জুলাইয়ে বৈদেশিক ঋণ ছাড়ের চেয়ে পরিশোধ হয়েছে আড়াই গুণের বেশি, বাড়ছে চাপ
মেগা প্রকল্পগুলোর জন্য নেওয়া ঋণের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হয়ে আসায় ঋণ পরিশোধের চাপ ক্রমাগত বাড়ছে। ফলে চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে যে পরিমাণ বৈদেশিক ঋণ পাওয়া গেছে, তার চেয়ে আড়াইগুণের বেশি ঋণ পরিশোধ করেছে বাংলাদেশ।
রোবার প্রকাশিত অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের ( ইআরডি) তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ে বৈদেশিক ঋণ ছাড় হয়েছে ১৮০.১৮ মিলিয়ন ডলার। আর এ সময়ে বাংলাদেশ উন্নয়ন সহযোগীদের আগের নেওয়া ঋণের সুদ ও আসল মিলিয়ে মোট ৪৫৩.২৩ মিলিয়ন ডলার পরিশোধ করেছে।
ইআরডির তথ্য বলছে, গত অর্থবছরের জুলাইয়ে বৈদেশিক ঋণ ছাড় হয়েছিল ২০৮.০৪ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এ বছরে জুলাইয়ে গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১৩.৩৯ শতাংশ কম অর্থছাড় হয়েছে।
গত অর্থবছরের জুলাইয়ে বাংলাদেশ বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করেছিল ৪৪৬.৬৮ মিলিয়ন ডলার। ফলে চলতি অর্থবছরে একই সময়ে ঋণ পরিশোধ প্রায় ৪ শতাংশ বেড়েছে।
ইআরডির কর্মকর্তারা জানান, অর্থবছরের শুরুতে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের কৌশল নির্ধারণ ও কর্মপরিকল্পনা নিয়ে ব্যস্ত থাকে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো। ফলে অর্থ ব্যয় খুবই কম হয়। এ কারণে জুলাই মাসে অর্থ ছাড় কমেছে।
তারা আরও বলেন, এ সময় উন্নয়ন সহযোগীরা সারা বছরের জন্য তাদের প্রস্তুতি নেয়। ফলে উন্নয়ন সহযোগীদের পক্ষ থেকেও বড় ধরনের অর্থছাড়ের সুযোগ কম থাকে।
অন্যদিকে বিগত সময়ে নেওয়া মেগা প্রকল্পের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হয়ে যাওয়ায় ঋণ পরিশোধের চাপ ক্রমগত বাড়ছে। এতে অর্থবছরের শুরুতেই বাংলাদেশকে ঋণের আসল ও সুদ বাবদ বড় অঙ্কের ঋণ পরিশোধ করতে হচ্ছে বলে জানান কর্মকর্তারা।
ইআরডির তথ্যানুসারে, বাংলাদেশ এ বছরের জুলাইয়ে আসল বাবদ উন্নয়ন সহযোগীদের পরিশোধ করেছে ৩২৭.৭২ মিলিয়ন ডলার, যা চলতি অর্থবছরের জুলাইয়ে বেড়ে ৩৪১.৭২ মিলিয়ন ডলার হয়েছে। তবে চলতি অর্থবছরের জুলাইয়ে সুদ পরিশোধ কিছুটা কমেছে। চলতি বছরের জুলাইয়ে সুদ বাবদ পেমেন্ট হয়েছে ১১১.৫১ মিলিয়ন ডলার, যা গত অর্থবছরের জুলাইয়ে ছিল ১১৮.৯৬ মিলিয়ন ডলার।
এদিকে প্রথম মাসে উন্নয়ন সহযোগীদের প্রতিশ্রুতিও কমেছে। চলতি বছরের জুলাইয়ে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে মাত্র ১৪.০৫ মিলিয়ন ডলারের, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৮৩ শতাংশ কম। গত জুলাইয়ে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি এসেছিল ৮৩.৪৬ মিলিয়ন ডলার। তবে চলতি অর্থবছরে যে প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে, তার পুরোটা অনুদান।
ইআরডির কর্মকর্তারা বলেন, নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর বৈদেশিক ঋণের প্রকল্পের ক্ষেত্রে কিছু পরিবর্তন এসেছে। যেসব প্রকল্পের ভ্যালু ফর মানি বা রিটার্ন আসবে, সেগুলো বৈদেশিক ঋণে বাস্তবায়ন করা হবে।
এ অবস্থায় সরকার নতুন করে প্রকল্প চিহ্নিত করছে। পাশাপাশি উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে আলোচনা শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ কারণে অর্থবছরের শুরুতে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে তেমন কোনো প্রতিশ্রুতি পাওয়া যায়নি।
'এক-দুই মাসের ডেটা দেখে পুরো বছরের প্রবাহ সম্পর্কে সিদ্ধান্তে আসা ঠিক নয়'
ইন্সটিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, 'একটা নতুন সরকার এসেছে, ছয় মাস হয়েছে। আর অর্থবছরও শুরু হয়েছে জুলাই থেকে। এই সময়ের মধ্যেই যদি আমরা আশা করি যে সবকিছু স্থির হয়ে যাবে বা সারা বছরের ফ্লো একই রকম থাকবে, তা সত্য না। কারণ, বিভিন্ন দাতা সংস্থার সঙ্গে যে নেগোসিয়েশনগুলো হয়, সেগুলো সময়সাপেক্ষ। শর্তাবলি নির্ধারণ, কারিগরি বিষয়, প্রকল্প যাচাই—সব মিলিয়ে এগুলো একদিনে হয় না। তাই প্রথম এক-দুই মাসের ডেটা দেখে পুরো বছরের প্রবাহ সম্পর্কে সিদ্ধান্তে আসা ঠিক নয়।'
তিনি আরও বলেন, 'বাস্তবে আস্তে আস্তে এসব নেগোসিয়েশন এগোয়। বিভিন্ন দাতা সংস্থার সঙ্গে আলোচনা চলতে থাকে। একেকটি চুক্তি যখন চূড়ান্ত হয়, তখন বড় অঙ্কের অর্থ একসঙ্গে আসে। এখন যেমন কিছু উদ্যোগ চলছে—যদি সেগুলো সফলভাবে সম্পন্ন হয় এবং দুই পক্ষ একমত হয়, তাহলে বড় অংকের ফান্ড আসতে পারে।'
এই অর্থনীতিবিদ বলেন, বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) পাশাপাশি আরও বেশ কিছু দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক দাতা সংস্থার সঙ্গে আলোচনা চলছে বাংলাদেশের। 'কাজেই আমরা হয়তো দেখব, আগামী ছয় মাস বা নয় মাসের মধ্যে এগুলোর অনেকগুলোই চূড়ান্ত হবে, শর্তাবলি ঠিক হবে। তখন চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে অর্থপ্রবাহ বাড়বে।'
ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়বে
মুজেরী বলেন, ঋণ পরিশোধের পরিমাণ বাড়ছে। এটা স্বাভাবিক এবং প্রত্যাশিত। 'কারণ অতীতে আমরা যে বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়েছি—বিশেষ করে বিভিন্ন মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য—সেগুলোর দায় এখন পরিশোধ করতে হবে।'
তিনি আরও বলেন, 'অনেক ঋণ এখন ম্যাচিউর (মেয়াদ পূর্তি) হচ্ছে। মানে যেগুলোর গ্রেস পিরিয়ড শেষ হয়ে গেছে এবং পরিশোধ শুরু করতে হচ্ছে।'
এই অর্থনীতিবিদ বলেন, বড় বড় প্রকল্পের ঋণের কিস্তি এখন থেকে ক্রমশ বাড়বে। ফলে আগামী বছরগুলোতে ঋণ পরিশোধের অঙ্ক কমবে না, বরং বাড়তেই থাকবে।
তিনি আরো বলেন, এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে নতুন ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে আরও সতর্ক হতে হবে।
'ইতোমধ্যেই দায়ভার বেড়েছে এবং সামনে আরও বাড়বে। ফলে এখনই সময় ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা এবং এমন খাতে বিনিয়োগ করা, যাতে অর্থনৈতিক রিটার্ন আসে এবং ঋণ পরিশোধের চাপ বহনযোগ্য থাকে।'
জুলাইয়ে সবচেয়ে বেশি অর্থ ছাড় করেছে এডিবি
ইআরডির তথ্যমতে, জুলাইয়ে মাসে সবচেয়ে বেশি অর্থছাড় করেছে এডিবি। সংস্থাটি এ মাসে ৬৫.৪৫ মিলিয়ন ডলার ছাড় করেছে।
এছাড়া জাপান ৩৮.৬৬ মিলিয়ন, বিশ্বব্যাংক ৪৭.৫৩ মিলিয়ন ও ভারত ২৬.৬৯ মিলিয়ন ডলার ছাড় করেছে।
