বন্যায় চট্টগ্রামের মানিক পাঠান গ্রামের ৬৫ শতাংশ বসতঘর ক্ষতিগ্রস্ত, সরকারি ত্রাণ পায়নি বহু পরিবার
দেড় বছরের শিশুটি ক্ষুধার্ত হয়ে বারবার মায়ের বুকের দুধ খুঁজে কেঁদে উঠছে। কিন্তু মা জেসমিন আক্তার নির্বাক, অসহায়। গত কয়েক দিন ধরে নিজেরই ঠিকমতো খাবার জোটেনি, তাই বুকের দুধও আর আগের মতো আসে না। বন্যার প্রবল স্রোতে জেসমিনদের মাটির ঘরটি ধসে গেছে। আসবাবপত্র থেকে শুরু করে তিল তিল করে জমানো সব সঞ্চয় এখন বানের জলে ভেসে গেছে। স্বামী আর কোলের শিশুকে নিয়ে এখন একটি প্লাস্টিকের ত্রিপলের নিচেই কাটছে তাদের দিন-রাত।
চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার কাথরিয়া ইউনিয়নের মানিক পাঠান গ্রামের এমন দৃশ্য এখন পুরো গ্রামজুড়েই।
প্রায় ১২০০ মানুষের এই গ্রাম ভয়াবহ বন্যায় বিপর্যস্ত হলেও গ্রামবাসীর অভিযোগ, বন্যা শুরুর পর থেকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ত্রাণ বা সহায়তা তাদের কাছে পৌঁছায়নি।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এমনকি তার কোনো প্রতিনিধি পর্যন্ত খোঁজ নিতে আসেননি বলে দাবি তাদের। রাজনৈতিক কোনো দলের পক্ষ থেকেও কোনো সহায়তা পাননি বলে অভিযোগ করেন গ্রামবাসী।
টানা আট দিনের বৃষ্টিতে সৃষ্ট বন্যায় চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উপজেলার ৮০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। গত কয়েক দিন ধরে বৃষ্টি না হওয়ায় বন্যার পানি নামতে শুরু করেছে। ভেসে উঠছে ক্ষতের ছাপ।
ভাঙা ঘরের স্তূপ, কাদামাখা উঠোন, শুকাতে দেওয়া ভেজা কাপড়, ত্রিপলের নিচে নতুন করে সংসার গড়ার চেষ্টা আর অনিশ্চয়তায় ভরা মানুষের চোখ। বন্যার পানি নেমে গেছে, কিন্তু এই গ্রামের মানুষের দুর্ভোগ এখনও শেষ হয়নি। তারা এখনও অপেক্ষা করছেন—কেউ যেন অন্তত এসে তাদের পাশে দাঁড়ায়।
স্থানীয়দের তথ্যমতে, ২৮০টি পরিবারের এই গ্রামের অধিকাংশ ঘরই ছিল মাটির। বন্যার পানিতে ১৮০টি বসতঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এরমধ্যে অন্তত ৬০টি ঘর পুরোপুরি ধসে গেছে। অনেক পরিবার এখন বাঁশের খুঁটি পুঁতে ত্রিপল টাঙিয়ে বসবাস করছে। আবার অনেকেই এখনও আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন।
কৃষক জামাল আহমেদ পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তিনি দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে (টিবিএস) জানান, বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে তার কৃষিজমি। ঘরে মজুত রাখা ধান ভিজে নষ্ট হয়েছে। বসতঘর ভেঙে পড়েছে। সেই ঘর চাপা পড়ে মারা গেছে তার দুটি গবাদিপশু। একসঙ্গে ফসল, ঘর আর গবাদিপশু হারিয়ে এখন কীভাবে পরিবার চালাবেন, সেই চিন্তায় দিন কাটছে তার।
একই গ্রামের আঞ্জুমা বেগমের জীবনেও দুর্ভোগ যেন থামছেই না। চার মাস আগে দুর্ঘটনায় তার স্বামীর হাত ভেঙে যায়। এরপর থেকেই পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হিসেবে বেকার তার স্বামী। এমনিতেই অভাবের সংসার চলছিল কষ্টে। এর মধ্যেই বন্যার পানি ঘরে ঢুকে ভেঙে দেয় বসতঘর।
তিনি জানান, পঙ্গু স্বামী ও এক ছেলেকে নিয়ে প্রায় অনাহারে দিন কাটছে তার।
ষাটোর্ধ্ব বিধবা জাহানারা বেগমের সংসারও দাঁড়িয়ে আছে অনিশ্চয়তার মুখে। দুই ছেলের একজন প্রতিবন্ধী।
তিনি বলেন, 'এক ছেলে দিনমজুরের কাজ করে কোনোমতে সংসার চালান। বন্যার পানিতে আমাদের মাটির ঘর মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। ঘরে থাকা সামান্য ধানও ভিজে নষ্ট হয়েছে। অনাহারে প্রতিবন্ধী ছেলেকে নিয়ে দিন কাটছে।'
শুধু ঘর নয়, হারিয়ে গেছে জীবিকার পথও। কৃষি ও দিনমজুরির ওপর নির্ভরশীল এই গ্রামের প্রায় ১৪০০ আড়ি ধান পানিতে ভিজে নষ্ট হয়েছে। গ্রামের তিনটি মুরগির খামারে মারা গেছে প্রায় ২ হাজার ৫০০ মুরগি। একটি হাঁসের খামার থেকে ভেসে গেছে প্রায় ৪০০ হাঁস।
বন্যার পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় গ্রামের সব পুকুরের মাছও হারিয়ে গেছে। ফলে অনেক পরিবারের সামনে এখন একই সঙ্গে খাদ্যসংকট ও আয়ের সংকট।
নেই আশ্রয়কেন্দ্র, ভাঙা সড়ক, বিচ্ছিন্ন গ্রাম
মানিক পাঠান গ্রামে নেই কোনো সাইক্লোন সেন্টার বা স্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র। তাই বন্যার সময় পুরো গ্রামের মানুষকে আশ্রয় নিতে হয়েছে মাত্র চারটি পাকা ভবনে। টানা ছয় দিন সেখানে গাদাগাদি করে থাকতে হয়েছে নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের। পরে পানি কমে গেলে অনেকেই ফিরে এসে দেখেন, তাদের ঘর আর আগের জায়গায় নেই।
গ্রামটিতে কোনো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ও নেই। এ গ্রামের শিক্ষার্থীরা পাশের গ্রামে গিয়ে পড়াশোনা করে। কিন্তু এবারের বন্যায় রাস্তা ভেঙে যাওয়ায় তাদের স্কুলে যাওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
এই এলাকায় প্রবেশের তিনটি রাস্তা থাকলেও এখন কোনোটিই স্বাভাবিক চলাচলের উপযোগী নয়। গ্রামের প্রধান সড়কের নির্মাণকাজ চলছিল। কিন্তু বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন কাদা আর ভাঙা পথ পেরিয়েই চলাচল করতে হচ্ছে গ্রামবাসীকে।
বাঁশখালীর কাথরিয়া ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মো. রফিক আহমেদ টিবিএসকে বলেন, '২৮০ পরিবারের মধ্যে মাত্র ৮০ পরিবারকে সরকারি ত্রাণ সহায়তার ১০ কোজি করে চাল দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বেসরকারিভাবেও অনেককে সহায়তা দেওয়া হয়েছে। যতটুকু বরাদ্দ পাচ্ছি, তা বিতরণ করছি।'
তবে গ্রামের অধিকাংশ বাসিন্দা দাবি করেন, তারা সরকারি ত্রাণ পাননি। কয়েকটি পরিবার কিছু সহায়তা পেলেও, গ্রামের বেশিরভাগ মানুষ বঞ্চিত হয়েছেন বলে অভিযোগ তাদের।
এদিকে সরকারি সহায়তা না এলেও 'মধ্যম মানিক পাঠান সমাজ কল্যাণ সমিতি'- নামে একটি স্বেচ্ছাস্বেী সংগঠনের সদস্যরা নিজেদের উদ্যোগে শুকনো খাবারের ব্যবস্থা করেন। পরে তাদের সমন্বয়ে ফেনীসহ আশপাশের কয়েকটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন কিছু শুকনো খাবার নিয়ে আসে। সেই সহায়তায় কয়েক দিন টিকে ছিলেন অনেক পরিবার।
কাথারিয়া ইউনিয়ন চেয়ারম্যান বাদশা মিয়া টিবিএসকে বলেন, 'বন্যার পানি ওঠার সময় থেকে ত্রাণ বিতরণ শুরু হয়। কয়েক দফায় প্রায় ৯৫ থেকে ১০০টির বেশি পরিবারকে সহায়তা দেওয়া হয়েছে। শুরুতে ২০ জন, পরে দুই দফায় ৬০ জন এবং তালিকার বাইরে আরও ১৫টি পরিবারকে ত্রাণ দেওয়া হয়।'
বাঁশখালীর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিন টিবিএসকে বলেন, 'ত্রাণ সাধারণত উপজেলা প্রশাসন থেকে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদে পাঠানো হয়। সেখান থেকেই ওয়ার্ডভিত্তিক বিতরণ করা হয়। আমার জানা মতে, মানিক পাঠান গ্রামে ত্রাণ পাঠানো হয়েছে।'
