বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের ঝুঁকি ও অর্থছাড়ের ধীরগতি পর্যালোচনায় আইএমএফ
দেশের বৈদেশিক ঋণের ঝুঁকি মূল্যায়নে গতকাল (১৪ জুলাই) অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)-এর সঙ্গে বৈঠক করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর প্রতিনিধি দল।
সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে আইএমএফ বাংলাদেশের ঋণের ব্যয়, নমনীয় ঋণ পরিস্থিতি, বাজারভিত্তিক ফ্লোটিং-রেট ঋণের ওপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরতা, গড় ঋণ নেওয়ার ব্যয় এবং বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের বাধ্যবাধকতা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানতে চায়।
বৈঠকে উপস্থিত ইআরডি কর্মকর্তাদের মতে, বহুপাক্ষিক এই ঋণদাতা সংস্থা সম্প্রতি বাংলাদেশে বৈদেশিক ঋণের অর্থছাড় কমে যাওয়ার কারণও জানতে চেয়েছে। পাশাপাশি, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উন্নয়ন অংশীদারদের বাজেট সহায়তা কেন কমেছে, সে বিষয়েও জানতে চেয়েছে প্রতিনিধি দল।
বৈদেশিক ঋণ ঝুঁকির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বর্তমানে 'লো-রিস্ক স্ট্যাবিলাইজেশন ফেজ' থেকে 'মিডিয়াম-রিস্ক অ্যাকসেলারেশন ফেজ'-এ প্রবেশ করছে বলে আইএমএফ প্রতিনিধি দলকে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
তারা জানান, নমনীয় ঋণের প্রাপ্যতা কমে যাওয়ায় বৈদেশিক ঋণ নেওয়া ক্রমেই ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে। বিশেষ করে জাপানসহ দ্বিপাক্ষিক ঋণদাতারা কম নমনীয় ঋণের দিকে ঝুঁকছে। একই সঙ্গে বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)-এর মতো বহুপাক্ষিক ঋণদাতাদের কাছ থেকে বাজারভিত্তিক ফ্লোটিং-রেট ঋণের অংশও ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণ পোর্টফোলিওর প্রায় ৩০ শতাংশই ছিল ফ্লোটিং-রেট ঋণ। সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে এ হার আরও বাড়বে বলে আশা করছেন কর্মকর্তারা।
কর্মকর্তারা আইএমএফকে জানিয়েছেন, বাংলাদেশ তীব্র রাজস্ব ও আর্থিক চাপের একটি পর্যায়ে প্রবেশ করছে। আগামী পাঁচ বছরে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে, যা দেশের আগে থেকেই দুর্বল দুর্বল রাজস্ব আদায়ের সীমাবদ্ধতা আরও স্পষ্ট করে তুলবে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি অর্থবছর থেকে ২০২৯-৩০ অর্থবছরের মধ্যে বাংলাদেশকে বৈদেশিক ঋণের কিস্তি ও সুদ বাবদ প্রায় ২৬ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করতে হবে।
১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর গত ৫৪ বছরে বাংলাদেশ বৈদেশিক ঋণের কিস্তি ও সুদ বাবদ প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করেছে। অথচ আগামী মাত্র পাঁচ বছরেই পরিশোধ করতে হবে সেই মোট অর্থের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ।
বৃহত্তর সামষ্টিক অর্থনৈতিক মূল্যায়নের অংশ
ইআরডি কর্মকর্তারা জানান, আইএমএফের এই পর্যালোচনা বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং বৈদেশিক ঋণের স্থায়িত্ব মূল্যায়নের বৃহত্তর প্রক্রিয়ার অংশ।
এ মূল্যায়নের অংশ হিসেবে প্রতিনিধি দল দেশের বৈদেশিক ঋণের সর্বশেষ অবস্থান সম্পর্কে জানতে চায়। একই সঙ্গে পাইপলাইনে আটকে থাকা প্রতিশ্রুত বৈদেশিক ঋণের অর্থছাড় দ্রুত করতে সরকার কী পদক্ষেপ নিচ্ছে, সে বিষয়েও জানতে চায়।
কর্মকর্তারা জানান, তারা আইএমএফ প্রতিনিধি দলকে জানিয়েছেন যে, আগের সরকারের কাছ থেকে পাওয়া অনেক চলমান প্রকল্প বর্তমানে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি বৈদেশিক অর্থায়নে নতুন প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষেত্রে সরকার সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।
তারা আরও জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের গতি কমে যাওয়ায় বৈদেশিক ঋণের অর্থছাড়ও কমেছে।
ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে পাইপলাইনে অর্থছাড়ের অপেক্ষায় থাকা বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ৪১ দশমিক ৭৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। চলতি অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ে বৈদেশিক ঋণের অর্থছাড় হয়েছে ৪ দশমিক ৫৭৭ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের ৫ দশমিক ৪৮৮ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় ১৮ দশমিক ৩ শতাংশ কম।
ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট বৈদেশিক ঋণের অর্থছাড় হয়েছে ৯ দশমিক ২৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আগের অর্থবছরে এ পরিমাণ ছিল ১০ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলার।
বাজেট সহায়তা
কর্মকর্তারা জানান, আইএমএফ সাম্প্রতিক সময়ে বাজেট সহায়তার প্রবণতা সম্পর্কেও ব্যাখ্যা চেয়েছে।
ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ রেকর্ড ৩ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বাজেট সহায়তা পেলেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে ১ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। চলতি অর্থবছরে বাজেট সহায়তা আরও কমতে পারে বলে আশা করছেন কর্মকর্তারা।
কর্মকর্তারা জানান, কোভিড-১৯ মহামারি এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর সৃষ্ট অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলায় বাংলাদেশকে সহায়তা দিতে বাজেট সহায়তা বৃদ্ধি করা হয়েছিল।
সম্প্রতি ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে ঘিরে বাড়তে থাকা ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বৈদেশিক অর্থায়নের প্রয়োজন আরও বাড়িয়েছে।
আগের সরকারের সময়ে ২০২৩ সালে সম্মত হওয়া ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের আইএমএফ ঋণ কর্মসূচি থেকে বাংলাদেশ বেরিয়ে এসেছে। এখন সংশোধিত সংস্কার শর্তের আওতায় ৪ থেকে ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের নতুন তিন বছর মেয়াদি ঋণ কর্মসূচি চাইছে সরকার।
এই নতুন ঋণ কর্মসূচির সম্ভাব্যতা যাচাই করতে আইএমএফের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল ১২ জুলাই পাঁচ দিনের সফরে ঢাকায় এসেছে।
