এআই কি আসলেই চাকরির বাজারে ধস নামাবে? ইতিহাস কিন্তু অন্য কথা বলছে
ভবিষ্যতের কর্মসংস্থান নিয়ে আমেরিকানরা এখন যতটা হতাশ, ইতিহাসের কোনো জনমত জরিপেই আগে এমনটা দেখা যায়নি। সম্প্রতি এক জরিপে দেখা গেছে, সাধারণ মানুষ মনে করে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে তাদের চাকরি হারানোর ২২ শতাংশ আশঙ্কা রয়েছে। ২০০৭ থেকে ২০০৯ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার সময়ের চেয়েও এই হার অনেক বেশি। আর এই চরম হতাশার মূল কারণ হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই।
শুধু সাধারণ মানুষই যে আতঙ্কিত, তা নয়। যেসব এআই কোম্পানি এই উদ্বেগের জন্ম দিচ্ছে, তাদের নেতারাই সবচেয়ে বেশি সতর্ক করছেন। অ্যানথ্রপিকের ডারিও অ্যামোদেই সতর্ক করে বলেছেন, এআই বেকারত্বের হার ১০ থেকে ২০ শতাংশে নিয়ে যেতে পারে। মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস বলেছেন, এআইয়ের যুগে অধিকাংশ কাজের জন্যই আর মানুষের দরকার হবে না।
ওপেনএআইয়ের প্রধান স্যাম অল্টম্যান অবশ্য বুঝতে পেরেছেন যে প্রযুক্তির এই ধ্বংসাত্মক ক্ষমতার কথা বলে বেড়ালে হিতে বিপরীত হতে পারে। তাই তিনি এখন সুর পাল্টে বলছেন, এআই হলো 'মানুষকে সাহায্য করার ও তাদের কাজের মান বাড়ানোর হাতিয়ার, তাদের জায়গা দখল করার জন্য নয়।' তবে এর পরও তিনি বলতে বাধ্য হয়েছেন যে 'আমরা যখন নতুন ধরনের কাজের দিকে যাব, তখন একটি বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটতে পারে।'
অর্থনীতিবিদরা কী বলছেন?
তবে এই বিষয়ে অর্থনীতিবিদদের এতটা হতাশ মনে হচ্ছে না। তারা 'লাম্প অব লেবার ফ্যালাসি' বা কাজের পরিমাণ নির্দিষ্ট থাকার ধারণাকে মোটেও প্রশ্রয় দেন না, যা চাকরির বাজারকে একটি স্থির ও 'জিরো-সাম গেম' হিসেবে দেখে।
তাদের যুক্তি হলো—প্রযুক্তি যদি কোনো এক খাতের কর্মীদের কাজ কেড়ে নেয়, তবে তা অন্য খাতের কর্মীদের সমৃদ্ধ করে। তখন ওই সমৃদ্ধ কর্মীরা তাদের বাড়তি আয় দিয়ে নতুন পণ্য ও সেবা কেনেন, যা শেষ পর্যন্ত নতুন কর্মসংস্থানেরই সৃষ্টি করে।
চাকরির বাজার যে এখনই ধসে পড়ছে, এমন কোনো লক্ষণ নেই। ওইসিডিভুক্ত দেশগুলোতে কর্মক্ষম জনসংখ্যার মধ্যে চাকরিজীবীদের হার বারবার রেকর্ড ভাঙছে। ধনী দেশগুলোর এই ক্লাবে বেকারত্বের হার মাত্র ৫ শতাংশ। আর আইন পেশার মতো যেসব খাতকে এআইয়ের আগমনে 'ঝুঁকিপূর্ণ' বলে মনে করা হচ্ছে, আমেরিকায় সেই খাতগুলোতেই এখন সবচেয়ে বেশি মানুষ কাজ করছেন।
২০২২ সালের শেষের দিকে ওপেনএআই চ্যাটজিপিটি বাজারে আনার অনেক আগে থেকেই আমেরিকান স্নাতকেরা চাকরির জন্য সংগ্রাম করছেন। অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করেন, আগামী দিনে এআইয়ের কারণে চাকরির বাজারে খুব বেশি বড় ধরনের কোনো ব্যাঘাত ঘটবে না। বরং আমেরিকার ব্যুরো অব লেবার স্ট্যাটিস্টিকস মনে করে, ২০২৪ থেকে ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশে আরও ৫২ লাখ নতুন চাকরি তৈরি হবে, যা মোট কর্মসংস্থান ৩ শতাংশ বাড়াবে।
ইতিহাসের পাতা থেকে শিক্ষা
এআইয়ের সক্ষমতা হয়তো বর্তমানের সব ডেটা ও এর ওপর ভিত্তি করে করা পূর্বাভাসগুলোকে ভুল প্রমাণ করতে পারে। কিন্তু যদি সত্যিই এআই লাখ লাখ মানুষের চাকরি কেড়ে নেয়, তবে তা মানব ইতিহাসে একটি নজিরবিহীন ঘটনা হবে। কারণ, এর আগে কোনো নতুন প্রযুক্তি এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়েনি যে তা বিপুলসংখ্যক মানুষকে দীর্ঘ সময়ের জন্য বেকার করে দিয়েছে। কেন এমনটা হয়নি, সেটি নিয়ে আলোচনা করলেই বোঝা যাবে যে এবারের পরিস্থিতি কতটা ভিন্ন—বা আদৌ ভিন্ন কি না।
ঐতিহাসিক ডেটা বলছে, প্রযুক্তির বিস্তার সব সময়ই খুব ধীরগতিতে হয়। ২০১২ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির রবার্ট গর্ডন দেখিয়েছেন, ১৩০০ সালের পর থেকে বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত অর্থনীতিতে মাথাপিছু জিডিপি প্রবৃদ্ধি বছরে আড়াই শতাংশের (২.৫%) বেশি হয়নি। অর্থাৎ, উদ্ভাবনের কেন্দ্রে প্রবৃদ্ধি ধীর হওয়ার কারণেই নতুন প্রযুক্তির কারণে চাকরি হারানোর গতিও সব সময় ধীর ছিল।
কৃষিকাজের কথাই ধরা যাক। গত এক হাজার বছরে কৃষিতে যুগান্তকারী প্রযুক্তিগত বিপ্লব ঘটলেও, এই খাতে কর্মসংস্থানের পরিবর্তন হয়েছে খুব ধীরগতিতে। ষোড়শ শতাব্দী থেকে ইংল্যান্ডের কৃষিতে শ্রমিকের হার ধারাবাহিকভাবে কমলেও, তা কখনোই হঠাৎ করে ধসে পড়েনি। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে আমেরিকায় আধুনিক ট্রাক্টর আবিষ্কৃত হয়। কিন্তু এর ফলে কৃষকের সংখ্যা কমতে কয়েক বছর নয়, কয়েক প্রজন্ম সময় লেগেছিল।
এমনকি যখন দ্রুত কর্মসংস্থানে পরিবর্তন আসে, তখনো শ্রমিকদের ভোগান্তি পোহাতে হয় না। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে প্রথম কম্পিউটার, শিপিং কনটেইনার এবং অন্যান্য আবিষ্কারের কারণে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী হ্যারল্ড উইলসন বলেছিলেন যে পশ্চিমা অর্থনীতি 'প্রযুক্তির তীব্র উত্তাপে' পুড়ছে। সে সময় ব্রিটেনকে সরিয়ে আমেরিকা বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতিতে পরিণত হয় এবং সেখানে মাথাপিছু জিডিপি বছরে আড়াই শতাংশ হারে বাড়ে।
সে সময় শিল্প বা পেশার পরিবর্তনের কারণে চাকরি হারানোর হার এখনকার চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি ছিল। তা সত্ত্বেও অনেকেই সেই সময়টাকে মজুরি বৃদ্ধি, সুযোগ সম্প্রসারণ এবং রাজনীতিতে মেরুকরণ না থাকার এক দারুণ যুগ হিসেবে স্মরণ করেন।
শিল্পবিপ্লবের সেই বিতর্কিত সময়
প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের একটি ঘটনা ইতিহাসে বেশ কুখ্যাত হয়ে আছে—ঊনবিংশ শতাব্দীর ব্রিটেনে হওয়া শিল্পবিপ্লব। অনেক বিবরণ অনুযায়ী, এটি শ্রমিকদের জন্য চরম বিপর্যয়কর ছিল।
১৭৬০ থেকে ১৭৮০ সালের মধ্যে জেমস ওয়াটের আবিষ্কার স্টিম ইঞ্জিনকে এতটাই দক্ষ করে তোলে যে তা দিয়ে কারখানা চালানো সম্ভব হয়। এর ফলে তীব্র অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি শুরু হয়, কিন্তু একই সময়ে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শ্রমিকদের মজুরি বাড়েনি। ১৭৯০ থেকে ১৮৪০ সালের মধ্যে পুঁজিবাদীরা বিপুল মুনাফা করলেও শ্রমিকদের মজুরি প্রায় একই রকম ছিল।
উল্লিখিত সময় মজুরি বৃদ্ধি সত্যিই কম ছিল, তবে তার আগের অর্ধশতাব্দীর চেয়ে তা ধীর ছিল না। এর কারণ হলো, শিল্পবিপ্লবের প্রথম বছরগুলোতে উৎপাদনশীলতার প্রবৃদ্ধি বেশ কম ছিল। ১৮৩০ সাল নাগাদ পুরো ব্রিটেনে মাত্র ১ লাখ ৬০ হাজার হর্সপাওয়ার বা অশ্বশক্তি ব্যবহৃত হতো, যা আধুনিক এক হাজার সাধারণ গাড়ির সমান।
তবে প্রযুক্তি যদি কিছু চাকরি ধ্বংস করে থাকে, তবে তা আরও অনেক বেশি নতুন চাকরি তৈরি করেছে। ১৭৬০ থেকে ১৮৬০ সালের মধ্যে ব্রিটেনে কর্মরত মানুষের সংখ্যা ৪৫ লাখ থেকে বেড়ে ১ কোটি ২০ লাখে দাঁড়ায়। আর বেকারত্বের হারও কমই ছিল।
ওই সময় দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির কথা বিবেচনা করলে, শ্রমিকদের ক্রয়ক্ষমতা যে কিছুটা হলেও বেড়েছিল, তা একটি 'সত্যিই অসাধারণ অর্জন' বলে মনে করেন প্রয়াত ব্রিটিশ জনসংখ্যাতত্ত্ববিদ স্যার টনি রিগলি।
আসল ভিলেন কারা?
প্রকৃত মজুরির দুটি মাপকাঠির ব্যবধান শিল্পবিপ্লব সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরে। গড়পড়তা নিয়োগকর্তারা তাদের পণ্য বিক্রি এবং উপকরণের খরচ বাদ দেওয়ার পর শ্রমিকদের মোটামুটি ন্যায্য মজুরিই দিতেন। এঙ্গেলস যেমনটা ভেবেছিলেন, পুঁজিপতিরা শ্রমিকদের শোষণ করে মুনাফা লোটেননি।
শ্রমিকদের আসল সমস্যা অন্যায্য মজুরি ছিল না, বরং তাদের মূল সমস্যা ছিল জীবনযাত্রার ব্যয়ের তীব্র বৃদ্ধি। যুদ্ধ এবং শস্য আমদানির ওপর উচ্চ শুল্কের কারণে তখন খাবারের দাম ধারাবাহিকভাবে বাড়ছিল এবং মাঝে মাঝে তা আকাশচুম্বী হতো। তাই শিল্পবিপ্লবের আসল ভিলেন ছিল সে সময়ের রাজনীতিবিদরা, কোনো মেশিন বা যন্ত্র নয়।
এটি সে সময়ের শিল্প অসন্তোষকে একটি নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে সাহায্য করে। ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে টেক্সটাইল শ্রমিকেরা বিদ্রোহ করে পাওয়ার লুম (বিদ্যুৎচালিত তাঁত) ধ্বংস করেছিল। তাদের ধারণা ছিল, এই যন্ত্রগুলো তাদের পেশাকে মেরে ফেলবে। এর কয়েক বছর পর দক্ষিণ ইংল্যান্ডের খেতমজুররা মাড়াই করার মেশিন ভাঙচুর করেছিল।
ইতিহাসবিদেরা এ ধরনের অসন্তোষকে প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখেন। তবে ধর্মঘট বা ভাঙচুরের ঘটনা পৃথিবীর ইতিহাসের মতোই পুরোনো। ইংল্যান্ডে ১৮০০-এর শুরুতে দাঙ্গার ঘটনা কম ছিল। বরং শতাব্দীর শেষ ভাগে যখন প্রকৃত মজুরি দ্রুত বাড়ছিল, তখনই দাঙ্গার ঘটনা বেশি ঘটেছিল।
অর্থনৈতিক ইতিহাসবিদ নিকোলাস ক্রাফটস বিষয়টি চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি লিখেছেন, শিল্পবিপ্লব এমন কোনো প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের 'টেমপ্লেট' বা মডেল নয়, যা জাতীয় আয়ে শ্রমিকের অংশ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিয়ে উৎপাদনশীলতা বাড়ায়।
সহজ কথায়, যারা এআইয়ের কারণে বিপুলসংখ্যক মানুষের বেকার হওয়ার কথা বলে সতর্ক করছেন, তারা এমন কিছুর ভবিষ্যদ্বাণী করছেন, যা ইতিহাসে আগে কখনো ঘটেনি।
তাহলে কি এআই নিয়ে চিন্তার কিছু নেই?
এর মানে এই নয় যে এমনটা কখনোই ঘটতে পারে না। এমন কিছু ঘটলে তার প্রথম লক্ষণ হবে বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতি আমেরিকায় উৎপাদনশীলতা দ্রুত বাড়ার পাশাপাশি প্রকৃত মজুরি বৃদ্ধির হার দুর্বল হওয়া।
এটি গর্ডনের সেই ২.৫% সীমার চেয়ে বেশি মাথাপিছু জিডিপি বৃদ্ধি এবং একই সঙ্গে করপোরেট মুনাফা লাফিয়ে বাড়ার মাধ্যমে প্রকাশ পাবে। এর অর্থ হবে, উচ্চ উৎপাদনের সুফল শ্রমিকের বদলে কেবল পুঁজিপতিদের পকেটেই যাচ্ছে। আরেকটি সংকেত হবে—বহু শিল্প খাতে ব্যাপকভাবে চাকরি হারানো।
ইতিহাস আমাদের একটি চূড়ান্ত শিক্ষাও দেয়। যদি কর্মসংস্থানে বড় ধরনের কোনো ব্যাঘাত আসেই, তবে তা অর্থনৈতিক মন্দার মাধ্যমেই প্রকাশ পাবে। অর্থনৈতিক মন্দা সব সময় অনুৎপাদনশীল চাকরিগুলোকে অর্থনীতি থেকে ঝেড়ে ফেলে দেয়। টিকে থাকার জন্য কোম্পানিগুলোকে তখন আমূল পরিবর্তন আনতে হয়, দুর্বল কোম্পানিগুলো বন্ধ হয়ে যায় এবং মূলধন ও শ্রমিকেরা আরও বেশি উৎপাদনশীল কোম্পানির দিকে চলে যায়।
অতীতের মন্দাগুলোর সময় আমেরিকার প্রায় সব সাধারণ বা রুটিন চাকরি এভাবেই হারিয়ে গেছে। আগামী মন্দায় কোন ধরনের চাকরিগুলো হারাবে, তা একটি বড় সংকেত দেবে। আর সেই সময় পর্যন্ত অ্যামোদেই, বিল গেটস এবং স্যাম অল্টম্যানসহ সবাইকেই এআই দুনিয়ার আসল রূপ দেখার জন্য অপেক্ষায় থাকতে হবে।
