আমেরিকার সঙ্গে ব্যবসা বন্ধ করা সব কানাডীয় কোম্পানিকে 'অবিলম্বে' যুক্তরাষ্ট্রে ফিরতে বললেন ট্রাম্প
কানাডার সঙ্গে চলমান বাণিজ্যযুদ্ধ আরও জোরদার করার ইঙ্গিত দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবসা করতে চাইলে কানাডীয় কোম্পানিগুলোকে তাদের সদর দপ্তর ও উৎপাদন কার্যক্রম 'অবিলম্বে' যুক্তরাষ্ট্রে সরিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
রোববার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, নতুন শুল্ক এড়াতে কানাডীয় কোম্পানিগুলোর 'আমেরিকায় ফিরে আসা' উচিত। নতুন এই শুল্ক ২০২৭ সাল থেকে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।
ট্রাম্প লিখেছেন, 'আমেরিকার সঙ্গে ব্যবসা করা সব কানাডীয় কোম্পানি অবিলম্বে যুক্তরাষ্ট্রে চলে আসুক। এর মধ্যে অনেক কোম্পানি কয়েক বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রের বোকা নেতৃত্বের কারণে অন্যত্র চলে গিয়েছিল। ফিরে এলে কোনো শুল্ক দিতে হবে না।'
কানাডার সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর এই মন্তব্য করলেন ট্রাম্প। সম্প্রতি তিনি দুগ্ধপণ্য ও কাঠসহ কিছু কানাডীয় পণ্যের ওপর সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন।
এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্রের ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়ামসহ বিভিন্ন রপ্তানি পণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক বসিয়েছে কানাডা। কানাডীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যবিরোধের জন্য দেশটি প্রস্তুত।
অন্য এক পোস্টে ট্রাম্প কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম 'সবচেয়ে খারাপ' বাণিজ্য অংশীদার বলে মন্তব্য করেন। অথচ কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর দুই দেশের মধ্যে প্রায় ৯০০ বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক কার্যক্রম বিদ্যমান।
ট্রাম্প লিখেছেন, 'কানাডা সবচেয়ে বড় সুযোগসন্ধানীদের একটি।'
তিনি আরও বলেন, 'আমি কানাডার গাড়ি চাই না, কানাডার যন্ত্রাংশ চাই না, কানাডার কিছুই চাই না। তারা কয়েক দশক ধরে আমাদের ঠকিয়ে আসছে। এবার তা বন্ধ হবে।'
ট্রাম্প দাবি করেন, তার শুল্কনীতি মার্কিন গাড়ি শিল্পকে রক্ষা করেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক গাড়ি নির্মাতা এখনো কানাডাসহ বিভিন্ন দেশে তৈরি যন্ত্রাংশ ও সরবরাহব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল।
চলতি বছরের শুরুতে মার্কিন প্রশাসন কিছু গাড়ির যন্ত্রাংশকে শুল্কের আওতার বাইরে রাখায় ফোর্ড কর্তৃপক্ষ ট্রাম্প প্রশাসনকে ধন্যবাদ জানিয়েছিল। তবে নতুন দফার শুল্কের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের গাড়ি শিল্প অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়বে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
ট্রাম্পের সাম্প্রতিক পোস্টে অবশ্য সেই আশঙ্কাই জোরালো হয়েছে।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে কানাডার সঙ্গে আলোচনায় বসার আগ্রহ খুব একটা দেখাননি ট্রাম্প। বরং কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ও ওন্টারিওর প্রিমিয়ার ডগ ফোর্ডসহ দেশটির রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে বিরোধ আরও উসকে দিয়েছেন তিনি।
গত বৃহস্পতিবার ট্রাম্প এক নির্বাহী আদেশে যুক্তরাষ্ট্রের সব ফেডারেল সংস্থাকে লেক অন্টারিওকে 'লেক আমেরিকা' নামে উল্লেখ করার নির্দেশ দেন। কানাডা সরকারকে চাপ দেওয়ার আরেকটি পদক্ষেপ হিসেবে নেওয়া এ সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক উপহাসও হয়েছে।
গত সপ্তাহে ট্রাম্পের সঙ্গে ব্যক্তিগত বিরোধে জড়িয়ে পড়া ডগ ফোর্ড রোববার সতর্ক করে বলেন, বাণিজ্যযুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা উভয় দেশের অর্থনীতির জন্যই ব্যাপক ক্ষতিকর হবে।
এবিসির 'দিস উইক' অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, 'ট্রাম্পের কারণে সবাই নিজেকে নিপীড়িত মনে করছে। এটি মার্কিন অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে খারাপ সিদ্ধান্ত হতে পারে। এর কোনো উদ্দেশ্য আমি বুঝতে পারছি না। এটি পুরোপুরি উল্টো পথে হাঁটা।'
ট্রাম্পের সিদ্ধান্তকে 'স্যাটারডে নাইট লাইভের কোনো কাণ্ডের মতো' বলেও মন্তব্য করেন তিনি। ডগ ফোর্ড বলেন, 'কেউ লেক ওন্টারিওকে লেক আমেরিকা বলবে না।'
এর আগেও সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্পকে 'বুলি' ও 'লুজার' বলে মন্তব্য করেছিলেন ডগ ফোর্ড।
ম্যানিটোবার প্রিমিয়ার ওয়াব কিনিউও ট্রাম্পের কঠোর সমালোচনা করে কানাডা সরকারকে পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, 'আমি মনে করি ডোনাল্ড ট্রাম্প খুবই দুর্বল। এক বছর আগের তুলনায় আজ বিশ্বে আমেরিকা দুর্বল অবস্থানে আছে। মধ্যবর্তী নির্বাচনে তিনি বড়ভাবে হারবেন। জীবনযাত্রার ব্যয় এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা, অথচ মার্কিনদের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে তিনি পুরোপুরি বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন।'
গত সপ্তাহে কানাডা পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেয়। তবে মার্কিন কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, কানাডার পক্ষ থেকে আরও পাল্টা পদক্ষেপ নেওয়া হলে ট্রাম্প প্রশাসনও তার জবাব দেবে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার কানাডার এক সম্প্রচারমাধ্যমকে বলেন, 'কানাডার পক্ষ থেকে আরও পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়া হলে আমরা অবশ্যই চুপ করে বসে থাকব না। আমাদের অবস্থান হলো, পাল্টা ব্যবস্থা নেবেন না।'
তিনি আরও বলেন, 'আমি জানি কানাডার মানুষ কেমন অনুভব করছেন এবং তারা কী ভাবছেন। বিষয়টি দুর্ভাগ্যজনক, কিন্তু বাস্তবতা এটাই। আমাদের নিজস্ব বাণিজ্যনীতি আছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের জন্য যা সবচেয়ে ভালো, আমরা সেভাবেই এগোব।'
