বন্যার পর চট্টগ্রামে বাড়ছে ডায়রিয়া, হাসপাতালে ভর্তি ২ শতাধিক
চট্টগ্রামে বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর বাড়ছে পানিবাহিত রোগের প্রকোপ। জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে নগরের তিনটি হাসপাতাল ও ১৪টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হয়েছেন ২০৬ জন রোগী।
এর মধ্যে চট্টগ্রাম নগরের তিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৯৬ জন ডায়রিয়া রোগী। বাকি ১১০ জন ভর্তি আছেন বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে।
ডায়রিয়ার উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যান নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থানার বাবুল কলোনির আব্দুল মতিন (৭৫)। একই এলাকায় ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে অন্তত ৩০ জন চিকিৎসা নিয়েছেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের স্বাস্থ্য বিভাগের প্রাথমিক তদন্তে বাবুল কলোনির একটি অপরিষ্কার পানির ট্যাংকের পানির কারণে ডায়রিয়া ছড়িয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইমাম হোসাইন টিবিএসকে বলেন, "প্রাথমিকভাবে আমরা ধারণা করছি, ট্যাংকের পানির কারণেই ডায়রিয়া ছড়িয়েছে।"
তিনি বলেন, আব্দুল মতিনের মৃত্যুর ক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে পানিশূন্যতাকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
একটি মেডিকেল টিম বাবুল কলোনি পরিদর্শন করে আক্রান্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে এবং পানির উৎস পরীক্ষা করেছে।
সবচেয়ে বেশি রোগী চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে বর্তমানে ৬৫ জন ডায়রিয়া রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাদের মধ্যে শিশু বিভাগের ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডে ৩৮ শিশু এবং মেডিসিন বিভাগের বিভিন্ন ওয়ার্ডে ২৭ জন প্রাপ্তবয়স্ক রোগী ভর্তি আছেন।
চট্টগ্রাম ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন ১৬ জন রোগী, যাদের মধ্যে চারজন শিশু। আর চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন ১৫ জন, যাদের মধ্যে তিনজন শিশু।
জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৪টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি থাকা ১১০ রোগীর প্রায় ৩০ শতাংশ শিশু।
উপজেলাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রোগী পটিয়ায়, ২২ জন। এরপর ফটিকছড়িতে ১৫ জন এবং আনোয়ারায় ১৩ জন।
বাঁশখালী ও বোয়ালখালীতে ৯ জন করে, চন্দনাইশ, লোহাগাড়া ও মিরসরাইয়ে ৭ জন করে, হাটহাজারী ও সীতাকুণ্ডে ৬ জন করে, সাতকানিয়ায় ৫ জন, রাঙ্গুনিয়ায় ৩ জন এবং রাউজানে একজন রোগী ভর্তি আছেন।
বন্যার পর অসুস্থতার অভিযোগ
চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি সাতকানিয়ার বাসিন্দা জহিরুল ইসলাম টিবিএসকে বলেন, "বন্যার পর কয়েকদিন এলাকায় পানি জমে ছিল। এরপর থেকেই অনেকেই অসুস্থ হতে শুরু করেন। আমারও ডায়রিয়া ও বমি শুরু হলে হাসপাতালে ভর্তি হই।"
তিনি বলেন, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী এখন ওআরএস ও ওষুধ নিচ্ছেন।
চমেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বোয়ালখালীর বাসিন্দা মোহাম্মদ ইউসুফ টিবিসকে বলেন, তার বাড়ি চার থেকে পাঁচ দিন পানির নিচে ছিল। পানি নেমে যাওয়ার দুই-তিন দিন পর ডায়রিয়া শুরু হয়। পরে অবস্থা খারাপ হলে হাসপাতালে ভর্তি হই।
চমেক হাসপাতালের শিশু বিভাগের ৯ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন বাঁশখালীর ১৮ মাস বয়সি শিশু জহিরুল আলমের মা লুৎফুল নাহার জানান, বন্যার কারণে তাদের পরিবার কয়েকদিন আশ্রয়কেন্দ্রে ছিল। বাড়িতে ফেরার পর টিউবওয়েলের পানি ব্যবহার শুরু করেন তারা। এরপর থেকে তার ছেলের ডায়রিয়া ও বমি শুরু হয়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে, বলছে স্বাস্থ্য বিভাগ
এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন জাহাঙ্গীর আলম বলেন, বন্যার পর পানির উৎস দূষিত হওয়ার কারণে ডায়রিয়া, কলেরাসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়ে।
তিনি টিবিএসকে বলেন, "বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এটি এখনো মহামারি পর্যায়ে যায়নি।"
তিনি জানান, ডায়রিয়ায় নিশ্চিত কোনো মৃত্যুর তথ্য স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে নেই। আব্দুল মতিনের মৃত্যুও এখন পর্যন্ত নিশ্চিত ডায়রিয়া মৃত্যু হিসেবে শ্রেণিভুক্ত করা হয়নি।
সিভিল সার্জন বলেন, বাবুল কলোনির পানির উৎস, স্যানিটেশন ব্যবস্থা ও আশপাশের পরিবেশ পরীক্ষা করা হবে। প্রয়োজন হলে পানির নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে পাঠানো হবে।
বন্যাকবলিত এলাকায় স্বাস্থ্য বিভাগ এ পর্যন্ত ৬৫ হাজার পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট বিতরণ করেছে। পাশাপাশি ওআরএস, নিরাপদ পানি ও চিকিৎসাসেবা দিতে মাঠ পর্যায়ে কাজ করছে মেডিকেল টিম।
স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা ডায়রিয়ায় আক্রান্তদের নিরাপদ পানি পান, নিয়মিত ওআরএস গ্রহণ এবং পানিশূন্যতার লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
