বেসরকারি চাকরিজীবীদের সুরক্ষা দিতে নতুন সার্ভিস রুলস করছে সরকার
বেসরকারি খাতের চাকরিজীবীদের চাকরির নিরাপত্তা ও ন্যায্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে যুগোপযোগী ও সমন্বিত 'বেসরকারি সার্ভিস রুলস' প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
এ লক্ষ্যে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় নতুন একটি বিধিমালা তৈরির কাজ শুরু করেছে। এর মাধ্যমে বেসরকারি খাতে ন্যূনতম বেতন, কর্মঘণ্টা, বিভিন্ন ধরনের ছুটি, নিয়োগপত্র বাধ্যতামূলক করা, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ বৈষম্য দূর, জোরপূর্বক শ্রম বন্ধ, হয়রানি প্রতিরোধ, চাকরির স্থায়িত্ব এবং অন্যান্য প্রাপ্য সুবিধার আইনি ভিত্তি নিশ্চিত করা হবে।
এ বিষয়ে গত ১০ মে সচিবালয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. এহছানুল হকের সভাপতিত্বে একটি মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়, চেম্বার ও বেসরকারি খাতের বিভিন্ন সংগঠনের মতামত নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
এ বিষয়ে মতামত জানাতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে ১৫ কর্মদিবস সময় দিয়ে চিঠি পাঠিয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।
সব পক্ষের মতামতের ভিত্তিতে 'বাংলাদেশ শ্রম আইন-২০০৬' ও 'বাংলাদেশ শ্রম বিধিমালা-২০১৫'-এ প্রয়োজনীয় সংশোধন বা সংযোজন আনা হবে। এ জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (বিধি অনুবিভাগ) মোস্তফা জামানকে প্রধান করে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
মোস্তফা জামান মঙ্গলবার (২০ মে) দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন এবং বেসরকারি চাকরিজীবীদের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, "বেসরকারি খাতের চাকরিজীবীদের চাকরির নিরাপত্তাকে সরকার সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। প্রায়ই দেখা যায়, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নিজেদের সুবিধামতো কর্মী ছাঁটাই করছে।"
তিনি আরও বলেন, "অনেক প্রতিষ্ঠান কর্মীদের বয়স হলে রাখতে চায় না। নারী কর্মীরা যথাযথ মাতৃত্বকালীন ছুটি পান না। অনেক প্রতিষ্ঠান সার্ভিস বেনিফিটও দেয় না। এসব সমস্যা দূর করতেই নতুন রুলস তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।"
মোস্তফা জামান বলেন, "বর্তমান শ্রম আইনসহ অন্যান্য আইনে বেসরকারি চাকরিজীবীদের সুরক্ষায় নানা বিধান রয়েছে। তবে বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই কর্মীরা ন্যায্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন। তাই সরকার একটি সমন্বিত বিধিমালা তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যাতে বেসরকারি চাকরিজীবীদের অধিকার ও ন্যায্যতা নিশ্চিত হয়।"
তিনি জানান, বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মতামত নেওয়া হচ্ছে। মতামতের ভিত্তিতে নতুন বিধিমালা চূড়ান্ত করা হবে।
তিনি আরও বলেন, "এই বিধিমালা বাস্তবায়নের দায়িত্ব শ্রম মন্ত্রণালয়কে দেওয়া হতে পারে। কারণ শ্রম মন্ত্রণালয়ের ট্রাইব্যুনাল রয়েছে, যেখানে কেউ বিধি অনুযায়ী বঞ্চিত হলে প্রতিকার চাইতে পারবেন।"
বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারেও বলা হয়েছে, বেসরকারি চাকরিজীবীরা যাতে প্রাপ্য ন্যায্য সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত না হন, সে জন্য বেসরকারি সার্ভিস রুল প্রণয়ন করা হবে।
বুধবার (২০ মে) শ্রম মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ কুদ্দুস আলী সরকার দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, শ্রম আইন-২০০৬ ও শ্রম বিধিমালা-২০১৫ আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) দ্বারা অনুমোদিত। এ ছাড়া বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কনভেনশনও এ আইন ও বিধিমালাকে স্বীকৃতি দিয়েছে। তারপরও দেশে বেসরকারি খাতের অনেক ক্ষেত্রে এসব আইন যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে না।
তিনি বলেন, "এখনও বেসরকারি খাতের কর্মীদের চাকরিচ্যুতি ঠেকানো যাচ্ছে না। মালিকরা চাইলে যেকোনো কর্মীকে চাকরিচ্যুত করছেন।"
তিনি আরও বলেন, "বর্তমান আইন ও বিধিমালার যেসব ক্ষেত্রে চাকরিজীবীদের স্বার্থ সুরক্ষায় ঘাটতি রয়েছে, সেখানে নতুন বিধান যুক্ত করে বিধিমালা হালনাগাদের পক্ষে শ্রম মন্ত্রণালয় মত দিয়েছে।"
মোহাম্মদ কুদ্দুস আলী সরকার বলেন, উবার, পাঠাও ও ফুডপান্ডার মতো অনলাইন প্ল্যাটফর্মভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের জন্য কোনো নির্দিষ্ট সার্ভিস রুলস নেই। একই অবস্থা গিগভিত্তিক সেবাদাতাদের ক্ষেত্রেও। এসব বিষয় নিয়ে প্রাথমিক পর্যায়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪ অনুযায়ী, দেশে কর্মরত মানুষের সংখ্যা ৬ কোটি ৯০ লাখ ৯০ হাজার। এর মধ্যে ৪৮ দশমিক ২ শতাংশ বেসরকারি, যৌথ উদ্যোগ ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত।
আরও ১৮ দশমিক ২ শতাংশ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত। অর্থাৎ মোট ৬৬ দশমিক ৪ শতাংশ কর্মী বেসরকারি খাতে কাজ করছেন।
সরকারি খাতে কর্মরত রয়েছেন ৪ দশমিক ৭ শতাংশ। বাকি কর্মীরা খানাভিত্তিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত।
বর্তমানে সরকার ৪৭টি খাতে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করেছে। আরও কয়েকটি খাতকে আনুষ্ঠানিক শিল্প খাত হিসেবে ঘোষণা করা হলেও সেসব বিষয়ে এখনও কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি।
দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর একটির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, "প্রায়ই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা অভিযোগ নিয়ে আসেন যে, তাদের কারণ ছাড়াই চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। অনেকে জানান, দীর্ঘদিন চাকরি করার পরও প্রতিষ্ঠান তাদের ন্যায্য পাওনা পরিশোধ করছে না।"
তিনি বলেন, "অনেক প্রতিষ্ঠান কর্মীদের কখনও স্থায়ী করে না। অনেক জায়গায় মাসিক বেতনের বাইরে অন্য কোনো সুবিধা নেই। আবার ঈদ বোনাসও অনেক ক্ষেত্রে কোনো নিয়মনীতি ছাড়াই দেওয়া হয়।"
তার মতে, বিদ্যমান শ্রম আইন সব বেসরকারি খাতে পুরোপুরি প্রয়োগ করা সম্ভব হয় না। চাকরিগত অস্পষ্টতার কারণেও কর্মীরা ন্যায্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন। তাই সব খাতের কর্মীদের জন্য একটি সমন্বিত বিধিমালা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের সাবেক সভাপতি ফজলুল হক দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, সমন্বিত সার্ভিস রুলস করা গেলে তা অবশ্যই ইতিবাচক হবে।
তবে তিনি বলেন, "বেসরকারি খাত অত্যন্ত বহুমুখী। একেক খাতের কাঠামো ও জনবল ব্যবস্থাপনা একেক রকম। ফলে সবার জন্য অভিন্ন সার্ভিস রুলস তৈরি করা বেশ চ্যালেঞ্জের।"
তিনি আরও বলেন, "এ ধরনের সার্ভিস রুলস প্রণয়নের আগে বেসরকারি খাতের সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। তাদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতেই এটি করতে হবে।"
