মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিল পাস, ১০০% শুল্কের ঝুঁকিতে ভারত
ইউক্রেনে আগ্রাসনের জেরে রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়াতে একটি কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও শুল্ক বিল পাস করেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদ। এর আওতায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে চীন, ভারত ও অন্যান্য দেশের ওপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত চড়া শুল্ক আরোপের এখতিয়ার দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি এতে ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা সম্প্রসারণের সুযোগও রাখা হয়েছে।
প্রয়াত মার্কিন সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম প্রতিনিধি পরিষদে বিলটি উত্থাপন করার প্রায় দেড় বছর পর বুধবার বিলটি প্রতিনিধি পরিষদে পাস হয় এবং তা সইয়ের জন্য প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে পাঠানো হয়েছে। তিনি এতে সই করলেই সেটি আইনে পরিণত হবে।
লিন্ডসে ও. গ্রাহাম স্যাংশনিং রাশিয়া অ্যান্ড ইরান অ্যাক্ট অব ২০২৬' শীর্ষক এই বিলটি গত মাসে সিনেটে অনুমোদনের পর প্রতিনিধি পরিষদে ২৬২–১৫৯ ভোটে পাস হয়। দলীয় অবস্থানের বাইরে গিয়ে ৫৮ জন ডেমোক্র্যাট সদস্য বিলটির পক্ষে ভোট দেন। অন্যদিকে মাত্র সাতজন বাদে রিপাবলিকান পার্টির বাকি সব সদস্যই এর পক্ষে ভোট দেন।
ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যয় করার মতো তহবিল থেকে মস্কোকে বঞ্চিত করতে নতুন এই (প্রস্তাবিত) আইনে রাশিয়ার জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা খাতকে নিশানা করা হয়েছে। একই সঙ্গে বর্তমান নিষেধাজ্ঞা ফাঁকি দিতে ব্যবহৃত দেশটির ট্যাংকারের 'শ্যাডো ফ্লিট'-এর (ছায়া বহর) ওপরও বিধিনিষেধ আরোপের কথা বলা হয়েছে।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্পের হোয়াইট হাউসে প্রত্যাবর্তন এবং কংগ্রেসের উভয় কক্ষে রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর ইউক্রেনসংক্রান্ত যতগুলো আইন পাস হয়েছে, তার মধ্যে এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
২০২৫ সালের এপ্রিলে গ্রাহাম ও অন্য কয়েক ডজন সিনেটর এটি উত্থাপন করার পর থেকে বিলটি উল্লেখযোগ্য বিরোধিতার মুখে পড়েছিল। কংগ্রেসের রিপাবলিকান নেতাদের ভোটাভুটির সময় নির্ধারণের অনুমতি দিতে ট্রাম্প ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত সময় নেন।
উল্লেখ্য, এটি ছিল ১১ জুলাই গ্রাহামের আকস্মিক মৃত্যুর ঠিক কয়েক দিন আগের ঘটনা।
ভোটগ্রহণের পর এক সংবাদ সম্মেলনে রিপাবলিকান সিনেটর ডার্লিন গ্রাহাম বলেন, 'এটি আমার কাছে অত্যন্ত অর্থবহ এবং লিন্ডসের কাছেও এটি অনেক বড় বিষয় ছিল।' তিনি তার প্রয়াত ভাইয়ের শূন্য আসনেই সিনেটর হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে পূর্ণ মাত্রায় সামরিক অভিযান শুরু করে রাশিয়া। এরপর থেকে দুই পক্ষের মধ্যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচেয়ে প্রাণঘাতী সংঘাত চলছে।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে পররাষ্ট্রনীতির প্রধান হাতিয়ার হিসেবে শুল্ক ও নিষেধাজ্ঞার নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রাখার ওপরই বেশি গুরুত্ব দিয়ে আসছেন ট্রাম্প। এ বিষয়ে কংগ্রেসের সঙ্গে সমন্বয় করে আইন প্রণয়নে তার আগ্রহ কম ছিল।
ডেমোক্র্যাটদের আপত্তি, জেলেনস্কির সমর্থন
এর আগে গত মাসে সিনেটে ৮৬-১১ ভোটে দ্বিদলীয় সমর্থনে বিলটি পাস হয়। সে সময় ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি মার্কিন আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে দেখা করে বিলটি পাসের আহ্বান জানান। এমনকি তিনি সিনেট কক্ষে বসে একটি কার্যপ্রণালিসংক্রান্ত ভোটও প্রত্যক্ষ করেন।
চলতি সপ্তাহে দেওয়া এক ভাষণে জেলেনস্কি বিলটির প্রতি তার সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, 'এটি আইনে পরিণত হওয়া অত্যন্ত জরুরি। বিশ্বজুড়ে যারা এই পদক্ষেপকে সমর্থন করছেন এবং বিশ্বাস করেন যে শক্তির প্রয়োগ কাজে দেয়, তাদের সবাইকে আমি ধন্যবাদ জানাই।'
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে রাশিয়া ও ইউক্রেন একে অপরের অবকাঠামো ও অন্যান্য অর্থনৈতিক লক্ষ্যবস্তুতে পাল্টাপাল্টি হামলা চালিয়ে আসছে। এসব হামলার লক্ষ্য ছিল, সামরিক কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটানো ও মনোবল দুর্বল করা। বুধবারও দক্ষিণ ইউক্রেনে একটি যাত্রীবাহী বাস ও ট্রেনে রুশ ড্রোন হামলায় পাঁচজন নিহত হন।
প্রতিনিধি পরিষদের ডেমোক্র্যাটরা বিলটির বিরোধিতা করেন। তাদের আশঙ্কা, এর মাধ্যমে ট্রাম্প মিত্র দেশগুলোর বিরুদ্ধে নতুন শুল্ক আরোপের অতিরিক্ত ক্ষমতা পাবেন। তাদের দাবি, রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার ক্ষমতা ট্রাম্পের আগে থেকেই রয়েছে; কিন্তু তিনি তা প্রয়োগ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
ডেমোক্র্যাটদের আরও অভিযোগ, বিলটিতে নিষেধাজ্ঞা থেকে ছাড় দেওয়ার সুযোগ ট্রাম্পের জন্য সহজ করে রাখা হয়েছে। তিনি শুধু এটিকে 'জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী' ঘোষণা করেই নিষেধাজ্ঞা থেকে ছাড় দিতে পারবেন। তাদের মতে, এতে প্রচলিত নিষেধাজ্ঞা আইনের তুলনায় প্রেসিডেন্টকে অনেক বেশি ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
হাউস ডেমোক্রেটিক নেতা হাকিম জেফরিজ জানান, বিলটিতে এত বেশি ফাঁকফোকর রয়েছে যে রাশিয়ার ক্ষতি করতে পারে—এমন নিষেধাজ্ঞাও শেষ পর্যন্ত কার্যকর নাও হতে পারে। বিপক্ষে ভোট দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে নিউইয়র্কের এই আইনপ্রণেতা বলেন, 'এই আইনের মাধ্যমে হয়তো আমেরিকান জনগণের ওপর নতুন করে শুল্ক চাপিয়ে দেওয়ার অবাধ ক্ষমতা পেয়ে যাবেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।'
এদিকে আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে বাড়তি শুল্কের রাজনৈতিক প্রভাব এবং এর ফলে পণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কায় কয়েকজন রিপাবলিকান সদস্যও উদ্বিগ্ন ছিলেন। বিভিন্ন জনমত জরিপে প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা নিয়ে দলটির চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিতও মিলছে।
তবে বিলটির সমর্থকরা বলেন, উভয় দলের উল্লেখযোগ্য সমর্থনে পাস হওয়া এই বিরল আইন রাশিয়া ও বিশ্বকে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেবে—ওয়াশিংটন ইউক্রেনকে সমর্থন দিয়ে যাবে। তাদের মতে, এতে মস্কো সমঝোতার টেবিলে বসতে বাধ্য হবে।
প্রতিনিধি পরিষদে ভোটের পর সংবাদ সম্মেলনে বিলটির অন্যতম প্রধান উদ্যোক্তা টেক্সাসের রিপাবলিকান প্রতিনিধি মাইকেল ম্যাককল বলেন, 'ইউক্রেন ও এর বাইরে দীর্ঘস্থায়ী শান্তির বিষয়ে লিন্ডসের যে স্বপ্ন ছিল, আজকের এই পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে আমরা তা বাস্তবায়নের আরেক ধাপ কাছাকাছি পৌঁছালাম।'
