রমজানে ডিমের দরপতন: ভোক্তারা স্বস্তিতে, লোকসানে খামারিরা

রমজানে চাহিদা কমে যাওয়ায় প্রতিবারই ডিমের দাম স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে কমে যায়। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। এতে ভোক্তারা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেও মূল্যস্ফীতির যাঁতাকলে পিষ্ট খামারিরা পড়েছেন লোকসানে। উৎপাদন খরচের চেয়ে প্রতি পিস ডিমে প্রায় আড়াই থেকে ৩ টাকা লোকসান গুনছেন খামারিরা। ডিমের সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে না ওঠায় দামের উত্থান-পতনে ক্ষতির মুখে পড়ছেন তারা।
কিশোরগঞ্জের সদর উপজেলার খামারি মো. সাদিকুর রহমানের খামারে বর্তমানে ৩ হাজার লেয়ার মুরগি ডিম উৎপাদনে রয়েছে। গতকাল তিনি প্রতি পিস ডিম বিক্রি করেছেন ৭.৫০ টাকায়।
সাদিকুর হতাশা প্রকাশ করে টিবিএসকে বলেন, 'প্রতিদিন আমার প্রায় ১০-১১ হাজার টাকা লোকসান হচ্ছে। অনেক বছর ধরে খামার করি। এবারের রমজানের মতো সংকট আর কখনও হয়নি।'
সংরক্ষণ সুবিধা না থাকায় আরও বিপাকে পড়ছেন জানিয়ে তিনি বলেন, 'আগের বছরগুলোতে আমরা আলুর কোল্ড স্টোরেজে ডিম রাখতে পারতাম। এতে ১০-১২ দিন ডিম ভালো থাকে।
'কিন্তু গতবার জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ব্যাপক জরিমানা করায় এবার কোনো কোল্ড স্টোরেজে ডিম রাখছে না। স্টোরেজ ব্যবস্থা থাকলে ডিমের দামে এত পতন হয় না।'
বর্তমানে রাজধানীতে খুচরা পর্যায়ে প্রতি হালি ডিম বিক্রি হচ্ছে ৩৮-৪৩ টাকায়। ২ মার্চ থেকে রমজান শুরু হয়। এর এক মাস আগে প্রতি হালি ডিমের দাম ছিল ৪৫-৫০ টাকা। আর ১৫তম রোজায় (১৬ মার্চ) প্রতি হালি ডিমের দাম ছিল ৩৮-৪৫ টাকা।
২০২৪ সালে রোজা শুরু হয় ১২ মার্চ থেকে। সরকারি সংস্থা ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত বছর রোজা শুরুর এক মাস আগে, অর্থাৎ ১২ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর খুচরা বাজারে প্রতি প্রতি হালি ডিম বিক্রি হয়েছে ৪৪-৪৭ টাকায়।
এরপর ১৫ রমজানে ডিমের দাম কমে দাঁড়ায় প্রতি হালি ৪০-৪৩ টাকা। রমজান শেষ হওয়ার পর ফের দাম বাড়তে শুরু করে। ঈদের এক মাস পর, ১২ মে প্রতি হালি ডিমের দাম দাঁড়ায় ৪৫-৫০ টাকায়।
২০২২ ও ২০২৩ সালের তথ্য বিশ্লেষণ করেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। রমজানে ডিমের মূল্যের চেয়ে আগে ও পরে প্রতি হালি ডিমের দাম ৮-১০ টাকা বেশি থাকে।
পোল্ট্রি খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, রমজানে ডিমের দাম কম থাকায় ভোক্তা স্বস্তি পেলেও উৎপাদন খরচ তুলতে না পেরে হিমশিম খাচ্ছেন প্রান্তিক খামারিরা।
খামারিরা বলছেন, রমজানের শুরু থেকে খামারের গেটে ৭-৭.৫ টাকায় বিক্রি হয়েছে প্রতি পিস ডিম। ১৮ মার্চের পর থেকে দাম বেড়ে ৯ টাকায় বিক্রি হলেও গত দুইদিন ধরে দাম আবারও কমছে।
গত বছর ডিমের উৎপাদন খরচ ও খামারি পর্যায়ে ডিমের দাম নির্ধারণ করে দেয় কৃষি বিপণন অধিদপ্তর।
সে হিসাবে, প্রতি পিস ডিম উৎপাদনে খামারি পর্যায়ে খরচ হয় ১০.১৯ টাকা। এর পরিপ্রেক্ষিতে খামারি পর্যায়ে প্রতি পিস ডিমের সর্বোচ্চ মূল্য ১০.৫৮ টাকা নির্ধারণ করে দেয় সরকার। পরবর্তীতে মূল্য সমন্বয়ের কথা থাকলেও আর পরিবর্তন করা হয়নি।
বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিআইএ) মহাসচিব ও ইউনাইটেড এগ্রো কমপ্লেক্সের স্বত্বাধিকারী খন্দকার মুহাম্মদ মহসিন টিবিএসকে বলেন, 'রমজানে বেকারি-কেন্দ্রিক খাবারের চাহিদা কমে যায়। এ কারণে ডিমের ব্যবহার কমে যায়। আবার ঈদের পর যখন সব স্বাভাবিক হয়, তখন ফের চাহিদা বেড়ে গেলে দামও বেড়ে যায়। এটা প্রতি বছরের চিত্র।'
রমজানে ডিমের চাহিদা প্রায় ৩০-৩৩ শতাংশ কমে যায় জানিয়ে তিনি বলেন, 'স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫ কোটি ডিমের চাহিদা থাকে। রমজানে চাহিদা এক-তৃতীয়াংশ কমে যায়। এই বাড়তি ডিম যদি নিয়ম মেনে কোল্ড স্টোরেজে সংরক্ষণ করা যায়, তাহলে ঈদের পর চাপ বাড়লে তা সামাল দেয়া সম্ভব হয়।
'এতে খামারিরাও দামের ক্ষেত্রে ক্ষতির মুখে পড়বেন না। সারা বছর একই দামে ভোক্তা ডিম খেতে পারবেন। কিন্তু আমাদের দেশে এখনও ক্ষুদ্র খামারিদের জন্য কোল্ড স্টোরেজ গড়ে ওঠেনি।'
মহসিন কোল্ড স্টোরেজের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে বলেন, যেসব জেলায় সবচেয়ে বেশি ডিম উৎপাদন হয়, সেখানে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, কৃষি বিপণন অধিদপ্তর ও ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সমন্বয়ে একটি মনিটরিং টিম গঠন করে নিবন্ধিত খামারিদের ডিম সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।
বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, 'আমি ভারতের কয়েকটি রাজ্যে দেখেছি সেখানে ৮-১৩ ডিগ্রি তাপমাত্রায় ডিম রেখে এক বছর পর্যন্ত সংরক্ষণ করা হয়। আামদের দেশে তো ডিম রাখার কোনো কোল্ড স্টোরেজ গড়ে ওঠেনি। আমরা প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে সে প্রস্তাব রেখেছি।'
'আমাদের কথা হলো, যেন সারা বছর একই দামে ভোক্তারা ডিম কিনতে পারে, খামারিরাও লোকসানে না পড়েন,' যোগ করেন তিনি।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, চাহিদার চেয়েও বাংলাদেশে প্রায় ৫৫ কোটি ডিম বেশি উৎপাদন হয়। দেশে বছরে ২ হাজার ৩৭৪ কোটি ডিম উৎপাদন হয়। সে হিসেবে মাথাপিছু ডিমের প্রাপ্যতা বছরে ১৩৫টি।
বাংলাদেশ পোল্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সুমন হাওলাদার কোল্ড স্টোরেজের পাশাপাশি খামারিদের সুরক্ষার দাবি জানান। তিনি বলেন, কোল্ড স্টোরেজ করতে হবে প্রান্তিক ক্ষুদ্র খামারিদের কথা বিবেচনায় রেখে।
তিনি বলেন, কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর চেয়ে ক্ষুদ্র খামারিদের উৎপাদন খরচ বেশি। এ কারণে দাম কমে গেলে ক্ষুদ্র খামারিরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। ডিমের দাম পড়ে গেলে খামারিদের সরকারের পক্ষ থেকে ঋণ সহায়তা দেওয়ার দাবি জানান তিনি।
সুমন আরও বলেন, তেজগাঁও বাজার থেকে সারা দেশে এসএমএসের মাধ্যমে ডিমের দাম নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। এখানে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ডিমের দাম কমানো-বাড়ানো হয়। সরকার এখনও এই সিন্ডিকেট ভাঙতে পারেনি। তাদের কারণে প্রান্তিক খামারিরা নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছেন।