তীব্র তাপে ফাঁকা রাস্তাঘাট: ভারতের এক শহরে তাপমাত্রা রেকর্ড ৪৮.২ ডিগ্রি
ভারতে বিশাল এলাকাজুড়ে এক চরম তাপপ্রবাহের কবলে পড়েছে। তীব্র রোদের হাত থেকে বাঁচতে রাস্তাঘাট আর বাজারগুলোতে দুপুরের পর থেকে প্রায় মানুষের দেখাই মিলছে না। এদিকে, অসহনীয় তাপ থেকে বাঁচতে কিছু কৃষক তাদের কাজ রাতে সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছেন।
বৃহস্পতিবার (২১ মে) ভারতের আবহাওয়া বিভাগ বা আইএমডি পূর্বাভাস দিয়েছে যে, রাজধানী দিল্লিতে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের (১১৩ ফারেনহাইট) কাছাকাছি থাকতে পারে।
নাগরিকদের এই অস্বস্তিকর গরম থেকে কিছুটা স্বস্তি দিতে, শহরের বিভিন্ন স্থানে কর্তৃপক্ষ অস্থায়ী 'কুলিং জোন' বা শীতলীকরণ কেন্দ্র খুলেছে।
আবহাওয়া অফিস থেকে সতর্ক করে বলা হয়েছে, উত্তর ভারতের একাধিক অঞ্চলে এই চরম পরিস্থিতি আগামী কয়েক দিন ধরে চলতে পারে, যেখানে তাপমাত্রা ঋতুর স্বাভাবিক তাপমাত্রার চেয়ে অনেক ওপরেই থাকবে।
খুব বেশি তাপের কারণে শরীরে যেন কোনো অসুস্থতা না দেখা দেয়, সে জন্য দিনের সবচেয়ে গরম সময়ে সাধারণ মানুষকে ঘরে থাকতে এবং সতর্কতা মানতে বলা হয়েছে।
সমতল অঞ্চলে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস (১০৪ ফারেনহাইট) এবং পাহাড়ি এলাকায় ৩০ ডিগ্রি (৮৬ ফারেনহাইট) বা এর চেয়ে বেশি হলে ভারতে আনুষ্ঠানিকভাবে তাপপ্রবাহ বা 'হিটওয়েভ' ঘোষণা করা হয়। এই চরম উত্তাপ উত্তর ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে সাধারণ জনজীবনকে প্রায় স্থবির করে দিয়েছে।
উত্তরপ্রদেশে, যা কিনা ভারতের সবচেয়ে বেশি জনসংখ্যার রাজ্য, সেখানকার বেশ কিছু জায়গায় রাস্তাঘাট আর বাজার দুপুর হতেই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, আর মানুষ ঘরের ভেতরেই থাকার চেষ্টা করছেন।
অন্যদিকে, ব্যবসায়ীরা বাধ্য হয়ে তাদের কাজের সময় এগিয়ে নিয়ে সকালেই সেরে নিচ্ছেন। আর কৃষকদের দিনের বেলায় প্রচণ্ড রোদের তাপ সহ্য করা অসম্ভব হয়ে পড়ায় তারা এখন রাতেই মাঠের কাজ করার উপায় বের করেছেন।
এছাড়া, মঙ্গলবার বান্দা শহরে তাপমাত্রা যখন সর্বোচ্চ ৪৮.২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে (১১৮.৮ ফারেনহাইট) পৌঁছায়, তখন গরমে শিশুদের স্বাস্থ্যের কথা চিন্তা করে কিছু স্কুল কর্তৃপক্ষ ছুটি ঘোষণা করে ক্লাস বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, কেউ যেন ভরদুপুরে বাইরে বের না হয়, পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি খায়, এবং মাথা ঘোরা বা তীব্র জ্বরের মতো কোনো সমস্যা বোধ করলেই যেন দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যায়।
দিল্লির স্থানীয় লোকজন ও ঘুরতে আসা পর্যটকদের কিছুটা স্বস্তি দিতে সারা শহর জুড়ে বিশেষ শীতলীকরণ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে।
ছায়াযুক্ত এই আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে এয়ার কুলার, ফ্যান, খাওয়ার পানি, এবং খাওয়ার স্যালাইন বা ওআরএস-এর ব্যবস্থা করা হয়েছে যাতে গরমের কষ্ট থেকে বাঁচতে মানুষের কিছুটা সাহায্য হয়।
গত বুধবার এ রকমই একটি তাঁবুর নিচে বেশ কিছু মানুষকে এয়ার কুলারের পাশে শুয়ে থাকতে দেখা গেছে, যেখানে দায়িত্বরত কর্মীরা পানির সাথে রিহাইড্রেশন সল্ট মিশিয়ে কাগজের কাপে বিলি করছিলেন।
বাশারত আহমাদ মাল্লা (২৫) নামের একজন পর্যটক জানান, 'আমরা ঘুরতে এসেছিলাম, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে গরমে মরেই যাবো। এই কুলিং সিস্টেম আমাদের কিছুটা হলেও আরাম দিচ্ছে।'
জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন যে, ভারতে তাপমাত্রার এই তীব্র ঊর্ধ্বগতি মূলত পুরো বিশ্ব জুড়ে ছড়িয়ে পড়া জলবায়ু পরিবর্তনের একটি বড় অংশ।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারত ঘন ঘন আরও তীব্র তাপপ্রবাহের সম্মুখীন হচ্ছে, এবং গত এক দশকের ভেতরে দেশটিতে সবচেয়ে উষ্ণ বছরগুলোর সমস্ত রেকর্ড তৈরি হয়েছে।
ভারতের পুনের 'ফ্লেম ইউনিভার্সিটি'-র পাবলিক পলিসির অধ্যাপক এবং জাতিসংঘের বিভিন্ন জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক রিপোর্টের প্রণেতা অঞ্জন প্রকাশ বলেন, 'আগের সময়ের তুলনায় গত দশ বছরে মানুষের নিজস্ব কাজকর্মে বা মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের ফলেই ভারত ব্যাপকভাবে উষ্ণ হয়ে উঠছে। বিশেষ করে, ভারতের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল দেশের অন্যান্য অনেক অঞ্চলের চেয়ে আরও দ্রুত গরম হচ্ছে।'
তিনি আরও যোগ করেন, ভারতীয়রা গ্রীষ্মের চরম গরমের সঙ্গে অভ্যস্ত হলেও, 'জলবায়ু পরিবর্তন এখন এই ধরনের অসহনীয় তাপপ্রবাহকে বারবার আমাদের দিকে ছুড়ে মারছে, যেমনটা আমরা এখন ভোগ করছি।'
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের গবেষণায় একটি ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে যে, ২০০৮ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর ভারতে তীব্র গরমে অন্তত ১ হাজার ১১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা ধারণা করেন যে, আসল সংখ্যাটি হয়তো হাজার ছাড়িয়ে যাবে। কিন্তু ডেথ সার্টিফিকেট বা মৃত্যু সনদে বেশিরভাগ সময় গরমকে সরাসরি মৃত্যুর কারণ হিসেবে লেখা হয় না বলে এই মানুষগুলো সরকারি খাতায় হিসাবের বাইরেই থেকে যান।
