ঈদে মুক্তি পাওয়া ছবিও কি ব্যবসা করতে পারে?
মনে আছে, নিরানব্বই সালের ঈদুল ফিতরে মাস্টার ভাইয়ের সবচেয়ে বেশি ছবি মুক্তি পেয়েছিল, এগারোটি। মুক্তির মিছিলে ছিল গুন্ডা নাম্বার ওয়ান, চিটার নাম্বার ওয়ান, রাজা নাম্বার ওয়ান, বনের রাজা রবিন হুড, জিদ্দি সন্তান ইত্যাদি। এগুলোর মধ্যে প্রথম তিনটিরই নায়ক ছিলেন মান্না। সবচেয়ে বেশি ব্যবসা করেছিল গুন্ডা নাম্বার ওয়ান, সম্ভবত দুই কোটি টাকা। ততদিনে মান্না হয়ে উঠেছেন মহানায়ক, তবুও তার সম্মানী ছিল দুই থেকে চার লাখ টাকা।
আজও আছেন মাস্টার ভাই
রোজিনার বাড়ির লজিং মাস্টার ছিলেন শহিদুল্লাহ মিয়া। তখনো অবশ্য রোজিনা নায়িকা হননি। তবে মায়া বড়ির মডেল হিসেবে পরিচিত ছিলেন। শহিদুল্লাহ গ্রাজুয়েট হওয়ার পরে সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগে চাকরি পেয়েছিলেন। কিন্তু এগারো দিনের মাথায় চাকরি ছেড়ে দিয়ে আবার রোজিনাদের বাড়িতে ফিরে আসেন। রোজিনা ততদিনে ব্যস্ত নায়িকা হয়ে উঠেছেন। তার একজন শিডিউল ম্যানেজার দরকার। শহীদুল্লাহ সৎ ও নির্ভরযোগ্য, ম্যানেজারের পদ পূরণ করলেন। রোজিনার দেখাদেখি সবাই তাকে মাস্টার ভাই বলে ডাকতে থাকল।
ব্যস্ততা বাড়লেও রোজিনা আবেগ হারিয়ে ফেলেননি। প্রযোজক ফজলুর রশীদ ঢালীকে ভালোবেসে ফেলেছিলেন। শুভ বিবাহ সম্পন্ন হওয়ার পর ঢালীর বনি পিকচার্স ও রোজিনার রোজিনা ফিল্মস নামের দুই প্রযোজনা সংস্থার অফিস হলো একই অফিসে।
১৯৮৪ সালে রোজিনা-ওয়াসিম অভিনীত রসের বাইদানী ছবির মাধ্যমে মাস্টার ভাই ডিস্ট্রিবিউশনের কাজে যুক্ত হন। ঈদের দুই সপ্তাহ আগে ছবিটি মুক্তি পেয়েছিল। জনপ্রিয়তা পেয়েছিল এত বেশি যে ৪৪টি প্রিন্ট করাতে হয়েছিল। এক হাজার চারশ সিনেমা হলের মধ্যে এক হাজার হলে প্রদর্শিত হয়েছে ছবিটি। এর পরে মাস্টার ভাই রোজিনা-ওয়াসিম জুটির মিস লোলিটা ছবির কাজ করেন। মাস্টার ভাই মনোযোগী ছিলেন, পরিশ্রমী ছিলেন, তাই কাজ শিখে নিয়েছিলেন দ্রুত। ৬৪ জেলার মধ্যে ৬০টিতে তার যাতায়াত ছিল।
বছরখানেকের মধ্যে হাজারখানেক হল-মালিকের সঙ্গে তিনি সুসম্পর্ক গড়ে তোলেন। প্রিন্ট বুঝে নেওয়া, পোস্টার জমা রাখাসহ অন্যান্য দাপ্তরিক কাজও শিখে নিয়েছিলেন। এক পর্যায়ে ডিস্ট্রিবিউশনের সব কলাকৌশল তার আয়ত্বে চলে আসে।
ঈদের ছবি আম্মাজান
আজ পর্যন্ত ৪০ বছরে তিনি বিভিন্ন প্রযোজনা সংস্থার ৩০০টি ছবি রিলিজ করেছেন। ৬৯ বছর বয়সেও তিনি কর্মচঞ্চল। তার সমসাময়িক কোনো পরিবেশক এখন আর সক্রিয় নেই। সে অর্থে তিনিই ইন্ডাস্ট্রির সবেধন নীলমনি। ২০১৫ সাল থেকে কাজ করছেন জাজ মাল্টিমিডিয়ায়। কেবল জাজেরই ৬০টি ছবি তিনি রিলিজ দিয়েছেন। জাজ ছাড়া অন্য প্রোডাকশনের ছবিও রিলিজ দেন। তাণ্ডব, তুফান, বরবাদ-সহ সাম্প্রতিক সময়ে শাকিব খানের এক ডজন ছবি রিলিজ দিয়েছেন।
তার চেয়ে ঈদের ছবির গল্প আর কে জানবে ভালো ভেবে এক দুপুরে হাজির হয়েছিলাম জাজের অফিসে। মাস্টার ভাইয়ের কেবিনে তখন তার শিষ্য রুহুল আমিনও উপস্থিত ছিলেন। রুহুল আমিন চলচ্চিত্র জগতে আসেন পঁচানব্বই সালে। প্রথম কাজ নেন মনোয়ার হোসেন ডিপজলের অফিস অমি-বনি কথাচিত্রে। ডিপজল ও তার ভাই শাহাদাত হোসেন বাদশা মিলে ডাকাত, টাকার পাহাড়, তেজী, কে আমার বাবা, আম্মাজান, কোটি টাকার কাবিন, চাচ্চু, পিতার আসন, মা আমার বেহেশত, রানী কেন ডাকাত, লন্ডভন্ড, আজকের ক্যাডার, গুন্ডার প্রেম ইত্যাদি ছবি দর্শকদের উপহার দিয়েছেন। এর মধ্যে কোটি টাকার কাবিন, আম্মাজান, চাচ্চু দারুণ ব্যবসাসফল। আম্মাজান-কে বলা হয় মান্নার সবচেয়ে জনপ্রিয় ছবির একটি। এটি মুক্তি পেয়েছিল ১৯৯৯ সালের ঈদুল আজহায়।
ডিস্ট্রিবিউশন বুদ্ধির খেলা
রুহুল আমিন মাস্টার ভাইয়ের সঙ্গে কাজ শুরু করেন ১৯৯৯ সালে। মাস্টার ভাইকে তিনি 'স্যার' বলে সম্বোধন করেন। বলছিলেন, 'ডিস্ট্রিবিউশন বুদ্ধির খেলা। সব ছবি সব মৌসুমে মুক্তি দেওয়া যায় না। আবার অ্যাকশন ছবি আর সামাজিক ছবি এক উপজেলায় একই সময়ে মুক্তি না দেওয়া ভালো। মনে রাখতে হবে, শিল্পাঞ্চলে আর চরাঞ্চলে ছবির চাহিদা আলাদা। বড় নায়কের সঙ্গে উদীয়মান নায়কের পাল্লা দিতে যাওয়া ঠিক নয়। কোন জেলায় কোন ধরনের ছবি ভালো চলে- তার হিসাবও রাখতে হয় ডিস্ট্রিবিউটরকে। স্যারের (মাস্টার ভাই) কাছ থেকেই আমি এগুলো শিখেছি। ডিস্ট্রিবিউশন জানার কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তো নেই, স্যারই আমার স্কুল-কলেজ।'
অ্যানালগ যুগে এক ছবি চার-পাঁচ বছর ধরে বিভিন্ন হলে ঘুরে ঘুরে চলত। তখন হল ছিল এক হাজার চারশ। একটি ছবির প্রিন্ট হতো ২০-২২টি, সুপার হিট ছবির প্রিন্টও ৪০টির বেশি হতো না। তখন যাতায়াত ব্যবস্থাও ভালো ছিল না। তবে বিনোদনের মাধ্যম আর বেশি না থাকায় চলচ্চিত্রের জন্যই অপেক্ষা করত দর্শক। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে ঈদ তো বটেই একুশে ফেব্রুয়ারি, পহেলা বৈশাখের মতো উৎসবেও ছবি মুক্তি দেওয়ার প্রতিযোগিতা হতো। পরের দিকে ভালোবাসা দিবসও উৎসবে পরিণত হয়। উৎসবের ছবিগুলোতে শহুরে দর্শকরা সপরিবারে ছবি দেখতে হলে যেতেন। লোক কাহিনী নির্ভর এবং সামাজিক তথা রোমান্টিক ছবিগুলো দেখতে গ্রামের নারীরাও হলমুখী হতেন। বিশেষ করে শাবানার ছবি দেখার দর্শকের অভাব হয়নি কোনোদিন।
শাবানার পর সুপারস্টার কোথায়?
২০০২ সালের ২৭ ডিসেম্বর সংখ্যায় চিত্রালীর প্রচ্ছদ প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল, শাবানার পর সুপারস্টার কোথায়? তারপর বিস্তারিত লেখা হচ্ছে, আগের প্রজন্মের তারকা একমাত্র শাবানাই ছিলেন, যিনি এই সময়ের তারকাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়েও জনপ্রিয়তার শীর্ষে ছিলেন। বয়সের প্রয়োজনে রোমান্টিক নায়িকা থেকে পরবর্তীতে বয়সী চরিত্র করেও জনপ্রিয় হয়েছিলেন।
১৯৬৭ সালে চকোরি ছবিতে নাদিমের বিপরীতে তিনি নায়িকা হিসেবে আবির্ভুত হন। তারপর মধু মিলন, অবুঝ মন, একই অঙ্গে এত রূপ, ছন্দ হারিয়ে গেল, দোস্ত দুশমন, ছুটির ঘণ্টা, ভাত দে, লালু ভুলু, রাজলক্ষ্মী শ্রীকান্ত, গরীবের বউ, সত্যের মৃত্যু নেই, স্বামী কেন আসামী-সহ ২৯৯টি ছবিতে অভিনয় করেন। মারদাঙ্গা, প্রেমমুখর, বেদনাবিধুর, হাস্যোজ্জ্বল, চঞ্চলা, সহনশীল, ত্যাগী ইত্যাদি বহুমুখী চরিত্রে তিনি অভিনয় করেছেন। ষাটের দশক থেকে নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত দর্শক সবসময়ই তার সঙ্গে ছিল। ২০০০ সালে তিনি চলচ্চিত্র জগত ত্যাগ করেন।
মাস্টার ভাই বলছিলেন, 'ছবির গল্প শাবানাকে ধরে লেখা হতো। যে বয়সে তাকে যে চরিত্রে মানায় সেটিই হয়ে উঠত ছবির কেন্দ্রিয় চরিত্র। এটি সত্যি কথা যে তিনি যতদিন অভিনয় করেছেন ততদিন হলগুলো দর্শক পেয়েছে। ববিতা ছিলেন মডার্ন, অঞ্জু ও রোজিনা ছিলেন ফোক-কুইন, কবরী মিষ্টি মেয়ে, সুচরিতা উচ্ছল-চঞ্চলা মানে প্রত্যেকের নির্দিষ্ট পরিচয় ছিল। কিন্তু শাবানা ছিলেন অল স্কয়ার। ঈদে শাবানা-রাজ্জাক-কবরীর ছবি থাকতই। শাবানার ছবি না থাকলে দর্শককে হলমুখী করা কঠিন হয়ে দাঁড়াত।'
মাস্টার ভাইয়ের কাছে আরো জানা গেল, সত্তরের দশকের শেষভাগ থেকে আশির দশক পর্যন্ত পরিদর্শক, প্রযোজক ও হল মালিক সমিতি মিলে একটি নির্বাচক কমিটি গঠন করতেন। এই কমিটি ঈদে কোন ছবি মুক্তি দেওয়া যায় তা নির্বাচন করত। মেরিট বিচার করে সাধারণত তিনটি ছবি মুক্তি দেওয়া হতো। মেরিট যাচাইয়ের মাপকাঠি ছিল তিনটি- প্রযোজনা সংস্থা, পরিচালক ও নায়ক-নায়িকা। সে আমলে কাস্টিং তো বটেই, কোন পরিচালক কী রকম ছবি বানান সে সম্পর্কেও দর্শকরা ধারণা রাখতেন, আবার কোন প্রযোজনা সংস্থা কী ধরনের ছবি প্রোডিউস করে তাও জানতেন দর্শকরা। যেমন, ইবনে মিজান ফোক-ফ্যান্টাসি ছবি বানাতেন, এজে মিন্টু এবং দেওয়ান নজরুল বানাতেন অ্যাকশন মুভি, দেলোয়ার জাহান ঝন্টু ফাইটিং-ফোক বানাতেন, আজিজুর রহমান বুলি বানাতেন স্টাইলিশ মডার্ন ছবি, মনতাজুর রহমান আকবর বানাতেন আন্ডারওয়ার্ল্ড-গ্যাংস্টার ধরনের ছবি। চিত্রা ফিল্মসের কাজি জহির বানাতেন সামাজিক ছবি।
প্রোডাকশন হাউজও চিনত দর্শকরা
রাজ্জাকের রাজলক্ষ্মী প্রোডাকশন, শাবানার এসএস প্রোডাকশন ভালোভাবে চিনতেন দর্শকরা। মুভি মোগলখ্যাত জাহাঙ্গীর খানের আলমগীর পিকচার্স চেনা ছিল দর্শকদের। কারণ, এই হাউজ থেকে নয়নমনি, কী যে করি, আলী বাবা চল্লিশ চোর, ডাকু মর্জিনা, ডিস্কো ডানসার, তিন বাহাদুর, রূপের রানী চোরের রাজার মতো জনপ্রিয় ছবি নির্মিত হয়েছে। চেনা ছিল সোহেল রানার পারভেজ ফিল্মস, নায়ক উজ্জ্বলের উজ্জ্বল ফিল্মস. ববিতার ববিতা মুভিজ, নায়ক জসিমের জ্যাম্বস প্রোডাকশন, সত্য সাহার স্বরলিপি বাণীচিত্র ইত্যাদি।
মাস্টার ভাই বললেন, 'একজন সুপারস্টারের কথা অনেকে ভুলে গেছে, তার নাম ওয়াসিম। তার সব ছবি থেকেই প্রযোজকরা পয়সা পেয়েছেন। অথচ ইন্ডাস্ট্রি তাকে যথাযথ সম্মান দিতে পারেনি। এখানে ভালো মানুষ সম্মান কমই পায়। আমি এটাকে বলি ডার্ক ওয়ার্ল্ড। ছবি তোলা হয় অন্ধকারে, প্রসেস করা হয় অন্ধকারে। আর ছবি দেখেও দর্শক অন্ধকারে। তাই আমি বলি এটি অন্ধকারের জগত।'
ওয়াসিম ১৫২টি ছবিতে অভিনয় করেছেন। তার মধ্যে মানিক রতন, কোরবানী, চন্দন দ্বীপের রাজকন্যা-সহ ৮টি ছবি ঈদুল ফিতরে মুক্তি পেয়েছে। আর ঈদুল আজহায় মুক্তি পেয়েছিল জিঘাংসা, শীষনাগ, শাহী দরবার, সতী নাগকন্যা, পাগলা মাস্তানসহ এক ডজন ছবি।
সে আমলে ঈদের ছবিগুলোর কথা দর্শক জানত কীভাবে? জানতে চাইলে মাস্টার ভাই বললেন, রমজানের ১৫ দিন আগে থেকেই ছবির বিজ্ঞাপন প্রচারিত হতো রেডিওতে। গান বাজানো হতো আরো আগে থেকে। সিনেমা হলগুলোতে একটি স্লাইড প্রদর্শিত হতো, যেখানে ছবির নাম এবং আর্টিস্টের মুখচ্ছবি থাকত।
ছবিতে গল্পও থাকে না
রুহুল আমিন যোগ করলেন, 'আশি-নব্বইয়ের দশকে অ্যাকশন ছবি, গ্রামীণ ছবি, ঐতিহাসিক ছবি, রাজা-বাদশার ছবি, ফোক ছবি, ফ্যান্টাসি ছবি, কমেডি ছবি, সামাজিক ছবি, রোমান্টিক ছবি ইত্যাদির আলাদা আলাদা ঘরানা ছিল। তখনকার সব ছবিতেই একটি গল্প থাকত তা যতই কাল্পনিক হোক না কেন। স্টার্টিং, সাসপেন্স, ক্লাইমেক্সশেষে দর্শকরা হল থেকে কান্না করে বের হতো। এমন সাধারণ ফর্মুলা ছবিতেই দর্শক খুশি হয়ে যেত, মনে করত পয়সা উসুল। এখন তো গল্পও থাকে না। তখন আর্টিস্টরাও ইন্ডাস্ট্রি টিকিয়ে রাখতে সম্মানী নিত না বা কম নিত। তখন সারা বছর ছবি মুক্তি পেত। এখন ঈদ ছাড়া ছবি খুব কম মুক্তি পায়। তাই মালিকরা সারা বছর হল বন্ধ করে রাখে, ঈদের সময় সাফ করে খোলে, দেড় দুই মাস খোলা রাখে।'
রাজ্জাক, সোহেল রানাদের যদি বাংলা চলচ্চিত্রের প্রথম প্রজন্ম ধরা হয় তবে দ্বিতীয় প্রজন্ম হলো মান্না, ইলিয়াস কাঞ্চন। আশির দশকের শেষে কাঞ্চন ছিলেন সবচেয়ে জনপ্রিয় তারকা। নব্বইয়ের দশকের রাজপুত্র হলেন সালমান শাহ। তিনি নিজস্ব রোমান্টিক ঘরানা তৈরি করেছিলেন। তার মতো স্টাইলিশ তারকা ঢাকাই ছবি এর আগে পায়নি। অভিনয়ও ছিল বাস্তবের একদম কাছে। শিক্ষিত যুবসমাজকে হলমুখী করতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ফারুককে এই ধারার শুরুর নায়ক ধরলে তারপর আসেন জাফর ইকবাল আর তারপরই সালমান শাহ। সালমান শাহের আকস্মিক মৃত্যুর পর শূন্যস্থান পূরণে এগিয়ে আসেন রিয়াজ, ফেরদৌস প্রমুখ।
অ্যাকশন ঘরানার নায়কদের মধ্যে সোহেল রানাকে শুরুতে পাই তারপর ওয়াসিম তারপর জসিম, রুবেল ও মান্না। এদের মধ্যে রুবেল মার্শাল আর্ট দিয়ে সুনামি তৈরি করেছিলেন।
মডার্ন নায়িকা হিসেবে প্রথম নাম আসে ববিতার, তারপর শাবনূর ও মৌসুমী। মৌসুমী আসা মাত্রই ইন্ডাস্ট্রি জয় করেছিলেন। কিন্তু শাবনূর তার সহজ-সাবলীলতা ও ধারাবাহিকতা দিয়ে দীর্ঘসময় ইন্ডাস্ট্রি শাসন করেছেন।
শাবনূর-মৌসুমী ঈদেই এসেছিলেন
১৯৯৩ সালে মৌসুমীর প্রথম ছবি কেয়ামত থেকে কেয়ামত ঈদে মুক্তি পেয়েছিল। ১৯৯৫ সালের ইদে সালমান-মৌসুমী আরেকটি হিট ছবি উপহার দিয়েছিলেন, নাম দেনমোহর। একই ঈদে সালমান-শাবনূর জুটির স্বপ্নের ঠিকানাও মুক্তি পেয়েছিল এবং বাম্পার ব্যবসা করে।
ছবিটির নির্মাণ তত্ত্বাধায়ক প্রয়াত শিল্পী চক্রবর্তী ২০২৩ সালে টিবিএসকে বলেছিলেন, 'স্বপ্নের ঠিকানা দিয়ে সালমান-শাবনূর জুটি টপে উঠে যায়। এরপর তারা পারিশ্রমিকও বাড়িয়ে দেয়। বেদের মেয়ে জ্যোস্না'র পর স্বপ্নের ঠিকানা সবচেয়ে ব্যবসা সফল ছবি। এর নির্মাণ ব্যয় ছিল ৬৫ লাখ টাকা আর ব্যবসা করেছিল ১৯ কোটি টাকা।'
তিনি আরো বলেছিলেন, 'ঈদে তখন ছবি মুক্তি দেওয়ার দৌড় শুরু হতো। ঘোড়ার গাড়ি ব্যানার-পোস্টারে ঘেরাও করে সারা শহর ঘোরানো হতো। সব মিলিয়ে একটি হৈ হৈ রৈ রৈ ব্যাপার ছিল। এখন হলে গিয়ে ছবি দেখার সংস্কৃতিটা উঠে যাচ্ছে।'
কাকরাইল গরম থাকত ঈদে
চলচ্চিত্র গবেষক মীর শামসুল আলম বাবুর অভিজ্ঞতাও কাছাকাছি। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় দেওয়ান নজরুলের সহকারী হয়ে এফডিসির খাতায় নাম লেখান।
তিনি বলছিলেন, 'সেসময় সিনেমার অফিস কাকরাইল আর গুলিস্তানে বেশি ছিল। দালাল, থার্ড পার্টি, ব্রোকার আর ডিস্ট্রিবিউটরদেও হল্লাচিল্লায় কান পাতা যেত না। ঈদে ছবি মুক্তির দৌড়ে প্রায় প্রতিবারই মাঠে নামত শাবানার স্বামী ওয়াহিদ সাদিকের প্রযোজনা সংস্থা এসএস প্রোডাকশন্স এবং নায়ক রাজ্জাকের রাজলক্ষ্মী প্রোডাকশন্স। কোন ছবি কয়টা হল পেল, সপ্তাহ শেষে রিটার্ন কত, কয়টা শো হাউজফুল গেল- অনেকের মতো আমিও এসবের নিয়মিত খবর রাখতাম। ভেতরে ভেতরে উত্তেজনা কাজ করত, উৎকন্ঠা আর উদ্বেগও তৈরি হতো।'
শাবানা-জসিমের হিংসা ছবিটিও ঈদের। শাবানার কাজের বেটি রহিমাও মুক্তি পেয়েছিল ঈদে। ১৯৯৬ সালের ঈদে ঘাত-প্রতিঘাত, বাজিগর, হিটলারের সঙ্গে আরো মুক্তি পেয়েছিল বিচার হবে। চিত্রালীতে প্রকাশিত এর বিজ্ঞাপনে লেখা ছিল- এবারের ঈদে নামাজ শেষেই সেমাই-পোলাও খেলেই চলবে না। তীক্ষ্ম নজর রাখবেন এক মামলার প্রতি। সালমান শাহ ও শাবনূরের প্রেমের বিচার সভা।
ছিয়ানব্বই সালের ঈদে আরো মুক্তি পেয়েছিল মৌসুমী-ওমর সানি অভিনীত ছবি গরীবের রানী। তার বিজ্ঞাপনে লেখা হয়েছিল-
জীবনে যাদের হররোজ ক্ষুধায় আসেনি নিদ
আধমরা সেই গরীবের ঘরে এসেছে কি আজ ঈদ?
সবাইকে ইদুল ফিতরের শুভেচ্ছা- গরীবের রানী।
বাংলা চলচ্চিত্র নামের ফেসবুক পেইজে রহমান মতির পোস্ট থেকে ঈদের আরো কিছু ছবির নাম জানা গেল। সেগুলো হলো স্বপ্নের পৃথিবী, আত্মত্যাগ, সুখের ঘরে দুখের আগুন, সুখের স্বর্গ, রূপসী রাজকন্যা, পৃথিবী তোমার আমার, জজ সাহেব, এ বাঁধন যাবে না ছিড়ে, ফুল নেব না অশ্রু নেব, কিলার, বাস্তব, কখনো মেঘ কখনো বৃষ্টি, বউ শ্বাশুড়ির যুদ্ধ, যত প্রেম তত জ্বালা, ছোট্ট একটু ভালোবাসা, মাথা নষ্ট, আমি জেল থেকে বলছি, কুসুম কুসুম প্রেম, দানব, কি যাদু করিলা, কিং খান, খোদার পরে মা, মোস্ট ওয়েলকাম ইত্যাদি।
কেন ছবি হয় না
এফডিসির ওয়েবসাইটে বছরওয়ারি ছবি মুক্তির যে তালিকা দেওয়া আছে, তাতে দেখা যাচ্ছে ২০০৬ সালেও ৯৮টি ছবি মুক্তি পেয়েছে। ২০০৫ সালে পেয়েছে ১০০টি ছবি। ২০০৪ সালে ৮৮টি ছবি। ২০২০ সালে ছবির সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায়, মাত্র ১০টি। তারপরের তালিকা আর ওয়েবসাইটে নেই। ধারণা করতে কষ্ট হয় না মূলধারার ছবির সংখ্যা এরপরের বছরগুলোতে বৃদ্ধি পায়নি।
'শাকিবকে কেন্দ্র করে ইন্ডাস্ট্রি এখন ওয়ান ম্যান শো। ঈদ ছাড়া সেভাবে ছবি মুক্তি পায় না, আর ঈদ মানে শাকিব খান। যে ছবিতে শাকিব নেই, তার হল বুকিংও নেই। ফলে কার্যত ইন্ডাস্ট্রি বেকার হয়ে গেছে। গত পাঁচ বছরে হাওয়া, পরান, প্রিয়তমা, তুফান, উৎসব ছাড়া খুব বেশি ছবি টাকা তুলে আনতে পারেনি', বললেন মাস্টার ভাই।
এর কারণ উল্লেখ করে তিনি বললেন, 'একটি নয়, অনেকগুলো কারণ কাজ করছে এর পেছনে। আগের প্রোডাকশন হাউজ, আর্টিস্ট, টেকনিশিয়ান নেই। যারা মার্কেটের পালস বুঝত তারা এখন কোথায়? অনেক রকম লোক মিলে একটি চলচ্চিত্র তৈরি হয়। এখানে সৃজনশীল মানুষ থাকে, কারিগরি মানুষ থাকে। সেই গায়ক, সুরকার, গীতিকার, চিত্রনাট্য লেখক, পরিচালক, ক্যামেরাম্যান, এডিটর, সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার তো নেই। দর্শকের রুচিও বদলে গেছে। মানুষ ঝুকে পড়েছে বিদেশি ছবির দিকে। হাতে হাতে এখন সিনেমা হল। এক মোবাইলে যখন সব পাওয়া যাচ্ছে তখন আর হলে যাওয়া কেন?
জানতে চাইলাম, তবে যে শুনতে পাচ্ছি এবারের ঈদে ১৬টি ছবি মুক্তির দৌড়ে নাম লিখিয়েছে, সেগুলো তাহলে কারা বানাচ্ছে, দেখবে কারা?
মাস্টার ভাই বললেন, 'হ্যা আমিও শুনেছি প্রিন্স, রাক্ষস, দম, প্রেশার কুকার, পিনিক, বনলতা এক্সপ্রেসসহ আরো কয়েকটি ছবি মুক্তির প্রতীক্ষায় আছে। এগুলোর মধ্যে এক-দুইটি ব্যবসা করে, টাকা তুলে আনতে পারে আরো এক-দুইটি। বাকিগুলোর প্রযোজককে আগামী বছর আর দেখা যাবে না। পূর্ব অভিজ্ঞতা তা-ই বলে। চলচ্চিত্র জগতটা মোহের জগত, কত মানুষ যে এখানে ফতুর হয়েছে আর কত মানুষের যে স্বপ্ন ভেঙেছে তার হদিস নেই।'
