জ্বালানি সংকটের শঙ্কায় বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ, অনিশ্চয়তায় ঈদে ঘরমুখো মানুষ
পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে রাজধানী ঢাকা ছাড়তে শুরু করেছেন অন্তত দেড় কোটির বেশি মানুষ। তবে এবারের ঈদযাত্রার আনন্দ কিছুটা ফিকে হয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের কারণে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি ও সরবরাহ বিঘ্নের শঙ্কার মধ্যে দূরপাল্লার বাস স্বাভাবিকভাবে চলাচল করতে পারবে কি না—তা নিয়ে বাসমালিক ও যাত্রীদের মধ্যে সংশয় দেখা দিয়েছে।
যদিও সরকার থেকে বারবার বলা হচ্ছে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। তারপরও ফিলিং স্টেশনগুলোতে আতঙ্কজনিত তেল কেনা থামানো যাচ্ছে না।
রাজধানীর গাবতলী ও সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল ঘুরে দেখা যায়, দূরপাল্লার পরিচিত বাস অপারেটরদের বাইরে স্থানীয় কিছু অপারেটর পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে টিকিটের দাম বাড়িয়ে রাখছেন বলে অভিযোগ করেছেন একাধিক যাত্রী।
গাবতলী বাস টার্মিনাল সংলগ্ন আহাদ এন্টারপ্রাইজের কাউন্টারে গিয়ে দেখা যায়, তারা ঢাকা-রংপুর রুটে নন-এসি বাসের টিকিটের জন্য ১২৫০ টাকা নিচ্ছেন। অথচ বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) এই রুটের ভাড়া নির্ধারণ করেছে ৮৭০ টাকা।
বিআরটিএ'র নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে অতিরিক্ত ভাড়া কেন নিচ্ছেন—জানতে চাইলে আহাদ এন্টারপ্রাইজের কাউন্টার মাস্টার শফিকুল ইসলাম স্বপন বলেন, "ঈদ উপলক্ষে ভাড়া সামান্য বাড়ানো হয়েছে। ফিরতি পথে এ সময় বাস ফাঁকা আসে। সে ক্ষতি পোষানোর জন্য ভাড়া বাড়ানো হয়েছে।"
বেসরকারি চাকরিজীবী সজিব হাসান ঈদের আগে বাড়ি ফেরার টিকিট খুঁজছিলেন গাবতলীতে। ঈদের দুই দিন আগের টিকিট কোনো কাউন্টারে না পেয়ে তিনি শেষমেশ কালোবাজারিদের কাছ থেকে টিকিট কিনতে বাধ্য হন। ৮৭০ টাকার একটি টিকিটের জন্য তাকে গুণতে হয়েছে ১৭০০ টাকা।
অন্যদিকে দূরপাল্লার যাত্রায় অগ্রিম টিকিট কাটা যাত্রীরাও পড়েছেন অনিশ্চয়তায়। বাস কাউন্টারগুলো থেকে যাত্রীদের সতর্ক করে বলা হচ্ছে, জ্বালানি সংকট দেখা দিলে নির্ধারিত দিনে বাস চলাচল নাও করতে পারে। সে ক্ষেত্রে টিকিট বাতিল করে অর্থ ফেরত দেওয়া হবে। এতে করে আগাম টিকিট কেটেও নিশ্চিন্ত হতে পারছেন না অনেক যাত্রী।
ভুক্তভোগীদের একজন পোস্তগোলার বাসিন্দা বেসরকারি চাকরিজীবী শহিদুল ইসলাম। তিনি ধোলাইপাড়ের ইউনিক পরিবহনের কাউন্টার থেকে আগামী ১৬ মার্চ গ্রামের বাড়ি বরিশালের বাকেরগঞ্জ যাওয়ার জন্য দুই দিন আগে অগ্রিম সাতটি টিকিট কেটেছেন। তবে কাউন্টার থেকে তাকে জানানো হয়েছে, তেল সংকট থাকলে নির্ধারিত দিনে বাস না চললে টাকা ফেরত দেওয়া হবে।
শহিদুল বলেন, "ভাড়া ১০০ থেকে ১৫০ টাকা বাড়লেও সেটা বড় সমস্যা নয়। সমস্যা হচ্ছে—যাওয়া হবে কি না, তা নিয়ে। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কাউন্টারে এসে যদি শুনি বাস যাবে না, তখন আমরা কোথায় যাব? ওই সময় তো আর টিকিটও পাওয়া যাবে না।"
গাবতলিতে কথা হয় সোহাগ পরিবহনের একজন বাসচালকের সঙ্গে। তিনি বলেন, নিজস্ব ফিলিং স্টেশন থাকায় তাদের জ্বালানি তেলের জন্য বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে না। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার শঙ্কা ও সরবরাহ অনিশ্চয়তার মধ্যেও তারা পূর্বনির্ধারিত শিডিউল অনুযায়ী সব বাস চালাচ্ছেন।
এদিকে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি বলছে, জ্বালানি তেল বিক্রির যে সীমা নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন, সেই পদ্ধতি ঈদযাত্রায় ভোগান্তি বাড়ানোর পাশাপাশি ভাড়া নৈরাজ্য 'উস্কে দিতে পারে'।
এমন পরিস্থিতি মোকাবিলায় অন্তত ঈদের দিন পর্যন্ত পরিবহনে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। মঙ্গলবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ দাবি জানান যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী।
যাত্রী কল্যাণ সমিতির পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে মোজাম্মেল বলেন, এবারের ঈদযাত্রায় বিভিন্ন শ্রেণির লঞ্চে ৪০ লাখ ট্রিপ, সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ৩০ লাখ ট্রিপ, হিউম্যান হলারে ৮০ লাখ ট্রিপ, কার-মাইক্রোবাসে ৬০ হাজার ট্রিপ, দূরপাল্লার বাস-মিনিবাসে ৩০ লাখ ট্রিপ, ঢাকার সিটিবাসে ৪০ লাখ ট্রিপ এবং রাইডশেয়ারিংয়ের মোটরসাইকেলে প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ ট্রিপে যাত্রী চলাচল করতে পারে।
