সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডে এক ‘সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের’ সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে: চিফ প্রসিকিউটর
সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যাকাণ্ডে একজন 'সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের' সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। একইসঙ্গে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার পক্ষ থেকে এই হত্যাকাণ্ডকে 'রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট' বা 'স্টেট স্পন্সরড মার্ডার' হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।
রোববার (৩০ আগস্ট) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম এসব তথ্য জানান।
তিনি বলেন, 'সাগর-রুনি মামলার তদন্ত আমাদের সংস্থা করছে না, এটি পিবিআই করছে। তবে অন্য একটি মামলার তদন্ত করতে গিয়ে আমরা কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্লু পেয়েছি। যেমন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে মেজর মোজাফফরের ব্যাপারে আমরা ক্লু পেয়েছিলাম। ঠিক তেমনি সাগর-রুনির বিষয়েও একটি ক্লু পাওয়া গেছে।'
তদন্তের স্বার্থে এখনই ওই ব্যক্তির নাম প্রকাশ করতে চাননি চিফ প্রসিকিউটর। তবে তিনি বলেন, 'একজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের সঙ্গে এই হত্যাকাণ্ডের কানেকশন পাওয়া যাচ্ছে। বিষয়টি আমরা নিবিড়ভাবে যাচাই করছি এবং ওই ব্যক্তির ওপর নজরদারি রাখা হয়েছে। আরও নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া গেলে আমরা পিবিআই-এর তদন্তকারী কর্মকর্তাকে তথ্য দিয়ে সহায়তা করব।' এই মামলাটির বিচার সংশ্লিষ্ট দায়রা আদালতেই হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এদিকে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ও বিশেষ তদন্ত কর্মকর্তা তানভীর হাসান জোহা সম্প্রতি গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডটি ছিল একটি 'স্টেট স্পন্সরড মার্ডার'। তদন্তে দেখা গেছে, হত্যাকাণ্ডের আগে থেকেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি অংশ ঘটনাটি সম্পর্কে জানত।
জোহা জানান, ২০১২ সালের ওই হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে র্যাবের ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের একজন কর্মকর্তা আগে থেকেই অবগত ছিলেন। তদন্তের মাধ্যমে সেই কর্মকর্তাকে শনাক্ত করা হয়েছে। ওই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, হত্যাকাণ্ডের আগের রাতে তাকে জানানো হয়েছিল যে 'কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে' এবং পরদিন সকালে তাকে প্রস্তুত থাকতে বলা হয়। পরদিন সকালে তিনি সাগর-রুনি হত্যার খবর পান।
সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্ত করতে গিয়ে এসব তথ্য বেরিয়ে এসেছে বলে জানান তানভীর হাসান জোহা। তিনি বলেন, জিয়াউল আহসানের কর্মকাণ্ড পর্যালোচনায় কিছু সন্দেহজনক আলামত পাওয়া গেছে, যা থেকে স্পষ্ট হয় যে সংশ্লিষ্টরা এই হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে আগে থেকেই জানতেন। তদন্ত শেষ হলে এসব প্রমাণ ট্রাইব্যুনালে পেশ করা হবে।
আলোচিত এই মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার তারিখ ফের পিছিয়েছে। গত ২৭ আগস্ট ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আরিফুল ইসলামের আদালতে প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য থাকলেও বর্তমান তদন্তকারী সংস্থা পিবিআই তা জমা দিতে পারেনি। আদালত আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর নতুন তারিখ নির্ধারণ করেছেন। এ নিয়ে মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার তারিখ মোট ১২৯ বার পেছাল।
২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাতে রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারে নিজেদের ভাড়া বাসায় খুন হন মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সরওয়ার এবং এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন রুনি। পরদিন ভোরে তাদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
হত্যাকাণ্ডের পর রুনির ভাই নওশের আলী রোমান শেরেবাংলা নগর থানায় মামলা করেন। প্রথমে থানা পুলিশ ও পরে ডিবি পুলিশ মামলার তদন্ত করে। এরপর হাইকোর্টের আদেশে তদন্তভার যায় র্যাবের কাছে। দীর্ঘ সময় র্যাব তদন্ত করার পর ২০২৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর হাইকোর্টের নির্দেশে মামলাটির তদন্তভার পিবিআই-এর নেতৃত্বাধীন টাস্কফোর্সের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
এ মামলায় এখন পর্যন্ত রুনির বন্ধু তানভীর রহমানসহ মোট আটজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্য আসামিরা হলেন— বাড়ির নিরাপত্তাকর্মী এনাম আহমেদ ওরফে হুমায়ুন কবির, রফিকুল ইসলাম, বকুল মিয়া, মিন্টু ওরফে বারগিরা মিন্টু, কামরুল হাসান অরুন, পলাশ রুদ্র পাল ও আবু সাঈদ। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে কয়েকজন বর্তমানে জামিনে রয়েছেন।
