ভারতের রাজনীতিতে নতুন সুপারস্টার—তেলাপোকা!—যেভাবে অনলাইনে ঝড় তুলল
ভারতের রাজনীতি সম্প্রতি এক অদ্ভুত মাসকটের সাক্ষী হয়েছে—তেলাপোকা।
নাছোড়বান্দা, নিন্দিত অথচ কার্যত অবিনশ্বর ধ্বংসাতীত—এই হলো তেলাপোকার বৈশিষ্ট্য। এই পতঙ্গকেই অনুপ্রেরণা করে গড়ে উঠেছে একটি স্যাটায়ার প্ল্যাটফর্ম। এক সপ্তাহেরও কম সময়ে সমাজমাধ্যমে তাদের অনুরাগীর সংখ্যা মিলিয়ন ছাড়িয়ে ভগেছে। মূলধারার সংবাদমাধ্যম থেকে শুরু করে পোড়খাওয়া রাজনীতিবিরাও এখন বিষয়টিতে নজর দিচ্ছেন।
গত সপ্তাহে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের এক বিতর্কিত মন্তব্যের পরই আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসে তেলাপোকা। এক মামলার শুনানি চলাকালীন সূর্য কান্ত সাংবাদিকতা ও সমাজকর্মের দিকে ঝুঁকে পড়া বেকার যুবসমাজকে তেলাপোকা ও পরজীবীর সঙ্গে তুলনা করেন বলে অভিযোগ।
যদিও পরে সূর্য কান্ত ব্যাখ্যা করেন, ভারতের আপামর যুবসমাজকে নয়, বরং 'ভুয়া ডিগ্রিধারী'দের উদ্দেশ্যেই ওই মন্তব্য করেছিলেন তিনি।
কিন্তু তার আগেই অনলাইনে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে ওই মন্তব্য। শুরু হয় বিতর্ক, মিম ও ক্ষোভ প্রকাশের ঝড়। এরই মধ্যে জন্ম হয় ককরোচ জনতা পার্টি—সিজেপি-র। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপির নামের অনুকরণেই এই ব্যঙ্গাত্মক নামকরণ। ২০১৪ সাল থেকে ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার খর্ব করার অভিযোগ তুলেছেন সমালোচক ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো। বিজেপি যদিও বরাবরই সেই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
সিজেপি কোনো আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক দল নয়, এটি মূলত রাজনৈতিক ব্যঙ্গের ভিত্তে গড়ে ওঠা আন্দোলন। এই দলের সদস্য হওয়ার শর্তাও বেশ মজার—বেকার ও অলস হতে হবে, দিনরাত অনলাইনে পড়ে থাকতে হবে এবং 'পেশাদারি দক্ষতায় বকবক করে ক্ষোভ উগরে দেওয়ার ক্ষমতা' থাকতে হবে।
এই অভিনব উদ্যোগের নেপথ্যে আছেন বোস্টন ইউনিভার্সিটির ছাত্র ও রাজনৈতিক জনসংযোগ কৌশলবিদ অভিজিৎ দিপকে। তিনি জানান, নেহাতই রসিকতা করে এই ভাবনা তার মাথায় এসেছিল।
আমেরিকায় যাওয়ার আগে অভিজিৎ আম আদমি পার্টির (আপ) সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এক দশকেরও বেশি সময় আগে দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলন থেকে উঠে আসা এই রাজনৈতিক দলটির সমাজমাধ্যমে জোরালো উপস্থিতির জন্য পরিচিত।
বিসি মারাঠিকে অভিজিৎ বলেন, 'আমার মনে হয়েছিল, আমাদের সবার একত্রিত হওয়া উচিত, হয়তো একটা প্ল্যাটফর্ম শুরু করা যেতে পারে।'
এর পরের ঘটনাপ্রবাহ তার প্রত্যাশাকেও ছাড়িয়ে গেছে।
কয়েক দিনেই গুগল ফর্মের মাধ্যমে সিজেপিতে নাম লেখান হাজার হাজার মানুষ। সমাজমাধ্যমে ট্রেন্ডিং হয়ে যায় #MainBhiCockroach (আমিও তেলাপোকা) হ্যাশট্যাগ। এমনকি বিরোধী নেতারাও এই উদ্যোগকে সমর্থন জানাতে শুরু করেন। বুধবার এক্স হ্যান্ডলে অন্যতম বিরোধীদলীয় নেতা অখিলেশ যাদব লেখেন, 'বিজেপি বনাম সিজেপি'।
শুধু অনলাইন নয়, এই উন্মাদনা ছড়িয়ে পড়েছে অফলাইনেও। বিভিন্ন পরিচ্ছন্নতা অভিযান ও প্রতিবাদ কর্মসূচিতে তেলাপোকার বেশে পোশাক পরে হাজির হতে শুরু করেন তরুণ স্বেচ্ছাসেবকেরা।
বৃহস্পতিবার সিজেপির ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টের ফলোয়ারের সংখ্যা ১০ মিলিয়ন ছাড়িয়ে গেছে। সদস্য সংখ্যার দিক থেকে বিশ্বের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল হিসেবে পরিচিত বিজেপির ইনস্টাগ্রাম ফলোয়ার প্রায় ৮.৭ মিলিয়ন। সেই সংখ্যাকেও ছাপিয়ে গেছে এই 'তেলাপোকা'দের দল।
তবে, ২ লাখেরও বেশি ফলোয়ার থাকা সিজেপির এক্স অ্যাকাউন্টটি এখন ভারতে দেখা যাচ্ছে না। অ্যাকাউন্টটি খুলতে গেলেই একটি বার্তা ভেসে উঠছে—'আইনি পদক্ষেপের কারণে' সেটি স্থগিত রাখা হয়েছে।
সিজেপির উত্থানের গতি ও ব্যাপ্তি অনেককেই চমকে দিয়েছে। তবে এই অনলাইন আন্দোলন কতটা বাস্তবের মাটিতে রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটাতে পারবে, তা নিয়ে এখনও সংশয় রয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলকে ছাপিয়ে গেলেও দেশজুড়ে লাখ লাখ সক্রিয় সদস্য নিয়ে বিজেপি ও বিরোধী দল কংগ্রেসই ভারতের মূল রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে টিকে রয়েছে।
তা সত্ত্বেও সিজেপির জনপ্রিয়তা কিন্তু বেড়েই চলেছে।
সমর্থকদের কাছে এই প্ল্যাটফর্ম যেন বদ্ধ রাজনৈতিক পরিবেশে 'মুক্ত বাতাস'। অনেকের মতেই, বর্তমান রাজনীতি অনেকটা নিয়ন্ত্রিত; ভিন্নমত সহ্য করার মতো পরিবেশ সেখানে নেই। মহুয়া মৈত্র, কীর্তি আজাদের মতো বিরোধী রাজনীতিবিদ ও প্রবীণ আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণও এ আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়েছেন।
অন্যদিকে সমালোচকরা একে বিরোধীদের মদতপুষ্ট 'অনলাইন রাজনৈতিক নাটক' বলে উড়িয়ে দিচ্ছেন। তাদের দাবি, দীপকের অতীতে আম আদমি পার্টির সঙ্গে যুক্ত থাকার বিষয়টিই ইঙ্গিত দেয় যে, এটি স্বতঃস্ফূর্ত বিদ্রোহ নয়, বরং সুপরিকল্পিত ডিজিটাল রাজনীতি।
এই অনলাইন উন্মাদনার বাইরেও সিজেপি ভারতে তরুণ প্রজন্মের প্রজন্মের ক্লান্তির প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, তারা প্রতিনিয়ত অনলাইনের রাজনীতির সংস্পর্শে এলেও প্রচলিত দলগুলোর মধ্যে তাদের নিজস্ব কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই।
বিশ্বের অন্যতম তরুণ জনসংখ্যা ভারতের। ১৪০ কোটির জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই ৩০ বছরের কম বয়সি। অথচ মূলধারার রাজনীতিতে তাদের অংশগ্রহণ অত্যন্ত সীমিত। সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ভারতের ২৯ শতাংশ তরুণ-তরুণী রাজনীতি থেকে দূরে থাকেন। রাজনৈতিক দলের সদস্য মাত্র ১১ শতাংশ তরুণ-তরুণী।
অভিজিৎ বলেন, 'মানুষ হতাশ, কারণ তারা মনে করেন না যে তাদের কথা শোনার বা প্রতিনিধিত্ব করার কেউ আছে।'
দক্ষিণ এশিয়ায় গত কয়েক বছরে তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বে আন্দোলনের ঢেউ আছড়ে পড়েছে। কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি ও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ক্ষোভ থেকে শুরু হওয়া এসব বিক্ষোভের জেরে শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও বাংলাদেশে সরকারের পতন ঘটেছে। ভারতে এখনও এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়নি ঠিকই, তবে সমস্যার শিকড় একই।
অর্থনীতি দ্রুত বড় হলেও কর্মসংস্থান, বৈষম্য ও জীবনধারণের ক্রমবর্ধমান ব্যয় নিয়ে আমজনতার উদ্বেগ কমেনি। প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পথে পা বাড়ানো তরুণদের কাছে এখন আর শুধু শিক্ষা স্থিতিশীল ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা দিতে পারছে না। জীবনে উন্নতির প্রতিশ্রুতিও ক্রমেই ফিকে হয়ে আসছে।
অভিজিৎ যদিও নেপাল বা শ্রীলঙ্কার পরিস্থিতির সঙ্গে ভারতের তুলনা করতে চান না, তবে তিনি স্বীকার করেন যে তরুণদের ক্ষোভ বাস্তব। সেই ক্ষোভই এখন অনলাইনে বিচ্ছিন্নভাবে প্রকাশ পাচ্ছে।
তিনি বলেন, 'জেনজি প্রথাগত রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর থেকে আস্থা হারিয়েছে। তারা নিজেদের ভাষায় নিজস্ব রাজনৈতিক মঞ্চ তৈরি করতে চায়।'
সিজেপির ওয়েবসাইটেও এই মানসিকতার প্রতিফলন দেখা গেছে। সেখানে কোনো রাজনৈতিক ইশতেহারের বদলে ইন্টারনেট সংস্কৃতির ছাপই বেশি স্পষ্ট।
সিজেপি নিজেদের তুলে ধরেছে 'অলস ও বেকারদের কণ্ঠস্বর' হিসেবে। দলটির দাবি, তাদের কোনো স্পনসর নেই, রয়েছে কেবল 'এক জেদি ঝাঁক'। যারা 'সব ঠিক আছে—এই ভান করতে করতে ক্লান্ত'। এই দলের মানুষকেই এ আন্দোলনে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
সিজেপির ওয়েবসাইটে রয়েছে বেশ কিছু মজার ফর্ম। ইচ্ছা করেই বিষয়গুলোকে খানিকটা অমার্জিত রাখা হয়েছে। এর উপস্থাপনা দেখলে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর চেয়ে কোনো গোষ্ঠীর অভ্যন্তরীণ রসিকতা বলেই বেশি মনে হয়।
তা সত্ত্বেও, হাস্যরসের আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে স্পষ্ট কিছু রাজনৈতিক দাবি: দায়বদ্ধতা, গণমাধ্যমের সংস্কার, নির্বাচনি স্বচ্ছতা ও নারীদের প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি। সেইসঙ্গে রয়েছে বেকারত্ব, মানসিক অবসাদ ও একটানা অনলাইন ঘেঁটে যাওয়ার (ডুমস্ক্রলিং) মতো বিষয় নিয়ে নিজেদের উপহাস করার মতো রসিকতা।
এই ব্যঙ্গ ও আন্তরিকতার মিশেলই তাদের আবেদনের মূল চাবিকাঠি। তাদের রসিকতাগুলো মানুষের মনে দাগ কাটে, কারণ এর নেপথ্যে থাকা কর্মসংস্থানের অভাব, বৈষম্য, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতাবোধের যন্ত্রণা অনেকেরই চেনা।
মাসকট হিসেবে তেলাপোকা বেছে নেওয়ার বিষয়টিও অনেকের কাছে যুক্তিযুক্ত মনে হয়েছে। তেলাপোকা মোটেও বীর নয়, উচ্চাকাঙ্ক্ষী তো নয়ই। বরং এর বৈশিষ্ট্য অনেক বেশি মৌলিক। প্রাণীটি ঘাতসহ, মানিয়ে নিতে পারে এবং অত্যন্ত কম প্রত্যাশা নিয়ে যেকোনো প্রতিকূল পরিস্থিতিতে টিকে থাকতে পারে।
অবশ্য রাজনীতি ও হাস্যরসের সীমারেখা মুছে যাওয়ার বিষয়টি নতুন কিছু নয়।
ইতালিতে কমেডিয়ান বেপ্পে গ্রিল্লো ঠিক এভাবেই প্রতিষ্ঠানবিরোধী রসিকতাকে হাতিয়ার করে 'ফাইভ স্টার মুভমেন্ট' গড়ে তুলেছিলেন। ইউক্রেনে ভলোদিমির জেলেনস্কি তো টেলিভিশনের পর্দায় কাল্পনিক প্রেসিডেন্টের চরিত্রে অভিনয় করতে করতেই বাস্তবের রাষ্ট্রনেতা হয়ে উঠেছেন। যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্পের শাসনামল ব্যঙ্গ ও বাস্তব রাজনীতির পার্থক্যই মুছে দিয়েছে।
ভারতের ক্ষেত্রে এই আন্দোলনটি মূলত অনলাইন-কেন্দ্রিক। হ্যাশট্যাগ, অবসাদ ও শ্লেষাত্মক হতাশা থেকে সূত্রপাত 'পোকা-কেন্দ্রিক' আন্দোলনের।
প্রথম দর্শনে ব্যাপারটা অস্বাভাবিক মনে হলেও, ভারতীয় রাজনীতির প্রেক্ষাপটে এটি মোটেই বেমানান নয়।
ভারতের রাজনীতিবিদেরা বহুদিন ধরেই চমকপ্রদ প্রদর্শনীর ক্ষমতার কদর করে আসছেন। হিমালয়ের গুহায় বসে ধ্যান করা থেকে শুরু করে বিধায়কদের বাসে তুলে নিয়ে রিসর্টে আটকে রেখে নাটকীয়ভাবে দলবদল—সবই দেখতে অভ্যস্ত এ দেশ।
অনলাইন প্রচারাভিযানও এখন সুপরিকল্পিত ভাইরাল ভিডিও ও চটকদার স্লোগানের ওপর নির্ভরশীল।
এই প্রেক্ষাপটে একটি পোকা-কেন্দ্রিক রাজনৈতিক গোষ্ঠীর আবির্ভাবকে অদ্ভুতভাবে প্রাসঙ্গিকই মনে হতে পারে।
আন্দোলনটি কেন এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল, তারও ব্যাখ্যা মেলে এখান থেকে। এর অর্থ এমনটা নয় যে, ভারতের তরুণ সমাজ নতুন কোনো রাজনৈতিক দল চাইছে। ব্যাপারটা এমনও হতে পারে, অনেকেই হতাশা প্রকাশের উপযুক্ত ভাষা খুঁজছেন।
দিপক বলেন, 'আমার মনে হয় সিজেপি কেবল শুরু। বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থায় তরুণরা বীতশ্রদ্ধ, ভবিষ্যতে এমন যুব সংগঠন আরও গড়ে উঠবে।'
তবে অনেকেই বিষয়টি নিয়ে সংশয়ে রয়েছেন। তাদের মতে, যে গতিতে এই দলের উত্থান হয়েছে, ঠিক সেই গতিতেই হারিয়েও যাবে।
সে যা-ই হোক, সিজেপি ইতিমধ্যেই ভারতের রাজনীতিতে এক অভিনব কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলেছে। অন্তত সাময়িকভাবে হলেও দেশের তরুণ প্রজন্ম এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে নিজেদের অস্তিত্বের জানান দিতে পেরেছেন।
আগেকার যুগে তরুণদের রাজনৈতিক ক্ষোভ থেকে জন্ম নিত নানা ইশতেহার। আর ২০২৬ সালে কখনও কখনও সেই ক্ষোভ থেকে জন্ম নিচ্ছে পতঙ্গ মাস্কটের মিম রাজনৈতিক দল।
