যুক্তরাষ্ট্রের চাপে রাশিয়ার তেল আমদানি কমিয়ে ভেনেজুয়েলার তেল আমদানি বাড়িয়েছে ভারত
চলমান বিশ্ব জ্বালানি সংকটের মধ্যেই ভারতে রান্নার গ্যাস এবং জ্বালানি তেলের দাম বেড়েই চলেছে। এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া সাম্প্রতিক নিষেধাজ্ঞার শিথিলতার মেয়াদ মাত্র ৩০ দিনের জন্য বাড়ানোতে, ভারতে রাশিয়ার তেলের আমদানি কমে আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আর ঠিক এমন সময়েই ভারত যুক্তরাষ্ট্রের চাপ সামলাতে বিকল্প হিসেবে ভেনেজুয়েলার তেল আমদানিতে নজর দিয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্র এবং সৌদি আরবের মতো বড় সরবরাহকারীদেরও পেছনে ফেলে দিয়েছে। মে মাসে ভেনেজুয়েলা হয়ে দাঁড়িয়েছে ভারতের অপরিশোধিত তেলের তৃতীয় বৃহত্তম যোগানদাতা।
বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে, ভারত গত ১০ সপ্তাহের মধ্যে চার সপ্তাহ ধরে রাশিয়া থেকে দৈনিক ২০ লাখ ব্যারেলের (বিপিডি) বেশি অপরিশোধিত তেল আমদানি করেছে। এর মধ্যে এপ্রিলে দৈনিক ১৮ লাখ ব্যারেল এবং মার্চে দৈনিক ১৬ লাখ ব্যারেল করে তেল নিয়ে রাশিয়ার জাহাজ ভারতের উদ্দেশ্যে ছেড়েছিল।
কিন্তু মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকির কারণে মে মাসে এই তেল তোলার হার ভয়াবহভাবে কমে যায়। তখন তা নেমে আসে দৈনিক ৭ লাখ ব্যারেলেরও নিচে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন তেলের নিষেধাজ্ঞায় আবার যে ৩০ দিনের বাড়তি ছাড় দিয়েছে, সেটি বাইরে থেকে একটি স্বস্তির খবর মনে হলেও, দেশীয় তেল পরিশোধকদের জন্য এতে খুব একটা সুখবর নেই। তাদের মতে, এবারের ছাড়ে নতুন কিছু নিয়ম যোগ করার ফলে এই সুযোগ তারা আর পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারবে না।
১৮ মে'র ওই নতুন নির্দেশনায় স্পষ্ট করে বলা হয় যে, 'আগামী ১৭ জুনের রাত ১২টা ০১ মিনিট পর্যন্ত রাশিয়ান অপরিশোধিত তেল বা পেট্রোলিয়াম পণ্যের বিক্রি, সরবরাহ, অথবা খালাস করা অনুমোদন পাবে, যদি তা ১৭ এপ্রিল বা তার আগে কোনো জাহাজে (এমনকি অবরুদ্ধ বা ব্ল্যাকলিস্টেড করা জাহাজে হলেও) লোড করা হয়ে থাকে।'
অর্থাৎ ১৭ এপ্রিলের আগে বোঝাই হওয়া পণ্যই কেবল ছাড়ের সুবিধা পাবে, নতুন কিছু নয়। তবে কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তা ওই পত্রিকাকে জানিয়েছেন, আগের ওই নিষেধাজ্ঞা থেকে বাঁচতে গত ১৭ এপ্রিলের আগে ওঠানো বেশিরভাগ তেলই আগে বিক্রি হয়ে গেছে। কারণ ১৭ মে সেই আগের ছাড়ের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল।
সরকারি তথ্যের প্রাথমিক হিসাবে দেখা যাচ্ছে যে, গত বছরের তুলনায় এপ্রিলে তেলের জন্য ভারতের প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি টাকা গুনতে হলেও, বাস্তবে ভারতে অপরিশোধিত তেলের আমদানি ৪.৩ শতাংশ কমেছে। দ্য হিন্দু জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সাথে ইরান যুদ্ধের জেরে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে থাকায়, তেলের চালান আসাও বাধাগ্রস্ত হয়েছে। আর এই সুযোগে ইকোনমিক টাইমসের খবর অনুযায়ী, মে মাসে ভেনেজুয়েলা সৌদি আরব এবং যুক্তরাষ্ট্রকে পেছনে ফেলে ভারতের কাছে তেল বিক্রিতে তৃতীয় স্থান অধিকার করেছে!
কেন এই পরিবর্তন?
রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের মতো ভারতের কিছু বড় তেল কোম্পানি একটু সস্তায় পাওয়া ভারি অপরিশোধিত তেল খুঁজছে। আর ভেনেজুয়েলা তাদের সেই সুযোগ দিচ্ছে।
এর মধ্যেই আমেরিকার সিনেটর মার্কো রুবিও এক অদ্ভুত ঘোষণা দিয়েছেন যে, ভেনেজুয়েলার নেতা শিগগিরই ভারত সফরে আসতে পারেন।
আর এর মাধ্যমেই বোঝা যাচ্ছে, আমেরিকা দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলো থেকে ভারতকে আরও বেশি অপরিশোধিত তেল কেনার দিকে এক প্রকার জোরাজুরি করছে।
ইকোনমিক টাইমসের এক রিপোর্ট অনুযায়ী, শুধু মে মাসেই ভেনেজুয়েলা প্রতিদিন ভারতে প্রায় ৪ লাখ ১৭ হাজার ব্যারেল তেল বিক্রি করেছে।
যেখানে এপ্রিলে এর পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৮৩ হাজার ব্যারেল, আর তার আগের ৯ মাসে তারা ভারতের কাছে এক ফোঁটাও তেল বিক্রি করেনি!
তেলের ঘাটতি নেই, জানাল কোম্পানিগুলো
বিশেষজ্ঞরা আগেই সতর্ক করেছিলেন যে, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়তে থাকলে রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানিগুলো তাদের লোকসান এড়াতে সাধারণের জন্য পেট্রোল আর ডিজেলের দাম আরও বাড়াতে পারে।
তবে, সরকারি তেল সরবরাহকারী সংস্থা 'ইন্ডিয়ান অয়েল' এই সংকটের কথা পুরোপুরি উড়িয়ে দিয়েছে। তারা জানিয়েছে যে তাদের পেট্রোল পাম্পগুলোতে কোথাও তেলের অভাব নেই, এমনকি তেল কম দেওয়ার বা রেশনিং করারও কোনো নির্দেশ তারা দেয়নি।
বরং তারা মনে করে, এখন মাঠে ধান কাটার সময় বলে চারদিকে ডিজেলের চাহিদা বেশি, তাই চাপটা একটু বেশি লাগছে। তারা এও জানিয়েছে যে বেসরকারি তেলের পাম্পের চেয়ে তাদের দাম একটু কম বলে সবাই এখন তাদের ওপরেই বেশি ঝুঁকেছে।
অন্যদিকে আরেক তেল কোম্পানি 'অয়েল ইন্ডিয়া' দাবি করেছে যে, সরকার রাস্তাঘাট আর অবকাঠামো বানাতে যে উদ্যোগ নিয়েছে তাতে তারা যথেষ্ট সাহায্য পাচ্ছে। কোম্পানির চেয়ারম্যান রঞ্জিত রথ 'দ্য হিন্দু' পত্রিকাকে জানিয়েছেন, খুব শিগগিরই তারা তাদের তেল উৎপাদনের পরিমাণ ব্যাপক হারে বাড়ানোর কাজে হাত দিতে যাচ্ছেন।
