চট্টগ্রামে নামতে শুরু করেছে বন্যার পানি, বেরিয়ে আসছে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন
এক সপ্তাহের ভয়াবহ বন্যার পর চট্টগ্রামের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো থেকে বন্যার পানি নামতে শুরু করেছে। এতে ঘরবাড়ি, ফসলি জমি, মাছের খামার এবং বিভিন্ন অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির চিত্র সামনে আসছে।
জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, এখন তাদের প্রধান অগ্রাধিকার হলো ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত রাখা, ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব করা, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন এবং বন্যা-পরবর্তী স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলা করা।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামের ১৬২টি ইউনিয়ন বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। এতে ১৫ হাজার ২২৩টি ঘরবাড়ি, ৩৮৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রায় এক হাজার ৩২০ কিলোমিটার সড়ক এবং ১৫৬টি সেতু ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কয়েক দিনের টানা ভারী বৃষ্টিপাত এবং উজানের পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট এ বন্যায় বাঁশখালী ও সাতকানিয়া উপজেলা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে প্রায় সাড়ে ৫ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েন।
বাঁশখালীর বাহারছড়া ইউনিয়নের বাসিন্দা শাহেদ হোসেন দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে (টিবিএস) বলেন, 'বাড়ি থেকে পানি নেমে গেলেও অনেক পরিবার এখনও রান্না করতে পারছে না, কারণ মাটির চুলা ব্যবহারের মতো পরিবেশ এখনও তৈরি হয়নি।'
তিনি বলেন, 'যাদের গ্যাস সংযোগ আছে তারা বাড়িতে রান্না করছেন। অন্যরা আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে গিয়ে রান্না করছেন।'
বাঁশখালী উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, পানি নামার সঙ্গে সঙ্গে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হচ্ছে। প্রাথমিক হিসাবে চার থেকে পাঁচ হাজার কাঁচা ও আধাপাকা ঘর সম্পূর্ণ বা আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে সব ইউনিয়নে বিস্তারিত ক্ষয়ক্ষতির হিসাব এখনও চলছে।
প্রশাসন জানিয়েছে, নিরাপদ খাবার পানি সরবরাহ, স্যানিটেশন নিশ্চিত করা এবং পানিবাহিত রোগ প্রতিরোধ এখন তাদের প্রধান অগ্রাধিকার। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের তালিকা তৈরি করে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হবে। পাশাপাশি এনজিও ও উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তায় ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি পুনর্নির্মাণ করা হবে।
বাঁশখালীর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রুহুল আমিন দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে (টিবিএস) বলেন, বন্যা পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে এবং অধিকাংশ এলাকা থেকে পানি নেমে গেছে।
তিনি বলেন, 'আজ (১৫ জুলাই) দিনের মধ্যেই প্রায় সব এলাকা থেকে পানি নেমে যাবে বলে আমরা আশা করছি। কেবল বিচ্ছিন্ন কিছু নিচু এলাকায় এখনও পানি রয়েছে।'
ত্রাণ কার্যক্রম সম্পর্কে ইউএনও বলেন, সরকারের বরাদ্দ দেওয়া ১৫০ টন চাল ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে বিতরণ করা হচ্ছে। উপজেলা প্রশাসন ও ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে প্রায় ১০ হাজার শুকনা খাবারের প্যাকেট বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া ব্যক্তি, বিভিন্ন সংগঠন ও স্বেচ্ছাসেবী দল আরও ১৫ থেকে ২০ হাজার রান্না করা খাবারের প্যাকেট বিতরণ করেছে।
পাশের সাতকানিয়া উপজেলাতেও বন্যার পানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
সাতকানিয়ার ইউএনও খন্দকার মাহমুদুল হাসান দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে (টিবিএস) বলেন, বন্যা-পরবর্তী কৃষি, মৎস্য ও সড়ক খাতের ক্ষয়ক্ষতির মূল্যায়ন শুরু হয়েছে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন পাওয়া যাবে।
তিনি বলেন, এ পর্যন্ত প্রায় ২৫ হাজার পরিবার ত্রাণ পেয়েছে। অধিকাংশ এলাকা থেকে পানি নেমে গেলেও অনেক ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত এবং কাদায় ঢেকে আছে।
তিনি আরও বলেন, 'বন্যার সময় নিরাপদ খাবার পানির তীব্র সংকট ছিল। এখন প্রতিটি ত্রাণ প্যাকেটের সঙ্গে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা হচ্ছে।'
এর আগে টানা ভারী বৃষ্টিপাত, পাহাড়ি ঢল এবং সাঙ্গু ও ডলু নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় বাঁশখালীর প্রায় ৮০ শতাংশ এবং সাতকানিয়ার প্রায় ৭০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়। এতে ঘরবাড়ি, কৃষিজমি, মাছের ঘের, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং পরিবহন অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।
