টুয়ার্ট ওয়ালটন তাঁর ২০১৮ সালের বই 'দ্য ডেভিলস ডিনার'-এ লিখেছেন, বেশি ঝাল মরিচ ছত্রাকের আক্রমণ তুলনামূলকভাবে ভালো করে ঠেকাতে পারে। অর্থাৎ অন্য অনেক মরিচ বা ফলের মতো সহজে ছত্রাকে আক্রান্ত হয়ে নষ্ট হয় না। সম্ভবত এ কারণেই আমাদের আদিম পূর্বপুরুষদের কাছেও এগুলো আকর্ষণীয় খাবার হয়ে উঠেছিল। অন্য অনেক খাবারের চেয়ে মরিচ হয়তো বেশি সময় ভালো থাকত। তার ওপর এতে রয়েছে প্রচুর ভিটামিনও।
পাখিদের আবার ক্যাপসাইসিনে কোনো সমস্যা হয় না। যে ঝালে মানুষের জিব জ্বলে যায়, পাখিরা তা প্রায় অনায়াসেই সহ্য করতে পারে। তাই তারা নিশ্চিন্তে মরিচ খেয়ে ফেলে। তারপর উড়ে যায় এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায়, আর অজান্তেই তাদের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে মরিচের বীজ। এভাবেই শুধু মরিচের টিকে থাকাই নিশ্চিত হয়নি, ঘটেছে তার বিস্তারও। একসময় সেই বীজ ছড়িয়ে পড়েছে দূরদূরান্তে, পৌঁছে গেছে পৃথিবীর নানা প্রান্তে।
পুরোনো দিনের কাক্সিক্ষত মসলা—লবঙ্গ বা দারুচিনির মতো—মরিচের বেড়ে ওঠার জন্য উষ্ণমণ্ডলীয় পরিবেশের প্রয়োজন ছিল না।
এটি এমন কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের সাথে বাঁধা ছিল না, যেটি লুট করে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। নতুন পরিবেশেও সহজে জন্মাত মরিচ। ফলে ধনীদের জন্য একে আলাদা করে রাখা যেত না। ব্যবসায়ীরাও দুষ্প্রাপ্য ও উচ্চমূল্যের পণ্য হিসেবে এর ওপর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি।
চীনের ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসাব্যবস্থায় বহুদিন ধরেই শরীরে উত্তাপ তৈরি করে এমন উপাদান ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়। এর উদ্দেশ্য ঘাম সৃষ্টি করা এবং শরীরের ভেতরে জমে থাকা আর্দ্রতা বের করে দেওয়া। এই আর্দ্রতা যেন শরীরের ভেতরে নেমে আসা কুয়াশা। এটি রক্তপ্রবাহে বাধা দেয়, শরীরকে ব্যথাতুর ও অবসন্ন করে তোলে।
চীনের ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসাব্যবস্থায় বহুদিন ধরেই শরীরে উত্তাপ তৈরি করে এমন উপকরণ ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়। এর উদ্দেশ্য ঘাম সৃষ্টি করা এবং শরীরের ভেতরে জমে থাকা 'আর্দ্রতা' দূর করা।
এখানে 'আর্দ্রতা' অবশ্য আবহাওয়ার আর্দ্রতা নয়। চীনা চিকিৎসার ধারণায় এটি শরীরের ভেতরের একধরনের ভারী, স্থবির অবস্থা—যেন কুয়াশা নেমে এসে সবকিছুকে ঢেকে দিয়েছে। এতে শরীর অবসন্ন হয়ে পড়ে, প্রাণশক্তি কমে যায়, তৈরি হয় একধরনের জড়তা।
ঝালের কথা শুনে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের একটি গল্প মনে পড়ে যায়। সোভিয়েত আমলে পূর্ব ইউরোপের কোনো এক দেশে কবিতা সম্মেলনে গিয়েছিলেন তিনি। দেশটির নাম, কিংবা গল্পটি কোন বইয়ে পড়েছিলাম, এখন আর মনে নেই। কিন্তু ঝালের কাহিনিটা মনে রয়ে গেছে।
সেখানে এক দোভাষীর মাধ্যমে পরিচয় হয়েছিল কম বয়সী এক ইন্দোনেশীয় কবির সাথে। সম্ভবত সেটিই ছিল তাঁর প্রথম ইউরোপ সফর। হয়তো প্রথম বিদেশযাত্রাই। ইংরেজি বা ফরাসি—কোনো বিদেশি ভাষাই তিনি জানতেন না। শুধু হাসতেন। আর প্রয়োজনীয় কথাবার্তা বলতেন দোভাষীর মাধ্যমে।
তাঁর একটি সমস্যা ছিল। ঝাল ছাড়া তিনি দিনের তিন বেলার কোনো খাবারই গিলতে পারতেন না। তাই দেশ থেকে সাথে করে নিয়ে এসেছিলেন ঘন এক ঝালের সস। সকালের নাশতায় পাউরুটি বা টোস্টে তা মাখিয়ে খেতেন। দুপুরে বা রাতে খাবারের সাথেও সেই একই ঝাল মিশিয়ে নিতেন।
ঝালের কথা শুনেই সুনীলের জিবে যেন পানি এসে গেল। তিনি সেই সস চেখে দেখতে চাইলেন। কিন্তু ইন্দোনেশীয় কবির দোভাষী তাঁকে কঠোরভাবে সাবধান করেছিলেন। জিনিসটি ভয়াবহ ঝাল। না খাওয়াই ভালো।
সতর্কবাণী শুনে সুনীলের বাঙাল রক্ত বোধ হয় খানিকটা চেতে গিয়েছিল। ঝালের ভয় দেখানো হচ্ছে! তিনি জেদ করেই টোস্টের ওপর সস মাখালেন। তারপর খেলেন। প্রথমে তেমন কিছুই হলো না। ঝাল তো দূরের কথা, বিশেষ কোনো প্রতিক্রিয়াই টের পেলেন না। কিন্তু কিছুক্ষণ পরই শুরু হলো আসল কাণ্ড।
মনে হলো, পেটের ভেতর যেন ঝালের বিস্ফোরণ ঘটেছে। প্রাণপণে মুখের ভাব স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে তিনি কোনোভাবে নিজের জন্য বরাদ্দ করা কক্ষে ফিরে যান। তারপর শুরু হয় ঝাল নিবারণের যুদ্ধ।
সেই যুদ্ধ কীভাবে হয়েছিল, কতক্ষণ চলেছিল—সুনীলের সেই বর্ণনা এখন আর মনে নেই। শুধু এইটুকু মনে আছে।
১৬২১ সালে বারমুডা থেকে আসা একটি ব্রিটিশ জাহাজের কল্যাণে মরিচ পৌঁছায় ভার্জিনিয়ায়। তখন একে শুধু 'লাল মরিচ' হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। পরে বারবিকিউয়ের কিছু রেসিপিতে এর জায়গা হয়। এই রান্নার ধারার জন্ম হয়েছিল দাসত্বে আবদ্ধ মানুষের হাত ধরে। মেক্সিকান সালসা একসময় যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে সুপারমার্কেটের তাকেও পৌঁছে যায়। এর একটি পরিচিত রূপ ছিল পেস পিকান্তে সস। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ডেভিড পেস এটি তৈরি করেন।
তিনি মেক্সিকান বংশোদ্ভূত ছিলেন না। তবে সান আন্তোনিওর টাকোর দোকানগুলোতে পাওয়া হট সসের মতো কিছু তৈরি করতে চেয়েছিলেন। এ জন্য স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হালাপেনো ব্যবহার করেন। এমনকি নিজেও সেগুলো চাষের চেষ্টা করেছিলেন।
পঞ্চদশ শতকের শেষ দিকে ইউরোপে মরিচকে ঘিরে যে সংশয় দেখা দিয়েছিল, তার মধ্যে একধরনের বিদ্রুপ আছে। খ্রিষ্টপূর্ব অন্তত পঞ্চম শতক থেকেই ইউরোপীয়রা মসলার জন্য হন্যে হয়ে উঠেছিল। খাবারের একঘেয়েমি কাটাতে তারা খুঁজত ঝাঁজ, এমন কিছু যা স্বাদকে চাঙা করে দেয়।
গ্রিক ইতিহাসবিদ হেরোডোটাস লিখেছিলেন, আরব ব্যবসায়ীরা অজানা এক দেশ থেকে দারুচিনি নিয়ে আসত। গ্রিকদের বলা হয়েছিল, বিশালাকৃতির পাখির বাসা থেকে সেই দারুচিনি সংগ্রহ করা হয়।
পঞ্চদশ থেকে সপ্তদশ শতকের মধ্যে ইউরোপীয়দের সমুদ্রপথে নতুন নতুন দেশ ও ভূখণ্ড খুঁজে বেড়ানোর যে যুগ, তার পেছনেও বড় প্রেরণা ছিল মসলা। দারুচিনি, গোলমরিচ, লবঙ্গের মতো মসলার খোঁজে জাহাজ নিয়ে মানুষ পাড়ি দিয়েছে অজানা সাগর। এই বাণিজ্যকে ঘিরেই গড়ে উঠেছিল বিশ্বের প্রথম দিকের বিশাল বাণিজ্য কোম্পানিগুলো। মানচিত্রের দূর প্রান্তের সেই মসলা তখন শুধু খাবারের উপকরণ ছিল না; তার দখল নিতে হয়েছে অভিযান, আগ্রাসন ও অন্য দেশের ওপর আধিপত্য বিস্তারের।
১৪৯২ সালে আটলান্টিক পাড়ি দেওয়ার সময় ক্রিস্টোফার কলম্বাসও খুঁজছিলেন মসলা। ক্যারিবীয় অঞ্চলে—যাকে তিনি ওয়েস্ট ইন্ডিজ মনে করেছিলেন—তিনি দেখেন মরিচ।
উদ্ভিদগত পার্থক্য উপেক্ষা করে কলম্বাস সিদ্ধান্ত নেন, এটি শুধু একধরনের পেপারই নয়, কালো গোলমরিচেরও যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বী। কালো গোলমরিচ অবশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন উদ্ভিদ। এই উদ্ভিদের বৈজ্ঞানিক নাম পাইপার নিগ্রাম।
কলম্বাস তাঁর ডায়েরিতে লিখেছিলেন, নতুন পাওয়া এই মরিচ 'আরও প্রচুর'। তারপর হয়তো খানিকটা আশাবাদ থেকেই যোগ করেছিলেন, 'এবং আরও মূল্যবান'।
'চিলি' শব্দটি এসেছে অ্যাজটেকদের নাহুয়াতল ভাষা থেকে। কিন্তু ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী ম্যাগলন তুসাঁ-সামার তাঁর 'এ হিস্ট্রি অব ফুড' বইয়ে লিখেছেন, ইউরোপে প্রথম যে নামটি জনপ্রিয় হয়, তা ছিল 'পিমিয়েন্তো'।
কলম্বাসের বিপণন কৌশলের ফলেই নামটি ছড়িয়ে পড়ে। এটি ছিল 'পিমিয়েন্তা' শব্দের আরও শক্তিশালী এবং তাই ব্যাকরণগতভাবে পুংলিঙ্গ। 'পিমিয়েন্তা' বলতে বোঝানো হতো কালো গোলমরিচ।
লিখিত নথি অনুযায়ী, ষোড়শ শতকে স্পেন থেকে উপহার হিসেবে সেখানে প্রথম মরিচ পৌঁছায়। তবে কোনো কোনো ইতিহাসবিদ এর আরেকটি উৎসের কথা বলেন—আক্রমণকারী উসমানীয়রা।
ধারণা করা হয়, উসমানীয়রা ভারত থেকে আনা মরিচ গ্রহণ করেছিল। আমেরিকা থেকে প্রথম যে মরিচের বীজ স্পেনে আনা হয়েছিল, সেখানে সেই বীজ থেকে মরিচের চাষ শুরু হয়। পরে স্পেনে জন্মানো সেই মরিচের বীজ পর্তুগিজ অভিযাত্রীরা ভারতীয় উপমহাদেশে নিয়ে আসেন।
অষ্টাদশ শতকে হাঙ্গেরীয়রা নিজেদের মরিচের মিশ্রণ তৈরি করে। যে মরিচ দিয়ে এটি বানানো হতো, তার নাম অনুসারেই মসলাটির নাম হয় পাপরিকা।
সম্প্রতি 'ড্রাকুলা ডেইলি' নামের একটি অনলাইন নিউজলেটারের কারণে অপ্রত্যাশিতভাবে আবার আলোচনায় আসে পাপরিকা। লেখালেখি ও ই-মেইল নিউজলেটার প্রকাশের প্ল্যাটফর্ম সাবস্ট্যাকে টানা দ্বিতীয় বছরের মতো কিস্তিতে প্রকাশ শুরু হয় ব্রাম স্টোকারের ১৮৯৭ সালের উপন্যাস 'ড্রাকুলা'।
উপন্যাসের শুরুতে তরুণ আইনজীবী জোনাথন হার্কার ট্রান্সিলভানিয়ায় যাওয়ার পথে পাপরিকা মেশানো একটি স্ট্যু খান। এরপর তাঁর রাত কাটে অস্বস্তিকর 'অদ্ভুত সব স্বপ্নে'। হার্কার লেখেন, 'হয়তো পাপরিকার কারণেই এমন হয়েছিল। আমাকে বড় জগের সব পানি খেয়ে ফেলতে হয়েছিল, তারপরও তৃষ্ণা মেটেনি।'
এতেই পাপরিকার ঝাল নিয়ে পাঠকদের মধ্যে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। কারণ, আজ আমরা যে পাপরিকা চিনি, তা সাধারণত নিরীহ ও মিষ্টি। #পাপরিকা হ্যাশট্যাগ ট্রেন্ড করতে শুরু হয়। কেউ কেউ এমন নিরীহ মসলার ভয়ে কাঁপা দুর্ভাগা ইংরেজটিকে নিয়ে ঠাট্টাও করেন।
তবে অন্যদের যুক্তি ছিল, উপন্যাসটি যখন লেখা হয়, তখন মিষ্টি পাপরিকার অস্তিত্বই ছিল না।